Feature Img
ছবি. নাসিরুল ইসলাম
ছবি. নাসিরুল ইসলাম

মানুষ নিপীড়নের পরিবর্তে স্বাধীনতা চায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্বাধীনতার কথা বলে, কিন্তু স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করে না। গণতন্ত্রের আদর্শটা বেশ দীর্ঘজীবীই বলতে হবে, কিন্তু এর স্বাস্থ্য ও সাফল্য প্রায়ই অনিশ্চিত। আমরা নিজেদের অক্ষমতা ঢেকে রাখার জন্য প্রায়ই বলি দেশে গণতন্ত্রকে সুযোগ দেয়া হয়নি। গণতন্ত্রের নিজস্ব কোন অবয়ব বা প্রাণ নেই। গণতন্ত্র স্বয়ংক্রিয় নয়। এর ভেতরে একটা তারল্য রয়েছে, যে পাত্রে অবস্থান করে সে তার আকার পায়। হুজ্জতে বাঙালের দেশে গণতন্ত্র যে কী ভঙ্গুর হতে পারে তার নিদর্শন আমাদের চোখের সামনে ভাসছে। ব্যাংকে আগুন জ্বালিয়ে, রিকশাওয়ালাকে জীবন্ত দগ্ধ করে, যত্রতত্র বোমা ফাটিয়ে, পটকাবাজি করে এবং বাসে বারুদ ছড়িয়ে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দলীয় নন্দিভৃঙ্গিরা গণতন্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি, অত্যন্ত স্বল্পকালের জন্য ক্ষমতায় আরোহণ করে দ্রুত তাদের পদস্খলন ঘটেছে মাত্র।

ঐতিহাসিকেরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে গণতন্ত্রের তরঙ্গের দেখা পান, তার মধ্যে তিনটি প্রধান উত্থান-পতন ঘটেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বিংশ শতাব্দীর বিশ দশক পর্যন্ত আমরা প্রায় ২৯টি গণতন্ত্রের দেখা পাই। ১৯২২ সালের দিকেই সেই গণতন্ত্রের তরঙ্গে ভাটা দেখা দেয়। গণতন্ত্রের সোপানে আরোহণ করেই ফ্যাসিজম ও নাৎসিজমের জন্ম। ১৯৪২ সালে বিশ্বে গণতন্ত্রের সংখ্যা ১২-তে নেমে আসে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের দ্বিতীয় জোয়ার দেখা যায়। ১৯৬২ সালের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৩৬-এ। আবার ভাটায় সত্তরের দশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা নেমে আসে ৩০-এ। ১৯৭৪ সালের দিকে স্মরণকালের তৃতীয় জোয়ারে আরও ৩০টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। এই জোয়ার আবার ভাটায় নামতে পারে। মধ্য একবিংশ শতাব্দীতে কয়টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বেঁচে থাকবে তার ওপর সাহস করে কে বাজি ধরবে? অর্থনৈতিক সংকটে গণতন্ত্র হারিয়ে যেতে পারে। গণতন্ত্র আত্মহত্যাও করতে পারে। সংকটকাল থেকে যেসব দেশ সংশোধনের চেষ্টা না করে বিভাময় নেতার পেছনে ঘুরে সেখানে গণতন্ত্র তো মৃত্যুপথযাত্রী।

রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধনের ব্যাপারে ও অঙ্গদল সঙ্গে রাখার ব্যাপারে নানা গড়িমসি করে। সাংবিধানিক প্রয়োজনে কোনো কোনো দল সংশোধন করে বড়ো অনিচ্ছায়, শুধু নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের প্রতি তেমন অঙ্গীকার লক্ষ করা যায় না। আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা তেমন বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেনি। এবার নির্বাচন কমিশন যেসব গুরুদায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে, তা পালন করার মতো দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তার চাহিদা মেটাতে হবে, যাতে নির্বাচন আইনের লঙ্ঘন দ্রুত এবং দৃষ্টান্তস্বরূপ কঠোরতার সঙ্গে প্রতিরোধ করা যায়।

বাংলাদেশের চাইতে অশান্তিময় দেশও পৃথিবীতে রয়েছে। তাদের সংখ্যা প্রায় ৩৫। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের স্থান ৮৬, ভুটানের নিচে। আমাদের দেশে প্রায় চার কুড়ি রাজনৈতিক দল আছে, যাদের সাইনবোর্ড ও দলীয় নেতার পোর্টফোলিও ব্যাগ ছাড়া প্রায় কোনো অস্তিত্ব নেই।

আমাদের নির্দিষ্ট তারিখ তফসিলের ব্যত্যয় ঘটে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের কয়েক বছরে। এরপর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভারত বিভাগ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবে নির্দিষ্ট তারিখের ধারণায় বড় তারল্য ঘটে।

দেশের সুশীল সমাজ নির্বাচনের জন্য নানা সংস্কারের সুপারিশ করে আসছে। নির্বাচন কমিশনের কিছু সংস্কার প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণ করে নেয়নি। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত  নির্বাচন কমিশনকে বড় হেনস্তা করা হয়েছে। তার জন্য নির্বাচন কমিশনও কিছুটা দায়ী। ফুটবল খেলা নিয়ে ইংরেজ দর্শকেরা যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে তার চেয়ে আমরা অনেক বেশি অনাচার করে থাকি। মামলা হলেও তার শেষ পর্যন্ত সুরাহা হয় না। সপ্তম সংসদে ভোলার একটি নির্বাচনী এলাকা প্রতিনিধিহীনভাবেই কাটিয়ে দেয়। নির্বাচন আইন ভঙ্গের জন্য তেমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়াও হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে যেভাবে চোখ রাঙায় এবং হম্বিতম্বি করে তার এক সহস্রাংশ করলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় কোন ভদ্রলোক রেফারির কাজ করতেন না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক মাস্তানি সুবিদিত। আমরা কোন কর্তৃপক্ষের শাসন মানতে চাই না। আমরা প্রত্যেকে একেকজন খুদে কর্তৃত্ববাদী। আমাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকৃতকরণের প্রতিভা বিস্ময়কর।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে স্বল্পকালের মধ্যেই বিত্তবান ও উচ্চবিত্তদের জন্য বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশগড়া ও ভাঙার সময় অর্থকরী উদ্যোগের জন্য সে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। চতুর বাঙালি বৈধ ও অবৈধ উপায়ের সর্ব উদ্যোগ গ্রহণ করে। নিম্নবিত্ত ও গরীবদের জীবনে বিজয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে দেশে বিশেষ করে রাজনীতিতে যে বিপ্লব ঘটে যায়, তাতে দেশের মানুষ আবার আশায় বুক বাঁধে। তারা দ্রুত বুঝতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো কেবলই দলীয় লক্ষ্য সামনে রেখে আত্মচিন্তায় মগ্ন। সপ্তম ও অষ্টম সংসদ ওয়াক আউটের জন্য ধুধু মরুভূমির মতো দেখায়। গত দুই বছরে দেশে যতো বাক্য ব্যয় হয়েছে তাদের ডেসিবল ছিল উচ্চমাত্রায়।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কাঠামোটা বড়ই ভঙ্গুর। আমাদের দেশের প্রথম আনুগত্য আত্মীয়ের প্রতি। বাংলা ভাষায় আত্মীয় সম্পর্কের শব্দের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বেশি, প্রায় ২১৫। পরিবারতন্ত্র নিয়ে ইতিমধ্যে নানাজনে সাতকাহন গেয়েছেন। আমাদের দ্বিতীয় আনুগত্য পাড়াগত বা অঞ্চলের প্রতি। শত অপকর্মের মহাজন তার নিজের অঞ্চলে ‘হামার ছাওয়াল’ বা ‘হামার মাইয়া’। সেখানে জনগণ তাঁর অনুগত, তিনি সেবিত এবং প্রচুর ভোট পান।

আর দুর্যোগপ্রবণ দেশে কে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়? তাঁরাই তো তাঁদের সহায়সংগতি! এমন ব্যক্তিদের দলে টানার জন্য কে না চেষ্টা করেছেন। একজন রাজনৈতিক দলপ্রধান বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে হেরে গেলে কোথায় থাকবে আদর্শ?’ সত্যিই তো, নির্বাচনে হেরে যাওয়া ভাবাই যায় না! যেনতেন প্রকারে নির্বাচনে জিততে হবে। যে আদর্শের ধারকেরা মধ্যবিত্তÑনিুবিত্তদের ঘরে বড় অনাদরে বেড়ে উঠেছিল তারা তো এখন দ্রব্যমূল্য ঠেকাতে মুরুব্বিদের ঘরে ঋণের মক্কেল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমাদের প্রশাসনে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্তৃক অধঃস্তন কর্মকর্তা কর্মচারীদের কর্মের তদারকি দিন দিন কমে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রতি যারা আনুগত্য প্রকাশে অতিরিক্ত উৎসাহ প্রদর্শন করেছেন তাদেরকে দল নিরপেক্ষ প্রশাসনের শাসন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে সরকারি সেবা খাতে সিসটেম লস ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পায়। ৩রা অক্টোবর ২০১০ জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হক বলেছেন, বিগত জোট সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সংসদকে জানান, বিগত চার দলীয় জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংঘটিত বিভিন্ন আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম উদঘাটনের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রাণয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি সাব কমিটি গঠন করেছে। সাব কমিটি এসব বিষয় যাচাই বাছাই করছে। এরপর অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করে জনসম্মুখে প্রকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সরকারের ঘোষিত নীতিমালা অনুসারে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের সব গ্রামে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। এ বছরের জুলাই পর্যন্ত ৮৭ হাজার ৩৭২ টি গ্রামের মধ্যে ৪৭ হাজার ৬৮২টি গ্রামে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আইপিপি-রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল প্রক্রিয়ায় নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে ১৪টি কোম্পানির ১ হাজার ২৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি আমদানি ও উৎপাদনে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়ার বিধান রেখে ‘বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে।

বিরোধী দলের সদস্যরা বিল পাসের আগে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিলেও অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকার কারণে তা উত্থাপিত হয়নি। একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিমের জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব অধিবেশনে উত্থাপন হলেও তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

‘বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ এর বিধান অনুযায়ী বিদ্যুৎ বা জ্বালানি আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন বা বিপণন, সঞ্চালনের ব্যাপারে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। এ সংক্রান্ত কোনো কাজে জড়িত সরকারি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা বা কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে গৃহীত যে কোন পরিকল্পনা ও প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার টেকনিক্যাল ও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য সমন্বয়ে প্রক্রিয়াকরণ কমিটি গঠন করবে। উক্ত কমিটি পরিকল্পনাটি প্রাথমিক পর্যায় থেকে প্রস্তাব প্রণয়ন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত বা সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপনের পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে। এই আইনের বিধান অনুযায়ী, সীমিত সময় প্রদান করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে।

প্রক্রিয়াকরণ কমিটি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বা দরকষাকষি করে কাজের জন্য মনোনীত করে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে প্রেরণ করতে পারবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তা বাস্তবায়ন করবে।

সরকারের কথা, দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি দূর করে শিক্ষা, ব্যবসা বাণিজ্য ও গৃহস্থলি কাজের চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিলটি আনা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও গৃহস্থালি কাজের চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জ্বালানি সম্পর্কিত খনিজ পদার্থের দ্রুত আহরণ ও ব্যবহারের দ্রুত সিদ্ধান্ত  নিতে হবে। এ বিশেষ আইনের ফলে নির্বাহী বিভাগের যেমন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হলো তেমনি অনিয়ম প্রতিকারের জন্য আদালতের দ্বার রুদ্ধ করা হলো।

দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি দূর করে শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য ও গৃহস্থালি কাজের চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিলটি পাস করা হয়েছে।

বিলটির ৯ ধারায় বলা হয়েছে, এ আইনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত, আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। ১০ ধারা অনুসারে আদালতের এখতিয়ার রহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এ আইনের অধীনে কৃত বা কৃত বলে বিবেচিত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। দায়িত্ব পালন কালে সরল বিশ্বাসে কৃতকার্যের জন্য কোনো কর্মকর্তা বা কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।

আজ যে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হচ্ছে এই প্রতিবেদনের জ্বালানী খাতের উন্নয়নের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হলেও প্রণোদনার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ, জনপ্রিয়তার জন্য গৃহীত নীতি বাস্তবায়নে সমস্যা এবং সরকারের স্বল্পমেয়াদী কর্মসূচিকে এই খাতের শাসন প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই খাতের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আমলা, বেসরকারি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীর জন্য লাগসই প্রণোদনা, সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দিতে পারে এমন একটি স্বায়ত্তশাসিত রেগুলেটরি কমিটি এবং জনঅংশগ্রহণে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষণায় খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে-সরকারের নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক, অতিদরিদ্রদের খাদ্য পাওয়ার বিষয়ে তথ্যে বিভ্রান্তি, খাস জমি পুনর্বন্টনে দুর্নীতি, চাষাবাদ সামগ্রীর বাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির অকার্যকর ব্যবস্থা ও দুর্বল ক্রয় কাঠমো। এই খাতের উন্নয়নের জন্য নীতি বাস্তবায়নে অতিদরিদ্রদের গুরুত্ব দান, খাদ্যের সহজলভ্যতা প্রতিষ্টার জন্য প্রান্তিক কৃষক ও ভূমিহীনদের ভূমির মালিকানা ও দখল নিশ্চিত করা, তদারকি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বাড়ানো এবং খাস জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে।

ই-গভর্নেন্স অধ্যায়ে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে–ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রতি সরকারের যথেষ্ট আগ্রহ থাকলেও সর্বস্তরে এর অংশিদারিত্বের অভাব লক্ষ্য করা গেছে। এই খাতের উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানিক ও প্রক্রিয়াগত সংস্কারকে জোরদার করাসহ আইসিটি আইন ২০০৯ সংশোধন, ৩০৬ টি করণীয় বিষয়ে তদারকি বাড়ানো, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি, ই-গভর্নেন্স বিষয়টিকে রাজনীতির উর্ধ্বে রাখা, জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবধান কমানো ও গরিব মানুষের জন্য সেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষণায় অভিবাসন বিষযে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, শ্রমিকদের জন্য বিদেশে কাজ করতে যাওয়া ব্যয়বহুল, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নিয়ন্ত্রহীন কার্যক্রম, বিদেশ গমন দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। গবেষণায় অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্বদান, বিদেশের সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উত্তম দরকষাকষি, স্বচ্ছ ও কার্যকর অভিবাসন প্রক্রিয়ার জন্য তদারকি কৌশল উদ্ভাবন এবং বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর সহজ উপায় বের করার সুপারিশ করা হয়েছে।

মনে হয়, দেশ এখন বাজিকরদের হাতে। যেখানে নাগরিকদের কোনো পাওনা বা প্রাপ্য রয়েছে সেখানেই বাজিকররা একটা উৎকট ব্যস্ততায় উন্মত্ত। ভর্তিবাজি, নিয়োগবাজি, টেন্ডারবাজি, দলবাজি, মতলববাজি এত বিভিন্ন ধরণের বাজির রকমফের দেখে দেশের লোক দিশেহারা। যেখানে একটা চতুর্ত শ্রেণীর চাকুরির জন্য তিন লক্ষ টাকা গুণতে হয় সেখানে মেধাভিত্তিক প্রশাসন কেমন করে আমরা গড়ব। বাংলাদেশে এখন দেবী লক্ষ্মী নতুন নন্দীভৃঙ্গিদের কবজায়। দেবী সরস্বতী অধোবদনে চিন্তান্বিতা। আজ চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য নিয়ে নানা তত্ত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয়, তা হচ্ছে রাজনৈতিক ক্যাডাররা নয়,  চীনের মেধাভিত্তিক প্রশাসনই তার উত্থানের প্রধান কারণ।

এক সময় বলা হতো নুতন আইন প্রণয়নের সময় আইন প্রণেতাদের হাত কাঁপা উচিত। সেদিন গত হয়েছে যখন বলা হত নূন্যতম সরকারই শ্রেষ্ঠ সরকার। সমাজের প্রত্যাশা বৃদ্ধির সাথে আইনের তদারকি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আইন প্রণয়ন যদি মুন্সীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সংসদে হ্যাঁ বা না বলেই তা বিবেচনা সীমিত থাকে তবে কর্তার ইচ্ছায় কানুন হবে। আর সে হবে এক বিষম ব্যাপার। বিশেষ আইন চিরকালের হতে পারে না। বিশেষ আইনে একটা উৎকট পত্যয়ের সম্ভাবনা থাকে। আর আদালতের এখতিয়ার ক্ষুন্ন করে কেবল প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার  বিবেচনা করা হলে তা আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে নিয়ে আনবে না। পাঁচ বছরের ক্ষমতায়ন একটা স্বল্পকালীন ব্যাপার। দুই তৃতীয়াংশ ভোট সরকারকে দিশেহারা করে তুলতে পারে। ম্যান্ডেলা তাঁর নির্বাচনের সময় যখন দেখলেন তাঁর জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও লোকে তাকে দুইতৃতীয়াংশ নিরঙ্কুশ ভোটদান করেনি তখন তিনি বলেছিলেন, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ”। গত চল্লিশ বছরে দুই তৃতীয়াংশ ভোট পাওয়া সরকারের আমলগুলো তেমন সুখকর হয়নি। আজ সারা পৃথিবীতে অহংপ্রজন্মের রবরবা। মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ সীমাবদ্ধ করে জনস্বার্থ অক্ষুন্ন রাখাই সরকারের কাজ। আর এত বড় দায়িত্ব পালন করতে হলে সরকারের প্রশাসনকে শুধু দক্ষ ও সমর্থই হতে হবে না অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সকলের প্রতি তাকে ন্যায়পর হতে হবে।

আমরা দেশের প্রশাসনে নাগরিকদের শরিকানা বৃদ্ধি করতে পারি নি। দেশের অভ্যুদয়ের কাল থেকে আমরা সংবিধানে প্রদত্ত স্থানীয় শাসনের বিধান লঙ্ঘন করে আসছি। এ ব্যাপারে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ও আমরা পালন করিনি। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের প্রধান সম্পাদক সাধারণত স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর লক্ষ্য থাকে রাজনৈতিক সংগঠনের দিকে। এখন স্থানীয় শাসনের ক্ষেত্রে সংসদ-সদস্যদের ক্ষমতা অভাবিতরূপে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের নানা ধরনের বেদাত প্রর্বতনা করার চেষ্টা করেছি। একসময় জেলাওয়ারি সংসদ সদস্যের যে খবরদারির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তা অবৈধ বলে আদালত ঘোষণা দেন। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যে অপচয়ের দুর্নাম তা লোকে সমভাবেই কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারে। আমি একবার বলেছিলাম বাংলাদেশের যদি কোনো সাম্রাজ্য থাকত তা হলে সেই বিরাণভূমিতে কোনো উপনিবেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের চারা গজাতো না। গত চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতার পর আমার এ ব্যাপারে মত পরিবর্তন করার কোনো অবকাশ দেখি না।

দেশের প্রশাসন সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত আসতেই পারে। না-থাকাটাই অস্বাস্থ্যের লক্ষণ। তবে সংবিধানে রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে যে সব মূলনীতি লিপিবদ্ধ রয়েছে তা তো আমাদের বিভক্ত চিন্তার ক্ষেত্রে সহজেই একটা মতৈক্য সৃষ্টি করতে পারে। সংবিধান সংশোধন-সম্পাদনের কথা উঠেছে। দেশের সকল নাগরিককে অধিকতর সংবিধান-অনুগ হতে হবে। প্রশাসনে সুশাসনের সুবাতাস বহাতে হবে। প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে দেশের লোকের সেবক নয় তা তারা হাড়ে হাড়ে বোঝে। জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক এটা যে একটা নিছক সাংবিধানিক আপ্তবাক্য নয় তা প্রতিষ্ঠাকল্পে আমাদের কঠোরভাবে ব্রতী হতে হবে। গত চল্লিশ বছরে হনন-আত্মহননে আমরা হিসাবদিহি নীতির যে অবমাননা করেছি তা বড়ই হৃদয়বিদারক।

গত চল্লিশ বছরে তখাকথিত তলাফুটো বাংলাদেশকে নিয়ে নানা আশঙ্কা ও আশা-নিরাশার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে এবং দেশের অভ্যন্তরে। সেইসব গবেষণার একটা সারাংশ একশ পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত করে নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। তা না হলে নাগরিকদের অনীহায় ও অনৌৎসুকে সব পরিশ্রম অর্থহীন হয়ে পড়বে। লোকে ‘থিংক ট্যাংক’কে বাংলা করবে ‘বুদ্ধির ঢেকি’!

৬ই অক্টোবর ২০১০ যাত্রীর সম্মেলন কক্ষে  প্রধান অতিথির বক্তব্য

১১ Responses -- “প্রশাসনের উন্নতিকল্পে কিছু সুপারিশ”

  1. Dr M A Obaydullah

    গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেই কোন সরকান গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। অবশ্যই গণতান্ত্রিক মানসিকতা থাকতে হবে।

    Reply
  2. salim

    বর্তমানে দেশের অরাজক পরিস্থিতি সবাই অনুধাবন করতে পারছে। কিন্তু সাহস করে কেউ কিছু বলতে পারছে না। বিচারপতি হাবিবুর রহমান স্যার সাহস করে সত্য উচ্চারণ করেছেন। জাতি অবশ্যই তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে আজীবন মনে রাখবে। সরকারের উচিত হবে, মানুষের মনের কথা অনুধাবন করে দেশ চালানো।

    Reply
  3. আবাবিল ইয়ামীন

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যি সত্যি প্রেতের আসর জেঁকে বসেছে। উদ্‌ভ্রান্ত জনগন যেমন বানরের খেলা দেখতে পছন্দ করছেন, রাজনীতিকরাও এমনিতর খেলা দেখাতে ক্রমেই পারদর্শী হয়ে উঠছেন বলেই ধারণা হচ্ছে। আমাদের দেশের বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠি রাজনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবেন বলেও মনে হয়না। দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতেই যাদের দিন চলে যায়, পেটের চিন্তা করতেই যারা হিম শিম খান, রাজনীতির মত জটিল বিষয় নিয়ে তাদের ভাবনার সময় কোথায়? বিশেষতঃ রাজনীতির গূঢ় সমীকরণগুলি তাদের কাছে সব সময় দূর্ভেদ্যই থেকে যায়। যার কারণে তারা প্রতারিত হন সবচেয়ে বেশী। আর সেই সুযোগে আমাদের চতুর রাজনীতিবিদরা বস্তাপচা সেকেলে সব প্রেসক্রিপসন চক্‌মকি রাংপাতায় মোড়িয়ে জনগনের উপর চাপিয়ে দেন। মোড়ক খুলেই জনগণ প্রতারিত হবার বিষয়টি জানতে পারলেও তখন আর মুক্তির উপায় থাকেনা। ফলে এদেশে রাজনীতিতে ধোকাবাজির এই ব্যবসাটা অনেকটাই বদ্ধমূল হয়ে গেছে। ব্যাপারটা অনেকটা শসব্যস্ত ক্রেতার কাছে ঠক ব্যবসায়ীর সুযোগ বুঝে পচা, নিম্নমানের ভেজাল পণ্য বিক্রির কারসাজির মত; নয়তঃ গৃহস্থের মুরগী খেকো ধূর্ত শৃগালের মতই মনে হচ্ছে। এদেশে ভোটাভোটির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাত বদলের কথা সংবিধানে বলা থাকলেও মুষ্টিমেয় কিছু চিন্তাশীল মানুষের ভোটের দৌড় রাজনীতির পাল্লার ফ্যার ভাংগাতেই নিঃশেষ হয়ে যায়; পাল্লার দাঁড়ির দিক পাল্টাতে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনা।

    সাধারনের এই নির্লিপ্ততার সুযোগে খাঁটি পণ্যের মন্দা বাজারের মত নির্মোহ রাজনীতিকদের দরপতন সূচক ক্রমেই নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। পেশাদার রাজনীতিকরা হয়ে পড়ছেন অপাংতেও। তাঁরা চকমকিওয়ালা রাজনীতিকদের মাঠ দখলের প্রযুক্তির কাছে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হাতগুটিয়ে বসে পড়ছেন। আর সম্ভাবনাময়ী মেধাবী রুচিশীল মানুষ রাজনীতিকে আর কৌলিণ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতে পারছেন না। সে নানান কারণ! ফলে স্বভাবতই রাজনীতির এ শুন্যস্থান পূরণ হচ্ছে পেশীশক্তি আর কালো টাকা দিয়ে। রাজনীতি একটি জাতির সম্পদ সৌকর্যের সর্বত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে তাকে উন্নতির শিখরে উঠতে পথনির্দেশনা দানের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে; তার মানব সম্পদকে উন্নত শিক্ষা আর প্রযুক্তি দিয়ে গড়ে তুলে সমৃদ্ধ দেশ গঠনে কাজে লাগাবে; রাজনীতির এসব আপ্তবাক্য, এদেশীয় সংস্কৃতিতে অনেকটাই সেকেলে পুথিবাক্য হিসেবে নর্দমায় বিসর্জন দেয়া হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিদেশী শাসক চক্রের তোষামুদে দালাল আর ভাড়াটে গুন্ডা বাহিনী দিয়ে দেশ শাসনের পুরাতন রেওয়াজ রাজনীতিতে পূনর্বাসন করা হচ্ছে।

    ঔপনিবেশিক আমলের শাসকদের সাথে এদেশের সাধারণ জনগনের মধ্যে বাস্তবে কোন সেতু বন্ধন ছিলনা। ফলে শাসকদের উপর জনগনের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন প্রভাব পড়তনা। শাসকদের ইচ্ছাই ছিল জনগনের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। প্রজার আর্তনাদ আর আহাজারী এদেরকে খুব কমই প্রভাবিত করত। আবার ইতিহাসের পাতায় এঁদের অনেকে প্রশংসিতও হয়েছেন তাঁদের প্রজাহিতৈষী কাজের জন্য; নিজ প্রজ্ঞার জোরে নয়তঃ তারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করতেন তাদের সৎ পরামর্শ পেয়ে। কাজেই ভুলের সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। হাজার বছরের গোলামীর পর ৭২-এ দেশটি স্বাধীন হল। স্বাধীনতার পর প্রভু আর দাসের সম্পর্কের অবসান হবে এটাই ছিল ভাবনা। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্রই নীতিহীনতার অবাধ বিস্তার সমাজের চিন্তাশীল মানুষকে হতবিহবল করে তুলেছে। পশুত্বের কাছে মানবতার এ এক চরম পরাজয়। বুদ্ধিজীবী মহল তো শাসকদের পরামর্শ দিয়েই চলেছেন; কিন্তু কাজ হচ্ছে বলে মনে হয়না। কোন প্রেসক্রিপসনেই কাজ না হওয়া যে মৃত্যুর ঘন্টাধ্বনি শুনার সমতুল! আর মৃত্যু যতই যন্ত্রণাদায়ক হোক না কেন তার সংক্ষিপ্ত ব্যাপ্তির কারণে মৃত্যুর প্রতীক্ষাই তার চেয়ে অধিক ভয়ংকর। অবজ্ঞার বিপরিতে বঞ্চনা নিঃসন্দেহে কষ্টদায়ক, কিন্তু প্রত্যাশার বিপরীতে লাঞ্ছ্বনা যে অধিক যন্ত্রণাদায়ক সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। দেশে আজ সেটিই ঘটে চলেছে। চারিদিকে আলোর কোন আভা চোখে পড়ছেনা। এত্থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

    কিন্তু পরিত্রাণ চাওয়ার পিছনেই বা যুক্তিটা কী সেটাও তো বোধগম্য নয়। ভাল কিছু হওয়ার জন্য, তার আগে কিছু ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আছে, কিছু প্রস্তুতি থাকে, তার অবস্থাই বা কি। জন্মলগ্নেই সকল সৃষ্টির ভবিতব্য বিকাশমান রুপের নক্সা (ব্লু-প্রিন্ট) তার কোরে (নিউক্লিয়াস) প্রচ্ছন্ন থাকে। সময়ের সাথে সাথে সে রুপ স্পষ্ট হয়ে অবশেষে পরিপূর্ণতা লাভ করে। এ সত্যটি প্রকৃতি হতে শুরু করে একটি রাষ্ট্রের বিকাশ লাভের ধারা পর্যন্ত সর্বত্রই সমভাবে প্রযোজ্য। এ নিয়মের কোথাও ব্যতিক্রম নেই। ব্যতিক্রম নির্ধারিত হয় শুধু এর নির্দিষ্ট লক্ষ্যে চলার পথে প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধা আর পারিপার্শ্বিক প্রভাবক দ্বারা। ভারতবর্ষ স্বাধীন হল ভারতীয়দের অধিকার আদায়ে নেতৃত্বদানকারী কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার্জনের প্রণোদনাও, বৈষম্য বিরোধী ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের ভিতর নিহিত। ভারত স্বাধীন হবার পর সে দেশের রাজনৈতিক নেতারা দল মত নির্বিশেষে সংঘবদ্ধ হয়ে দেশ গঠনের জন্য গত ৬৩ বছর ধরে যেভাবে কাজ করেছেন, বাংলাদেশকে গঠনের জন্য এদেশের রাজনৈতিক নেতারা গত ৪০ বছরে কাজ করাতো দূরে থাক এক মুহূর্তের জন্যও বিষয়টির প্রয়োজনীয়তার কথা উপলব্ধি করেছেন বলে তাদের আচরণ দেখে তা মনে হয়নি। বরং কলোনিয়াল শাসকদের মত বিভাজনকে উসকে দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পথকে সুগম করতে চেয়েছেন। ব্রিটিশদের তৈরি ঔপনিবেশিক পরাধীন অবকাঠামোর, স্বাধীন জাতির আদলে সংস্কারতো হয়নি, বরং সেটাকে ভেংগে চুরে লেজে গোবরে করে ফেলা হয়েছে।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে পেশীশক্তির ভুত চেপেছে গত ৪০ বছরেরই। এর লালনও চলছে অবাধে। কিন্তু একে যেভাবে তাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে সেটাই আশ্চর্য হবার মত বিষয়! মানুষকে ভুতে ধরলে হয়তো ওঝা দিয়ে ঝাড় ফুঁক দিলে সারবে; কিন্তু রাজনীতির ভুত অতো সহজে যাবার নয়। কারণ এ ভুতেরা দানবীয় শক্তিতে এতোটাই বেশী বলিয়ান যে এরাই এখন সমগ্র দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকাররা এখন শো’ পিস মাত্র আসল নিয়ন্ত্রক এই নেপথ্যের ভুতেরা। তারা খায় দায় সবই করে কিন্তু এদের জবাবদিহিতাও নাই। এরা ক্যামেলিয়নের মত দ্রুত রঙ বদল করতে পারে। সরকারের ক্ষমতা বদলালে এদের ক্ষমতার মাপাংক বৃদ্ধি পায় বৈ কমেনা। এরা কারো কোন চোখ রাংগানীর তোয়াক্কা করেনা। কারণ ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধীদলকে যত না ভয় পায় তার চেয়ে বেশী ভয় করে নিজ দলীয় এই ভুতকে। কারণ এদের মনের মত হয়ে না চললে সরকারকে বিরোধীদল বা জনগন নয় এই ভুতেরাই ক্ষমতা থেকে নামাতে সক্ষম। এতোকিছু জানার পরও কেইবা ঝুঁকি নেয়।

    আমাদের দেশে ভুতের বড় সুতিকাগার তিনটি। (১) শিক্ষা ব্যবস্থা (২) সমাজ ব্যবস্থা ও (৩) রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বিগত ৪০ বছরের লালিত ভুত দমন করতে ৪০ বছর না হলেও কমপক্ষে ২৫ বছর লাগতে পারে। ভুত তাড়ানোর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। আর এপথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে ভুতাক্রান্ত রাজনীতিবিদরা। অভ্যেসগত কারণে তারা কিছুতেই চাইবেন না ভুতের সংগ পরিত্যাগ করতে।

    ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন শিক্ষা ব্যবস্থাতেও যেটুকু মুল্যবোধ ও দেশপ্রেম তৈরির উপকরণ ছিল গত ৪০ বছরে পরীক্ষা নিরীক্ষা আর শিক্ষাবানিজ্য করতে করতে তার সবটুকু ঘ্রাণ উবে গেছে। এখন অবশিষ্ট আছে শুধু খোসা। শিক্ষাপোকরণ, মান সম্পন্ন শিক্ষক আর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে না পারলে জনগনের টাকা খরচ করে আর শিক্ষার বাজেট বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। শিক্ষার ক্ষেত্রে কানা গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভাল; একথাটি শতভাগ সত্য। সমাজ ব্যবস্থায় ন্যায়নীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। কর্ম সংস্থান, সম্পদের সুষম বন্টন, সম্পদে ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তেই জরুরী। রাজনীতিকদের উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাব পরিহার করে, এক টেবিলে বসে দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করতে হবে। দেশের সমস্যা সমুহকে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তার সমাধান করতে হবে। রাজনীতিকদের অবশ্যই যেকথটি মনে রাখতে হবে, তাহল, দানবদের তান্ডবের প্রায়শ্চিত্ব আপনাদেরকেই হবে, তা সে আজ হোক আর কাল হোক।

    Reply
  4. Mahbubur Rahman Manik

    জনার শেলী কে ধন্যবাদ।এতদিন পরে জনসন্মুখে এসে ভাল কিছু বলা এবং পরামর্শ’র জন্য ।

    Reply
  5. জয়শ্রী সরকার

    অন্ধ জনে পথের দিশা বাতলে দিলেই অন্ধের নিরবচ্ছিন্ন পথচলা সম্ভব নয়। আবার তার হাত ধরে ধরে আজীবন চলতে থাকাও অসম্ভব। তাহলে অন্ধজনের হবেটা কি? সে কি আজীবন ঐ পরমূখাপেক্ষী হয়েই পড়ে থাকবে? আমার মনে হয় বেচারাকে বড়সড় কোন সার্জনের হাতে তুলে দিলেই মিলতে পারে উভমুখী নিস্তার। প্রশাসনের উন্নতিকল্পে তাই প্রথমেই দরকার পড়তে পারে উহার সংজ্ঞাবদল। লেখাটি আমাদের হাতে একটা অত্যন্ত মূল্যবান নমুনাচিত্র তুলে দিয়েছে যা আমাদের সামনে প্রশাসনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বর্তমানকে দাঁড় করিয়ে দেয়। লেখাটির মধ্যবর্তী সুপারিশসমূহ আমাদের কাছে এর আগেও অনেকবার অনেকভাবে এসেছে কিন্তু আমরা সম্ভবত এর বাস্তবায়নের কাঠামোটাই দেখতে বেশি আগ্রহী। আমাদের এই বাস্তবায়নের কাঠামোটা নিয়ে ভাববার জন্য আপনার প্রতি একান্ত অনুরোধ রইল। সেইসাথে গণতন্ত্রের হার-জিতকে আলোকিত করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    Reply
  6. Mon Bhalo Nai

    Nothing to say, if all the political parties actually keep 50% of their promises to the general people then it could be a different country. This report is nothing but a real picture of our country. In December 2008 election we thought that the government will do the changes as the promise to the countryman but unfortunately they have shown their natural colour.

    Reply
  7. আবাবিল ইয়ামীন

    তবে রাজনীতির দেহে ক্যান্সার যে পরিমাণে বিস্তৃত হয়েছে, তাতে সাধারণ শৈল্য চিকিৎসা তো দূরে থাক কোন বোর্ড বিশেষজ্ঞদলের সার্জিক্যাল অপারেশন দিয়েও রোগ সারবে বলে মনে হচ্ছেনা। এখন মৃত্যুতেই রোগীর পরম মুক্তি বলে অনুমিত হচ্ছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—