সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় পাটির প্রধান প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দলের অবস্থান সর্ম্পকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলে অনেকের মনে তার প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ বিরাজ করছিল তা ধরে রাখতে পারছেন না। দলের কর্মীরা অনেক সময় জনগণের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না। সাধারণ মানুষ আবার হাসাহাসিও করছেন। তারা অনেকেই খবরের পিছনের খবর সর্ম্পকে ভালোভাবে জানেন না।

জনাব এরশাদ সাহেব যখন প্রধান মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন তখনও অনেকে এ জাতীয় দ্রুত সিদ্ধান্তের রদবদল নিয়ে সমালোচনা করতেন। Chief Martial Law Administration কে অনেকে Cancel My Last Announcement বলে সমালোচনা করতেন। কিন্তু এখন তার পরিচিতি ভিন্ন। তিনি একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা। রাজনীতিবিদদের মানুষ শ্রদ্ধার আসনে দেখতে চায়, কারণ গণতান্ত্রিক ধারায় তাদের প্রজ্ঞা ও মেধা এবং দেশপ্রেম অনেক গভীর ও উঁচুমানের বলে মানুষ মনে করে। তাছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনীতিবিদের ভাবনা ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে জনগণের ভাগ্য নির্ধারিত। তাদের কথায় ও বক্ত্যবে এমন সুর ও আস্থার ভাব প্রতিভাত হলে জনগণের শ্রদ্ধাবোধ গভীর হয়।

তদুপরি, এখন হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে জনমত যাচাইয়ের এক বিশেষ মুহূর্ত। এখানে একজন রিকশাচালক ও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমান ভোটের অধিকারী। যে কোনো হালকা বক্তব্য সমালোচনার পাত্র হয়ে গণতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। তাই আমাদের উৎকণ্ঠা।

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের উপর থেকে জনগণের শ্রদ্ধাবোধ মনে হয় দিনের পর দিন হ্রাস পেতে চলেছে। তারা ক্রমাগত প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ মানুষের, শুধুমাত্র গণমাধ্যমের নয়। এই তো সেদিন, ডিসেম্বর ২, ২০১৩, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে গিয়েছিলেন আগুনে পোড়া মানুষদের দেখতে। পেট্রোল বোমায় দগ্ধ গৃহবধূ গীতা সরকার কাঁদতে কাঁদতে প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে তার আকুতি আর তীব্র ক্ষোভের কথা জানালেন। তিনি বললেন, “আমরা ভালো সরকার চাই, অসুস্থ সরকার চাই না। আমরা আপনাদের তৈরি করেছি, আপনারা আমাদের তৈরি করেন নাই। আপনারা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন।” আরও অনেক বড় বড় কথা বলেছেন গীতা সরকার, “আমরা খালেদারেও চিনি না, হাসিনার কাছেও যাই না।” (প্রথম আলো, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৩)

সাবলীল অথচ এমন জোরালো ভাষায় জনতার উৎকণ্ঠা কেউ ইতোপূর্বে প্রকাশ করেছেন কিনা, আমাদের জানা নেই। একজন প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে তাঁর মুখের সামনে এমন নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরতে পারেন একজন গৃহবধূ, আমরা অনেকেই ভেবেও দেখিনি কোনোদিন। গীতা সরকার বলেছেন, “আমরা আপনাদের তৈরি করেছি”– এ যেন মনে হয় এব্রাহাম লিঙ্কনের মহান উক্তির প্রতিধ্বনি– ‘জনগণ সরকার গঠন করে’।

আপনারা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন, এমন কথা সম্ভবত বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জের আপামর জনগণের মনের কথা যা অতি সহজে গৃহবধূ গীতা সরকার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে বলে দিলেন নির্ভয়ে। এরই নাম হচ্ছে জনতার কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের জনগণ এখন অনেক সচেতন, তারই প্রতিধ্বনি হয়েছে এক গৃহবধূর কথায় ও ভাবনায়। ভাবতেও ভালো লাগে, সম্ভবত গণতন্ত্রের এখানেই শিক্ষা ও সাফল্য।

বাস্তবে এদেশের জনগণ চায় একটি ভালো সরকার। কোনো প্রকার অসুস্থ বা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে বিব্রত দিশাহীন কোনো সরকার নয়। সরকার দেশ পরিচালনায় সাবলীল গতি ও প্রকৃতি ধারণ করতে ব্যর্থ হবে, সুশাসনের নিদর্শন হবে তিরোহিত এবং প্রশাসন দুর্র্নীতিতে হবে ভারাক্রান্ত– দেশবাসী এমনটি আশা করে না এবং এরই নাম আসলে অসুস্থ সরকার। এমন সরকার চায় না দেশবাসী এবং দুর্বল রাজনীতিও আশা করে না। তাই ১৯৯১ সালের পর প্রতিবারই সরকার বদল হয়েছে নির্বাচনের মাধ্যমে। জনগণের ধারণা হচ্ছে, রাজনীতিবিদেরা তাদের প্রত্যাশা পূরণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, প্রত্যাশিত পথে চলছে না। তাই উচ্চারিত হচ্ছে বারবার– আমরা ভালো সরকার চাই, চাই সুশাসনের নির্দশন।

ভালো সরকার পেতে হলে ভালো নেতার প্রয়োজন হয়। জনগণ এখন ভালো নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছে। এ ক্রান্তিলগ্নে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি যেভাবে কথা বলছেন এবং অনেক বড় বড় নেতা যেভাবে ভাষণ দিচ্ছেন জনগণ হতাশ হচ্ছে। আস্থা পাচ্ছে না দেশের ভবিষ্যৎ এ জাতীয় নেতৃত্বের কাছে। যে কোনো দেশের জন্য রাজনীতিবিদের উপর থেকে এমনভাবে আস্থা হারানো কোনো শুভলক্ষণ নয়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অনেক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, আর্থিক অঙ্গনে, সামাজিক মূলধন সৃষ্টিতে। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি তৃতীয় বিশ্বের জন্য উদাহরণ। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে এমন অর্জন বিস্ময়কর। শিক্ষাখাতে অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দারিদ্র বিমোচনে উৎকর্ষ সাধন, বৈদেশিক মুদ্রা উপাজর্নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের শ্রম এবং তৈরি পোশাক শিল্পের অভাবনীয় সাফল্য সমগ্র বিশ্বের নজর কেড়েছে। এতসব অগ্রগতি ও অর্জনে রাজনীতিবিদদের উল্লেখযোগ্য অবদান আছে বলে অনেকেই মনে করেন না।

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ূ বেড়ে এখন হয়েছে ৬৮ বছর যা ১৯৭২ সালে ছিল চল্লিশ বছরের নিচে। মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়ে উপনীত হয়েছে প্রতি লক্ষে ১৯৪, যা ছিল ৬৫০ এর অধিক। তেমনিভাবে শিশুমৃত্যূর হার হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে প্রতি হাজারে ৩১ যা ছিল প্রায় ১৫০ জন। প্রজননহার কমে হয়েছে ২.৩, যা ছিল ৬ এর অধিক। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও সংক্রামক ব্যাধি নিবারণে জনগণ সক্ষমতা অর্জন করেছে। এ সবই হচ্ছে বড় প্রাপ্তি।

এমনসব উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির অন্যতম কারণ হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং প্রচুর ছোট-বড় বেসরকারি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের অমূল্য অবদান। তেমনিভাবে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়ে উন্নীত হয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ এবং মহিলাদের শিক্ষাঙ্গনে পদচারণা চমক সৃষ্টি করেছে।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করত, সেই হার বর্তমানে হ্রাস পেয়ে হয়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এ খাতে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, প্রশিকাসহ নারীদের দ্বারা পরিচালিত বেসরকারি সংগঠনসমূহের অবদান অমূল্য ও অসাধারণ। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসমূহ এ ক্ষেত্রে ব্যাপক কৌশলগত ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৪০ লক্ষ মহিলা কর্মী নিয়োজিত আছেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে এ খাত প্রায় ৬৭ শতাংশ অবদান রাখছে। স্মরণ করতে হয় প্রয়াত সচিব নুরূল কাদের খানের অবদান যিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এ খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং প্রতিযোগিতায় আজ বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এজন্য বেসরকারি মালিকানাধীন উদ্যোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের বিশেষ ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য।

পক্ষান্তরে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সরকারে অধিষ্ঠিত ক্ষমতাসীনেরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও দলবাজি করে অগ্রগতির ধারা ব্যাহত করেছেন এবং সুশাসনের পরিবেশ বিঘ্নিত করে আমলাতন্ত্রকে দুর্বত্তায়নে বাধ্য করেছেন। কোনো কোনো মন্ত্রী পিয়ন ও দারোয়ান নিয়োগে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতা অপহরণ করেছেন। যেমন হয়েছে খাদ্য বিভাগে, তেমনি হয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগে। এ কারণেই উচ্চ আদালত প্রায় পাঁচ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে সম্প্রতি। রাজনীতিতে নিবেদিত কালো বিড়ালেরা সমগ্র দেশে অনেক ক্ষেত্রে অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি করেছেন। এসব কাহিনি এত ব্যাপক এবং বিস্তৃত যে যাকে সংক্ষেপে বলা যায় গণতন্ত্রবিরোধী এবং অসুস্থ সরকারের প্রতিচ্ছবি।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের রাজনৈতিক দৈন্যতা দেখে আমেরিকা ও ভারত থেকে বিভিন্ন স্তরের কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ আসছেন, আমাদের সর্বোচ্চ স্তরের নেতাদের পরামর্শ দিতে এবং তাদের জ্ঞানের ভাণ্ডারে কিছু সংযোজন করতে। হয়তো-বা কখনও ধমকের সুরে কিছু বলছেন, আবার কখনও শিক্ষকের ভূমিকায়। এ লজ্জ্বা রাখব কেমন করে! বাংলাদেশের বেশ কিছু জ্ঞানী-গুণী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক সন্মানের আসনে আসীন আছেন। সেখানে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের দৈন্যদশা উপহাসের পাত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়ে সমগ্র জাতিকে লজ্জা দিচ্ছে।

রাজনীতিবিদদের কাছে অনুরোধ থাকবে– জনগণের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করুন এবং তাদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা আদায়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে এমন কাজ করুন। ইতিহাস আপনাদের স্মরণ করবে যুগ যুগ।

ধীরাজ কুমার নাথউপদেষ্টা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার

২২ Responses -- “পরিবর্তনশীল এরশাদ ও রাজনীতিবিদদের প্রতি শ্রদ্ধা”

  1. মৃদুল রায়

    লেখককে ধন্যবাদ যে তিনি একজন ব্যাক্তিকে দিয়ে বর্তমান রাজনীতির অবস্থা তুলে ধরেছেন- যে অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি চায়।

    Reply
  2. কাইয়ুম

    আমরা যা বলতে পারি না তা আপনি এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। জনগণের মনের কথাগুলো বলেছেন। আসলে আপনি-আমি মুখে যাই বলি না কেন, বর্তমান রাজনীতিবিদরা তা কি মনে করেন?

    স্যার, আপনাকে ধন্যবাদ এই মতামত প্রকাশের জন্য।

    Reply
  3. Latif

    সত্যি বলতে কি ভাই, আমরা যতই কথা বলি আর লেখালেখি করি না কেন, এসব লেখা কি ওই সকল নেতানেত্রীরা দেখেন না পড়েন? সো মিছেমিছি কষ্ট। আর যে সকল নেতারা পড়বেন তারা কি এসব কথা তাদের নেতাদের কানে দেন নাকি? দিলে তো সারছে। তোষামোদি কাঁধে উঠবে না!

    সরি ভাই, এসেছিলাম বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে। তবে সারাক্ষণ মন থাকে দেশে পড়ে। লেখাপড়ায় একটু মন দিতে পারছি না, বিশ্বাস করুন। খুব দুঃখ হয় এদিকে দেশের অবস্থা দেখে।

    Reply
    • Aniket Sumon

      প্রিয় লতিফ ভাই,

      আপনি তো দূরে থেকে দুঃখ পাচ্ছেন। আর আমরা এখানে প্রতি মুহূর্তে প্রাণের ভয় করছি। রাজনীতিবিদরা আমাদের জীবন অতীষ্ঠ করে তুলেছেন। আমাদের এখন দরকার একঝাঁক নতুন রাজনীতিবিদ যারা হবেন আধুনিক ও সভ্য, আপনি বাইরের জগতে যেমনটি দেখছেন। তারা লোভী হবেন না। আর হবেন না না দুর্নীতিবাজ।

      দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের নির্মূল করার জন্যই আমাদের এখন উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

      Reply
  4. সুব্রত ভৌমিক

    একটি সময়োপযোগী লেখা। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের দীনতা, নির্বুদ্ধিতা ও কুপমণ্ডুকতা একটা দেশের জন্য কতুটুকু ভয়ানক হতে পারে লেখাটি পড়লে বুঝা যায়।

    লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করি এ বিষয়ে ভবিষ্যতে তিনি আরও লিখবেন।

    Reply
  5. Swapon K. Shil

    এই আর্টিকেলের টপিকটি এ সময় খুবই জরুরি। রেফারেন্সগুলোও খুব সত্যি। ধন্যবাদ আপনাকে মূল্যবান এ লেখার জন্য। আপনার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বলতে পারি–

    ‘‘রাজনীতিবিদদের কাছে অনুরোধ থাকবে–- জনগণের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করুন এবং তাদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা আদায়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে এমন কাজ করুন। ইতিহাস আপনাদের স্মরণ করবে যুগ যুগ।’’

    Reply
  6. Dr. Kazi Nurun Nabi

    পরিবর্তনশীল এরসাদকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। এ যেন আমাদেরই মনের কথা।

    Reply
  7. ডাক্তারবাবু

    আপনার লেখা ভালো হয়েছে। তবে দুয়েক জায়গায় পড়তে গিয়ে একটু ভিন্ন চিন্তা এসেছে। হয়তো মনের ক্ষোভের জন্যই।

    “… অনেকের মনে তার প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ বিরাজ করছিল তা ধরে রাখতে পারছেন না।”

    –তার প্রতি কারও কোনো শ্রদ্ধা ছিল কখনও? থাকলে সেই ব্যক্তি নিজেই শ্রদ্ধার পাত্র, তবে বোকা।

    ” রাজনীতিবিদদের মানুষ শ্রদ্ধার আসনে দেখতে চায়, কারণ গণতান্ত্রিক ধারায় তাদের প্রজ্ঞা ও মেধা এবং দেশপ্রেম অনেক গভীর ও উঁচুমানের বলে মানুষ মনে করে। তাছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনীতিবিদের ভাবনা ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে জনগণের ভাগ্য নির্ধারিত। তাদের কথায় ও বক্ত্যবে এমন সুর ও আস্থার ভাব প্রতিভাত হলে জনগণের শ্রদ্ধাবোধ গভীর হয়।”

    — দেখতে চায় পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু তার পরের কথাগুলো শুধুই তাত্ত্বিক এবং হাস্যকরও বটে।

    ” … শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়ে উন্নীত হয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ এবং মহিলাদের শিক্ষাঙ্গনে পদচারণা চমক সৃষ্টি করেছে।”

    — একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হয়ে আমি প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি শিক্ষার কী দৈন্যদশা … এই ধরনের শতকরা একশতভাগ শিক্ষিতের চেয়ে বরং আগেকার দিনের মতো ২৫-৩০% শিক্ষিত হলেও দেশ বদলে যেত।

    তাই বলে আমি চাই না যে শিক্ষার হার কমে যাক। আমি বলতে চাই, সংখ্যার চেয়ে মানের দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত। তাহলেই আপনি অন্য যেসব পরিবর্তন আশা করছেন বা আফসোস করছেন তা দেখা যাবে।

    Reply
    • ahmed faisal

      শ্রদ্ধেয় ডাক্তার স্যার, আপনি সরলীকৃত মন্তব্য করেছেন। উচ্চশিক্ষিতরাই ভুল করছে বেশি, যার কুফলে স্বল্পশিক্ষিতরা ব্যবহৃত হচ্ছে আর অশিক্ষিতরা বলি হচ্ছে।

      প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বা ক্ষমতাধর আমলা বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের যথার্থ গাইডেন্স কখনও দেন না উচ্চশিক্ষিতরা। বলেন না দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্নীতি। কৃষক সহজে পায় না ঋণ, সার-সেচ, ফসলের মূল্য; দিতে পারে না খাজনা ঘুষ ছাড়া; পরিবহণ শ্রমিক পথে পথে ঘুষ-চাঁদা না দিয়ে গাড়ি চালাতে পারে না; কৃষিপণ্য পৌঁছানো যায় না শহরে; শহরের ফুটপাত আর রাস্তা বেদখল করে পুলিশ-রাজনৈতিক কর্মীরা করে ঘুষ-চাঁদাবাজি, ভিক্ষুকের কাছ থেকেও ঘুষ নেয় তারা, যার ভাগ চলে যায় অনেক বড়লোকের পকেটে। আপনি রেলের টিকেট বা বড় হাসপাতালের সিট পাবেন কি তাদের বখরা না দিয়ে?

      এসবের বিরুদ্ধে কতটুকু সোচ্চার উচ্চশিক্ষিতরা? বরং নিজের টিকেটটাও তদবিরের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন, বলেন না সিস্টেম উন্নত করতে।

      আর সরকার ভালো কিছু করলেও স্বীকার করেন না। শাখা রেললাইন তুলে দিয়ে, কৃষিতে ভর্তুকি তুলে দিয়ে বিশ্ব ব্যংককে খুশি করেছিলেন মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব। আর বর্তমান সরকার রেলের উন্নতি করে, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে, দোতলা বাস কিনেও এতটুকু স্বীকৃতি পায়নি। অথচ স্বীকৃত দিলে এসব উন্নয়ন টেকসই হত এবং পরবর্তী সরকার বাধ্য হত আরও উন্নতি করতে।

      অন্যদিকে সরকারি দল ঘুষ-দুর্নীতি দূর করতে যথেষ্ট সচেষ্ট না হওয়ায় সাধারণ মানুষ সব ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করতে অপারগ হচ্ছে।

      মৌলবাদীরা ক্ষমতার ভাগ আর অর্থ কামাইয়ের পথ করতেই ব্যস্ত। আর তাই সুদ-ঘুষ-খুন-দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটা কথাও না বলে একাত্তরের খুনি-ধর্ষকদের বাঁচাতে ব্যস্ত …..

      Reply
  8. Aniket Sumon

    এই আর্র্টিকেলের বিশ্লেষণটি বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ লোকের কণ্ঠস্বর। মি. নাথ যথাযথভাবেই আমাদের সেন্টিমেন্ট ও চিন্তা তুলে ধরেছেন। আপনার ব্রিলিয়ান্ট কলামের জন্য ধন্যবাদ।

    Reply
  9. সামির

    আপনাকে ধন্যবাদ, অসাধারণ একটা লেখা। রাজনীতিবিদরা জনগণকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে জানে না, এটাই জাতির একটা বিশাল লজ্জা। সাধারণ জনগণ সংকট মোকাবেলার কথা বলে আসছে বার বার কিন্তু তারা এটা আমলে নেন না, বরং বিদেশিরা কী আহামরি যে তারা আসেন তাদের জ্ঞান দিতে!!!

    রাজনীতি যারা করে তাদের একটা কথা বলব খুব সহজে। বাংলার জনগণকে আর গাধা ভাববেন না, দিন পাল্টে গেছে।

    Reply
  10. ahmed faisal

    এরশাদ ফার্স্ট বয় ছিলেন (রওশন ফার্স্ট লেডি), হতে পারে অবৈধ পথে! আর এখন থার্ড পলিটিক্যাল পার্টির নেতা। ফার্স্ট থেকে থার্ড হওয়ার পরে কেউই স্বাভাবিক থাকতে পারে না।

    এখন এরশাদ শুধুই তাঁর অতীতের সুখকর স্মৃতি ভেবে দুঃস্বপ্ন দেখেন! ফার্স্ট-সেকেন্ডরা অহেতুক পাওয়ার ব্যালেন্স করতে থার্ডকে টানেন!

    ফার্স্ট-সেকেন্ড দুটির যে কোনো একটি বা দুটিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় হলে, স্বাধীনতার চেতনায় কমিটেড হলে, নিজ দলের অভ্যন্তরে এবং সংসদে গণতন্ত্রমনা হলে দ্রুত দেশ শান্তিময় হবে, আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

    Reply
  11. Bashar

    আমরা দুঃখিত মাননীয় PM এবং Ex-PM…

    জনাব এরশাদ, এতদিন আপনাকে অপছন্দ করতাম। কারণ আপনার পরিবর্তনশীল কৌশলের জন্য। স্বৈরাচার এখন আর আপনি একা নন। এবার আপনি আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। তাহলে দেশের অনেক উপকার হবে।

    Reply
  12. Dipak Kumar Sarker

    সঠিক আলোচনার মাধ্যমে সত্য তুলে ধরার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    সত্যিই, আমাদের নেতারা শ্রদ্ধা হারাচ্ছেন দিন দিন। জনগণ মনে করে, তারা রাজনীতি করেন দুর্নীতি করার জন্য, জনগণের কল্যাণের জন্য নয়। আগামী দিনগুলোও এভাবে চলতে পারে না। কিছু পরিবর্তন অবশ্যই দরকার, সেটা খুব জরুরিভাবেই।

    লেখককে ধন্যবাদ ঠিক জায়গায় নির্দেশ করার জন্য। আর সঠিক সময়ে যথায়থ এক্সপ্রেশন ও ভাষায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে।

    Reply
  13. junaid ahemd

    ওয়ান্ডারফুল রাইট-আপ… এ যাবতকালে যা দেখলাম তাতে মনে হল এটাই…. বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একমাত্র ঈশ্বরই এই জাতিকে রক্ষা করতে পারেন। কারণ কেউ জানে না কীভাবে এই সংকট কাটবে।

    বস্তুত, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি এখানে কারও মোটেই আস্থা নেই।

    এ রকম উচ্চমানের একটি আর্টিকেলের জন্য লেখককে ধন্যবাদ।

    Reply
  14. জাহিদ হোসেন

    আপনি ঠিকই বলেছেন রাজনীতিবিদদের বর্তমান দৈন্যদশা সম্পর্কে। এদের অবস্থা দেখে বড়ই করুণা হয়। বিরোধী বা সরকারি উভয় দলের নেতা জাতীয় লোকদের এখন খুবই করুণ সময় যাচ্ছে। বিরোধীরা আছেন কখন তাদের বাসায় এসে পুলিশ হানা দেয় আর সরকারি দলের নেতারা ভাবছেন নিকট ভবিষ্যতের কথা। কারণ এমন ভালো কাজ করেন নাই তারা যে ক্ষমতাহীন হওয়ার পরে সাচ্ছন্দ্যে দিণাতিপাত করবেন।

    আমাদের দেশের মূল সমস্যা হল রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সমস্ত টাঊট বাটপাড় শ্রেণির লোকেরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কারণ একটাই, তা হল অল্প সময়ে প্রচুর অর্থ ও নাম কামানো। তাই যত শর্টকাটে নেতা হওয়া যায় ততই বিত্তের হাতছানি। অতএব এদের কাছ থেকে যা পাওয়ার কথা তাই পাওয়া যাচ্ছে। এদের চিন্তাটাই অসুস্থ, তাই অসুস্থ রাজনীতি ছাড়া আর কী-ই-বা আমাদের আশা করা উচিত তাদের কাছ থেকে?

    এই রাজনীতি যে অসুস্থ তারই প্রতিফলন ঘটেছে সেই আগুনে আহত গীতা সরকারের মুখ থেকে। একথা সারা দেশের মানুষের মনের অবস্থার প্রকাশ।

    এরশাদ হল সেই রকম একজন যাদের হাত ধরে এদেশের রাজনীতির অবনতি হয়ে গেছে। তাই তার অবস্থানের পরিবর্তন বার বার একটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না। আমরা তাতে কিছু মনে করলে তার কিছু আসে যায় না এবং তিনি তাতে মাইন্ডও করেন না। কারণ উনার কোনো হায়া (লজ্জা) আছে কিনা তা এই বিশ্বে কারও জানা নেই।

    Reply
  15. Rashed

    আমি আপনার কথায় একমত। ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত (শেখ মুজিবর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ) দেশগড়ার একটা ইতিহাস আছে। কিন্তু ১৯৯১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কি সেই রকম কোনো ইতিহাস আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারবে বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো?

    আমরা জনগণ তাঁদের কাছে কী পেলাম?

    Reply
  16. Kibria Zahid Mamun

    রাজনীতিবিদদের জনগণের ভাষা বুঝবার নিষ্ফল আবেদন করেছেন আপনি। ৪৩ বছর যারা এটা বোঝেনি তারা তা আজ বুঝবে কী করে ভাবলেন? জনগণের ভাষা বুঝবে এটার বিস্লেষণ করতে গেলে আরব্য রজনীর উপন্যাসের মতো এক হাজার রাত পেরিয়ে যাবে!

    জনগণের ভাষা বুঝতে গেলে আইনকে সবার উর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। সেটা কি এই দেশে হয়েছে? খালেদা-হাসিনাদের নামে শত শত মামলা। কারও গায়ে আইন হাত দিতে পারে না। দিতে গেলে আইন উড়ে যায়। আর আমি জনগণ ৫০০০ টাকা বকরি পালনের জন্য ঋণ নিলে তাতে পুলিশ আমার কোমরে দড়ি লাগায়!

    তবে কী দাঁড়াল? বঙ্কিমচন্দ্রের হাড়গোড় কবরে আছে কিনা সন্দেহ কিন্তু তার সে বাণী আজও অক্ষত– ‘আইন সে তো তামাশা মাত্র’।

    শত গীতা সরকার আগুনে পুড়তেছে, আমরা কপাল চাপড়াচ্ছি। মজার বিষয় হল, কাল যদি ভোট হয় আমরা বগল বাজাতে বাজাতে ভোট কেন্দ্রে যাব, ভুলে যাব গীতা সরকারকে এই পাপের রাজনীতি পুড়িয়েছে। তারপর পাঁচ বছর ৩০০ ফুটবল প্লেয়ারের লাথি খাব ফুটবলের মতো। গীতা সরকার কেন পুড়ল, তার ক্ষতিপূরণ নাথিং। সান্ত্বনার বানী– সাবধানের মার নেই।

    গীতা সরকার নূর হোসেনের মতো দেয়ালের ফটোফ্রেমে উঠবে। মধ্যরাতের এনজিওবাজ বুদ্ধিজীবীদের রেফারেন্স হবে। প্রশ্ন হল, গীতা সরকারের পোড়া শরীর মারিয়ে আমরা ভোট দিতে যাই কেন?

    কারণ আমরা ৯০% মুসলিম, ১০০% করাপটেড= বাংলাদেশ।

    আমাদের গণতন্ত্র, ইসলাম, বাইবেল, গীতা, বুদ্ধিজম– সবকিছু মুখোশ। মুখোশের নিচে করাপটেড বাঙালি। যা খুঁজে পেয়েছিলেন ব্রিটিশ বাবু। ২০০ বছর আগে লিখেছিলেন– ‘গণ্ডারের যেমন শিং-এর সঙ্গে সম্পর্ক, তেমনি আমাদের দুর্নীতির সঙ্গে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—