Feature Img

begum-mushtari-shafi4(1)আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এতে আমি অত্যন্ত খুশি। আমি আন্তরিকভাবে খুশি, কারণ এই মানুষটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গণহত্যাসহ নানা নির্যাতন চালিয়ে চট্টগ্রামের সব মানুষের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল।

১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল আমার স্বামী ও ভাইকে স্থানীয় রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়। এরপর যখন তখন শহরের এনায়েত বাজারে এই বাড়িতে আর্মি হানা দিত। তারপর আমি ভারতে চলে গেলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরলাম। নিজের বাড়িতে এলাম। দেখি সমস্ত বাড়ি খা খা করছে। সবকিছু লণ্ডভণ্ড। আমাকে দেখে কয়েকজন প্রতিবেশি আমার বাড়িতে আসেন। তাদের মুখে শুনলাম চট্টগ্রামে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পরিবারের নৃশংসতার কথা।

ভারতে থাকাকালীন সময়েও শুনতে পেয়েছিলাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার ভাই গিয়াস কাদের চৌধুরী চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। তারা যাকে তাকে ধরে নিয়ে যেত।

চট্টগ্রামে ফেরার পর জানতে পারি আমার বাড়ি আলবদর বাহিনী দখল করে নিয়েছিল। এই বাড়িতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মাঝে মাঝে আসত। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এখানে রাখত। নির্যাতন করত আর পরে তাদের বাড়ি গুডস হিলে নিয়ে যেত। পরে জেনেছি একাত্তরে অনেককে মেরে ফেলেছিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

রাউজানের কুণ্ডেশ্বরীর নূতন চন্দ্র সিংহ অত্যন্ত দয়ালু ও ভালো মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী অত্যন্ত নির্মমভাবে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করেন। এটা অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। চট্টগ্রামে আরও অনেককে সে নির্যাতন করেছিল। এক পর্যায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পালিয়ে যায়।

বাংলাদেশে ঘাতকদের বিচারের জন্য স্বাধীনতার পর আমরা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করি। রাজাকারদের বিচারের জন্য রাজপথে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি আমরা। সরকারকেও আবেদন জানাই। কিন্তু কিছুই হয়নি।

অবশেষে বর্তমান সরকারের আমলে একে একে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়। প্রত্যেকের বিচার শুরু হয়। সব রাজাকারের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

অনেক পথ পেরিয়ে আজ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় হয়েছে। সকাল থেকে অপেক্ষায় ছিলাম কখন রায় হবে। রায়ে আমি সন্তুষ্ট। কিন্তু যতদিন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হবে ততদিন শান্তি পাব না। রায় কার্যকর দেখে যেতে চাই। আশা করি সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও রায় কার্যকর হবে।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ভীষণ অহমিকাপূর্ণ একজন মানুষ। সে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও সে অনেক বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা বলেছে। সে কয়েকবার সাংসদ ও মন্ত্রী হয়েছে। সে ক্ষমতায় গেছে কিন্তু কোনোদিন মানুষের কোনো উপকার করেনি।

স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর এ রায় পেলাম। তবে যারা বিচার চেয়েছিলেন তাদের অনেকে এ রায় দেখে যেতে পারলেন না। চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ আজ মনেপ্রাণে খুশি হয়েছে। তাদের খুশিতে আমি নিজেও প্রাণ পাচ্ছি।

দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রামের পর এ রায় বেশ অনেকটাই অর্জন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার সঙ্গে নির্যাতনের সঙ্গে যেসব রাজাকার-আলবদর জড়িত তাদের সবার বিচার হওয়া উচিত।

আশাবাদের পাশাপাশি আশঙ্কাও আছে। তাই পরিপূর্ণ শান্তি পাচ্ছি না। রায় কার্যকর না হলে ভীষণ খারাপ হবে। শেখ হাসিনার সরকারের মেয়াদকালে যদি বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণা ও কার্যকর না হয় তবে কী হবে জানি না। আশঙ্কা থেকে যায় বিএনপি বা অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে দেশের অবস্থা খুব খারাপ হতে পারে।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। কিন্ত তাদের মনে দেশপ্রেম আছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারেই কেউ কেউ না কেউ শহীদ হয়েছেন। তাই তরুণ প্রজন্ম আজ হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেছে। গণজাগরণে তারুণ্যের জয়যাত্রা দেখে আমি খুব আনন্দিত। সব রাজাকারের বিচার শেষ হলেই তরুণরা শান্ত হবে।

তারপর তরুণরা সুন্দরভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

বেগম মুশতারি শফি : শহীদজায়া ও চট্টগ্রাম উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি।

Responses -- “রায় হয়েছে রয়ে গেছে আশঙ্কা”

  1. জাহিদ হোসেন

    রাজাকারদের বিচার একটা পুরানো ঘটনা হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ এই বিচারের বয়স এখন সর্বনিম্ন ত্রিশ বছর হতে পারত। রাজকারদের অবস্থান আসলে দেশব্যাপী ছিল। তাই যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে ওদের বিচার হলে এত কাহিনী আজ শুনতে হত না। কিন্তু তা হ্য়নি, বরং স্থান-ভেদে অনেক বড় বড় রাজাকার পালিয়ে রক্ষা পেয়ে গেছে এবং অনেকে আবার হয়তো তখনকার ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়তার সুবাদে পার পেয়ে গিয়েছে যা আসলে আমাদের দেশে হরহামেশাই ঘটে থাকে।

    সবচে’ বড় ব্যাপার হল সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা। এই বিষয়ের উপরে ইশারা করেই এক যুদ্ধাপরাধী, পরবর্তীকালের মন্ত্রী বলল যে, এ দেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। সাধারণ ক্ষমা মানে সবার জন্যে এক। এখানে ছোট বড় বলে কোনো কথা নেই। তাই তারা এমন বলছে এবং তাদের দোসরগণ একই দোহাই দিচ্ছে, আর বলছে এটা সরকারের একটা রাজনৈতিক কূটকৌশল বা নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার একটা বিশাল ইস্যু। একথা এখন আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি যে এটা আসলেই একটা নির্বাচনী মুলা যার ব্যবসা ছাড়া– একটি দল মনে করছে‌– ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না।

    আর বিরোধীরা মনে করছে এই ব্যবসা ওদেরকে করতে দেওয়া যাবে না, তাহলে দেশ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে। অথচ দুই দলই মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত। প্রথম দলের ভুল হল এদের ক্ষমা করে দেওয়া, আর দ্বিতীয় দলের ভুল হল তাদেরকে আশ্রয় দান করা। অর্থাৎ শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু। এই একটা ইস্যু জাতিকে আসলেই কার্যত দুভাগ করে দিয়েছে।

    একদল এদের মৌলবাদী ঘরানার সব ভোট ব্যাংক কিনে নিয়েছে, আরেক দল এদেরকে চেষ্টা করছে কোন পদ্ধতিতে নিজেদের কাছে ভিড়ানো যায়। প্রথম দলটি আর একবার ক্ষমতায় গিয়েছিল এই শ্রেণির প্রত্যক্ষ মদদে। তখন তারা এই রাজাকারদের বিচার করেনি। এবার কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কারণ এরা এদের বিচার করবে এই ওয়াদা করে ক্ষমতায় এসেছিল। তাই তাদের বিচার একেবারে ক্ষমতার শেষ প্রান্তে এসে করল।

    এটা আমি কসম কেটে বলতে পারি এবার দ্বিতীয় দলটিই ক্ষমতায় আসবে এবং দণ্ড দেওয়া সব রাজাকারদের ছেড়ে দেওয়া হবে। আর এটাই হবে প্রথম দলটির সবচে’ বড় হাতিয়ার বিরোধী দলে গিয়ে আন্দোলন করার আর পরবর্তী নির্বাচনের একটা প্রধান ইস্যু সৃষ্টি করার।

    মোট কথা, কোনোভাবেই দেশের মানুষকে শান্তিতে কাজ করতে দেওয়া হবে না। এগুলো হল আমাদের রাজনীতিবিদদের অনেক পুরনো ‘রাজনীতি রাজনীতি’ খেলা, যা তারা মনে করে সাধারণ কেউ বুঝে না।

    বাংলাদেশ এই ভাঁওতাবাজির কবল থেকে কবে যে মুক্তি পাবে তা শুধু অনাগত ভবিষ্যৎই বলতে পারে। আপাতত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

    Reply
    • abdus salam

      আপনি কি আপনার সুবিধাবাদী মনোভাব নিয়ে ভাল আছেন? থাকতে পারবেন? শত্রু মিত্র চিনতে না পারলে এ রকম হতাশা নিয়েই বাকী জীবনটা শেষ করতে হবে। ভাল তো থাকতেই পারবেন না, চোখে খালি সর্ষে ফুল দেখবেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তো পুরোপুরি শেষ হয় নি, আমি মনে করি এখনও শুরুটাই ভাল করে হয় নি। তাই এখনও অনেক শত্রু তাঁদের পরিচয় গোপন করতে পারছে। যুদ্ধের কাজ শেষ করতে হলে তো লড়াই এর কোন বিকল্প নাই। জাতীয় মুক্তি এবং যথার্থভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে হলে চুড়ান্ত লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তিকে জিততেই হবে। জয় বাংলা।

      Reply
      • জাহিদ হোসেন

        এইসব রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে শুধু মাঠ গরম করা যায়। সমাধান কিছু হয় না। আপনাদের মতো রাজনৈতিক সুবিধাভোগীরাই শুধু এইসব অলীক গল্প শোনায়। আপনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন কিনা জানি না। যদি দেথতেন বুঝতেন রাজাকার কী জিনিস। এদের ক্ষমা করার অধিকার কোনো ব্যক্তির নেই। যার মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়েছে বা যার বাবা, ভাই, দাদা, মামা ইত্যাদি নিকটাত্মীয়কে হত্যা করা হয়েছে সে-ই বুঝতে পারবে আমার কথার মর্মার্থ।

        এইসব নিরর্থক কথা বলে আসল ব্যাপার আড়ালে ঢাকার চেষ্টা করবেন না। একটা দেশে কয়টা মুক্তিযুদ্ধ দরকার???? এগুলি আসলেই কতগুলা ফালতু কথা ছাড়া আর কিছু নয়।

  2. dewan

    মি. মনজুর,

    আপনি একটা আস্ত পাগল, নতুবা সাকা চৌধুরীর চেয়েও বড় রাজাকার। উপরের কথাগুলো লিখতে আপনার বিবেকে একবারও বাধল না, হাত কাঁপল না?

    ধিক, আপনার মতো বিবেকহীন মানুষকে….

    Reply
  3. Ami Mofiz Bolchi

    আপা,

    আপনার সঙ্গে একমত। আশংকা আছে যদি সেটি কার্যকরী না হয়। সব সম্ভবের দেশ এটি। নেক্সট সরকার বিএনপি এলে এরা প্রেসিডেন্সিয়াল পারডন পেতে পারে। তখন এরা দেশকে নরক বানাবে।

    টিভিতে দেখলাম বহু হিন্দু পরিবার বাড়িঘর ফেলে পালিয়েছে রায়ের পর। বারবার মনে হচ্ছে, আমরা নতুন এক ইতিহাস দেখব এবার। ২৫ অক্টোবরের পর…

    Reply
  4. Jashim

    ধন্যবাদ আপা। আপনার লেখা বিডিনিউজে পড়ে ভালো লাগল। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। বেঁচে থাকুন অনেক দিন।

    আপনি হয়তো আমাকে মনে করতে পারবেন…

    — নজরুল, সাবেক ডিউট অফিসার, রেডিও বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম

    Reply
  5. মনজুর

    যুদ্ধের সময় আপনি চাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে পারতেন। তা না করে আপনি দেশ ছেড়ে চলে গেলেন কেন? এই দেশ আমাদের মা, এটা তো মুক্তিযোদ্ধারা বলে, আমরা তরুণরাও বলি। আমি হলে যুদ্ধ করতাম মায়ের জন্য। আপনি মাকে ফেলে কীভাবে চলে গেলেন? আর আজ আপনি আমাদের এই কাহিনি শোনাবেন যে আপনি কী করে মাকে বিপদে ফেলে পালিয়ে ছিলেন?

    গর্ব করা সাহসী মানুষদের মানায়, ভীতু মানুষদের নয়। জয় বাংলা।

    Reply
  6. mahbub

    আর এই সাকা চৌধুরী বলে কিনা সে দেশেই ছিল না ওই সময়… কত বড় মিথ্যা কথা। আর যারা এ ব্যাপারে সাক্ষী দেয় তাদের মিথ্যা কথা বলার জন্য বিচার হওয়া উচিত।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—