Feature Img

Mozammel-Babu1সম্প্রতি পরিবেশবিধ্বংসী জাহাজ ভাঙা বাণিজ্যের পাশবিকতা নিয়ে নির্মিত লোহাখোর প্রামাণ্য চিত্রটি দেখে আমি রীতিমত বিবমিষার গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। এ যেন একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে এলেক্স হেলির রুটস ছবিটির পুনঃ চিত্রায়ন। শিপ ব্রেকিং শিল্পের নামে চলে আসা অবাধ পরিবেশ দুষণ সম্পর্কে আমার কম-বেশি ধারণা ছিল, কিন্তু শ্রম শোষণের এত বড় পৈশাচিকতা আমি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি নি।

‘শিপ ইয়ার্ড’ বলতে যা বোঝানো হয় তা আসলে উন্মুক্ত সমুদ্র সৈকত ছাড়া আর কিছুই নয়। সেখানে খোলা আকাশের নিচে লক্ষ লক্ষ ইলেকট্রোড পুড়িয়ে চলে পরিবেশ দূষণের কদর্য ‘ফায়ার ওয়ার্কস’। আর জাহাজ টানার জন্য মঙ্গাপীড়িত এলাকা থেকে আসা ভূখা-নাঙা শ্রমিকের কাঁধে তুলে দেয়া হয় লোহার শেকলের দুঃসহ জোয়াল।

নিত্যদিন আগুনের তেজষ্ক্রিয় লেলিহান শিখার মধ্যে বসবাস ছাড়াও পরিত্যক্ত জাহাজটিতে এমন কোন দুষিত পদার্থ নেই যার সংস্পর্শে শ্রমিকরা পতিত হয় না। জাহাজ ভাঙার পর যা ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের বায়ুমণ্ডল এবং সমুদ্রের পানিতে। তিন থেকে চার মাস এ নরকের আগুনে পুড়ে দুর্ঘটনার হাত থেকে দৈবাৎ বেঁচে মুমূর্ষু শ্রমিক একদিন বাড়ি ফিরলেও তারা ফুসফুস ভরে নিয়ে যায় পৃথিবীর দূষিততম বাতাস এবং কাঁধে রক্তজবার মত কৃতদাসের ক্ষত।

‘ইন গড উই ট্রাস্ট’ শ্লোগান নিয়ে পিস, হ্যাপিনেস অ্যান্ড প্রসপারিটির নামে পরিচালিত শতাব্দীর নৃশংসতম এ টর্চার সেলের ভয়াবহতা দেখে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে না কেন? সফেদ দাড়ির নরপিশাচ ‘লোহাখোর’দের ওপর বিশাল আকাশ ভেঙে পড়ে না কেন?

এ সব কয়েদখানায় এক মওসুমের জন্য কাজ করতে আসা শ্রমিকদের খোরাকি নিয়মিত চালিয়ে রাখা হলেও দোকানের দেনা শোধ করা শেষে তাদেরকে শূন্য হাতেই বাড়ী ফিরতে হয়। নূরানী চেহারার নিষ্ঠুর মালিকরা এমনভাবে তাদের মজুরী নির্ধারণ করে যেন কোন রকমে তিন বেলা খাওয়াটা চলে এবং তা থেকে উৎপাদিত প্রতি ক্যালরি অ্যানার্জি দাসত্বের প্রক্রিয়ায় শুষে না যায়। হারভাঙা খাটুনির পর শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে তারা যখন বলে, ‘কাজের তুলনায় তোরা খাস বেশি’, তখন আমার মাথায় খুন চেপে যায়!

তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশে এ পৈশাচিক কৃতদাস প্রথা চলতে দেয়া যায় না। কতিপয় নরপশুর আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার স্বার্থে বাংলাদেশকে কিছুতেই পৃথিবীর আস্তাকুঁড়ে পরিণত হতে দেয়া হবে না। এদেশের প্রতিটি মানুষ এখন সোনার বাংলা গড়তে প্রাণান্ত পরিশ্রম করছে। পৃথিবী জুড়ে আজ বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। কেউ বলছে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’, আবার কারও মতে ‘রেসিলিয়েন্ট বাংলাদেশ’! চায়নাকে বলা হয় ‘পৃথিবীর কারখানা’ এবং ভারত হচ্ছে ‘পৃথিবীর ব্যাক অফিস’। আমরা যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নিয়ে স্বপ্ন দেখছি তখন হাতে গোনা কয়েকজন কুলাঙ্গারের কারণে আমাদেরকে ‘পৃথিবীর বর্জ্যখানা’ বলতে দেয়া হবে কেন? কেনই বা আমরা অহেতুক বিরাট অংকের কার্বন ইমিশনের দায় নেবো?

জাহাজ ভাঙার ধান্দাটি শতভাগ মিথ্যাচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যারা এ অসাধু ব্যবসাটিকে ‘শিল্প’ বলে আখ্যায়িত করে, তারা চুরি-ডাকাতি-খুন কোন কিছুকেই ‘শিল্প’ বলতে দ্বিধা করবে না। সুযোগ পেলে তারা মানুষের কাঁধেও জোয়াল তুলে দেবে। এতদিন তথাকথিত এ বিকাশমান শিল্পে দেড় লক্ষ কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে আজ পর্যন্ত তারা সর্বমোট আঠারো হাজারের বেশি শ্রমিকের তালিকা দিতে পারেনি।

এমনকি বিভিন্ন প্রপাগান্ডায় তারা দেশের সর্বমোট লোহার চাহিদার ৮০ ভাগ মিটিয়ে আসছে দাবি করলেও পরিসংখ্যান তাদেরকে ২৫ ভাগে বেঁধে দেয়। আরেকটি প্রচারণাকে তারা সবচেয়ে বড় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে–‘জাহাজ ভাঙা বন্ধ হয়ে গেলে দেশে লোহার মহাসংকট দেখা দেবে, বাজারমূল্য আকাশ ছোঁবে এবং নির্মাণ শিল্প ধ্বংসের মুখে পরবে!’ অথচ যে কোন চিন্তাশীল মানুষই বুঝবেন, ৭৫ ভাগ লোহা আমদানি করা গেলে, বাকি ২৫ ভাগ যাবে না কেন? তাছাড়া পরিমাণের বিচারে জাহাজ ভাঙা লোহা আমাদের ২৫ শতাংশ চাহিদা মেটালেও সামগ্রিক স্ট্রেংথ বিবেচনায় তাদের কন্ট্রিবিউশন আরও অনেক কম।

উন্নতমানের লোহা আমদানি করা হলে তার অর্ধেকেই আমাদের চাহিদা মিটে যাবে। গুণ বিবেচনায় এধরনের নিম্নমানের লোহার দাম অর্ধেকের চেয়ে কম হওয়া উচিত হলেও অর্থপিপাসুদের উচ্চ মুনাফার কারণে বাজারে গিয়ে আমরা মাত্র ১৫ ভাগ সাশ্রয় পাই। সর্বোপরি, কারও যদি নিম্নমানের লোহা দিয়ে কাজ চলে, তারা প্রয়োজনে ‘স্ক্র্যাপ’ আমদানি করবে, পরিবেশ বিনষ্টকারী বর্জ্যজাহাজ নিয়ে আসবে কেন?

পৃথিবীর কোন সভ্য দেশ নিজেদের ভূখণ্ডে আজ জাহাজ ভাঙতে অনুমতি দেয় না। আমরা কি তাহলে অসভ্য আর বর্বর নাকি? পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমিক নির্যাতন সকল বিবেচনাতেই এ অশুভ বাণিজ্য বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। মন্দের ভালো হিসেবে মহামান্য হাইকোর্ট তাদের এক সাম্প্রতিক রায়ে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে যথপোযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘প্রি-ক্লিনিং সার্টিফিকেট’ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই চালাকির আশ্রয় নিয়ে ‘ইন বিল্ট’ বর্জ্যকে ক্লিনিংয়ের আওতা থেকে ছাড় দেয়ার পাঁয়তারা করছে। তারা নাকি এ সংক্রান্ত নীতিমালা এবং গাইডলাইন নিয়েও আলোচনা চালাচ্ছে, যেখানে পরিবেশবাদীরা চাইছে বলবৎযোগ্য কঠোর আইন, কেননা চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী!

আগামী ১৬ আগস্ট, ২০১০ তারিখে নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করার জন্য শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশন দেশের সব সেরা আইনজীবিদের নিয়ে অ্যাপিলেট ডিভিশনে যাচ্ছে।

দেশের সকল বিবেকবান মানুষের প্রত্যাশা সরকার অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস যেন দুষ্কৃতিকারীদের পক্ষ না নেয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত, আমি মনে করিনা এই ধরণের অনাচার তিনি চলতে দিবেন।

মোজাম্মেল বাবুসাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

২১ Responses -- “লোহাখোররা ধ্বংস হোক, নিপাত যাক!”

  1. Prince

    আসাধরন লেখার জন্য বাবুকে ধন্যবাদ। ভাবতে অবাক লাগে ২১ শতকের বাংলাদেশে এখনো কৃতদাস প্রথা রয়ে গেছে। তারচেয়েও আরো অবাক হতে হয় যখন দেখা যায়, দাঁড়ি-টুপি ওয়ালা নুরানী চেহারার মুমিন মোসলমানরাই এ যুগের দাশপ্রভু। বাবু ভাই আল্লাহর আরশ এই নরকের দুয়ারে কখনো পৌছাবে বলে আমার মনে হয় না, ঐ আশার গুড়েবালি। বাবুকে আবারো ধন্যবাদ। ক্যেনাডা থেকে প্রিন্স।

    Reply
  2. Jamil Hayder

    Dear Mr. M. Babu, thanks for your article. Some people say you are bad & some are saying good in their comments. Actually that is not my point. you are highly educated and intelligent. . I will request you to write on that topics which will change our corrupted system, otherwise 150 million people only talking & talking nothing will be change.

    Reply
    • সালেহা রানী

      Dear Mr. Qibria,

      Thank you very much for your response. Yes I don’t know Mozammel Babu very well as you are. But My response is on his writing not about him. In this writing he did not write any thing like Indian Dalal.

      Reply
  3. সালেহা রানী

    মোজাম্মেল বাবু কে নিছক আলীগের লোক বলেই ভাবতাম, আজকের লেখা পড়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জন্মালো। যারা তাকে ভারতের দালাল বলে গালি দিচ্ছে তাদের বাবার নিশ্চয় রক্ত চোষার ব্যবসা আছে। তা না হলে তাদের রক্তে আছে জন্ম জন্মান্তরের পাকি বিষ। তাদেরকে হিজবুল বাহারে উঠিয়ে করাচি বন্দরে নামিয়ে দেয়া উচিত।

    Reply
  4. সানোয়ার

    আমার দেশ নিয়া লিখে যে দাবড়ানি খেয়েছেন তাতে ভোল পাল্টে ফেলেছেন। মজা বাবু নিজেকে পাল্টান…

    Reply
  5. A.R. Qibria

    MOJA BABU…..apnare thik manachse na ei type er topics e, Awamilegue er (……) chata marka kisu likhen….Knowledge wala public er moto kotha manai na apnake, .sobaike sob kisu manaina Boss….apni likhtei jodi hoi then faltu kisu likhen…..ok Boss?…rag korlen?

    Reply
  6. farhad

    He is an Indian dalal , he is trying to destroy our ship braking industry . its true that it is inhumane that labor are working in a poisoning environment .but if you say something like this you must have to give a solution . our capital is less so not possible for buying modern equipment as labor already know they r working with poison.

    Reply
  7. সৈয়দ আলি

    হাহাহাহা মোজা বাবুর জনপ্রিয়তা দেখলে হিংসা হয়! বুকে হাত দিয়ে বলুন মোজা, আপনার দলের নেতারা এই ব্যবসার পৃষ্ঠপোষক নন? যদি না হন, তাহলে সরাসরি শিল্পের নামে এই মধ্যযুগীয় শোষনক্ষেত্র আর দেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর এই ব্যবসা আপনার সরকার অবিলম্বে বন্ধ করছে না কেন?

    Reply
  8. তারেক মাহমুদ

    এমন বলিষ্ঠ লেখনির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এ ব্যাপারে আসলে সকলকে সোচ্চার হওয়া উচিৎ।

    Reply
  9. জীবন

    মনে হচ্ছে মোজাম্মেল বাবু ক্রমেই বুদ্ধিজীবি হয়ে উঠছেন। চালিয়ে যান ভায়া, তবে আওয়ামী লীগের স্তুতি ছাড়বেন না। তাহলে ‘নগদ নারায়ন’ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ফলো আ গা চৌ।

    Reply
  10. MOHAMMAD SAHABUDDIN

    কট্টর পলিটিক্যাল লেখা হতে দুরে এসে একটি ভিন্নধর্মী লেখার জন্য ধন্যবাদ
    খুশি হব যদি টক শো গুলোতেও নেকেট পলিটিক্যাল না হন।
    ধন্যবাদ

    Reply
  11. PATHIK

    when you are talking about labor oppression, you must arrange alternative employment.
    if you can give them better job, better environment, nobody will opt for hazardous one.

    Reply
  12. Anu

    Thanks for the article. But a curisity arise in mind that in your article your attitude towrds beard person is extremly shocking. can you cite any deta how much the ship owners are beared person. perhaps you will fail. Because you are the person who always against the Muslim follower. thes detest attitude some how ruin you.

    be cautious about it.

    Reply
  13. Showkat

    I would rather ask the writer to look into other side. He may suggest some remedies and plans to safeguard the life of laborers.did he calculate the cost of closing this industry once and for all. he was quite rude. does he have any other way to rehabilitate 1000s of laborers for their bread and butter. it is very easy to give opinion and open mouth for every….ask a person who does not have any other source to win bread for him and his family members,what is the pain of hunger. be realistic and pragmatic, before passing any opinion. the awful thing is-in this country everyone tries to become an expert of any field and the expert are based in the capital within 50 sq kms, leading luxury life; the same people are seen in every seminar and symposium, be it for economics,health,gas,electricity….on and on…as if they have solution for every problem….

    showkat

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—