ক.

জনগণের মধ্য থেকে, জনগণ দ্বারা, জনগণের জন্য সরকার, বহুল উচ্চারিত এ উদ্ধৃতি আব্রাহাম লিংকনের। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যাদের আস্থা নেই বা যে সমস্ত রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক নয়, তারাও ‘জনগণের জন্য সরকার’, অন্তত এই উচ্চারণের বাইরে নয়।

আর গণতান্ত্রিক দেশে তো জনগণই সব। শুধু জনগণের জন্য সরকারই নয়, জনগণের মধ্য থেকে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকার। আর তাই জনগণই ক্ষমতার উৎস, জনগণের জন্য কাজ করছি, জনগণই এর জবাব দেবে, জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, সর্বদা জনগণের পাশে আছি, এই অন্যায়ের বিচার জনগণের কাছে দিচ্ছি, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দেওয়া হবে, জনগণই শক্তি, জনগণ আমাদের পাশে আছে ইত্যাদি আমাদের দেশের সরকারি ও বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাসহ সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিদিনের উচ্চারণ।

একানব্বই সাল থেকে আমাদের দেশে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক ধারা শুরু হয়। কখনও কখনও নির্বাচনে সূক্ষ্ম বা মোটা দাগের কারচুপির অভিযোগ, টুকটাক নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, টাকার খেলা, পেশিশক্তির প্রভাব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লম্বা শাসন– এসব বাদ দিলে মোটামুটিভাবে জনগণের দ্বারা সরকার এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

সুতরাং ‘বাই দি পিপল’ আমাদের দেশে মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে বা হতে চলেছে বলেই ধরে নেওয়া যায় এ কারণেই যে, জনগণ কিছুটা অথবা পুরোটা প্রভাবিত হয়েই হোক আর সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেতেই হোক, অন্তত ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে এবং সেই ভোটে সরকার গঠিত হচ্ছে।

‘বাই দি পিপল’ নিয়ে যখন আমাদের কিছুটা সন্তুষ্টি তখন ‘ফর দা পিপল’-এর কী অবস্থা? এ কথা তো সত্যি যে ‘বাই দি পিপল’-এর কোনো অর্থই থাকে না, যদি না তা ‘ফর দা পিপল’ হয়। আমাদের এই নির্বাচিত সরকারগুলো কি ‘ফর দা পিপল’? এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক, কিছুটা-অনেকটা, ব্যর্থতা-সফলতা, আংশিক সফল-সম্পূর্ণ সফল, আংশিক ব্যর্থ-সম্পূর্ণ ব্যর্থ, স্বৈরাচারী-গণতান্ত্রিক ইত্যাদি ইত্যাদি এবং তা চা-স্টলে, বাসে-ট্রেনে, অফিসে-আদালতে, চারদেয়ালে-খোলাপ্রান্তরে, টকশোতে, কোথায় নয়?

সরকারি ও বিরোধী দল এবং এদের সমর্থক অথবা বিরোধী, সুশীল সমাজ বা সাধারণ জনতা যাই হোক না কেন সাফল্য ও ব্যর্থতার দাবিতে সুস্পষ্ট মতবিরোধ থাকবে এটাই স্বাভাবিক, যদিও অনেক সময় তা নগ্নতার পর্যায়ে চলে যায়। তবে বিতর্কের খাতিরে যে যাই বলুক না কেন একটি বিষয় প্রমাণিত যে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দল ক্ষমতায় আসার পর শেষ পর্যন্ত তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি বরং বেশ অজনপ্রিয় হয়েছে।

এ কারণেই এখন পর্যন্ত কোনো দলই দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করতে পারেনি। বিরোধী দল পরবর্তী সরকার গঠন করেছে। আর এর কৃতিত্ব যতটা না বিরোধী দলের, তারও অধিক সরকারি দলের, অর্থাৎ জনসাধারণ সরকারি দলের প্রতি অনাস্থা আনতেই বিরোধী দলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বিরোধী দলের কোনো কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বা বিরোধী দলের সাংগঠনিক দক্ষতা এই পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেনি।

এ কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতেই পারে যে সরকার ‘ফর দা পিপল’ নয়, হলেও অংশত। মূলত নির্বাচিত হওয়ার পর উভয় দলই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ বিবিধ অভিযোগে আক্রান্ত হয়ে। সরকারি দলের নেতা ও কর্মীবাহিনী সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে অধিক ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা ভুলেই যান যে, সরকার জনগণের জন্য, রাজনীতি কোনো বাণিজ্যিক মাধ্যম নয়।

গণতন্ত্রের যে চিরায়িত ত্রুটিসমূহ, তার সবই আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য। আর এ কারণেই সর্বসাধারণ রাজনৈতিক দল, নেতা-কর্মী তথা রাজনৈতিক সকল কর্মের প্রতি সকল প্রকার নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছে, এমনকি অশ্লীল শব্দপ্রয়োগে তাদের ক্ষোভ প্রকাশে কুণ্ঠিত হয় না। একটি রাজনৈতিক দল অন্য একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি কুরুচিপূর্ণ বিদ্বেষ অহরহ প্রকাশ করে যাচ্ছে। বর্তমানে রাজনৈতিক পেশা ব্যতিত অন্য কোনো পেশায় এমনটা পরিলক্ষিত হয় না। কোনো কবি অন্য কোনো কবিকে, কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন অন্য কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনকে, এমনকি কোন আলু-পটলের ব্যবসায়ী অন্য কোনো আলু-পটলের ব্যবসায়ীকে এমন ভাষায় সমালোচনা বা গালগালাজ করে না।

খ.

সাধারণত সরকার গঠনের প্রথম চারটি বছরের তুলনায় শেষ বছরের চিত্র অনেকটা ভিন্ন হয়। কিছুটা সংযত হয়ে শেষ বছরটায় সরকার, সরকারি দল ও নেতাকর্মীরা অনেকটাই জনবান্ধব হওয়ার চেষ্টা করে। বর্তমান সরকারের গত কিছুদিনের কয়েকটি ঘটনা আমরা উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি–

১) কিছুদিন আগে চট্রগ্রামে এক টেন্ডারবাজিতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের গোলাগুলিতে এক শিশুসহ দুজন মারা যায়। ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যেই মামলা হয় এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতা-কর্মীদের দ্রুত গ্রেফতার করা হয়। সরকারের শেষ বছরের ঘটনা না হলে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। হয়তো বিবৃতি, পাল্টা-বিবৃতিতে বিষয়টিকে ধোঁয়াশে করে তোলা হত।

২) কয়েকদিন আগে বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ নিয়ে একটা ছোটখাট আন্দোলন হয়ে গেল। সরকার তথা পিএসসি দাবি দ্রুতই মেনে নেয়, পরীক্ষার পুনর্মূল্যায়িত ফলাফল প্রকাশ পায়। দু-তিন বছর আগে হলে হয়তো এত সহজে বিষয়টা নাও মিটতে পারত।

৩) লিমনের ঘটনাটি দেশের একটি আলোচিত ঘটনা। অনেক ঘটনাই ঘটে গেল, রাষ্ট্র একটি নিঃস্ব কিশোরের মুখোমুখী। শেষ পর্যন্ত সরকার লিমনের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৪) সরকারি মন্ত্রীদের অসংলগ্ল কথাবার্তা বলা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে, কমে গেছে দাম্ভিকতাও।

৫) সর্বস্তরের দলীয় নেতাকর্মীদের সংযত হওয়ার প্রবণতা।

গ.

সরকার বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মানেই নেতিবাচক এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আর এমনটা ভাবলে বা হলে জনসাধারণের দাঁড়ানোর কোনো জায়গাও থাকে না। সরকার জনগণের জন্য কিছু করে না এমনটাও মনে করার কারণ নেই। তবে সরকার জনগণের জন্য কিছু করছে এটাই স্বাভাবিক, এটা সরকারের দায়িত্ব, এ জন্যই তারা নির্বাচিত, দুঃশাসনের জন্য নয়। সরকারি দায়িত্ব পবিত্র দায়িত্ব, কলুষতার সুযোগ সেখানে নেই।

আর এই যে ব্যর্থতা তা কি বর্তমান সরকারের জন্যই শুধু প্রযোজ্য? তা অবশ্যই নয়, আগের সরকারগুলোও দায় এড়াতে পারে না, আবার ভবিষ্যৎ সরকারও কোনো গ্যারান্টি দিতে পারে না সুশাসনের। নতুন সরকার, তা যে দল বা জোটই গঠন করুক না কেন, আবার নতুন করে লুটেপুটে খাবে। আর এসব তো রাজনৈতিক নেতাদেরই কথা, একে অপরকে, একদল অন্য দলকে এভাবেই সমালোচনা করে থাকেন; একে অপরকে বড় দুর্নীতিবাজ, লুটেরা আখ্যায়িত করে থাকেন।

ঘ.

সম্প্রতি ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে, যদিও এটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন, মোটামুটি একটা জনমত প্রতিফলিত হল, বিগত সংসদ নির্বাচনে বিপুল আসনে জয়ী আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। এই নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগের অজনপ্রিয় হওয়ার কোনো প্রামাণিক তথ্য ছিল না, যা ছিল তা অনুমাননির্ভর। সুতরাং এই ৫টি নির্বাচন সরকারি দল, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ তথা সাধারণ জনগণের কাছে এক প্রামাণিক বার্তা নিয়ে এসেছে।

এমন বার্তা পাওয়ার সুযোগ নির্বাচন ছাড়া ছিল না। আর আজকে যে সরকারের মধ্যে বিনয়ের ভাব বা কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, তার অন্যতম কারণ হয়তো এই নির্বাচনী বার্তা। আর এমন বার্তা পাওয়ার সুযোগ যদি একটি বছর অন্তর অন্তর থাকত তাহলে হয়তো লিমনকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হত না; ছাত্রলীগ-যুবলীগ এমন বেপরোয়া হত না; দুর্নীতি, স্থল ও জলদস্যুবৃত্তিতা এমন পর্যায়ে যেত না।

তার মানে সরকারকে ঘন ঘন জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারলে হয়তো অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়। নির্বাচনই কেবল সরকারকে জনগণের মুখোমুখী দাঁড় করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে আমেরিকার প্রতিনিধি সভার মতো দুই বছর পর পর পুরো সংসদ নির্বাচন করা সম্ভব নয় এবং তা বাস্তবসম্মত নয়। তবে প্রতি বছরই সরকার এবং রাজনৈতিক দলকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করতে হবে, ভোটারের মুখোমুখী করতে হবে সরকারকে এবং তা সম্ভব হলে সঠিক পথে এগুচ্ছে কি না তার বার্তা পেয়ে যাবে সরকার।

পাঁচ বছর পর পর একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির মধ্য দিয়েই হোক আর অন্য পদ্ধতির মধ্য দিয়েই হোক, এ যে কোনো সুফল বয়ে আনছে না তা আজ প্রমাণিত। খুঁজতে হবে নতুন বিকল্প নির্বাচন পদ্ধতি, নতুন সরকার পদ্ধতি যা প্রতিনিয়ত সরকারকে জনগণের মুখোমুখী দাঁড় করাবে।

ঙ.

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে নিম্নরূপ একটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, আবার আমেরিকান সিনেটের মতো প্রতি দুই বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশের নির্বাচন অথবা অন্য কোনো পদ্ধতি বিবেচনায় আনা যেতে পারে যা জনবান্ধব সরকার গঠনে সহায়ক হবে। প্রস্তাবিত পদ্ধতি অনুসারে বর্তমান জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনকে ৫টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রতিটি গ্রুপে আসন সংখ্যা হবে ৬০টি।

Table--2

প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে একটি গ্রুপের ৬০টি আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাঁচ বছরে ৫টি গ্রুপের ৩০০টি আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ৬ষ্ঠ ও ৭ম বছরে ১ম ও ২য় গ্রুপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এভাবে প্রতি বছরের ডিসেম্বরে একটি গ্রুপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কখনওই সংসদ বিলুপ্ত হবে না। প্রতি বছর ডিসেম্বরে ৬০ জন সাংসদের পরিবর্তন ঘটবে।

যেহেতু বর্তমানে একটা পার্লামেন্ট বিদ্যমান আছে যা কিছুদিনের মধ্যেই তার মেয়াদ পূর্ণ করতে যাচ্ছে, তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে, আগামী কয়েক বছরের নির্বাচনি পরিকল্পনা নিম্নরূপ হতে পারে। এতে বর্তমান সংসদের ৬০ জন সদস্য অতিরিক্ত ৬ মাস এবং ১২০ জন সদস্য অতিরিক্ত ১ বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তীতে ১ নং গ্রুপের নির্বাচিত ৬০ জন সদস্য ২ বছরের জন্য এবং ২ নং গ্রুপের ৬০ জন সদস্য ৩ বছরের জন্য, ৩ নং গ্রুপের ৬০ জন সদস্য ৩ বছর ৬ মাসের জন্য এবং ৪ নং গ্রুপের সদস্যগণ ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন।

অর্থাৎ এই ২৪০ জন সংসদ সদস্য ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত না হয়ে বিভিন্ন মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন। ৫ নং গ্রুপের ৬০ জন সদস্য ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন এবং পরবর্তিতে সকল গ্রুপের সদস্যই ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন।

M_2(1)

পদ্ধতিটির একটা বড় নেতিবাচক দিক হল, এক বছর পরেই সরকার পরিবর্তনের আশঙ্কা। অবশ্য এটি অনিবার্য নয়, কখনও কখনও এমনটা ঘটতে পারে। সবই নির্ভর করছে সরকারের কর্মকাণ্ডের উপর। সরকার যদি এক বছরের মধ্যেই বুঝিয়ে দেয় জনগণের জন্য কিছু করতে পারছে না, সে ব্যর্থ, তাহলে এক বছরে অধিক ক্ষমতায় থাকতে চাইবেই বা কেন? আর এটিই এই পদ্ধতির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।

সরকার পরিবর্তনের আশঙ্কা থেকে সরকার সবসময় জনকল্যাণমূলক কাজে সচেষ্ট থাকবে এবং জনগণকে বিবেচনার মধ্যে রাখবে। নির্বাচনের এই পদ্ধতিতে প্রতি বছরই সরকার গৃহীত কর্মসুচি জনমত যাচাইয়ের সুযোগ থাকছে, সরকার নিজেকে শোধরানোর সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া একটি ভারসাম্যমূলক সংসদ গঠনের সুযোগ থাকছে।

২০০১ এবং ২০০৮ এর সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছে। এমনটা হয়ে যাওয়ার পর তা আর ৫ বছরের মধ্যে কোনো সংশোধনের সুযোগ থাকেনি বা থাকে না। বর্তমান প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম, অর্থাৎ হঠাৎ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে।

আর যদি তা কখনও হয়, তা হবে এক বা দুবছর মেয়াদি জনচিন্তার সুচিন্তিত ফসল। জনগণই সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি থেকে অথবা কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের বাসনা থেকে, যা জাতির জন্য অনিবার্য, এমনটা চাইলে তবেই সম্ভব এবং তা দীর্ঘমেয়াদী ভাবনা-চিন্তার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হবে। হুজুগে কিছু হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই থাকবে না, যা আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

চ.

আমাদের দেশে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছেন ৫ বছরের জন্য। যদি নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিগণ বা দল তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করেন বা জনসাধারণ সন্তুষ্ট হতে না পারেন তখন জনগণের ৫ বছর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

কিন্তু প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে এক বছরের মধ্যেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলের একপঞ্চমাংশ জনগণ তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বাংলাদেশের ২/৩ টি জেলা বাদে অধিকাংশ অঞ্চলের মতামত জাতীয় মতামত হিসেবেই গণ্য হওয়ার কথা। এই পদ্ধতিতে সরকারি ও বিরোধীদল উভয়ই তাদের নতুন নতুন ইস্যু নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করতে পাচ্ছে অথবা পূর্বতন ইশতেহারের পরিবর্তন ঘটাতে পাচ্ছে।

সুতরাং প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে শাসক ও শাসিতের পারস্পরিক কর্তব্য ও দায়িত্বের নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ বেশি থাকছে। তবে এমন একটা সম্ভাবনা দেখা দিতেই পারে যে, সরকার আসন্ন ৬০টি আসনের নির্বাচনী এলাকায় অধিক উন্নয়ন কর্মসুচি গ্রহণ করে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চাইবে, প্রয়োজনে অন্য এলাকাকে বঞ্চিত করে। এ ক্ষেত্রে প্রথমবার এ কৌশল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও দ্বিতীয়বার থেকে এ সম্ভাবনা থাকছে না বরং হিতে বিপরীত হতে পারে।

এছাড়া প্রস্তাবিত নির্বাচন পদ্ধতি রাজনৈতিক দলসমূহের সাংগঠিনক কর্মতৎপরতার বৃদ্ধি ঘটাবে। সাধারণত নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে সাংগঠিনক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করে। বিশেষ করে সরকারি দলে সাংগঠনিক তৎপরতার চেয়ে বাণিজ্যিক তৎপরতার বৃদ্ধি ঘটে। প্রস্তাবিত পদ্ধতি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সুষম ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে।

নির্বাচন কমিশনের জন্য অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা সহজ হবে। কারণ ৬০টি আসনে নির্বাচন হওয়ার ফলে অধিক মনোযোগী হতে পারবে। প্রতি বছর নির্বাচন হবার কারণে কমিশনের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং মানসিক চাপের হ্রাস ঘটবে।

ছ.

বর্তমান প্রস্তাবনায় যে নির্বাচন-সূচি উপস্থাপন করা হয়েছে তা বর্তমান সংসদকে মেনে নিয়েই। অর্থাৎ বর্তমান সংসদের ১২০টি আসনের নির্বাচন হবে এ বছর ডিসেম্বরে, ৬০টি আসনের নির্বাচন হবে আগামী বছর জুলাইতে এবং অবশিষ্ট ১২০টি আসনের নির্বাচন হবে আগামী বছর ডিসেম্বরে।

এতে সংবিধানের বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে। সেটা হয়তো তেমন একটা সমস্যা নয়, বড় সমস্যা হল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যু। বিরোধী দলের দাবি, আগামী সংসদ নির্বাচন হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ১৯৯১ থেকে এ পর্যন্ত যতগুলি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদে- যা স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি, সবই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

আসন্ন নির্বাচনও তাই হত, এ নিয়ে বিরোধী দলের কোনো দাবি করার অবকাশ থাকত না, যদি না মাননীয় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষিত না হত। তবে আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণার পাশাপাশি রায়ে একটি পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে দিয়েছেন এবং তা আমাদর সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে। তা হল, সংসদ চাইলে আগামী দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন হতে পারে।

এই পর্যবেক্ষণের কারনেই তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে সকলেরই আস্থা কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংসয় সর্বমহলেরই, যদিও বর্তমান সরকার সবগুলো স্থানীয় নির্বাচন ও সংসদের উপনির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে।

এই সংশয় থেকেই বিরোধী দলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও একটি অংশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে। কারণ সবাই চায় একটি অবাধ ও নিরেপেক্ষ নির্বাচন। এই যে রাজনৈতিক দলের মধ্যে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস, বৈরি সম্পর্ক তা তাদেরই লজ্জা। আর দেশের অংশ হিসাবে এ লজ্জা দেশের প্রতিটি নাগরিকের।

কিন্তু দুই টার্ম পর? দশ বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের সুযোগ থাকছে না। এরপর থেকে যতদিন গণতন্ত্র থাকবে ততদিন দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে হবে। তাহলে আমরা দশ বছর পিছিয়ে পড়ব কেন?

বরং যে ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে বা অনিবার্যভাবে যে ব্যবস্থার অস্তিত্ব দশ বছর পর থাকবে না, তা নিয়ে সময় নষ্ট করে কী লাভ? বরং কীভাবে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে সেদিকেই মনোনিবেশ অধিক জরুরী। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করাসহ যে যে পদক্ষেপ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক হবে তাই নিয়ে আমাদের ভেবে দেখতে হবে।

সামনে চলার পথ খুঁজে বের করতে হবে আমাদের এবং তা হতে হবে নিরাপদ ও সুন্দর। আর এ পথ খোঁজার দায়িত্বটা নিতে হবে সরকার ও বিরোধী দলকেই; একসঙ্গে, হাতে হাত রেখে।

আবু সাইয়ীদচলচ্চিত্রনির্মাতা, প্রযোজক ও লেখক

Responses -- “নতুন সরকারের সন্ধানে”

  1. shikdar dastagir

    প্রস্তা্বটা ভালো। তবে এত চোর এবং নির্বোধের দেশে এটি ফলদায়ক হবে না। আমাদের দেশের মানুষ এমনিতেই মেধাহীন। তার উপর বিয়ল্লিশ বছরের কুশাসন এদেশের মানুষকে আরও অথর্ব করে ফেলেছে। শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ ৫ নামক মরণনেশা ধরিয়ে আমাদের আগামী প্রজন্মের মেধা বলতে গেলে শূন্যের কোঠায় পৌছে দেওয়া হয়েছে।

    সুতরাং দেশকে সত্যিকারভাবে এগুতে হলে মাহাথির মোহাম্মদ তার শাসনের শুরুতে যে কাজগুলো করেছিলেন, ঠিক সে রকম কাজ করতে হবে কঠোর এবং দৃঢ়চিত্তে কোনো একজন মাহাথিরকে। অন্যথায় এ ঝুড়ি ঝুড়ি নেতা (বেশিরভাগই ফালতু নেতা) ব্যবস্থা বহাল রেখে কোনো কিছু আশা করা যায় না।

    Reply
  2. আমীন আল রশীদ

    প্রস্তাবটি ভালো। তবে কিছু কিছু জায়গা জটিল মনে হতে পারে। একটা বিষয়ে আমি একমত যে, আমাদের জাতীয় নির্বাচনে একই দিনে ৩০০ আসনে ভোট গ্রহণ থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। কেননা, আমাদের জাতীয় রাজনীতির অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতার জেরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো উদ্ভট এবং অগণতান্ত্রিক যে বিধান সংবিধানে সংযুক্ত হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার একটা উপায় হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন দিনে ভোট গ্রহণ।

    বিরোধীরা যখনই তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসেন, তখনই সরকারের তরফে দাবি করা হয় যে, গত সাড়ে চার বছরে দেশে ছয় হাজারের মতো স্থানীয় সরকার এবং বেশ কিছু উপ-নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। এমনকি সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশনে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবিকেও সরকার তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের ফল বলে দাবি করছে। এই যুক্তিতে সরকার বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনও যদি এই সরকারের অধীনে হয়, তাও অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। কিন্তু বিরোধীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ।

    সরকারের এই যুক্তি আমরা যারা সরকারি বা বিরোধী কোনো পক্ষেরই প্রতিনিধিত্ব করি না, তাদের পক্ষেও মানা কঠিন। প্রথমত, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে সরকার পতন হয় না বা পরিবর্তন হয় না। কয়েকটি উপনির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীর পরাজয়ও ক্ষমতার পালাবদলে কোনো ভূমিকা রাখে না। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের অধিকাংশ আসনে পরাজয়ের ফলে সরকারের পরিবর্তন হবে। সুতরাং, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার কোনো প্রভাব না খাটালেও জাতীয় নির্বাচনেও যে সেই সহনশীলতার পরিচয় দেবে, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?

    দ্বিতীয়ত, স্থানীয় নির্বাচনে, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবার পথে একটা বড় ভূমিকা ছিল গণমাধ্যমের। গণমাধ্যম যে কী পরিমাণ সোচ্চার এবং প্রভাবমুক্ত ছিল, তা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরে দেখেছি। ভিন্ন ভিন্ন দিনে এসব নির্বাচন হওয়ায় দেশের ২৪-২৫টি টেলিভিশনের শতাধিক ক্যামেরা ওই নির্বাচনী এলাকগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থীদের দিকে তাক করা ছিল। সুতরাং শামীম ওসমানরা সুবিধা করতে পারেননি। বরং ভোট শেষ হবার আগে আগে তিনি নজরুলের কবিতা আওড়িয়ে বলেছিলেন : বন্ধু, বড় বিষজ্বালা এই বুকে। এই বিষজ্বালা যে ভোটের ফল নিজের পক্ষে নিতে না পারার, তা সবাই বোঝেন।

    এখন প্রশ্ন হল, একই দিনে যখন ৩০০ আসনে ভোট হবে, গণমাধ্যম সেখানে কতটা ওয়াচডগের ভূমিকা নিতে পারবে? ২৫টি টেলিভিশন, মূলধারার গোটা ত্রিশেক সংবাদপত্র এবং কয়েকটি রেডিওর সাংবাদিকদের একত্র করলে সেই সংখ্যা কত হবে? তাদের পক্ষে কি ৩০০ আসনের সবগুলো কেন্দ্রে নজরদারি করা সম্ভব হবে? যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সরকার যদি নির্বাচনে কারচুপি করে, তাহলে সেটি গণমাধ্যম কী করে জনগণের নজরে আনবে? যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের ফল সরকার পরিবর্তনের মূল মাধ্যম, সুতরাং কোনো একটি দল ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিয়ে সেই নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখবে, এট ভাববার মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি আমরা গড়ে তুলতে পেরেছি?

    যদি না পারি, যদি বিশ্বাসহীনতা আর অনাস্থা জারি থাকে, তাহলে একদিনে ৩০০ আসনে নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তনের বিকল্প নেই। চলচ্চিত্রনির্মাতা আবু সাইয়ীদ যে নির্বাচনী ভাবনা তুলে ধরেছেন, এজন্য তিনি ধন্যবাদ পেতেই পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে, তার ভাবনাটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা।

    Reply
  3. Ronald

    প্রস্তাবটি খুবই ভালো। বিবেচনা করলে জাতি উপকৃত হতে পারে এবং চিরদিনের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর হলে দেশ তথা মানুষ উপকৃত হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—