Feature Img

ABM-Nasir--editedজামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের রায় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধের পথে বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে রইল।

রায়টি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কয়েকজন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞের কাছে তাদের অভিমত জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে চাইলেন না। সবার উত্তরের সারমর্ম হচ্ছে, “আমরা অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি।”

অর্থাৎ উনারা বুঝতে চাচ্ছেন বাতাসের গতি। তারপর উনাদের মতামত জানাবেন।

এই বিশেষজ্ঞদের কার্যক্রম, বক্তব্য ও লেখনি থেকে বোঝা যায় যে তারা জামায়াতকে নিয়ে যত না উদ্বিগ্ন তার চেয়ে অনেক বেশি আওয়ামী লীগ ও আল কায়েদা নিয়ে। গণহত্যার সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা, সন্ত্রাস, মৌলবাদী রাজনীতি নিয়ে এদের সে রকম কোনো নিবন্ধ অথবা গবেষণা নেই। এদের গবেষণার মূল বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে ইসলামিক র‌্যাডিক্যালিজমের উত্থান।

কিন্তু প্রকৃত কারণ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা। যুক্তরাষ্ট্রে আলোচ্য বিষয় হিসেবে ইসলামিক র‌্যাডিক্যালিজম জামায়াতি ইস্যুর চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এ নিয়ে আলোচনা করা, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লেখার অনেক আউটলেট ও আর্থিক সুবিধা আছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে জামায়াতবিরোধী অবস্থানের তেমন কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই এবং একই কারণে জামায়াত-সম্পর্কিত সভা ও সেমিনারে অংশগ্রহণের সুযোগও সীমিত– সেহেতু এ বিষেশজ্ঞদের মধ্যে জামায়াতের মৌলবাদী রাজনীতি নিয়ে ততটা মাথাব্যথা নেই যতটা আছে ইসলামিক র‌্যাডিক্যালিজম নিয়ে!

বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা আরেকটি কারণে জামায়াত সম্পর্কে তেমন উচ্চবাচ্য করছেন না; আর সেটি হচ্ছে চৈনিকপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তাদের অতীত সংশ্লিষ্টতা। আদর্শিক কারণে তারা ও তাদের অনেক নেতা সেই ষাটের দশক থেকেই ভারতে ও রাশিয়ায়। যে জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ ও শেখ মুজিবর রহমানের নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি তারা কখনও মেনে নিতে পারেননি। তারা এখনও মনেপ্রাণে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দল মনে করেন।

এই বিশেষজ্ঞরা মনেপ্রাণে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও আদর্শিক কারণে জামায়াত-বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা দিতে নারাজ। তারা মনে করেন সরাসরি জামায়াত-বিরোধিতা মানে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করা। কোনো কারণে যদিও-বা তারা জামায়াত-বিরোধী কোনো সভাতে অংশ নেন, নিরপেক্ষতার ভেক ধরে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে অতীতের আঁতাতের বিষয়টি তুলে ধরে জামায়াত ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে একসারিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তাতে করে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না।

কেন জামায়াত নিষিদ্ধ জরুরি

যুক্তরাষ্ট্রের মতে, জামায়াতে ইসলামী একটি মডারেট ইসলামিক দল। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত জামায়াতে ইসলামীকে এ স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জামায়াতকে ‘মডারেট’ ইসলামিক দল নামে তকমা দেওয়া হলেও আদতে দলটি চরমপন্থী। দলটির তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে ‘মওদুদীবাদ’। মওদুদী জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি হচ্ছেন প্রথম ইসলামিক চিন্তাবিদ যিনি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১৯৫৩ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। হত্যাযজ্ঞে উসকানি দেওয়ার দায়ে এক মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। এ রায়ের পর ১২ মে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামবেসি থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো এক তারবার্তায় মওদুদীকে ‘most dangerous man in Pak’ বলে উল্লেখ করা হয়।

১৯৭১ সালে এ দল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা, নারীধর্ষণ, লুটপাটসহ সব ধরনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।

প্রশ্ন হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার জন্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যদি নাৎসি ও ফ্যাসিবাদীদের রাজনৈতিক অধিকার না থাকে, তবে বাংলাদেশে গণহত্যায় সম্পৃক্ত থাকার জন্য জামায়াতে ইসলামী কেন নিষিদ্ধ হতে পারবে না?

জামায়াত কেন গণতান্ত্রিক দল নয়

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মনে করে যে জামায়াত যেহেতু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মেনে নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রায় ৫ ভাগের মতো ভোট পেয়েছে, সেহেতু একে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা ঠিক হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরাও ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করেন যে, কোনো ব্যক্তি ও দলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার সমঅধিকার আছে। যেহেতু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু জামায়াতেরও রাজনীতি করার অধিকার থাকতে পারে।

তারা আরও মনে করেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ফলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাতে এ দলের ক্যাডাররা অন্যান্য ডানপন্থী দলে যোগ দিয়ে আরও চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়বে। আর তখন দেশে অস্থিতিশীলতা বাড়বে।

বস্তুতপক্ষে, জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলেও তাত্ত্বিকভাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। যেমন, মুওদুদীবাদ মানব-রচিত সব ধরনের মতবাদ, যেমন গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রকে প্রত্যাখান করে। মওদুদীবাদের এ তাত্ত্বিক ভিত্তি জামায়াতের প্রয়াত আমীর আব্বাস আলী খানের এক লেখাতেও প্রকাশ পেয়েছিল।

আরেকটি লেখায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, কোনো ব্যক্তিকে জামায়াতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে দলের মূলনীতিতে বিশ্বাসী হতে হবে। অর্থাৎ কোনো হিন্দু অথবা খ্রিস্টান যদি জামায়াতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চায় তবে তাকে প্রথমে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে হবে।

তার মানে জামাতীয় রাষ্ট্রে অমুসলিমের সরকারপ্রধান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জামায়াতের এ তত্ত্ব বৈষম্যমূলক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।

যেহেতু সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের জামায়াতী চেষ্টা ১৯৭১ সালে ব্যর্থ হয়েছে, বর্তমানে এ দলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে শরিয়াভিত্তিক একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা।

একটি চরমপন্থী মতাদর্শের দলকে এভাবে নিজেদের রূপ লুকিয়ে রাজনীতি করতে দেওয়ার পরিণতি তো ভালো হবে না।

তথ্যসূত্র :

ক. Telegram sent (350.1PAK-Jamat-I-Islami-MAUDODI,
Maulana, 5/12/1953)

খ. Abbas Ali Khan-“Jamaat-e-Islami’s view on defense of Bangladesh” (পৃ. ৪)

গ. An Introduction to Jamaat-e-Islami

এবিএম নাসির : যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

এবিএম নাসিরযুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

২৬ Responses -- “জামায়াত: মডারেট না চরমপন্থী”

  1. জাহিদুল ইসলাম

    সকল স্বাধীনতাবিরোধী নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে, মূল সদর দফতর পাকিস্তানের লাহোরের সঙ্গে সব ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা ছিন্ন করে, একটি যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে দেশের জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়ে জামায়াতে ইসলামী যদি নিজেদেরকে শুদ্ধ করে নেয়– তবে এই দল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারে। তাতে মূলত আমার কোনো আপত্তি নেই।

    Reply
    • Mohammad

      America created Laaden, to fight against USSR in Afghanistan. They needs people & party like Laaden and Al-Qaida, so that they can use this matter to interfere in other country. This is the matter why they certify Jamaat as a moderate Islamic party.

      In fact, Jamaat is not at all an Islamic organization. According to Hadis, killing of a muslim is qufri. In another Hadis it was mentioned that, he is a good muslim from whom’s hand & tongues other muslims are safe. So if you carefully look at the activities of Jamaat-Shibir, you will understand that they should not be treated as muslim. Jamaat-Shibir says that Rosul (PBUH) is their leader and Quran is their constitution, in this way they tried to made Quran and Rosul (PBUH) as part of their party. They tried to made Quran and Rosul (PBUH) as their own property. In this way they are misguiding muslims of Bangladesh, they are utilizing Quran and Rosul (PBUH) as their capital. This was possible only due to ignorance in proper Islam of muslims. Rosul (PBUH) died several years ago, so there is no scope to say him as leader. Leadership is possible only by a person who is alive.

      Around 90% of peoples of Bangladesh are muslim. Most of them are muslim, because they born in a muslim family. You will find very few muslims who try to read and follow Quran and Hadis. The main problem of muslims of Bangladesh is that they learnt Islam from moulavis. These moulavi’s made Islam as their business capital. So the best way to learn Islam is to read Quran and Sahih Hadis (Bukhari, Muslim, Tirmizi, Abu Dawood). When you will read and try to understand Quran and Hadis, you will realize what is proper Islam. At the same time you will also understand what is the difference between proper Islam and Jamaat-Hefazaat’s Islam.

      Few days ago I read the interview of the son of Moududi, where he said that Moududi kept them in long distance from Jamaat politics. From another we saw that none of Jamaat’s top leader sent their son & daughter in madrasha for education. In my opinion, we should start an andolon for declare Jamaat-Shibir as non-muslim.

      At end, I request everybody to study Quran and Sahih Hadis. This is the only way to learn the proper Islam, and try to keep himself safe and away from Jamaat-Shibir and Hefazaat.

      May Allah help us to keep ourselves away from Jamaat-Shibir and Hefazaat and also to be good muslim. Amin.

      Reply
  2. mohammed toaha

    জামায়াত আদর্শবাদী সংগঠন। অতীতে এদেশ বা অন্যদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে ওদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নেই। যারা সেকুলার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত তারা মূলত জামায়াতকে ভয় পায়। বলা যায়, নিবন্ধন বাতিল বা অন্য কোনোভাবে জামায়াতকে ঠেকানো কঠিন। কারণ গ্রামে-গঞ্জে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংগঠনটি বিস্তৃত।

    বলা যায়, বাংলাদেশে আর কোনো সংগঠন এত মজবুত আদর্শিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নেই।

    Reply
    • abdus salam

      আদর্শটা কী? ইসলামের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতার ভাগ নেওয়া আর ইহুদি-মার্কিন অক্ষশক্তির দালালি ছাড়া কিছু নয়। কারণ গত ৬০ বছরের ইতিহাসে এই দুটি কাজ আদর্শিকভাবে করেছে ওরা। নিরীহ নারী, শিশু আর বুদ্ধিজীবীদের ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে ইসলামের কোথায় বলা হয়েছে? সুদ-ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জামায়াতের কোনো তৎপরতা আমি কখনও দেখিনি। তাহলে ইসলামের আদর্শ কি এগুলো?

      আমরা যারা নিজেদের মুসলমান দাবি করি, নিজেদের ঈমান রক্ষার্থে এদের ‘ইসলামী’ নাম ব্যবহারে বাধা দেওয়া কি জরুরি নয়?

      Reply
  3. Ahmed

    বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের বিরোধিতা করেছে ভারতের ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকা। পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক প্রচারিত এ দৈনিকের গতকালের সম্পাদকীয়তে ‘জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের সুফল বিএনপির বাক্সে যাবে’ বলে মতপ্রকাশ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মোকাবিলা গণতান্ত্রিক পথে করা উচিত বলে মন্তব্য করে পত্রিকাটির ‘নিষেধাজ্ঞা নয়’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে–

    ‘‘বাংলাদেশের ধর্মাশ্রিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ভোটে দাঁড়াইবার অধিকার কাড়িয়া লইল ঢাকা হাইকোর্ট। এই দলের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সকলেই মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও গণধর্ষণে জড়িত থাকার দায়ে হয় মৃত্যুদণ্ড নতুবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। দলের নবতিপর সর্বাধিনায়ক গোলাম আযম তো নব্বই বছরের কারাদণ্ড পাইয়াছেন। এখন আবার ঢাকা হাইকোর্ট ওই দলের ভোটে লড়িবার অধিকারও রদ করিয়া দিলো। পরবর্তী পদক্ষেপ সম্ভবত জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা। এই মর্মে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের নানা মহল হইতে দাবি উঠিয়াছে। শাহবাগ আন্দোলনের মঞ্চ হইতেও সেই দাবির প্রবল ও ব্যাপক প্রতিধ্বনি শোনা গিয়াছে।

    জামায়াতে ইসলামী যে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের অনেকের কাছে একটি ঘৃণিত সংগঠন, তাহাতে সংশয় নাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দলের নেতা-কর্মীদের ভূমিকাই ইহাকে জনচক্ষে ঘৃণ্য করিয়াছে। ইতিপূর্বে অন্তত তিন বার এই সংগঠন বাংলাদেশে নিষিদ্ধও হইয়াছে। কিন্তু ফৌজি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জামায়াতীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা রদ করেন এবং আর এক ফৌজি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাহাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে টানিয়া আনেন। বর্তমানে দেশের প্রধান বিরোধী দল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এই জামায়াতপন্থিদের সহযোগী। এই দুই দল কেবল একসঙ্গে নির্বাচনই লড়ে নাই, বেগম জিয়া যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন জামায়াতীরা তাঁহার সরকারে একাধিক মন্ত্রিত্বও হাসিল করিয়াছেন। বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অদূরেই, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি’র সহিত জামায়াতের সম্পর্ক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দল নির্বাচনে যোগ দিতে না পারিলে বা নিষিদ্ধ হইলে বিএনপি’র ভোট-বাক্সে তাহার প্রভাব পড়িবার সম্ভাবনা প্রবল। সেই প্রভাব দেশের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির অনুকূল হইবে বলিয়া মনে হয় না।

    এই সূত্রেই একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। কোন রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের মত পছন্দ না করিলে বা তাহাকে অন্যায় মনে করিলে নিষেধাজ্ঞাই কি যথাযথ উপায়? ইতিহাসের সাক্ষ্য ইহার বিপরীতই। দমন-পীড়ন, নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক দলকে আত্মগোপন করিতে বাধ্য করে বটে, কিন্তু নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীরা জনসাধারণের চোখে বীরের কিংবা নিহত হইলে শহীদের মর্যাদা পান। তাহাতে তাঁহাদের জনপ্রিয়তা, প্রাসঙ্গিকতা আরও বৃদ্ধি পায়। গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে, সরকারি নজরদারি ও প্রহরা এড়াইয়া নিষিদ্ধ দলটি সমাজে দ্রুত বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করিতে থাকে। দেশে দেশে বিপ্লবী কিংবা মৌলবাদী ধর্মীয় সংগঠনগুলি এ ভাবেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করিয়া শাসকদের ঘুম কাড়িয়া লইয়াছে। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করিলেও তাহার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াইয়া দেওয়া হইবে। জামায়াতে ইসলামীর মতামত বা ক্রিয়াকলাপের মোকাবিলা যদি করিতে হয়, তবে গণতান্ত্রিক পথেই তাহা করণীয়, সে জন্য তাহাকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করিতে দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে জামায়াতপন্থিদের তত্ত্ব, মতাদর্শ ও নীতি-কর্মসূচির সহিত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রকাশ্য বিতর্ক ও আলোচনার সুযোগ থাকিবে। এ ধরনের তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা গণতন্ত্রের প্রাণস্বরূপ। ইহার সুযোগ বন্ধ হইয়া গেলে সবদিক দিয়াই স্বৈরতন্ত্র মাথা চাড়া দিতে পারে।’’

    Reply
    • ashikur rahman

      জামায়াত গণতান্ত্রিক দল নয়। যখন-তখন নিরীহ মানুষ হত্যা, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র করা এদের মূল কাজ। এ ধরনের দলের সঙ্গে বিতর্ক হতে পারে কি?

      নিরীহ জনগণের জানমাল না বাঁচিয়ে এদের সঙ্গে বিতর্ক করা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা– এ সব করে কারা জামায়াতকে সুযোগ দিতে চায় তা কি বিবেকবান মানুষ বুঝে না?

      Reply
  4. দেশদ্রহী

    জামায়াতের কোন নেতা দুর্নীতিবাজ? শিবিরের কোন কর্মী ধর্ষক? আ্ওয়ামী লীগ আর ছাত্রলীগের কোন নেতাকর্মী দুর্নীতিবাজ আর ধর্ষক নয়? পক্ষপাতমূলক লেখা।

    মুসলিম হিসেবে পরিচয় দানকারী ব্যক্তি কখনও-ই শরিয়া আইনের বিরোধিতা করতে পারেন না।

    Reply
  5. kawsar mia

    পৃথিবীর মানুষকে বিশ্বাস করতে পারি না। আসলে কোনো দলই পরিপূর্ণ নয়। আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী দল, আর জামায়াত ধর্মবিদ্বেষী একটি দল!

    Reply
  6. আজাদ

    জামায়াতবিরোধী সব লেখক একচোখা… তারা মূলত জামায়াতের ব্যাপারে ডান চোখকে অস্বীকার করেন। এই পক্ষপাতমূলক চিন্তা জন্মসূত্র থেকে্…

    Reply
  7. Nazmul alam

    আমরা জানি যে বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ, তাহলে আমরা কেন একটি মুসলিম সংগঠন বা দলকে সমর্থন করি না? যদি জামায়াত একটি অমুসলিম দল হয় তাহলে কেন সরকার হেফাজতে ইসলাম সংগঠনকে সমর্থন করে না?

    Reply
  8. সোহেল আহমেদ

    জামায়াত মডারেট নয়, চরমপন্থীও নয়। একেবারে নরমপন্থী দুগ্ধপোষ্য শিশু। আইন মেনে চলা একটা সাংবিধানিক দল। এ সব কথা যখন অতলান্তিকের দুই তীর মানে পুবের ইউরোপ আর পশ্চিমের মার্কিন মুলুক থেকে প্রাচ্যের এই বঙ্গমুলুকে আসে, তখন বুঝতে হবে এ সবের পেছনে অনেক দীর্ঘ শানে নজুল আছে। ১৯৭১-এ প্রায় সব পাকিস্তান বিশেষজ্ঞই মনে করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত এক পাকিস্তান টিকে যাবে আমেরিকার চূড়ান্ত হস্তক্ষেপে এবং এই ১৯৭১-এ জামায়াত ছিল আমেরিকা, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের পক্ষে এবং বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে একটি বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক।

    এখনও তাই। যেখানে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছে আদালত, সেখানে পত্রিকাতেই একই সঙ্গে খবর আসছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ড্যানি লুইস সাহেবের বাসায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভির সঙ্গে জামায়াত নেতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্তদের পক্ষের অন্যতম আইনজীবী ব্যরিষ্টার আবদুর রাজ্জাকের বৈঠক হয়।

    মার্কিনিদের যখন ইসলামী মৌলবাদীদের দরকার হয় তখন ওরা ভালো। আবার যখন এই লাঠিয়ালের লাঠির আঘাতে স্বয়ং জমিদার আহত হন– যেমন ৯/১১– আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তখন মার্কিনিরা সুর ও তাল পরিবর্তন করে। মার্কিনিরা এ দেশে দূতাবাস বন্ধ রাখছে মূলত আক্রমণের অগ্রিম সংবাদ পেয়ে!

    হায় রে কপাল বাঙালির! আমরা বিয়াল্লিশ বছরের পুরানো গণহত্যার জন্য গোলাম আযমের মতো আইখমানদের ফাঁসি দিতে পারব না!!! কেননা আমেরিকানরা চায় না, ইউরোপ চায় না, সৌদি আরব চায় না। শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দিয়ে আমাদের উপর ‘উম্মতে রাসুলের’ মতো আচরণ করবে বলে শোনা যাচ্ছে আজ বছর দুই এক হল।

    ‘ওরা’ চান আমরা আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে শুধু মার্কিনবিরোধী ইসলামী মৌলবাদীদের ধরি। গবেষণাও সে কারণেই…..

    Reply
    • nazrul islam

      এই চমৎকার প্রত্রিক্রিয়ার জন্য জনাব সোহেল আহমেদকে সাধুবাদ।

      এবিএম নাসিরকেও ধন্যবাদ। লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগল।

      Reply
      • শামছুজ্জামান সেলিম

        আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক দলের তৎপরতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। সাংবিধানিক ধারায় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের সমর্থন আদায় করে ‘ক্ষমতায়’ যাওয়ার জন্য যারা কাজ করে তাদের সাধারণ স্বীকৃতিই এখন বিশ্বের চল। এখানে রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের প্রতি আস্থা থাকতে হবে। জামায়াত রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ ‘বিচার ব্যবস্থাকে’ একেবারেই অগ্রাহ্য করে। ‘ট্রাইব্যুনালে’ রায় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আদালতকে চ্যালেঞ্জ করে ধ্বংসাত্বক তৎপরতা শুরু করে। অথচ এই দেশে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। এই ধারা অসংবিধানিক এবং সন্ত্রাসমূলক।

        কোনো রাষ্ট্র এদের রাজনৈতিক দলের মর্যাদা দিতে পারে না। জামায়াতকে এখই নিষিদ্ধ করতে হবে।

  9. Pak

    একটি চরমপন্থী মতাদর্শের দল জামায়াতকে এভাবে নিজেদের রূপ লুকিয়ে রাজনীতি করতে দেওয়ার পরিণতি ভালো হবে না।

    Reply
    • শামছুজ্জামান সেলিম

      একটা কথা ঘন ঘন বলা হয়ে থাকে যে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলে ওরা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে ধ্বংসাত্বক তৎপরতা করবে! জার্মানির নাৎসিদের নিষিদ্ধ করার পর কি ওখানে ‘ধ্বংসাত্বক’ তৎপরতা চলছে? এই যুক্তি কুযুক্তি, ধোঁকা।

      Reply
  10. তাজুল ইসলাম

    বাংলাদেশে জামায়াত ইসলামী নিষিদ্ধ জরুরি, কিন্তু কেন? আপনার বক্তব্যে সুষ্পষ্ট কারণ ব্যাখা করেননি। এটা শুধু আপনার একান্ত মতামত।

    জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের নেতারা দেশের জন্য হয়তো কল্যাণকর কিছু করেননি। কিন্তু তাই বলে তো সবাই নয়। কতিপয় ব্যক্তির জন্য আপনি তো একটি সংগঠনকে বন্ধ করে দিতে পারেন না।

    Reply
    • সুদীপ্ত

      @ তাজুল ইসলাম

      আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে ১৯৭১ সালে জামায়াত কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে নয়, বরং সংগঠন বা দল হিসেবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বিভিন্নভাবে দেশের বিরোধিতা করেছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন অপপ্রয়াস চালিয়েছে। নিবন্ধন পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কী ধরনের সন্ত্রাসী (রগকাটা) কার্যক্রম চালিয়েছে তা দেশের মানুষ দেখেছে। ১৯৭১ ও এর পরবর্তী সময়ে দেশের বুদ্ধিজীবী ও সুধীসমাজের উপর যে উদ্দেশ্যে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে তা আজ সবাই বুঝতে পেরেছে।

      যারা এখনও মনেপ্রাণে নিজেদের পাকিস্তানি মনে করে, দেশের স্বাধীনতা বা সংবিধানকে স্বীকার করে না, তারা সেই দেশেই কোন অধিকারে রাজনীতি করার সুযোগ পাবে? তারা তো দেশে থাকারই যোগ্য নয়। তাই শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যক্তি নয়, সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ ও নির্মূল করতে হবে।

      আর এরপরও যারা জামায়াতকে সমর্থন করে সহানূভূতি দেখায় স্পষ্টভাষায় তারা দেশদ্রোহী ও বাংলাদেশবিরোধী; তারা নব্য রাজাকার। তাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

      Reply
  11. Bangladeshi

    এত বড় একটি বিষয় নিয়ে শুধুমাত্র কয়েকলাইন লিখেই মতামত দিয়ে দিলেন?

    এবার বলুন তো দেখি, গত প্রায় ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি খুনোখুনি, লুটপাট, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, ধর্ষণ, নারীনির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন কোন দলটি করেছিল? আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো নয় কি? গত বিয়াল্লিশ বছরে উল্লেখিত অপরাধগুলোর সঙ্গে কারা সবচেয়ে বেশি জড়িত?

    এ হিসেবে এবার বলুন কারা চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী? কাদের সবার আগে নিষিদ্ধ করা উচিত?

    Reply
    • Uttam

      ২০০১-২০০৫ সময়কালে এদেশে যে সংখ্যক খুনোখুনি, লুটপাট, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, ধর্ষণ, নারীনির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা জামায়াত-শিবির ও এদের সহযোগী সংগঠন বিএনপি দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল, গত প্রায় ৫ বছরে এর অর্ধেকও হয়নি…

      Reply
    • M Masud Alam

      আপনার মন্তব্য ভালোই। কারণ আপনি দেশ নিয়ে ভাবেন। আপনার মন্তব্যে যে সব অপরাধের কথা বললে ১৬ কোটি মানুষের দেশে এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তবে রাষ্ট্র যখন সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখণ আপনার ভাবনাগুলো কোথায় থাকবে? ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলা, ৬৪ জেলায় একসঙ্গে বোমা মহড়া, ব্রিটিশ হাইকমিশনারের উপর বোমা, সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়াকে বোমা মেরে হত্যা, আহসানউল্লঅহ মাষ্টার এমপিকে বোমা মেরে হত্যা প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন? বাংলা ভাইদের উত্থান, মানুষ মেরে গাছের উপর টাঙ্গিয়ে রাখা– এসবও স্মরণ নেই?

      নিজামী সংসদে বললেন, ‌‌’বাংলা ভাই বলে দেশে কিছু নেই, বাংলা ভাই কাগজের সৃষ্টি’!!!

      Reply

Leave a Reply to kawsar mia Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—