Feature Img

imran-pঅবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এ দিনটির জন্য আমরা অপেক্ষা করেছিলাম। রাজাকারদের শিরোমণি গোলাম আযমের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল। ২০১০ সালের ১ অগাস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিল। ২০১২ সালের ১৩ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহণ, দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনসহ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গত ১৭ এপ্রিল গোলাম আযমের মামলাটি অপেক্ষমান রাখা হয়। প্রায় ৩ মাস অপেক্ষমান থাকার পর মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হল।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু যথার্থভাবেই বলেছিলেন, ‍‍‘‘গোলাম আযম শুধু মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ‌‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন না, তিনি ছিলেন মূল নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী।’’

সুতরাং গোলাম আযমের মামলার রায় সামগ্রিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩ এর ২০(২) ধারা অনুযায়ী অপরাধীর শাস্তি হতে হবে তার কৃত অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী। গোলাম আযম ১৯৭১ সালে যে মাত্রার অপরাধ করেছেন তাতে তার উপযুক্ত শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড।

গোলাম আযমের মামলার রায় গোষণার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি তার বয়সঘটিত ব্যাপার নিয়ে কিছু কথাবার্তা উঠেছে। কেউ কেউ বলেছেন, বয়সের কারণে তার সাজা কমে যেতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যুদ্ধকালীন অপরাধ এমন মাত্রার অপরাধ যার বিচারের ক্ষেত্রে ভিকটিমদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের বিষয়টি সবার আগে বিবেচনা করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, জার্মানির কোর্টে অপরাধীর বয়স ও যুদ্ধাপরাধ প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু বিতর্ক হয়েছে। সেখানে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, বয়স যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো বাধা হতে পারে না। সাবেক নাজি সদস্য হেইনরিখ বোয়েরের (Heinrich Boere) শাস্তির বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ জার্মানির একটি কোর্ট যুদ্ধকালীন অপরাধের দায়ে হেইনরিখ বোয়েরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেদারল্যান্ডসের তিন বেসামরিক নাগরিককে হত্যার দায়ে আদালত তাকে এ দণ্ড প্রদান করে।

দণ্ড প্রদানের সময় হেইনরিখ বোয়েরের বয়স ছিল ৮৮। তাই এ ডাচ নাগরিকের পক্ষে বার্ধক্যজনিত দণ্ড মওকুফের বিষয়টি তোলা হয়। কিন্তু আদালত যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। উল্লেখ্য যে, জার্মানিতে মৃত্যুদণ্ড নেই (পশ্চিম জার্মানি ১৯৪৯ সালে এবং পূর্ব জার্মানি ১৯৮৭ সালে মুত্যদণ্ড বিলোপ করে), যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই সেখানে সর্বোচ্চ দণ্ড।

সুতরাং এটি বলা যায় যে, আদালত হেইনরিখ বোয়েরেকে সর্বোচ্চ দণ্ডই দিয়েছে। বয়সের কারণে সাজা কমিয়ে দেয়নি। ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিবিসি হেইনরিখ বোয়েরের দণ্ড নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, হেইনরিখ ৯০ বছর বয়সে কারাদণ্ড ভোগ শুরু করেন।

গোলাম আযমের মামলার রায়ের সঙ্গে হেইনরিখ বোয়েরের মামলার রায় খুবই প্রাসঙ্গিক। যারা বলছে বয়সের কারণে গোলাম আযম লঘু দণ্ড পেতে পারেন তাদের হেইনরিখ বোয়েরের মামলার কথা মনে রাখা উচিত। বাংলাদেশে আইনগতভাবে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ নয়। এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে। এগুলো হল: মানবতাবিরোধী অপরাধ ও এর অনুরূপ আন্তর্জাতিক অপরাধের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি, সহযোগিতা এবং হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ। পাঁচটি অভিযোগে ৬০টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের ছয়টি, পরিকল্পনার তিনটি, উস্কানিদানের ২৮টি, সহযোগিতার ২২টি এবং হত্যা ও নির্যাতনের ১টি ঘটনা। এসব অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে গোলাম আযমের শাস্তি নির্ধারিত হবে বলে আশা করা যায়।

কোনো কোনো দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। কিন্তু কিছু কিছু দেশে যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে বিধানের ব্যতিক্রম রয়েছে। এর মাধ্যমেই প্রমাণ হয়, সেসব দেশে যুদ্ধকালীন অপরাধকে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিছু কিছু দেশের প্র্যাকটিস অনুযায়ী, বয়স্ক লোকদের সাজা প্রদানের সময় নানা বিষয় বিবেচনা করা হয়। সেটি সাধারণত অন্যান্য ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। যা জার্মানির কোর্টে হেইনরিখ বোয়েরের মামলার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে।

আমরা জানি কাদের মোল্লার আপিল শুনানিতে ৭ জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে অ্যামিকাস কিউরিদের কাছে একটি প্রশ্ন ছিল- ‌’আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে কি না।’ এখনও পর্যন্ত চারজন মতামত জানিয়েছেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রফিক-উল হকের বক্তব্য- ‘‘১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল) প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই।’’

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহমুদুল ইসলামের বক্তব্য- ‘‘১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের বিরোধ থাকলে প্রথাগত আইন প্রযোজ্য হবে না।’’

সুতরাং বলা যেতে পারে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের ১৯৭৩ সালের আইন অনুযায়ী অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের সুযোগ রয়েছে। আইনের ২০(২) ধারার উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখেই গোলাম আযমের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। এরপর অনেক বছর চলে গেছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। তাই বলে কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধের মাত্রা কমেছে? মনে রাখতে হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কোনো ধরনের প্রতিহিংসাপ্রসূত অবস্থান থেকে করা হচ্ছে না, এর সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ন্যায়বিচার জড়িত। একাত্তরের ৩০ লাখ শহীদের রক্তের ঋণ ও ৪ লাখ বীরাঙ্গনার আত্মত্যাগের সঙ্গে সম্পর্কিত এ বিচার।

আমরা মনে করি যুদ্ধাপরাধীদের নেতা গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারবে।

ডা. ইমরান এইচ সরকার: মুখপাত্র, গণজাগরণ মঞ্চ।

ইমরান এইচ সরকারমুখপাত্র, ইমরান এইচ সরকার

১৩ Responses -- “ন্যায়বিচার ও গোলাম আযমের বয়স”

  1. hasan

    গো আযমের হায়াত আর বেশি হলে ৫ কি ১০ বছর। আর যেসব রাজাকার আছে সবার ফাঁসি চাই।

    Reply
  2. সৈয়দ আলি

    ইমরান,

    আপনার আশঙ্কাই সত্য হল। গু আজম ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচল। বয়স অতিক্রম করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণে আপনার কঠিন যুক্তি কেন আমাদের রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউসন টিম দিতে পারল না তা নিয়ে আমার দুটি ব্যাখ্যা আছে।

    ১. নড়বড়ে প্রসিকিউটরদের অতখানি জ্ঞান বা অধ্যয়নই নেই।

    ২. (এটি হয়তো আপনার ভালো লাগবে না) জামায়াতের সঙ্গে সরকারের একধরনের আপোস ও আঁতাতের ঘটনা পত্রপত্রিকায় এসেছে যা সরকারকে গু আজমের প্রতি সহৃদয় ও দয়ালু করে তুলেছে।

    গু আজম ১৯৭৮ সালে দেশে ফিরে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে বুক চাপড়ে বলেছিল যে তার নামে কোনো থানায় একটি জিডি পর্যন্ত নেই, তাই একাত্তরে কৃত অপরাধে তার কোনো বিচার প্রচেষ্টা সফল হবে না (অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন)।

    গু আজমের এই বুকচাপড়ানো সঠিক। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলাম, তারা তৎকালীন সরকারকে গু আজম ও তার স্যাঙ্গাতদের নামে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানিয়েছিলাম।

    আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যারা মুখে ফেনা তুলেন, সেদিন তাদের লক্ষ্য ছিল বিড়ি ফুঁকা থেকে বেনসন ফুঁকা, পা-গাড়ি থেকে মটরগাড়ি চড়া। স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তাটুকু করার আন্তরিকতা বা প্রয়োজন তারা বোধ করেননি।

    আর আজ ইতিহাসের সেই দায়ভার আপনাদের মতো তরুণদের ঘাড়ে এসে পড়েছে।

    Reply
  3. jaidul kabir

    বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখিয়ে ট্রাইবুনাল তাঁর রায়ে রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান থেকে বিরত থাকলে
    এ দেশের স্বাধীনতাকামী জনগন তা মেনে নেবে না।
    তাই আমরা আশা করব আজ গো:আযমের সর্বোচ্চ শাস্তির (ফাঁসি)রায় ঘোষণা হবে।

    সবাই বলুন

    জয় বাংলা
    জয় বাংলা
    জয় বাংলা

    Reply
  4. ফরহাদ

    মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনাকারী, ষড়যন্ত্রকারী, উস্কানিদাতা, পাকিস্তানি সেনাদের সাহায্যকারী এবং দেশের মা-বোনদের ইজ্জতহরণকারী রাজাকার গোলাম আজমের ফাঁসি হওয়া উচিত।

    Reply
  5. ashikur rahman

    যারা ধর্মকে ব্যবহার করে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের মৃত্যু ঘটায় তাদের ব্যাপারে আপোষকামীরা তো তাদেরই একান্ত অনুচর। এই বিষক্রিয়া থামাতে হবে। মার্কিন ষড়যন্ত্র ঠেকাতে যে কৌশল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃবৃন্দ সেদিন গ্রহণ করেছিলেন তার ফলে মুক্তিযুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়, কিন্তু মুক্তিসংগ্রাম তো চালাতে হবে।

    জয় বাংলা।

    Reply
  6. উমর ফাঈলাসূফ

    আশা করছি এই ঘাতককূল শিরোমণির ফাঁসির মাধ্যমেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। শহীদ জননীর সন্তান-সন্ততিদের জন্যে আজকের রাতটা একটু বেশিই দীর্ঘ।

    জয় বাংলা।

    Reply
  7. baharul alam

    Amra pakistani dalaler shiromoni golam Ajomer shorbochho shasti chai . ekhane jatir rokter shathe baimani amra kokhono mene nebona. proejone abar juddhe jabo tobu adeshke rajakarder kolonko theke mukto korte chai. dhonnobad shahoshi lekhar jonno a shomoyer shresto torun bir Emran ke.

    Reply
  8. বাংগাল

    এই রাজাকার শিরোমণি ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায় ওর পিতৃভূমি পাকিস্তানে। লাহোরে পৌঁছে বলেছিল, বাঙালি জাতি জারজ। ভুট্টো, ইয়াহিয়া, টিক্কা খানের পেয়ারা দোস্ত গোলাম আযমের অপরাধ ওই তিন ইবলিসের চেয়ে কম নয়। বয়সের কথা বলে ওকে চরম সাজা থেকে রেহাই দিলে ১৯৭১ সালের ওই হায়েনাদের হাতে নিহত গর্ভবতী নারীর গর্ভে থাকা শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধ হতভাগাদের আত্মা কি আমাদের মাফ করবে? করবে না।

    ওই পিশাচের চরম সাজা হোক এই আমাদের কামনা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—