Feature Img

rezaul-fমায়ের কোল সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, মা তাঁর সন্তানের সহজ স্বাভাবিক মিত্র–বাংলাদেশের সাধারণ ভাবনা মোটামুটি এমনি। সন্তানের ক্ষতির বিষয়ে আইন বা সমাজ কেউই মাকে অভিযুক্ত করে না সাধারণভাবে। মাতৃত্ব নামক ভাবমূর্তি এমন একটা মতাদর্শিক বিস্তৃতি নিয়ে আছে যে, সে ধরনের অভিযোগ আবশ্যিকভাবেই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়বার কথা। কিন্তু, সাম্প্রতিক সামিউল হত্যার বিষয়টি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো যে “সন্তানের হত্যাকারী হিসেবে মা”–বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে কোনো সংকট-ই তৈরি করতে পারেনি; মিডিয়া, আইন ও সমাজ সম্মিলিতভাবে মা আয়শাকে হত্যাকারী হিসাবে বিশ্বাস করেছে।

এতে করে সমাজ বদলের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি–যেখানে মায়ের কাছে বা হেফাজতে সন্তানকে আর নিরাপদ ভাবা যায় না? কোনো একটা ঘটনা যদি একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশংকা তৈরি করতে পারে তাহলে কাছাকাছি সময়ে ঘটা মা ও দুই সন্তানের কথিত আত্মহত্যার অপর ঘটনাই বরং মায়ের দিক থেকে সন্তানের নিরাপত্তা বিষয়ে বেশি আশংকা তৈরি করবার কথা।

কারণ, মা-ই দুই সন্তানকে হত্যা করবার পরে নিজে আত্মহত্যা করেছে–যৌক্তিকভাবে এমনটা বলা না গেলেও সন্তানের মৃত্যুর সাথে মায়ের মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক (অন্ততঃ প্ররোচক অর্থে–প্রাপ্তবয়স্ক না হলে প্ররোচনাই একটি বড় অপরাধ হবার কথা।) মিডিয়া, আইন ও সমাজের নিকট বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে এবং সেটি অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয় নাই (পুরো ঘটনার দায় গিয়ে পড়েছে স্বামী ও স্বামীর পিতা-মাতা-বোন ও বর্তমান স্ত্রীর উপর।)। দেখা যাচ্ছে, একটা ঘটনায় মায়ের বিপক্ষে সকল আলামত থাকবার পরেও মা অভিযুক্ত হন নাই হত্যার ব্যাপারে, আর অন্য ঘটনায় যতক্ষণ পর্যন্ত আলামত ও অন্য অভিযুক্তকে পাওয়া যায় নাই ততক্ষণ সামিউলকে তার মা-ই হত্যা করেছে বলে মিডিয়া ও তার গ্রাহকগণ বিশ্বাস করেছে, এবং পরে কথিত হত্যাকারী আরিফ (মায়ের প্রেমিক) দৃশ্যপটে এলেও গণমানসে মায়ের ‘ডাইনী’ রূপ এখনো সমানভাবে বিদ্যমান।

এই দুই মায়ের প্রধান পার্থক্য হলো–দুই সন্তানের মা (রীতা) স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত আর সামিউলের মা বিয়ে কার্যকর থাকাকালীন অন্য পুরুষের সাথে প্রেম (পরকীয়া প্রেম) করেছে। এই পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, তালাকপ্রাপ্তি সন্তান হত্যার দায়মুক্তি দেয় আর পরকীয়া প্রেম সন্তান হত্যার অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে বাংলাদেশের জনমনে, অন্ততঃ মিডিয়াভাষ্য তেমনটাই বলে: “মায়ের পরকীয়ার বলি শিশু সামিউল” (২৫ জুন দৈনিক সমকাল, বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর শিরোনাম); bdnews24.com পুলিশের বরাতে ২৪ জুন লিখেছে, “পরকীয়া সম্পর্কের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে”; দৈনিক প্রথম আলো ২৬ জুন “সামিউল হত্যাকাণ্ড ছেলে খুনের ঘটনায় নিজের বন্ধুকে দুষলেন মা” শিরোনামে যে নিউজ করেছে সেখানে পরকীয়া শব্দের বদলে “অনৈতিক সম্পর্ক” ব্যবহার করা হয়েছে, মামলার বর্ণনায় উদ্ধৃতি হিসাবে পরকীয়া শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন সংবাদপত্রের বাইরে সকল টিভি চ্যানেল ও বাংলা ব্লগ বিষয়টিকে পরকীয়া প্রেমের বলি হিসেবেই প্রচার করেছে। প্রচুর পাঠক মন্তব্য পেয়েছে এই সংবাদ, ৩০ জুন প্রথম আলোর ওয়েব ভার্সন থেকে পাঠক মন্তব্য:

“মা জে আমন কাজ করতে পারে ভেবে আমার চোকে পানি আসসে ,আমন মা কে ফাসিতে জুলান দরকের”,

“তুমি মা হতে পার না।”,

“আয়শা হুমায়রার কোন খবর পত্রিকায় আসছে না কেন? শুধু আরিফ এবং তার সহযোগীরাই নয় মা রূপী ডাইনী আয়শা হুমায়রারও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

ইত্যাদি। অথচ, ঐ একই সপ্তাহে ঢাকায় পুলিশ হেফাজতে তিনজন মারা যায়, কিন্তু মিডিয়া ও জনগণ তাতে তেমন আলোড়িত হয়নি। দেখা যাচ্ছে, আইনের থেকে নৈতিকতা বড় সংবাদ তৈরি করে বাংলাদেশের মিডিয়ায়। আইনীভাবে সামিউল হত্যা অপরাপর হত্যার মতোই, কিন্তু পুলিশ কাউকে হত্যা করলে একাধিক অপরাধ সম্পাদিত হয়, যথা: হত্যা, শপথ ভঙ্গ করায় রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ইত্যাদি।

অন্যদিকে, এমনকি আয়শা যদি সামিউলকে হত্যাও করে, তা কেবল হত্যাই, কারণ, আইনীভাবে সামিউলঘটিত কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলো না আয়শার, বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী মা সন্তান পালনে অনিচ্ছুক হলে কোনো অপরাধ সংগঠিত হয় না, সন্তান লালন-পালনে পিতার আইনী বাধ্যবাধকতা আছে এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের নিকট তার কতগুলো মৌলিক অধিকার পাওনা আছে, কিন্তু সন্তান বিষয়ে মায়ের আইনী কোনো দায় নেই (একটি বিশেষ ক্ষেত্র বাদে, মুসলিম ভরণপোষণ আইনের ৩৭০ ধারার ২ উপধারায় বলা আছে–পিতা গরীব হলে এবং নিজস্ব পরিশ্রমের ফলে আয়ক্ষম না হলে এবং মায়ের অবস্থা স্বচ্ছল হলে বাবার ন্যায় মা তার ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য)।

সামিউল যদি আরো ছোট হতো, আয়শা যদি সামিউলকে স্তন্যদানে রাজি না হতো, তবুও তা আইনীভাবে কোনো অপরাধ নয়, কারণ, খাবারের সংস্থান আইনীভাবে পিতার দায়িত্ব এবং তখনো স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে স্বামী বাধ্য (মুসলিম আইন অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীকে যেসব ‘ন্যায়সঙ্গত’ নির্দেশ দিতে পারে সেগুলোর মধ্যে সন্তানকে স্তন্যদানের নির্দেশ আছে কিনা–তার আইনী ব্যাখ্যা বা নির্দেশনা এখন পর্যন্ত নেই; যদি সেটা বৈধ নির্দেশও হয় তাহলেও স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে বড়োজোর, কোনো অপরাধের অভিযোগ করতে পারে না।), অথবা, তালাক দেবার ক্ষমতা (বিধিবদ্ধভাবে নোটিশপ্রদান সাপেক্ষে) আছে স্বামীর, তবে তালাক দেবার পরেও ভরণপোষণ দিতে হবে–ইদ্দতকাল সমাপ্তি পর্যন্ত।

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী সন্তানের আইনানুগ অভিভাবকত্ব ও দায়-দায়িত্ব পিতার, সন্তানের সাহচর্য বা দেখভাল করা মায়ের ‘অধিকার’ (বাধ্যবাধকতা নয়) বলে বর্ণিত হয়েছে এবং সেটা পিতার অধীনস্থ হেফাজতকারী হিসেবে মাত্র। স্বেচ্ছায় কোনো অধিকার ত্যাগ করা অপরাধ হতে পারে না, আর সামাজিকভাবে এই ত্যাগ নিন্দাযোগ্য হলে মুসলিম নারীর পিতার মৃত্যুপরবর্তী উত্তরাধিকার ত্যাগ করাটাও নিন্দাযোগ্য হবার কথা বা অধিকার ত্যাগ ছাড়া যেহেতু কোনো দান হতে পারে না তাই সকল দানই নিন্দাযোগ্য। আবার, মুসলিম আইনের (THE MUSLIM FAMILY LAWS ORDINANCE, 1961 ) ব্যাখ্যায় সহিহ্ বিয়ের শর্তসমূহের (একজন নারী ও একজন পুরুষ, সম্মতি, ইজাব কবুল, সাক্ষী, দেনমোহর, ধর্ম, স্ত্রীর সংখ্যা, ইদ্দত, নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়ের বাইরে) মধ্যে উভয়ের মাঝে প্রেম কোনো শর্ত নয়–বিয়ের সময়ও নয়, পরেও নয়; আদতে প্রেম বলতেই কিছু নেই আইনে।

বিয়ে কার্যকর থাকাকালীন আরেকটা বিয়ে করতে পারে না স্ত্রী, কিন্তু প্রেম বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই (এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, আয়শার স্বামী আয়শা ও শামসুজ্জামান আরিফের প্রতি সামিউল হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেছে, পরকীয়া প্রেম বা প্রতারণা বা অন্য কোনো অভিযোগ নয়।)। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে ব্যাভিচারের সংজ্ঞা পাওয়া যায় ১৮৬০ সালে প্রণীত পেনাল কোড-এর ৪৯৭ ধারায়, যা স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে অভিযোজিত হয়েছে:

Adultery 497. Whoever has sexual intercourse with a person who is and whom he knows or has reason to believe to be the wife of anther man, without the consent or connivance of that man, such sexual intercourse not amounting to the offence of rape, is guilty of the offence of adultery, and shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to five years, or with fine, or with both. In such case the wife shall not be punished as an abettor.

এখানে দেখা যাচ্ছে যে, স্বামীর সম্মতি ও সহযোগিতা নিয়ে তাঁর স্ত্রীর সাথে অন্য পুরুষের যৌনসম্পর্ক স্থাপনও ব্যাভিচার হবে না (একই আইনের ৩৭৫ ধারা মোতাবেক স্ত্রী রাজি না থাকলে ধর্ষণ বলে পরিগণিত হবে।) এবং যেইক্ষেত্রে ব্যাভিচার হবে সেক্ষেত্রে ব্যাভিচারী পুরুষের শাস্তি হবে কিন্তু সহযোগী হিসেবে নারীর কোনো শাস্তি হবে না। অতএব বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিয়ে বহির্ভূত যৌনসম্পর্ক পুরুষের জন্য কখনো কখনো অপরাধ (Legal Offence) হলেও নারীর জন্য কখনোই অপরাধ নয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংবিধান যেহেতু নাগরিকদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বসবাসের অধিকার দিয়েছে, তাই এটা সহ সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে নাগরিকদের প্রেম বা পরকীয়া প্রেম অন্তর্ভূক্ত থাকবার কথা (এ বিষয়ে কোনো আইনী প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি এখনো সম্ভবতঃ); সেক্ষেত্রে ব্যাভিচারে আদৌ কোনো লিগাল অফেন্স ঘটে না।

সেটা ঘটুক বা না ঘটুক, বিদ্যমান কোনো আইনেই মা আয়শার দিক থেকে প্রেমের ফলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। তাহলে, দেশের সংবিধান ও আইনের বাইরে না গেলেও সে যে অপরাধী–এ ব্যাপারে সার্বজনীন ঐকমত্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো? সংবিধান ও আইন লংঘন না করেও আয়শাকে ‘অনৈতিক’ বলে চিহ্নিত করা হলে, সেই নৈতিকতায় সাংবিধানিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ, আইনের শাসনপ্রত্যাশী রাষ্ট্রের কী দরকার?

সম্প্রতি আদালত ফতোয়া (বিচার বহির্ভূত শাস্তি) নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের মিডিয়াকে ফতোয়ার ব্যাপারে মুখর দেখা যায় প্রায়ই; ফতোয়া প্রায় ক্ষেত্রেই এমনসব বিষয়ে দেওয়া হয় যেগুলো আসলে আইনীভাবে কোনো অপরাধ নয়, যেমন–প্রেম, পরকীয়া, ব্যাভিচার, বিয়ে বহির্ভূত গর্ভধারণ ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রধান মিডিয়া ও তার গ্রাহকগণ সম্মিলিতভাবে আয়শা হুমায়রাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে সামিউল হত্যার প্রমাণ পেয়ে নয় বরং পরকীয়া প্রেম করার কারণে অথবা বলা যায়, প্রেমকে হত্যার আলামত/প্রমাণ হিসেবে ধরে নিয়েছে। আইনের চোখে অপরাধ নয় এমন কর্মকে অপরাধ বলে প্রচারণা চালানো, শাস্তি দেওয়া/চাওয়া, পুলিশী টানাহ্যাঁচড়ায় ইন্ধন দিয়ে যাওয়া–ফতোয়ার সাথে এর তফাত কোথায়? বাংলাদেশ রাষ্ট্র, মিডিয়া, সমাজ সম্মিলিতভাবে আয়শার প্রতি যে বেআইনী আচরণ ও মানহানি করলো–তার বিচার কে করবে? তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মিডিয়ার এই টানাহ্যাঁচড়ার অধিকার কে দিলো? এই অধিকার কারো নেই কিন্তু শক্তি আছে সমাজের, মতাদর্শিক ক্ষমতা কাজ করে আয়শার বিপক্ষে।

একজন পাঠক যেমন বলেছেন, “তুমি মা হতে পার না।”, এটা বাংলাদেশের সমাজের বক্তব্য, মতাদর্শিক স্বর। এই সমাজ মাতৃত্ব নামের একটি নিঃস্বার্থ ভাবমূর্তি নির্মাণ করেছে আর নারীকে নির্দেশ দিয়েছে ঐ ভাবের মূর্তি হবার। এই সমাজে মা একটি প্রায় অযৌন অস্তিস্ত্ব, মাতৃত্ব আর কামনা-বাসনা বিপরীত বৈশিষ্ট্য, আটাশ বছরের যে নারী এক বা দুটি সন্তান নিয়ে স্বামীহারা হয়েছে, তাঁর কাছে এই সমাজের আশা ও নির্দেশ, “সন্তানদের মানুষ কর, সন্তানরা তোমাকে দেখবে।”, যেন স্বামী শুধু দেখবার জন্য, যেন স্বামী আর সন্তানদের ভূমিকা অদলবদল করা যায়, বিধবার প্রেমাকাঙ্ক্ষা তাঁর মাতৃত্বের হানি ঘটায় এই সমাজে।

এই সমাজের সন্তান মাকে ভালোবাসে কিন্তু মায়ের প্রেম ও প্রেমিককে ঘৃণা করে, প্রেমিক মা ডাইনী হয়ে যায়–মাতৃত্ব হারায়। ছয় বছরের সামিউল আইন চেনে না সমাজ চেনে, সমাজ তাকে মাতৃত্বের প্রহরী বানিয়েছে, মায়ের প্রেম তার পছন্দ নয়। কিন্তু হোক তার অপছন্দ, মায়ের পরকীয়া প্রেম কি মাকে খুনী বানায়? পরকীয়া প্রেম তো কোনো বেআইনী কর্ম নয়, একটি আইনী কর্মের জন্য কাউকে কেন খুন করতে হবে? পরকীয়া প্রেম যদি আবশ্যিকভাবে খুনী বানিয়ে ফেলে তবে বলতেই হবে–সাম্প্রতিক বাংলাদেশে আয়শা ছাড়া আর কোনো পরকীয়া ঘটে নাই, চলছে না; অন্যদিকে পরকীয়া ঘটছে এমন কোনো পরিসরে খুন হলে যদি সেটা আবশ্যিকভাবেই পরকীয়ার ফলাফল হয় বা ফলাফল হিসেবে দেখায় মিডিয়া তবে র‌্যাব/পুলিশ/সেনাসদস্য হওয়া মানে কেন খুনী বা ধর্ষক বা ঘুষখোর হবে না? যেখানে কিনা একই সপ্তাহে কেবল ঢাকায় পুলিশ হত্যা করেছে তিনজন বলে অভিযোগ আছে, ছয় বছরে র‌্যাব হত্যা করেছে দেড়/দুই হাজার (আত্মস্বীকৃত), সেনাবাহিনীর হাতে চলেশ রিছিল, কল্পনা চাকমা (কত অবাঙ্গালী!), বঙ্গবন্ধু, চার নেতাসহ আরো কত কে! রাষ্ট্র, মিডিয়া বা সমাজ তা যদি না বলে তবে আরিফ হোক আর আয়শা হোক, সামিউল হত্যাকারী যেই হোক না কেন–তাঁর সাথে পরকীয়ার সম্পর্ক নেই, পরকীয়া প্রেম মানবাধিকারের অন্তর্গত নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিষয় মাত্র।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরকীয়া বা প্রেম তথা বিয়ে-বহির্ভূত যৌনতা অপছন্দ করে, সেইটা পরিবারের সংজ্ঞা আর উত্তরাধিকার আইন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করলেই পরিষ্কার হয়, কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞ না হয়েও বলা যায় যে, বিয়ে-বহির্ভূত যৌনতা আইনীভাবে কোনো অপরাধ নয়, অন্ততঃ যতক্ষণ পর্যন্ত লাইসেন্সপ্রাপ্ত যৌনতা ব্যবসা বিদ্যমান। আবার বিয়ে-বহির্ভূত যৌনতা বেশির পক্ষে ‘অসামাজিক কর্ম’ বলে পরিচিত, অপরাধ নয়। মিডিয়ার সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেখা যায়, সামিউল হত্যাকারীগণ (মা আয়শা ও তাঁর প্রেমিক আরিফ) পরকীয়া প্রেম করতো। সামিউল হত্যার ক্ষেত্রে পরকীয়া প্রেম আর হত্যাকে কার্যকারণ সম্পর্কে যুক্ত করেছে মিডিয়া। এই আইনবহির্ভূত সম্পর্ক তৈরি মতাদর্শিকভাবে অপছন্দের কর্ম/ঘটনা নিবারণের উপায়।

এই ব্যাপারে সমাজ, আইনী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের ছদ্মবেশ ধারণ করে, মূলতঃ মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ দেয় তার বিপুল বিস্তৃত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। মিডিয়া এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম হাতিয়ার। যেই আচরণ রাষ্ট্র ও সমাজ অপছন্দ করে কিন্তু কোনো অপরাধ/ক্রাইম নয়, কোনো শাস্তির বিধান নাই–সেই আচরণ সমূহ প্রতিরোধের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ কী কী করে তার একটা ভালো নজির সামিউল হত্যা প্রসঙ্গ। হত্যা বাংলাদেশে সাধারণ ঘটনা, আরিফ কেবল একজন হত্যাকারী, আইন লংঘনকারী।

কিন্তু আয়শা নৈতিকতা লংঘন করেছে এই সমাজের, আয়শা একজন মা, তবু কামনা-বাসনা সমেত নারী থেকে গেছে, মাতৃত্ব ভাবের মূর্তি হতে রাজি হয় নাই; তাই আয়শা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত, নৈতিকতা লংঘনকারী ভবিষ্যতের নারীর জন্য একটি গালি’র নাম আয়শা, ভবিষ্যতের সন্তান পরপুরুষের দিকে তাকানো মায়ের চোখে আয়শাকে খুঁজে পাবে। নৈতিকতা রক্ষায় সমাজের অস্ত্রভাণ্ডারের জন্য আয়শাকে দরকার আছে, তাই আয়শাকে নির্মাণ করে নেয় সমাজ ভবিষ্যতের জন্য। আর বর্তমানে হয়তো উপভোগ্যও, রিমান্ড তো অপ্রকাশ্য ঘটনা, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে স্ত্রীকে (১৩ বছরের উপরে) বলপ্রয়োগে যৌনকর্মে বাধ্য করা ধর্ষণের আওতায় পড়ে না, বেশ্যাদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ ধরা হয় না আর আয়শাদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ ঘটে কিনা–তা জানা যায় না, এই আইন মেনে চলা কিন্তু সমাজশত্রুদের প্রতি আচরণ নিয়ে মাথা ঘামায় না কেউ।

এস এম রেজাউল করিমকবি, লেখক, সমালোচক, নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার ও নৃবিজ্ঞানী

২৮ Responses -- “পরকীয়া প্রেমের বিরুদ্ধে নৈতিক অভিযান”

  1. jannat

    ami porokia bishoy tike somorthon korina motei, karon ami samajik ‘jib’,kintu konodin ekta bisoy ajj porjonto keo katha bole nai keno somaje ‘porokia’ premer utptti,
    (1)ek joner bibahito jibon pach bochorer, saradin se dokan kore rat dosh tay basay ase,klanto sarir nia tini taratari kheye gumiea poren, soptahe ekdin bondher din e sudhu wife er sathe ektu valo kore katha bolen,tar kache bebsa onek boro……
    (2)karo abostha emon ‘ami khabar dae, bacchader khoroch dae, kapor chopor dae, R ki cahida thakte pare’……..
    (3)’amar bibahito bou jeno_ take jakhon takhon torcher korar liz nea asechi’
    (4)maf korben, ekti internal katha boli_ amader deshe onek purush e ache jara jouno (husband & wife)bisoytake khub ekta gurotto den na, boibahik ‘puran’ theke poreche ” ekjon baba tar meyeke bis bachor vat kaoate parle baki din tao kaoate parto, kintu songsar kora abong saririk proyojon e bibaher mul karon”…
    ##Ami muloto etai bojate chechi ” Songsare Valobasa Khub E jaruri Ekta bepar,dujon dujon ke ghovir vabe valobasun Porokia ae somaje R thakbe na”.
    Vul hole khoma korben, ghovir cinta na kore mayeder ke dhosi R jat gelo jat gelo bole kadben na…….

    Reply
  2. Noyan Khan

    েলেখককে অনেক ধন্যবাদ। আপনার লেখাটি সত্যিই খুব মূলবান। সজাজকে বদলাতে হলে আমাদেরকে যুগান্তর কারী কিছু করতে হবে।
    অনেক ধন্যবাদ। নয়ন খান।

    Reply
  3. রাসেল

    যে লেখা! খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে সমকামিতাও জায়েজ হয়ে যাবে।

    Reply
  4. আতিক

    ভালো লাগলো না। নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে সমাজের কাঠামো আর মতাদর্শের প্রয়োজনীয়তাটা বুঝতে পারা উচিত ছিল।

    Reply
  5. তাসনিম

    আমরা কোরান কী বলছে সেটা দেখি না। আইন, সংবিধান আর নীতির কথা বলি, তাই আমাদের এই অধপতন। আর এরকম লেখা পত্রিকায় দেয়াই তো ঠিক না।

    Reply
  6. Md. Kamrul Hasan Sohag

    There are many gaps in law. Even we need to change Constitution. By taking chance this gap we should not shout in favour of such kind of illegal matter. Man build law, not law control man; just show the way.

    However your writing is so nice and informative. thanks.

    Reply
  7. joyshri

    ভাবনা আপেক্ষিক। সমাজ আমাদের, আমরা যেমন করে ভাববো তারই প্রতিচ্ছায়া স্পষ্ট হবে ধীরে ধীরে। পরকীয়া তৃতীয় পক্ষের কাছে অশোভন কিন্তু যে করে সে নিশ্চয় ভালোবেসেই করে। আর ভালোবাসা শোভন। কিন্তু পরকীয়াকে মেনে নেয়ার মতো মহান হওয়া হয়তো খুব কঠিন। ভাবনা স্বাধীন তাই ভেবেছেন। অনেকের চেয়ে অন্যরকম করেই ভেবেছেন। ভালো লেগেছে।

    Reply
  8. Dewan

    The reporter sharply try to explain something and he has a logic.
    I will support it because of his logic as per his reference in his report.

    I would like to say something else: This is not first time killing or suicide which is for sex or sexual relation. Many qualified or non qualifed people putting them in trouble for sex only. Actually people in Bangladesh are really suffering from sexual desire. If Ayesha made a mistake then it does not mean all mother will follow same thing. If father can be engaged easily with another women for sexual relationship then mother can follow same thing. Because both are human.

    We don’t like to see people die for sex, mother killed her children for sex, father devorce his wife for sex.

    Sex should be easy with terms and condition and should be maintain properly and legal way. It is available in Bangladesh but not safe.

    Reply
  9. আরাফাত রহমান

    পরকীয়া প্রেমের কিছু গুণগান করলেন আর কি।

    সমাজ ব্যবস্থায় পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাস আর ভালবাসার কতটা গুরুত্ব তা পশ্চিমা বিশ্ব ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে। আমরা পশ্চিমা বিশ্বের অনুকরণে যদি পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেই তাহলে সমাজে বিশৃংখলা ছাড়া আর কিছুই পাব না। আইন মানুষের জন্য মানুষ আইনের জন্য নয়। দরকার হলে আইন সংশোধন করতে হবে। কিন্তু আইনের দোহাই দিয়ে পরকীয়ার মত নির্লজ্জ কাজকে স্বীকৃতি দেয়া আমি সমর্থন করি না।

    Reply
    • রেজাউল করিম

      আইন মানুষের জন্য, আর মানুষ কি নৈতিকতার জন্য? পশ্চিমা সমাজে পরিবার ধ্বংস হচ্ছে কীভাবে? হলিউডের একেকজন কয়েকবার করে পরিবার (বিয়ের মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয় ধরে) গঠন করে। ধরেন, লিজ টেলর ৮ বার বিয়ে করলো, মানে কি এই নয় যে–পরিবার গঠনের দিকে তাঁর ঝোঁক প্রবল? ইন্ডিয়ানার লিন্ডা উলফ্ ২৩ বার বিয়ের মাধ্যমে পরিবার গঠন করেছেন, মে মাসের ০৩ তারিখ তিনি একা ছিলেন বলে দেখলাম ( http://www.time.com/time/magazine/article/0,9171,1983883,00.html ) এবং তিনি বিয়ের উপর আস্থা হারাননি, আবার বিয়ে করবার আগ্রহ জানিয়েছেন।

      Reply
      • জয়

        মানুষ যেদিন তার নৈতিকতা হারাবে সেদিন পশুর সাথে তার তফাৎ থাকবে না। মানুষ যদি অনৈতিক কাজকে সমর্থন করে তাহলে সে সমাজ গঠন করলো কেন, পরিবার গঠন করলো কেন? যুক্তির কোনো শেষ নেই। কিন্তু পরকীয়ার মত কাজকে সমর্থন করা অসুস্থ সমাজের ইঙ্গিত বহন করে। আজকের সমাজ খুবই অস্থির। যাই হোক, পশুর মত শুধু ভোগবিলাস মানুষের জীবন নয়। অধিকার আর মূল্যবোধের পার্থক্য মানুষের অনুধাবন করা উচিত।হয়তো তথাকথিত আধুনিক কিছু মানুষের কাছে কথাগুলো backdated…

  10. Jahangir

    It’s good interpretation of law, there is no doubt. Yet there is another word,called’Tradition’ which can’t also be denied as such if I site the example from the analysis itself can’t be accepted to any wide hearten husband that his wife is involved with another guy in ‘parakiya’ or anything else.

    Reply
  11. চঞ্চল বালি

    পৃথিবীর কোন ধর্ম বিবাহপূর্ব কিংবা বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে মেনে নেয়নি। এই উভয় ধরনের সম্পর্ক ব্যাভিচার। ঘুরিয়ে পেচিয়ে যত আইনই সামনে আনুন না কেন এটি মারাত্মক অপরাধ। আর ধর্মকে যারা সেকেলে মনে করেন, তাদের জন্য বলছি, ব্যাভিচার করতে গেলে আপনার বিবেক আপনাকে তাড়িত করে কিনা–সেদিকে লক্ষ্য করুন। যে কাজে নারকীয় সুখ পাওয়া যায় কিন্তু পরক্ষণে অনুশোচনা আসে সেটিকে পশুপ্রবৃত্তি বলা যায়, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের কাজ হতে পারে না। কাজেই উপরোক্ত আর্টিকেলের লেখক এবং তার এই লেখাকে সমর্থনকারী প্রত্যেকের জন্য রইল অসংখ্য করুণা।

    Reply
      • চঞ্চল বালি

        নরকে সুখ নেই। এই পৃথিবীতে যে ‘সুখ’ পাওয়ার জন্য বিবেকের প্রচণ্ড তাড়না অনুভব করতে হয় এবং সেই তাড়নায় সুখ উপভোগ করার প্রতিটি মুহূর্তে অসম্ভব যন্ত্রণায় ভুগতে হয়, তাকে নারকীয় সুখ বলে। সেই বিবেকের তাড়না প্রথম কয়েকবার ব্যাভিচার করার পরই নষ্ট হয়ে যায়। হয়তো শতবার কিংবা সহস্রবার ব্যাভিচার করার পর এটিকে পান্তাভাত মনে হয়, কিন্তু সমাজের অধিকাংশ মানুষ পরকীয়া প্রেম নামক পরকীয়া ব্যাভিচার মুক্ত সুস্থ পৃথিবী চায়।

  12. মানস

    আপনাকে “মতামত” দুনিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে দেখে ভাল লাগছে। খুবই জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকগুলো সামাজিক প্রশ্নেই পাবলিক-জবান এবং প্রেস আসলে একই পাটাতনে বসবাস করে। যৌনতা নিয়ে তো বটেই। ফলে এই জায়গা থেকে প্রশ্ন তুলে আপনি বেশ বড় ঝুঁকি নিলেন। আইন নিয়ে আপনার পড়ালেখা আমাকে ঈর্ষান্বিত করল।… বিডিনিউজ প্রচলিত ‘কলাম’ চক্কর থেকে পাঠকদের মুক্তি দিয়েছে। তাদের ধন্যবাদ জানাই।

    Reply
  13. অধীর দত্ত

    This is an awesome explanation and the civil society is under revolution.How the general people will take it, that’s not well focused on media as they are showing vague but predeclared/expected factors.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—