Feature Img

shyamoly-Edited১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই তো বাঙালিরা বুঝে গেল তারা প্রতারিত হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র ভিন্ন ধরনের ভিন্ন চেহারার শাসকদের দ্বারা বাঙালিকে আবার সেই একই শোষণ ও দমনের চক্রে বেঁধে ফেলল। বাঙালি বুঝল, প্রভু বদল হয়েছে মাত্র, তাদের অবস্থার বদল নয়। তাই প্রতিবাদ শুরু হয়ে গেল পাকিস্তানের জন্মের এক বছরের মধ্যেই। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের বীজ পোঁতা হয়ে গেল।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে পাকিস্তানের তখনকার জাতীয় নেতা বা জাতির জনক হিসেবে অভিহিত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের বক্তব্য ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। আর প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলেন এদেশের ছাত্র-জনতা।

এরপরের আড়াই দশক পাকিস্তানিদের দ্বারা বাঙালিদের নানাভাবে নিপীড়িত হওয়ার করুণ গল্প। সে গল্পের পথ ধরেই না আমাদের স্বাধীনতালাভের অনিবার্যতা, একটি যুদ্ধের মাধ্যমে অনেক অর্জনের স্বত:স্ফুর্ততা।

একাত্তরের প্রতিটি দিনের স্মৃতিই যেন আমার কাছে এই সেদিনের মতো। বাঙালি তখন কী বিপুল আবেগে অপেক্ষা করছে স্বাধীনতার জন্য। আশা ছিল আলোচনার মাধ্যমেই পাকিস্তানের বাঙালি-অধ্যুষিত অংশটি আলাদা একটি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবে। যেভাবে ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান।সে লক্ষ্যেই ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনা চলছিল। আলোচনা যখন ভেস্তে গেল তখন সাধারণ মানুষই বুঝে গেলেন একটি যুদ্ধ অনিবার্য।

বাঙালি জাতি কিন্তু এই যুদ্ধের ব্যাপারে মনে মনে প্রস্তুত ছিলেন। তাই ৩ মার্চেই ছাত্রনেতারা বঙ্গবন্ধুর হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন।বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলেন। কিন্তু ২৫ মার্চের সেই অতর্কিত হামলার বিষয়টি ছিল আমাদের অজানা। জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার হামলার পরকল্পনা করেছিল।তারা ওই রাত থেকে শুরু করে সারা বাংলায় যে বিরাট পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছিল- যে হত্যাযজ্ঞে পাক হানাদার বাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছিল এদেশেরই রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী, এটা তো ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা।

এটুকু ইতিহাস বাঙালি জানেন। নতুন করে বলার কিছু নেই। তবু আজ বারবার ভাবতে হয়, বলতেও হয় যখন যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্তদের পক্ষে কাউকে কাউকে সাফাই গাইতে দেখি। যখন শুনি এদেশের জনগণের ওপর যে ব্যাপক ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তার জন্য দায়ী জামায়াত ইসলামীর নেতারা দায়ী নন। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর যে ঘৃণ্য তৎপরতা আমাকে নিজের চোখে দেখতে হযেছে, যাদের বর্বর সহযোগিতায় আমার স্বামী আলীম চৌধুরী নিহত হয়েছেন- আজ ক্ষোভের সঙ্গে দেখতে হয়, শুনতে হয় তারা নাকি কোনো অন্যায়ই করেনি! তারা সুফি, ধর্মপ্রাণ মুসলমান! তাদের অহেতুক বিচারের মুখোমুখি করে হয়রান করা হচ্ছে। আমার মতো শহীদ পরিবারগুলোর পক্ষে এ ধরনের কথা শোনা যে কত কষ্টের তা বলে বা লিখে বোঝানো মুশকিল।

পঁচিশে মার্চের কালরাত ও তার পরের ন’মাসের কিছু স্মৃতি এখানে তুলে ধরছি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় অনেকেই ঢাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিলেন। আমরা যাইনি নানা কারণে। আমরা তখন থাকতাম পুরানা পল্টনে। বাবা ছিলেন অসুস্থ। পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্থ। তাই তাঁকে নিয়ে ওই মুহুর্তে ঢাকার বাইরে যাওয়াটা অসম্ভব ছিল। তাছাড়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ওই রাতে তিনি তাঁর বাসা ছেড়ে আমাদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁকে রক্ষা করা তখন আমাদের একটি দায়িত্ব হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে দেখলাম, ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছেন। মুখটা বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। দেশ একটি বড় বিপর্যয়ৈর মুখে, এ ভাবনা তাঁকে আলোড়িত করছিল।

আমরা দেখলাম, আমাদের বাসায়ও তিনি নিরাপদ নন। কারণ তাঁর আত্মীয়ের বাসা বলে তাঁকে খুঁজতে পাকবাহিনী এখানে চলে আসতে পারে। তাই তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে ভারতে পাঠানোর পরিকল্পনা হল। আমার মা আর শাশুড়ি তখন তাঁকে বোরকা-শাড়ি পেরিয়ে, মাথায় খোঁপা বেঁধে দিয়ে, পায়ে মেয়েদের জুতো পরিয়ে দিলেন। পরে আমার ভাই তাঁকে রিকশায় করে অলি-গলি ঘুরে ঘুরে হোসেনী দালানে পৌঁছে দিলেন। ওখান থেকে তিনি পরে চলে গেলেন ভারতে।

এ ঘটনার পরও আমরা পুরো ন’মাসই ওই বাসায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছি। আমার স্বামী ডা. আলীম চৌধুরী তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই এ বাসায় এবং চেম্বারে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার সুযোগ করে দিতেন। তাই সবাই এ বাসার কথা জানত। পঁচিশে মার্চ রাত এগারোটা পর্যন্ত তিনি অনেককে নিজে গাড়ি চালিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিয়ে এসেছেন।

তাই পরের মাসগুলোতে আমাদের ঠিকানা ছিল অনেকের জন্য নিরাপদ আশ্রয়। বিপদ দেখলে আলীম কখনও কখনও মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে শুইয়ে রেখে দিতেন রোগী বানিয়ে। টাকা-পয়সা তো সবই দিয়ে দিয়েছি। তখন বেশিরভাগ দেশপ্রেমিক বাঙালিই তাই করতেন। শুধু নিজেদের চলার টাকাটা রেখে বাকিটা যুদ্ধের জন্য বিলিয়ে দিতেন।

আমাদের বাসায় এভাবে লুকিযে আশ্রয়-প্রশ্রেয় পেতেন বলেই কিনা কে জানে, জুলাইয়ের এক বৃষ্টির দিনে বাসায় এসে হাজির হল একজন। তার নাম মওলানা মান্নান, সেই ইনকিলাবের মান্নান। সে ছিল আশ্রয়প্রার্থী। বলল, পাকিস্তানিরা তার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, ছেলেমেযে নিয়ে কোথায় যাবে, চার-পাঁচ দিন থাকতে চায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আলীম রাজি হয়ে গিযেছিলেন। কিন্তু আমার একদম প্রথম দেখাতেই লোকটাকে ভালো লাগেনি। তাই বেঁকে বসলাম, না, এর জায়গা হবে না। তিনি খুব অবাক হলেন। কারণ কত মানুষকে আমরা এ বিপদে সাহায্য করেছি, আর মান্নানের বেলায় আপত্তি কেন? তিনি বুঝতে পারছিলেন না। পরে আমার শাশুড়ি যখন আমাকে এসে এ কথাটা বললেন, তাঁর মুখের ওপর আর ‘না’ বলতে পারলাম না। কিছু করতে না পেরে অঝোরে কাঁদলাম। মনে হচ্ছিল কী যেন একটা সর্বনাশ হযে গেল আমার। মানুষের বোধহয় সিক্সথ সেন্স থাকে!

মান্নান তো ওই ক’টা দিন থাকল না, পরে আমাদের নিচতলাটা ভাড়া নিয়ে নিল। ক’দিন পর জানাল, সে আলবদর বাহিনীর অন্যতম সংগঠক।আমাদের সদর দরজা পাহারা দিতে শুরু করল পাকিস্তানি আর্মির সহযোগী ওই বাহিনীর সদস্যরা। পরনে আলবদরদের পোশাক। ছাই রঙের প্যান্ট আর নীল শার্ট। হাতে অস্ত্র। আলীম খুব বিরক্ত হতেন। আর মান্নান বলত, ‘আপনার বাসায় আছি বলে মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে মারবে না, তাই আলবদররাও এ বাড়ি পাহারা দেয়।’ পরে বুঝেছিলাম, আলীমের আশ্রয়ে থেকে সে আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে বেঁচে গিযেছিল।

এরপর কয়েক মাস এভাবে কেটে গেল। আলীমকে মাঝে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে বদলি করা হল। উনি কিছুদিন ওখানে থেকে পরে আবার পারিবারিক সমস্যা দেখিয়ে বদলি হয়ে মিটফোর্ডে চলে এলেন। কারণ আমি তখন দুই শিশুকন্যা নিয়ে অসহায়। বাবা বিছানায়। এ অবস্থায় উনি তো দূরে থাকতে পারেন না। আলীমকে বদলি করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জন্যই। আলীম অনেককে সাহায্য করছেন এ খবর প্রশাসনের কাছে নিশ্চয়ই ছিল।

তিনি ফিরে এলেন ৩ নভেম্বর। ডিসেম্বরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। ভারতীয় মিগ আকাশজুড়ে চক্কর দিচ্ছে, বোমা ফেলছে দেখে আলীম বলতেন, ‘পাকিস্তানিরা বোকার স্বর্গে বাস করছে। ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র বুঝি সপ্তম নৌবহর নিয়ে এসে ওদের যুদ্ধে জিতিয়ে দেবে। এটা হবে না। শিগগির আমরা স্বাধীনতা পাচ্ছি।’

এরপর এল ১৫ ডিসেম্বর। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আলবদরদের একটি গাড়ি এসে থামলিআমাদের বাড়ির সামনে। এরকম রোজই আসে। আমরা আলাদা করে কিছু ভাবিনি। আমরা দুজন বারান্দায় বসে গল্প করছিলাম। ওরা আলীমকে নিয়ে যেতে চাইল, এক কাপড়ে, শীতবস্ত্র ছাড়া। আলীম তখন নিচে মান্নানের বাসার দরজায় আঘাত করতে লাগলেন। মান্নান সবসময় বলত, ‘আমি আছি তো, আলবদররা আপনাকে কিছু বলবে না।’ অথচ তখন আলীমের এত ধাক্কাধাক্কির পরও দরজা খুললই না। বরং ভেতর থেকে বলে দিল, ‘আপনি যান, কোনো ভয় নেই।’

আলীমকে ওরা নিযে চলে গেল। আমি দৌড়ে গেলাম তার বাসায়। আমাকেও বারবার আশ্বাস দিয়ে রাখল সে। নির্ঘুম, দুশ্চিন্তায় ঘেরা একটি রাত কাটানোর পর এল ১৬ ডিসেম্বর। সকালে দেখলাম ঢাকা জুড়ে এক উৎসবের আমেজ। মানুষ জাতীয় পতাকা নিয়ে চলাফেরা করছে। বুঝলাম আমরা স্বাধীন হয়ে গেছি। কিন্তু আলীম কোথায়? আমি পথে পথে ঘুরে তাকে খুঁজলাম। কোথাও পেলাম না। মান্নান পালিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা বাসায় এলেন। বললেন, কোথায় সে মান্নান যে আলীমকে খুন করেছে!

আমি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি আলীম নেই। এক পরিকল্পিত ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি। এরপর তো তাঁর লাশই পেলাম।

মওলানা মান্নান ধরা পড়েছিল। আবার ছাড়াও পেয়েছে। আসলে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন থেকেই। তাই বুঝি পরে একটা প্রজন্মকে আমরা কোনো ইতিহাস জানতে না দিয়ে বড় করে তুললাম। এ প্রজন্ম ঠিকঠাক ইতিহাস জানতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর কথা শোনেনি। বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা বোঝে না। একচল্লিশ বছরেও রাজাকারদের বিচার হয়নি বলে ওরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে। জিয়া, এরশাদ আর খালেদা জিয়ার সরকার ওদের পুনর্বাসন করেছেন।

এখন বিচার ওদের হতেই হবে। নইলে আমরা জাতি হিসেবে অস্তিত্বের সংকটে পড়ব। এই যে হ্যাকিং করছে ওরা, বিচার বানচালের চেষ্টা করছে, কোটি কোটি টাকা দিয়ে লবিস্ট নিয়োগ করে বিচার ভিন্নখাতে নিতে চাচ্ছে- এসব চলতে দেওয়া যাবে না। সব ষড়যন্ত্র দূর করে আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে পারব বলেই আমি আশাবাদী।


শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী
: লেখক, শিক্ষাবিদ।

১৮ প্রতিক্রিয়া -- “যুদ্ধাপরাধের বিচার ও স্মৃতিতে একাত্তর”

  1. Borhan Biswas

    আমি মনে করি, দেশে এখন একাত্তরের অবস্থা বিরাজ করছে। জামায়াত যদি এ যাত্রায় বেঁচে যায় তবে স্বাধীনতার পক্ষে যারা কথা বলেন, স্বপ্ন দেখেন তাদের নিশ্চিহ্ন করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে তাতে সন্দেহ নেই। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর কিংবা তার চেয়েও ভয়াবহ কিছু ঘটবে এটা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। এতে অবশ্য আমরা মোটেও ভীত নই। আর সবার মতো চুপ করে থেকে নিজেদের আমরা সুবিধাবাদী দলের অন্তর্ভুক্ত করতে চাই না।

    এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়……

    জবাব
  2. রিফাত জামিল ইউসুফজাই

    আমরা আজও ১৪ ডিসেম্বরের ক্ষত বুকে নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জ্বলছি। পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকাররা পরাজয় নিশ্চিন্ত জেনেই আঘাতটা হেনেছিল। তারা এখন পর্যন্ত সফল কারণ তাদের বিচার হয়নি। আমরা যদি এসব ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে না পারি, তবে সত্যিকার অর্থেই আমরা পরাজিত বলে প্রমাণিত হব।

    জবাব
  3. Rahman

    @শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ঘাতক মান্নান আমার উপজেলায় জন্ম নিয়েছিল বলে। তার কলঙ্কের দায় আমরা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছি! আপনার স্বামী শহীদ ডা: আলীম চৌধুরীর আত্মার শান্তি কামনা করি।

    সে সঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। তখন আমি নিতান্তই কিশোর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি। আমাদের স্কুলের মাঠেই একাত্তরের পশু ঘাতক মাওলানা মান্নান হেলিকপ্টারে উড়ে আসবে। এ নিয়ে ওদের রাজনৈতিক দলের মধ্যে উৎসবের হাওয়া বইছে। আমিও মহাখুশি হেলিকপ্টারে কেউ আসছে জেনে, তাকে দেখতে যাব এমনই পরিকল্পনা। কিন্তু যাওয়ার পথেই বাবার সামনে পড়লাম। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কোথায় যাচ্ছ? বললাম, মাওলানা মান্নান আসছে, তাকে দেখতে যাব। বাবা ফের বললেন, তুই কি জানিস এ লোকটা ৭১-এ কী করেছিল, তার ভূমিকা কী ছিল? তুই যে, বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল, হামিদুরদের কথা পড়ে মন খারাপ করিস, এই মান্নানের মতো লোকগুলোই ওদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল! এরা রাজাকার!

    ওইদিন আমি আর পশুটাকে দেখতে যাইনি। এরপর থেকেই ওর ছবিযুক্ত পোষ্টার দেখলে তার ওপর থুথু ফেলতাম। ওই পশুটা বহুবার আমার এলাকায় গিয়েছে কিন্তু বাবার কথা শোনার পর থেকে পশুটাকে দেখার কথা ভাবলেও আমান মন ঘৃণায় ভরে উঠত।

    আমা করি, ওই পশুটি জীবিত না থাকলেও তার মতো পশুদের বিচার হবে। জাতি দায়মুক্ত হবে।

    জবাব
  4. Naseer Yousuf

    এত বড় একটি ট্র্যাজিডির জন্য আপনাদের পরিবারকে সমবেদনা জানাই। পাশাপাশি আপনার প্রতিবাদ ও সাহসী পদক্ষেপের জন্য আপনাকে অভিনন্দন।

    জবাব
  5. বনি আমিন

    ক’দিন আগে টেলিভিশনের একটি চ্যানেলেও আপনার স্মৃতিচারণ শুনলাম। আজ এ লেখা পড়লাম। মাওলানা মান্নান বেঁচে নেই, তার পরিবারেরর সদস্যরা আছে। তারাও হয়েতো এটা শুনেছে বা আপনার এ লেখা পড়েছে। তাদের কঠিন হৃদয়ে আপনার এ ব্যথার কোনো প্রভাব পড়বে না। দরকার শুধু অপশক্তির উপযুক্ত বিচার।

    ন্যায়ের বাণী যেখানে নিভৃতে কাঁদে, সেখানে হৃদয়ে জমে শুধু ক্ষোভ। জমতে জমতে তা মহীরুহ হযে যেতে পারে।

    তাই অপেক্ষা আর সয় না। নুয়ে এসো বটবৃক্ষ তুমি, শাখা-প্রশাখায় জড়িয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেল অশুভ অপশক্তিকে…..

    জবাব
  6. saiful

    কৈশোরে পড়েছিলাম, মানুষ দুধরনের, ভালো আর খারাপ। ‘খারাপ’ মান্নান পত্রিকার মালিক হয়েছিল, সমাজে প্রতিপত্তি অর্জন করেছিল, তাতে কী? আপনাদের অবদানের জন্য আপনারা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন এটা নিশ্চিত জেনে রাখুন। যত দিন যাবে ততই জাতি আমাদের সূর্যসন্তানদের কথা বেশি করে বলবে।

    জবাব
  7. মজিবুর রহমান বাচ্চু

    আপনারা যারা লিখতে পারেন তাঁরা নিয়মিত লিখুন। স্বাধীনতার স্বপক্ষের লেখকদের লেখা অনেক কম। আজ স্বাধীনতাবিরোধীদের দেখুন, তারা শুধু দেশেই নয় বিদেশেও কোটি কোটি টাকা ঢালছে তাদের পক্ষে লেখা ও কথা বলার জন্য। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোতে কোটি কোটি ডলার ঢেলে লবিং নিয়োগ করে তাদের পক্ষে লেখাচ্ছে ও প্রভাবিত করছে সবাইকে। এতে তারা অনেকটা সফল হয়েছে আমাদের নিরবতার জন্য।

    লেখক নাসরিন আপাকে তাঁর তথ্যনির্ভর লেখার অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    জবাব
  8. কাজী মাহবুব হাসান

    পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এদেশীয় দোসর, রাজাকার ও সহযোগী সংস্থাগুলো পরিকল্পিতভাবে দেশকে মেধা ও বিবেকশূণ্য করেছিল একদিন। এরপর সামরিক শাসকদের উপর ভর করে নিজেদের শিকড় বিছিয়েছে আরও অনেক গভীরে… তাদের বিছানো ফাঁদে পা ফেলেছে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলও, এর একটি এক সামরিক শাসকের হাতে গড়া দল।

    আমর যারা বিচারের দাবি করছি তাদের ভুললে চলবে না প্রতিপক্ষ এখন আরও ধুর্ত, তাদের মরণ-কামড় দেওয়ারই সময় এখন। ‍আপনার দৃঢ়তা এবং সাহস আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করুক, শহীদ ডা: আলীম চৌধুরী স্যারের মতো দেশকে ভালোবাসতে, সত্যিকারের ভালো একজন মানুষ হতে। সামনে আরও বড় দু:সময়, আমরা যেন লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হই।

    জবাব
  9. lokman

    যে মান্নান শ্রদ্ধেয় ডাক্তার আলীম চৌধুরীকে হত্যা করেছিল, তার সংগঠন জমিয়াতুল মুদাররেসীন এবং পত্রিকা ইনকিলাব আজ আওয়ামী লীগকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। মান্নানের ছেলে বাহাউদ্দীন এখনও জীবিত। এরা যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেন।

    জবাব
  10. এ হুসাইন মিন্টু

    লেখককে অনেক ধন্যবাদ, সেই সঙ্গে তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা নতুন প্রজন্ম। দেখিনি, কিন্তু যখন কারও মুখে পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের তখনকার বীভৎসতার কথা শুনি তখন একদিকে যেমন চোখে জল আসে অন্যদিকে ঘৃণায়-ক্ষোভে ফেটে যাই। কিন্তু আমরা মানুষ, ওদের মতো জানোয়ার নই। মানুষ যেকোনো বর্বরতার বিচার করে, যত বড় অপরাধীই হোক না কেন, তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে এনে শাস্তি দিতে পারে।

    আমাদের দেশে সে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুরো জাতি যখন অধীর আগ্রহে জানোয়ারদের ফাঁসির অপেক্ষা করছে তখন কেবলমাত্র স্বার্থের জন্য কেউ কেউ এ বিচারের বিরোধিতা করে, বিচার বাধাগ্রস্থ করার অপপ্রয়াস চালায়, তখন আবার ঘৃণায়-লজ্জায় বিমর্ষ হই। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিরা এদেশ থেকে বিতাড়িত হলেও এখানে এখনও কারও কারও ঘাড়ে ওদের ছায়া ভর করে আছে, অন্তর কুৎসিত হয়ে আছে। দেশ আমাদের হলেও আমরা এখনও দেশের হতে পারিনি!

    জবাব
  11. onik

    “আশা ছিল আলোচনার মাধ্যমেই পাকিস্তানের বাঙালি-অধ্যুষিত অংশটি আলাদা একটি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবে। যেভাবে ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। সে লক্ষ্যেই ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনা চলছিল।” -বঙ্গবন্ধু কি সে লক্ষ্যেই আলোচনা করছিলেন?

    জবাব
    • মজিবুর রহমান বাচ্চু

      বাবা অনিক, বঙ্গবন্ধু যখন সরল বিশ্বাস নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছিলেন, ইয়াহিয়া তখন গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সৈন্য এনে জড়ো করছিল এটা তো আমরা সবাই দেখেছি। খুনী ইয়াহিয়া সবকিছু গুছিয়ে নেয়ার জন্য আলোচনার নামে শুধু কালক্ষেপণ করছিল এবং তৈরি হওয়া মাত্রই ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অতর্কিতে নিরস্ত্র মানুষের উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছিল।

      আপনার কি মনে হয় বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক আলোচনা না করে ইয়াহিয়া খানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন? যেমন জামায়াত, মুসলিম লিগাররা এখন বলে, তারাও স্বাধীনতার পক্ষে ছিল এবং একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেনি। আপনি কি এটাই বোঝাতে চাচ্ছেন নাকি?

      জবাব
  12. কেরামত আলী

    আপনার সুন্দর লেখাটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি যা হারিয়েছেন তা কখনই পূরণ হওয়ার নয়। এই মাওলানা মান্নান স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে ছিল। পরে জিয়া এবং এরশাদ তাকে মন্ত্রী বানিয়েছেন।

    বাস্তব হল যে, আওয়ামী লীগ এদের ক্ষমা করেছিল। নতুন প্রজন্ম এ কথা জানে না। আগে মাওলানা মান্নানকে রাজাকার বলে আওয়ামী লিগাররা মুখে ফেনা তুলে ফেলত। ভোল পাল্টে তার পত্রিকা “ইনকিলাব” ও জমিয়তুল মোদারেসিন আওয়ামী লীগকে সাপোর্ট দেওয়া শুরু করার পর আওয়ামী লীগ ও এর বুদ্ধিজীবীরা এখন তাকে আর রাজাকার বলে গালি দেয় না।

    বড়ই বিচিত্র এদেশ!

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—