আরিফ জেবতিক

একবিংশ শতাব্দীর নীলকুঠির আগুন নেভাব কীভাবে?

নভেম্ভর ২৬, ২০১২

Arif-Jebtik-f111111111211গার্মেন্ট কারখানা নিয়ে কিছু লিখতে গিয়েই হাত কাঁপছে। আশুলিয়ার তাজরিন গার্মেন্টস লিমিটেডে যে পরিমাণ প্রাণহানি হয়েছে তাতে করে এ বিষয়ে আসলেই সুস্থ মাথায় কিছু লেখা সম্ভব নয়। আমরা যারা সভ্যতার দাবি করছি, উন্নয়ন আর অগ্রগতির কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছি তাঁদের উচিত লজ্জায় আর গ্লানিতে মুখ লুকানো, কষ্ট ও বেদনায় অস্থির হয়ে পড়া।

দুর্ভাগ্য এদেশের পোশাক শ্রমিকদের। ইতিহাসের পাতায় পাতায় তারা শুধু নির্যাতন আর বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। সেই ব্রিটিশকালে এদেশের মসলিন শিল্পীদের বুড়ো আঙুল কেটে দেয়া হতো যাতে করে ঔপনিবেশিক শক্তির বাজারে পরিণত হতে স্থানীয় শিল্প কোনো বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। নীলকর সাহেবরা নীলকুঠিতে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে করে মেরে ফেলতেন এদেশের কৃষকদের, যারা ঔপনিবেশিক পোশাক রাঙানোর রঙ উৎপাদনে রাজি হতেন না। আজ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতা আরো বড় আকারে ফিরে আসছে। আজ শুধু পোশাক শ্রমিক তাঁর বুড়ো আঙুল হারাচ্ছেন না, হিটলারের গ্যাসচেম্বারের মতো অগ্নিকুন্ড বানিয়ে সেখানে আমরা পুড়িয়ে ফেলছি এদেশের শত শত শ্রমিককে। এসব ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, যেগুলোকে আমরা দুর্ঘটনা বলে বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে আসছি, এসব হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার সময় চলে এসেছে।

আমাদের পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত চলছে ১৯৬৫ সালের কারখানা আইনের উপর ভিত্তি করে। সময় সময় এই আইনের কিছুটা আধুনিকায়ণসহ আইনটির বিশেষ করে নিরাপত্তা অংশটুকু খুবই পরিস্কার। এই আইন মেনে চলার ন্যূনতম উদ্যোগ থাকলেই শ্রমিক হত্যা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা যায়।

কিন্তু এদিকে নজরদারি কখনোই হয়নি। আমাদের দেশে যদিও কারখানা পরিদর্শক পদে সরকারের মানুষ আছেন, কিন্তু তাঁরা কখনোই ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে আমি শুনিনি। এর কী কারণ সেটি আমি জানি না, লোকবলের অভাব হয়তো একটি বড় কারণ, তবে দুর্নীতিও যে একটি কারণ সেটি অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এ নজরদারিতে রাষ্ট্রের ভুমিকা নিতে হবে। এতদিন পর্যন্ত গার্মেন্ট কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশে ন্যূনতম যে উন্নতি হয়েছে সেটার কৃতিত্ব দিতে হবে বিদেশী বায়ারদের। বায়ারদের চাপ না থাকলে কারখানাগুলো হয়তো টয়লেটও স্থাপন করত না, শ্রমিকদেরকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হতো। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে শেষ বিচারে বায়াররাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সস্তা কারখানাই তাঁদের মূখ্য আরাধ্য। সুতরাং তাঁরা যতই চাপ দিক না কেন, খুব বড় ব্যতয় না হলে ব্যবসা প্রত্যাহার করতে পারে না। আর যদি ব্যবসা প্রত্যাহার করেও সেই স্থানটি তখন নিয়ে নেয় বিদেশের ছোটখাটো ইম্পোর্টার ব্যবসায়ীরা, যারা কারখানার কর্মপরিবেশের ধার ধারে না। সুতরাং বায়ারদের উপর বিষয়টি ছেড়ে দিলে খুব উপকার পাওয়া যাবে না।

ছবি: হাসান বিপুল

তাজরিন গার্মেন্টস-এর পুড়ে যাওয়া অভ্যন্তর ভাগের একাংশ। ছবি: হাসান বিপুল

এ ব্যাপারে আমার সুস্পষ্ট প্রস্তাব রয়েছে। আমি মনে করি এখন সময় এসেছে কারখানা আইন যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কী না সেটি দেখার জন্য ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা। নিকট অতীতে ভ্রাম্যমান আদালত আমাদের অনেক উপকারে এসেছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে, রেস্টুরেন্টে, ঘিঞ্জি এলাকার ভেজাল কারখানাগুলোতে পরিচালিত এসব আদালতের কারণে ভেজালের প্রকোপ শেষ না হলেও দাপট অনেকটাই কমে এসেছে। মানুষের মাঝেও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন রাজধানীর বুকে একের পর এক ফরমালিনমুক্ত বাজার চালু হচ্ছে সেই সচেতনতারই ধারাবাহিকতায়।

একই পদ্ধতি আমাদের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরীগুলোতেও নেয়া উচিত। বাংলাদেশে যদি শিল্পপুলিশ চালু করে শিল্প কারখানার নিরাপত্তা দেয়া যেতে পারে, তাহলে ভ্রাম্যমান শিল্প আদালত তৈরি করে কারখানাগুলোর নিরাপত্তা পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে না কেন? সরকারের উচিত হবে কারখানা বহুল এলাকায় স্থায়ীভাবে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা। আদালত একেকটি কারখানায় প্রবেশ করে দেখবে সেখানকার সিড়িগুলো খোলা আছে কী না, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের সংখ্যা ঠিক আছে কী না, জলাধার আছে কী না। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র পরিচালনাকারীরা কি শুধুই খাতায় আছে নাকি গোয়ালেও আছে সেটা দেখার জন্য এসব লোকদের দিয়ে প্র্যাকটিকালি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র পরিচালনা করে দেখতে হবে।

দেয়ালের সঙ্গে লাগানো হোসপাইপটির অপর অংশ আদৌ জলাধারে যুক্ত আছে নাকি ডেকোরেশন পিস সেটি একজন স্মার্ট ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে খুঁজে বের করা কঠিন হবে না। জরুরী বহির্গমনের পথটি শুধু খোলা থাকলেই চলবে না, সেই গেটের পাশে অবশ্যই তালা ভাঙ্গার যন্ত্রটি থাকতে হবে যাতে করে এমনকি তালা মারা থাকলেও যাতে সেই পথ সময়মতো খোলা সম্ভব হয়। আদালতের উচিত হবে প্র্যাকটিকালি ফায়ার ড্রিল পরিচালনা করে দেখা আসলেই প্রতিমাসে কারখানায় ফায়ার ড্রিল হয় কী না। এর বাইরে শ্রমিকদের বেতন ভাতা ওভারটাইম নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে কী না, কাজের পরিবেশ ঠিক আছে কি না সেগুলোও আদালতের বিবেচ্য হতে পারে। আইনের ব্যত্যয় দেখলে ভ্রাম্যমান আদালত ঐ কারখানার মালিক এবং মিডম্যানেজমেন্টের লোকদেরকে প্রয়োজন ও গুরুত্ব বিচারে জেল জরিমানা করবেন।

আমার বিশ্বাস এরকম আদালত পরিচালনা করলে ম্যাজিকের মতো কাজ হবে। মালিকরা তখন নিজ নিজ কারখানার প্রতি মনোযোগী হবেন।

বিজিএমইএর এখনকার কাজ হচ্ছে আগুন লাগলে প্রতি শ্রমিককে একলক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায় সেরে ফেলা। কিন্তু বিজিএমইএকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। আমি প্রস্তাব করছি যে বিজিএমইএ মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টের প্রশিক্ষনের জন্য উদ্যোগ নিক। এই প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হোক। প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো ব্যাক্তি যাতে কোনো কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার, লাইনচিফ, সুপারভাইজার হতে না পারে।

তাজরিন গার্মেন্টস কারখানার ঘটনাটি বিবেচনা করলে দেখা যাবে, এই প্রাণহানির মূল কারণ মিডলেভেল ম্যানেজমেন্টের ব্যর্থতা। কারখানাটিতে একাধিক সিড়ি ছিল, অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র ছিল। সময় মতো ফায়ার এলার্মও বেঁজে উঠেছিল কারখানায়। কিন্তু মিড লেভেলের ম্যানেজমেন্ট শ্রমিকদেরকে নিচে নামতে দেয়নি। এর একটি কারণ হচ্ছে আমাদের মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট পোশাক সেলাইয়ে দক্ষ হলেও তাঁদের পক্ষে নিরাপত্তা বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা পাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি কারখানায় কমপ্লায়েন্স ডিপার্টমেন্ট নামে একটি ডিপার্টমেন্ট করে, হাতে গোনা দুয়েকজন লোককে দিয়ে আইওয়াশ করা হচ্ছে। কিন্তু টোটাল এপ্রোচ না থাকায় মধ্যম সারির এসব ব্যবস্থাপক, যারা শুধু উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত তাঁরা বড় কোনো দুর্ঘটনার সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, প্রায় সবক্ষেত্রেই এসব সিদ্ধান্ত আসলে দুর্ঘটনার মাত্রাকেই বৃদ্ধি করে, তাজরিন গার্মেন্টসেও এমনটিই হয়েছে।

আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা দুর্ঘটনা ঘটার আগে তো ব্যবস্থা নেই ই না, দুর্ঘটনা ঘটার পরেও আমরা বিষয়টিকে শুধু শোক আর ক্ষোভ প্রকাশের বিষয় করে বিষয়টি ভুলে যাই। কিন্তু ভবিষ্যতে যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেটি নিয়ে কাজ করি না। আমি আশাকরি সরকারের যথাযথ ব্যক্তিদের কেউ না কেউ এই লেখাটি পড়বেন। একটি ভ্রাম্যমান আদালত আপাতত একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে, এটা তাঁরা বুঝতে পারবেন। একজন মালিককে জেলে দিন, একজন প্রোডাকশন ম্যানেজারের হাতে হাতকড়া লাগান, সেগুলো মিডিয়ায় প্রচার করুন, তাহলে দেখবেন পরদিনই প্রত্যেকটি কারখানায় সাজ সাজ রব পড়ে যাবে।

অন্যথায় সবই অরণ্যে রোদন। আমরা লিখতেই থাকব, বিজিএমইএ মাথা গুনে ১ লক্ষ করে টাকা দিতেই থাকবে, কিন্তু আমাদের মা-বোন-ভাই যারা ভাগ্যান্বেষণে নিজের শ্রম নিংড়ে দিচ্ছেন, তাঁদের পোড়া লাশের সারি শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরই হতে থাকবে।

আরিফ জেবতিক:ব্লগার ও সাংবাদিক।

Tags: , , , , , , , ,

WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
| | More
 -------------------------------------------------------------------------
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর নিজস্ব। bdnews24.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bdnews24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)

-------------------------------------------------------------------------

৬ প্রতিক্রিয়া - “ একবিংশ শতাব্দীর নীলকুঠির আগুন নেভাব কীভাবে? ”

  1. আয়না on নভেম্ভর ২৭, ২০১২ at ৬:০৩ অপরাহ্ণ

    ম্যাজিস্ট্রেট কি করবে? মালিকদের অনেক পয়সা, সব কিনে নেবে। অন্যায় আর দখল দিয়েই গড়ে ওঠে গার্মেন্টস ব্যাবসা।

    • আল মাহফুজ on নভেম্ভর ২৭, ২০১২ at ৯:৪১ অপরাহ্ণ

      কার্যকর ব্যবস্থা নিন। দেখবেন,অবস্থা কীভাবে বদলে যায়। বাঙ্গালী আর এমন জঘন্য ‘হত্যাকাণ্ড’ দেখতে চায় না..

  2. blues on নভেম্ভর ২৭, ২০১২ at ১:০৭ অপরাহ্ণ

    নিন্ম রুজীর শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের সত্যিই কোন মূল্য নেই বাংলাদেশে। জাত, ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে সবার জন্য সমান অধিকার-সংবিধানের এই পংক্তি এই দেশে চরম ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। সাদা চামড়ার ইংরেজ বেনিয়ারা যেই শ্রেণী বৈষম্য আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে তা থেকে আমাদের মুক্তিতো ঘটেইনি বরং আমরা তা সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছি। পিয়ন, চাপরাশি, কাজের বুয়া, ড্রাইভার ছাড়া আজ আমাদের সামাজিক স্ট্যাটাস অচল। এ নিয়ে খেদোক্তি কম করিনি ব্লগে, কিন্তু এটিই চরম সত্য, বাস্তবতা এবং এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজে অবশ্য পালনীয়, অনুসরনীয়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে যেভাবে আমরা কাজের বুয়া, করনিক, পিয়ন, রিকশা ওয়ালা কিংবা নিজস্ব ড্রাইভারের সাথে তুই তোকারির আচরন করি তাতেই বুঝা যায় যে ঐসব মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা কিংবা সুরক্ষা আমাদের কাছে কতটূকু মূল্যবান। আমরা ঘুমাই খাটের উপরে আর বাড়ির কাজের ছেলেটি কিংবা মেয়েটি ঘুমায় ফ্লোরে কোন তোষক ছাড়াই, এই মনুষ্যত্বের আবহে পূড়ে অংগার হওয়া ঐ শ্রমিক মানুষগুলো- মনে হয়না কোনো ভাবাবেগ ঘটায় আমাদের মনে। কেউ কি ভেবেছে একবার এই দেশটা শুধুমাত্র দাঁড়িয়ে আছে ঐ গারমেন্টসের শ্রমিক গুলো আর মধ্যপ্রাচ্যের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর রক্ত জল করা শ্রমের উপরে!
    ধিক আমাদের মনুষ্যত্বকে!

  3. Thut kata on নভেম্ভর ২৭, ২০১২ at ১০:১০ পুর্বাহ্ন

    বিএনপি-জামায়াত এটা করেছে।

  4. স্বপন মাঝি on নভেম্ভর ২৬, ২০১২ at ১০:১৬ অপরাহ্ণ

    গঠনমূলক আলোচনা। সপ্তাকাশে অবস্থিত সরকারের কানে এসব পৌঁছালেই হয়।

    “অন্যথায় সবই অরণ্যে রোদন। আমরা লিখতেই থাকব, বিজিএমইএ মাথা গুনে ১ লক্ষ করে টাকা দিতেই থাকবে, কিন্তু আমাদের মা-বোন-ভাই যারা ভাগ্যান্বেষণে নিজের শ্রম নিংড়ে দিচ্ছেন, তাঁদের পোড়া লাশের সারি শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরই হতে থাকবে।”

    বোধ-বিবেক তাড়িত মানুষদের রাস্তায় নামতে হবে।

  5. Shahjahan Siraj on নভেম্ভর ২৬, ২০১২ at ৯:২৭ অপরাহ্ণ

    আমাদের পুঁজিতিরা অভিভাবক নয়, দাসপ্রভু!

    ব‍্যবসার উদ্দে‍শ‍্য যদি শুধু মুনাফা আর পুঁজি-রোজগার হয়, তাহলে পরিস্থিতিটা ‘মৃত্যু-উৎসব’ হওয়া স্বাভাবিক, যেমনটা প্রায়শ দূর্ঘটনার মাধ‍্যমে ঘটছে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে! একদিকে অবহেলার কারণে আগ্নিকান্ড, অন‍্যদিকে শাসন-শোষণ আর বঞ্চনার চরম শিকার আমাদের শ্রমিকরা। যাদের টাকায় মালিকেরা দামি-দামি গাড়িতে চলেন, তাদের বড়-বড় বাড়ি উঠে, ছেলেমেয়েদের আনন্দভ্রমণ হয়, তাদের তারা মানুষই মনে করেন না। এ কথাগুলো যদি কোনো মালিক বা মালিকপক্ষকে বলি, তারা নিশ্চিত গোসসা করবেন। কিন্তু এটাই সত‍্য- একজন শ্রমিক সারাদিন পরিশ্রম করে ঠিকমতো খাবার পায় না, বাসস্থান পায় না আর জীবকার জন‍্য নূন‍্যতম বেতন পায় না, অথচ মালিকপক্ষ এটা মানতেই চায় না। শ্রমিকদের দিয়ে ডলার/ পাউন্ড অঙ্কে আয় হলেও, তাদের বেতন দেওয়া হয় পয়সার অঙ্কে। এর বেশি চাইলেই বলে- ‘লাভ হয় না, ব‍্যবসা খুবই মন্দা।’

    মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাস মনে করে। অনেকে বাহাদূরি করে বলেন- বাংলাদেশে শ্রমের মূল‍্য পৃথিবীতে সবচেয়ে কম। আমি এর বিপরীতে বলতে চাই- বাংলাদেশে শ্রমের মূল‍্য কম নয়, বরং শোষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এখানে যারা শোষণ করে তারাই পার পায়, আর যারা শোষণের বিরুদ্ধে বলে তারা দূর্ভোগের শিকার হয়। কেউ স্বীকার করুন আর নাই করুন- আমি বলব বাংলাদেশে এখনও দাসপ্রথা চলছে। এখনও দাসপ্রভুদের মতো মালিকপক্ষ তাদের লাভ ছাড়া কিছুই বুঝে না। উনারা টাকার লোভে, ক্ষমতা আর মর্যাদার নেশায় বিভোর, যেমনটা ছিলেন দাস-মালিকরা। তখন দাসের হাতে-পায়ে শিকল থাকত, বাংলাদেশের সেবাদানকারী ও শ্রমিকদের হাতে-পায়ে শিকল থাকে না- এটাই তফাত। কিন্তু প্রতি পদে আছে শাসন-শোষণ আর অবহেলা!

    আমি মনে করি, বেতন বা রোজগারের ব‍্যবধান আজই, এখনই কমানো দরকার। দরকার শ্রমিকের আয়ের ৫০-৬০% বেতন হিসেবে দেওয়া! আর মালিকের আয়ের উপর উচ্চ কর আরোপ করা যাতে পুঁজি নিদ্দিষ্ট ব‍্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে না থাকতে পারে। পুঁজির বা ধনের বড়াইয়ে যে সমাজ চলে – সেখানে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন‍্য এর বিকল্প নেই। সবার হাতে টাকা থাকলে – তথাকথিত ক্ষমতাবানরা মিথ‍্যা ক্ষমতা দেখাতে পারবে না – যেমনটা পারেন না জাপানের পুঁজিপতিরা!

মন্তব্য করুন

প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes

ফেসবুক লিংক

ট্যাগ

আর্কাইভ