হাসান বিপুল

ভোপাল থেকে নিশ্চিন্তপুর

নভেম্ভর ২৬, ২০১২

Bipul-fআর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই ভারতের ভোপাল বিপর্যয়ের ২৮ বছর পূর্তি।

মুম্বাই, দিল্লী বা কোলকাতা যেমন পরিচিত শহর ভোপাল তেমন নয়। অনুমান করি, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানায় যারা কাজ করেন, ভারতের ভোপাল শহরটির নাম তারা কখনো শোনেননি। তারা জানেন না ১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর রাতে কী ঘটেছিল ওই শহরটিতে আর শহরটির মানুষের ভাগ্যে। সত্যি ঘটনা হলো, যাদের ভাগ্যে ওই রাতটি এসেছিল, তাদের অনেকেই জানতে পারেননি কী ঘটলো তাদের জীবনে। অথচ শ্রমিকের করুন ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহরটি।

ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী শহর ভোপাল। ম্যাপে হিসেব করে দেখলে শহরটি ভারতের প্রায় মাঝামাঝি অবস্থিত, যেমনটা আমাদের রাজধানী ঢাকা। আমাদের ঢাকার মতোই শহরটিতে রয়েছে বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং তাদের অনেকেই শ্রমিক। বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা শ্রমিক। শহরটিতে যে কয় ধরনের উল্লেখযোগ্য কারখানা রয়েছে, তার মধ্যে তালিকার শুরুতেই আসে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা, ওষুধ তৈরির কারখানা, সুতা কারখানা, অলঙ্কার এবং রাসায়নিক বিভিন্ন পণ্যের কারখানা।

ভারতের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাস্টার কন্ট্রোল ফ্যাসিলিটি রয়েছে এখানে, আরো রয়েছে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এর দপ্তর, অ্যাডভান্সড ম্যাটিরিয়ালস অ্যান্ড প্রসেস রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং ভারত হেভি ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড-এর মতো প্রতিষ্ঠান।

সেই সঙ্গে আরো একটি প্রতিষ্ঠান ছিলো ওই শহরে। আমেরিকান কোম্পানি ইউনিয়ন কার্বাইডের কীটনাশক তৈরির কারখানা ছিলো ওই শহরটিতে।

১৯৮৪ সালের ২ আর ৩ ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে ওই কীটনাশক কারখানায় একটি দূর্ঘটনা ঘটে। প্রায় ৩২ টন বিষাক্ত মিথাইল আইসেসায়ানেট গ্যাস রাতের বেলায় মিশে যায় শহরের বাতাসে। শহরের প্রায় ৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হন ওই বিষাক্ত গ্যাসে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের হিসেবে ওই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান ২২৫৯ জন। মধ্য প্রদেশ সরকারের হিসেবে তাৎক্ষণিক মৃতের সংখ্যা ছিল ৩৭৮৭ জন। আর পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিসসহ বিভিন্ন বেসরকারি হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে মারা গিয়েছিলেন ৫০০০ মানুষ। দেখুন, বিভিন্ন দূর্ঘটনায় বাংলাদেশে আমাদের যেমন মরা মানুষের সংখ্যার বেলায় এদিক সেদিক হয়ে যায়, ওদেরও তেমনটা হয়েছিল ওই ঘটনায়। কী আশ্চর্য মিল!

ছবি: হাসান বিপুল

তাজরিন গার্মেন্টস-এর পুড়ে যাওয়া অভ্যন্তর ভাগের একাংশ। ছবি: হাসান বিপুল

এতো গেল তাৎক্ষণিক হিসাব। দীর্ঘ মেয়াদে ওই বিষক্রিয়ায় ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষ মারা গেছেন। যেসব কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ওই ঘটনার পরও বেঁচে ছিলেন তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেননি। বিয়ে হয়নি অধিকাংশের। যারা সংসারী হয়েছেন, তাদের অধিকাংশের কোলে এসেছে বিকলাঙ্গ সন্তান। সবই ওই বিষের প্রকোপে।

ভারতের বিখ্যাত ফটোপ্রাফার রঘু রাই ওই দূর্ঘটনার পরদিনই গিয়ে হাজির হন ভোপাল শহরে। ক্যামেরায় ধারণ করেন ধ্বংসযজ্ঞ। পরবর্তী ১৮ বছর ধরে তিনি ক্যামেরায় ধারণ করেছেন ওই বিষের ফলাফল।

রঘু রাই যখন ঢাকায় এসেছেন, ফটোগ্রাফির একজন ছাত্র হিসেবে আমার সুযোগ হয়েছিল তার মুখ থেকেই ওই ঘটনা শোনার।

ভয়াবহ ওই ঘটনার হতবিহ্বলতা খানিকটা কেটে যাবার পর রঘু বিশ্লেষণ করতে বসেন ঘটনাক্রম। তার মনে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে দূর্ঘটনা কেন ভোপালে ঘটল। উত্তর, কারণ ইউনিয়ন কার্বাইডের কারখানা ভোপালে তাই। পরের প্রশ্ন, ইউনিয়ন কার্বাইডের মালিক তো আমেরিকান। কারখানাটি ভোপালেই কেন, আরেকটু বড় করে ভাবলে ভারতেই কেন? কারণ ভারতে বা ভোপলের মতো শহরে শ্রমিক সস্তা। আচ্ছা, পরের প্রশ্ন, কারখানা তো আমেরিকায় আছে, ইংল্যান্ডে আছে, জার্মানীতে আছে, আছে আরো বিভিন্ন উন্নত দেশেও। দূর্ঘটনাটি কেন ভারতে অবস্থিত একটি কারখানাতেই ঘটল? কারণ- তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে কারখানায় নিরাপত্তা বাজেট তেমন একটা থাকে না। কম পয়সায় পণ্য উৎপাদন করতে পারলে মালিকের ব্যবসা ভালো হবে। কাজেই উৎপাদন খরচ কমাও। উৎপাদন খরচ কোন কোন খাতে কমানো যায়? পয়লা দুটি জায়গা হলো শ্রমিক মজুরি এবং নিরাপত্তাজনিত খরচ। আর নিরাপত্তার অভাবে শ্রমিক মারা গেলে প্রতিষ্ঠানের মালিকের তেমন কিছু যায় আসে না। কারণ, তৃতীয় বিশ্বে মানুষের জীবনের দাম উন্নত বিশ্বের মানুষর জীবনের দামের চেয়ে কম। সহজ হিসাব।

ওই দূর্ঘটনার ছবি নিয়ে রঘু পরবর্তী সময়ে প্রদর্শনী ও ছবির বই তৈরি করেন, নাম ছিল ‘এক্সপোজার: পোরট্রেইট অফ এ কর্পোরেট ক্রাইম’। রঘুর মতে, এমন দূর্ঘটনায় মৃত্যু আসলে মালিকের লাভের স্বার্থে শ্রমিকের মৃত্যু। এটি তার ভাষায় হত্যাকাণ্ড। কেবল হত্যাকাণ্ড নয়, মুনাফার লোভে এটি পরিকল্পিত হত্যা। আর এই হত্যা প্রাতিষ্ঠানিক। এজন্যই এটি ‘কর্পোরেট ক্রাইম’। এদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো না গেলে এমন ঘটনা আরো ঘটবে।

ভোপালের ওই দূর্ঘটনার পর যে প্রশ্নগুলো রঘু রাইয়ের মনে এসেছিল ঠিক তেমন প্রশ্ন কি আমরা এখন করতে বসবো ২৫ নভেম্বর আশুলিয়ায় নিশ্চিন্তপুর তাজরিন ফ্যাশনস-এর ঘটনা নিয়ে? প্রথম প্রশ্ন, কারখানাটিতেই কেন দূর্ঘটনা ঘটল? কেন আগুন লাগলে আতঙ্কিত শ্রমিক দেখতে পেয়েছেন কারখানার প্রধান ফটকে তালা? কখনো তো শুনিনি কোনো তৈরি পোশাক কারখানার মালিকের বাসায় ফটকে তালা থাকার কারণে এমন দূর্ঘটনা ঘটেছে?

হাসান বিপুল: সাংবাদিক।

Tags: , , , , ,

WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
| | More
 -------------------------------------------------------------------------
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর নিজস্ব। bdnews24.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bdnews24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)

-------------------------------------------------------------------------

৫ প্রতিক্রিয়া - “ ভোপাল থেকে নিশ্চিন্তপুর ”

  1. কান্টি টুটুল on নভেম্ভর ২৭, ২০১২ at ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

    নিহত শ্রমিক পরিবার প্রতি দশ লক্ষ টাকা সহ এক বৎসর পূর্ণ বেতন-ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক,

    দেশের প্রবৃদ্ধিতে ঈর্ষণীয় অবদান রাখা গার্মেন্টস‌ শ্রমিক বোনদের এই আর্থিক সুবিধা প্রদান এই শিল্পকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

  2. হুমায়ূন কবীর ইমন on নভেম্ভর ২৭, ২০১২ at ১২:৪৩ অপরাহ্ণ

    নিবেদিত প্রাণ সংবাদকর্মী ও আলোকচিত্রী হাসান বিপুল বরাবরই আমার প্রিয় লেখক। তথ্য সমৃদ্ধ লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। ঈশ্বরের চাইতে হয়ত আপনি অনেক বেশি সংবেদনশীল, তাতে যেমন তার মসনদ টলেনা; ঠিক তেমনি পাতি ঈশ্বর বনে যাওয়া এইসব মালিকদেরও ঘটনাগুলো ঠিক স্পর্শ করেনা কিছুতেই। আগুনও অনেকটা ঈশ্বরের মতো- পোড়ায় শুধু নিম্নবিত্তের শরীর আর মধ্যবিত্তের মনন।

  3. nahid on নভেম্ভর ২৬, ২০১২ at ১০:২৪ অপরাহ্ণ

    খুব ভালো হয়েছে।

    আরো লিখবেন…….

  4. Faruk Ahmmed on নভেম্ভর ২৬, ২০১২ at ৫:৫৩ অপরাহ্ণ

    আশুলিয়ার কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব দুর্বল বলে মনে হয়েছে। যদি সঠিক কমপ্লায়েন্ট মানা হত তাহলে দুর্ঘটনা অনেকটা এড়ানো যেত।

  5. Hossain on নভেম্ভর ২৬, ২০১২ at ৪:০৯ অপরাহ্ণ

    সুন্দর বিশ্লেষণ। ভালো লেগেছে।

মন্তব্য করুন

প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes

ফেসবুক লিংক

ট্যাগ

আর্কাইভ