Feature Img

Salahuddin-2111111112জামায়াত-শিবিরের সাম্প্রতিক কাজ-কারবার নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেকেই। বোঝা গেল, দেশের রাজনীতি আগামী দিনগুলোতে মারাত্মক সাংঘর্ষিক দিকে চলে যাচ্ছে। নির্বাচন এলেই আমাদের রাজনীতিতে এই আবহটা তৈরি হয়ে যায়। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নানা সমীকরণ তৈরি হয়। এটা হবেই। তবে আমি মনে করি, এ প্রেক্ষিতে আমাদের, মানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে একজোট হতে হবে। নিজেদের কাজটা করে যেতে হবে। আমি মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি না বলেই ফ্যাসিবাদী এবং উর্দি-পরা শাসকদের হাতে গড়া দলগুলোকে রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকার করে নিতে হচ্ছে।

একাত্তরে গণহত্যা চালানোর জন্য জামায়াতের ক’জন শীর্ষ নেতার বিচারকাজ চলছে। খুব শিগগির কিছু-কিছু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার রায় হয়ে যাবে। নি:সন্দেহে জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি মনে করতে পারে যে, তাদের কিছু নেতার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাবে, তাদের শাস্তির রায় হবে। এদেশের মাটিতে রাজনীতি করতে হলে এটা তাদের জন্য একটি বড় পরাজয়ও বটে। তাই ওরা এটা বানচাল করতে তো চাইবেই। এধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই ওরা দেশে অস্থিরতা তৈরি করে থাকতে পারে।

আর এ প্রেক্ষিতেই জামায়াতকে এদেশে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত কিনা এ নিয়ে এখন কথাবার্তা হচ্ছে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবিও খুব জোরালো হয়ে উঠছে। আমার মতামত খুব স্পষ্ট। আমি চাই না, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হোক। নিষিদ্ধ করা হলেই কি ওরা দমে যাবে? আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমি যদ্দূর জানি, বিলেতে ফ্যাসিস্ট পার্টি এখনও বৈধভাবে কাজ করছে। ইউরোপের কিছু-কিছু দেশে নাজি পার্টিও আছে। কিন্তু এসব দল তো ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার কথা ভাবতেও পারে না। কারণ ওখানে ওদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে।

আমাদের দেশেও সেটা করা উচিত। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে একধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। আমার কথা ওই একই- এদেশের মাটিতে জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের রাজনীতি বন্ধ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একসময় জামায়াতের রাজনীতি এদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আবার ফিরেও এসেছে ওরা উর্দি-পরা শাসকদের সহায়তায়। এবারও নিষিদ্ধ করা হলে একই ঘটনা ঘটতে পারে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এরা আবার একই রূপে বা নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।

কিন্তু জামায়াত-শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করা হলে জনগণের কাছে এরা একটি শক্তি হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হবে। এরা তো সবসময় নিজেদের একটি শক্তি হিসেবে দেখাতে চায়। সে জায়গাটা শেষ করে দিতে হবে।

আমাদের সমাজের প্রগতিশীল অংশের কাছে দেশের মানুষের একটি দাবি আছে। এদেশের মাটি থেকে চিরতরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে উৎখাত করতে হলে এ শক্তিকে তৃণমূল পর্যন্ত কাজ করে যেতে হবে। আমরা সমাজের কিছু অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল চেতনার মানুষ আগামী ৮ ডিসেম্বর ‘সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী জাতীয় সম্মেলন’ করতে যাচ্ছি। এধরনের আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও বলছি- আমরা খুব বেশি সেমিনার-কেন্দ্রিক, ঢাকা-কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। এভাবে চললে তো হবে না। আন্দোলনটা ছড়িয়ে দিতে হবে গ্রাম পর্যন্ত। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্তার ঘটাতে হবে সাধারণ মানুষের মধ্যে। তাহলে সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে দমন করা সহজ হবে।

মনে রাখতে হবে, এদেশে জামায়াত একমাত্র ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নয়, আরও অনেক দল রয়েছে। এসব দলের কোনওটিরই রাজনীতি জনগণের কল্যাণের জন্য নয়। তাই শুধু একটি নয়, সব ধর্মভিত্তিক দলেরই রাজনীতির মূল জায়গাটিতে আঘাত করতে হবে।

এ জন্য আমাদের নিজেদেরও আত্মশুদ্ধির দরকার আছে। আমরা যদি জনগণের কাছ থেকে দূরে চলে যাই তাহলে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো জনগণকে বিভ্রান্ত করবে। আত্মশুদ্ধির জন্য আমাদের প্রথমত এবং প্রধানত জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। এ সরকারের বর্তমান মেয়াদে দুর্নীতির কিছু অভিযোগ উঠেছে। হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, পদ্মাসেতু নির্মাণ নিয়ে দুর্নীতি ইত্যাদি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আমি মনে করি, সেসব অভিযোগ তলিয়ে দেখা দরকার ছিল। এসব অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া বা অস্বীকার করারও কিছু নেই। এসব প্রসঙ্গে স্পর্শকাতর হওয়াও অনুচিত। কারণ প্রশাসনের কোনো কোনো অংশ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ দিয়ে চালিত হতে পারে। তাই এসব গোষ্ঠীর জনবিরোধী কাজকর্ম ঠেকাতে না পারলে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন হবে।

সরকার দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিয়ে কাজ করছেন এটা ঠিক। তবে আমি মনে করি খুব ধীরগতিতে সব হচ্ছে। আরও দ্রুত তদন্ত হতে হবে যাতে জনমনে এ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়।

আরও একটি কাজ করা খুব বেশি জরুরি। সরকারি যেসব কমিশন গঠন করা হয়েছে সেগুলোকে সত্যিকারের কার্যকর করে গড়ে তুলতে হবে। এখন লোকে বলে এগুলো ‘নখদন্তহীন বাঘ।’– এমন কথা শোনার জন্য আমরা তৈরি নই। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পর্কে এমন সমালোচনা রয়েছে। অথচ এটির কাজ ব্যাপক। এ প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা হলে আমরা যেকোনো দুর্নীতির ঘটনার স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত আশা করতে পারব। জনগণও সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে পারবে।

নিজেদের যদি আমরা ঠিক করতে পারি, ভুলত্রুটি এড়িয়ে সব সমালোচনা গ্রহণ করে কাজ করতে পারি তাহলে আর সমস্যা নেই। আত্মশুদ্ধি থেকেই আসে আত্মশক্তি। আর সেটাই আমাদের অর্জন করতে হবে।

আমার মনে হয়, তৃণমূলে কাজ করা আর আত্মসমালোচনার মাধ্যমে জনগণের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক শক্তি টিকে থাকতে পারবে। অন্যরা এখানে আর ঘাঁটি গাড়তে পারবে না। কখনও-ই না।

ড. সালাউদ্দীন আহমদ : জাতীয় অধ্যাপক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

প্রতিক্রিয়া -- “নিষিদ্ধ নয়, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করা হোক”

  1. ইয়ামিন

    প্রশ্নটা সেখানেই! কোনো দুর্বৃত্তকে দিয়ে কারও অপকর্মের মোকাবিকা করানো যায় না। তাহলে এটা জাতির বিপর্যয়ের অন্যতম একটা কারণ হয়ে উঠবে।

    জবাব
  2. হাসান জেদ্দা

    সাম্প্রদায়িকতা মানে শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নয়। বিএনপি একটা সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ আরেকটা সম্প্রদায়। এ দুই সাম্প্রদায়িকতা থেকে আগে দেশকে বাঁচান। তারপর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করুন। ধন্যবাদ।

    জবাব
  3. স্বাধীনতা

    রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরেই তো এখন জামায়াতের উপর পুলিশি নির্যাতন চালানো হচ্ছে। জামায়াতের লোকজনের সঙ্গে চারিত্রিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করার মতো সৎসাহস ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের নেই। তাই তারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এখন নির্যাতন-নিপীড়ন করাসহ যুদ্ধপরাধের বিচারের মতো সেটেল্ড বিষয় সামনে নিয়ে এসে কুটকৌশলে জামায়াতকে দমনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু তাতে সফল হবে না।

    জবাব
  4. অম্লান কৌশিক

    আমি আমার নাতিদীর্ঘ জীবনে এমন কোনো স্বাধীন দেশ বা জাতি দেখিনি যেখানে স্বাধীনতাবিরোধীদের দাপটে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিকে বিলাপ করতে, শপথ নিতে বা জোট বাঁধতে হয়। একবার ভাবুন তো? এই স্বাধীনতা কি আমরা এনেছি? এই স্বাধীনতার জন্য কি আমরা জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ ছিলাম? আমরা কি তখন দেশি এবং নব্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একই সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম? জানি সব উত্তরই হবে ইতিবাচক। তবে কেন এই স্বাধীনতার শত্রু নামক জুজুর ভয়? আসলে, স্বাধীনতার শত্রু সেই রক্ষণাত্নক অবস্থানেই আছে যেখানে ছিল তারা প্রায় ৪০ বছর আগে। আমাদের শাসকশক্তি তাদের কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখতে, সম্প্রসারিত করতে সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলছে। একই খেলা খেলছে আরেক দল ‘ভারত সব নিয়ে নিল’ চিৎকার করে।

    দ্বিতীয় পরিস্থিতির কিছুটা বাস্তবতা পাওয়া গেলেও, দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে দুই পক্ষেরই সদিচ্ছার ভয়াবহ সঙ্কট রয়েছে। সুখের কথা, এই দুই শ্রেণির রাজনীতিবিদদের গ্রামে-গঞ্জে সর্বরোগের মহৌষধ বটিকা বিক্রেতার চেয়ে বেশি কিছু মনে করা হয় না। আর তাই তাদের ডাকে এগিয়েও আসে না, ঝাঁপিয়েও পড়ে না।

    দুঃখের কথা, এই দুই শ্রেণির বাইরে তাদের কোনো বিকল্পও খোলা নেই। তাই একই বৃত্তে আময়া ঘুরছি অনন্তকাল।

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—