বেবী মওদুদ

স্কুল-ভর্তিতে সব কোটা বাতিল হোক

নভেম্ভর ১৪, ২০১২

Babymoudud-f11111প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী-ভর্তিতে সংসদ সদস্যদের কোটা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। আমি মনে করি, পদক্ষেপটি সঠিক হয়েছে। তাই অভিভাবকরা দুশ্চিস্তামুক্ত হয়েছেন। সাংসদদের জন্য ২ ভাগ কোটা বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে পত্রিকায় যখন খবরটি প্রকাশিত হল- আমার মোটেই ভালো লাগেনি। অনেকের কাছ থেকেই নানা প্রশ্ন শুনতে হয়েছে আমাকে। অভিভাবক মহলে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এমনকী শিক্ষক সমাজও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন।

আমি জানি না কে বা কারা এর প্রস্তাবক। আর এমন প্রস্তাব যদি করাই হল তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন এমন একটি হঠকারি পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হয়ে উঠল? কোন উদ্দেশ্যে? উদ্দেশ্যটি নিশ্চয়ই শুভ ছিল না। তবে এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের চরিত্রহননের একটা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ছিল বলেই আমার ধারণা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়মতো যথাযথ নির্দেশ দিয়ে এ অশুভ পদক্ষেপ বাতিল করেছেন, সে জন্য তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, “সবকিছু বিবেচনা করে আমরা মনে করি- সাংসদদের জন্য আলাদা কোটা রাখা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মতামত নেয়া হয়েছে। তিনিও মনে করেন, সংসদ সদস্যদের জন্য কোটা রাখা ঠিক নয়।” ১১ নভেম্বর শিক্ষা সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী সাংবাদিকদের সামনে ঢোল পিটিয়েছিলেন এভাবে- “ভর্তির ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের জন্য দুই শতাংশ কোটা চালু করতে নীতিমালা সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রীর মতামত নেয়ার আগে তিনি এ খবর সাংবাদিকদের জানিয়ে অভিভাবক-শিক্ষকদের আতঙ্কিত ও সাংসদদের হেয় করার অধিকার কোন ক্ষমতাবলে পেয়েছেন, জানতে চাই। স্ব-উদ্যোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কারা জড়িত ছিলেন সেটাও জানা দরকার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নানা শাখা-প্রশাখা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠান, পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, এ রকম নানা ভাগ। তাছাড়া এর অধীনে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, পাঠ্যপুস্তুক ও সিলেবাস প্রণয়ন বোর্ড এবং পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিনামূল্যে বিতরণ কর্মসূচি আছে। রয়েছে শিক্ষক নিবন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ও এমপিওভুক্তির কাজ। ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি ও কয়েক ধরনের পাবলিক পরীক্ষা নেয়া এবং সার্টিফিকেট দেওয়া এ মন্ত্রণালয়েরই কাজ। সরকারি শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্বও এই মন্ত্রণালয়ের। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের ওপর খবরদারি মন্ত্রণালয়টিই করে।

এ বিশাল বৃক্ষের জন্য প্রতিবছর বাজেটে সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তারপরও দেখা যায়, শিক্ষার হার বাড়লেও ঝরে পড়ার হার প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত অনেক বেশি। এর চেয়ে বড় কথা- বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বেশি বলেই এ নিয়ে দুর্নীতি, অপচয়, অবহেলা-বঞ্চনা ও উপেক্ষা এ মন্ত্রণালয়েই সবচেয়ে বেশি। আর এ জন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা দায়ী। গ্রামের একটি স্কুল নিবন্ধন করার জন্যও বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা ঘুষ চেয়ে থাকেন ওরা। কথাটা কি অস্বীকার করতে পারবেন?

এছাড়া এমপিওভুক্তি বা উন্নয়নের অর্থ বরাদ্দের জন্যও মোটা অংকের টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। অর্থ না দিলে সরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ফাইল ও চেক ছাড় পায় না। রমরমা নিয়োগ-বাণিজ্যের কথাও শোনা যায় সবার মুখে-মুখে। মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ শিক্ষা বিভাগীয় কর্মকর্তারা এ সবের সঙ্গে জড়িত বলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এমন বেহাল অবস্থা। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন এর রন্ধে রন্ধে আশ্রয় নিয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই নীতিমালা বাধ্যতামূলক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য রাখা চলবে না। প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। সবাই যেন ভর্তির সুযোগ পায় সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

যে সব প্রতিষ্ঠান এ নীতি মানবে না, বেশি টাকা নেবে সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। এগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শুধু কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণই যথেষ্ট নয়, আরও কিছু দরকার। কারণ ওরা প্রভাবশালীদের কারণে আবারও ফিরে আসতে পারে। তাই কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে মন্ত্রণালয় থেকে বিতাড়িত করতে হবে।

আসলে শিক্ষাকে যদি আমরা কলুষমুক্ত করতে না পারি তাহলে জাতিও কলুষমুক্ত হবে না। দেশ পিছিয়ে থাকবে। যে কোমলমতি শিশু জানতে পারবে যে তাকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য নির্দিষ্ট অংকের বাইরে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়েছে, বা সে কোটার কারণে ভর্তি হতে পেরেছে- সে কখনও-ই সেটা মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। বড় হয়ে সে নিজেও অসৎ পন্থা খুঁজতে থাকবে। আর স্বাভাবিক নিয়মে যারা ভর্তি হবে তারা অস্বাভাবিক পন্থায় ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েদের একটু নিচু চোখেই দেখবে। শৈশব থেকে সমাজের এ সব ভেদাভেদ ও শ্রেণীবৈষম্য শিশুকেও স্বার্থপর ও নীতিহীন করে ফেলতে পারে। এ সব বন্ধ করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

পাশাপাশি বলব, সাংসদদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভর্তি-বাণিজ্য চালানোর অভিযোগ একতরফাভাবে দেওয়া ঠিক নয়। শিক্ষক ও শিক্ষা-বিভাগীয় কর্মকর্তারা এ বাণিজ্যে প্রচন্ড উৎসাহী হয়ে থাকেন। অনেকে তো কোটাও বিক্রি করে দেন অর্থ নিয়ে। আর বলেন- নির্দিষ্ট কোটায় কাউকে পাওয়া না যাওয়ায় অন্যদের সুযোগ দেওয়া হল!

আমাদের অনুরোধ থাকবে শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী কোটা রেখে আর সব কোটা উঠিয়ে দেওয়া হোক। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য কোটা থাকবে কেন? তারা দেশের কী এমন সম্পদ যে তাদের জন্য কোটা বরাদ্দ রাখতে হবে?

বেবী মওদুদ: লেখক ও সাংবাদিক।

Tags: , ,

WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
| | More
 -------------------------------------------------------------------------
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর নিজস্ব। bdnews24.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bdnews24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)

-------------------------------------------------------------------------

৬ প্রতিক্রিয়া - “ স্কুল-ভর্তিতে সব কোটা বাতিল হোক ”

  1. Bishowgit on নভেম্ভর ১৫, ২০১২ at ৯:০৪ অপরাহ্ণ

    প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপটি যথাযথ হয়েছে।

  2. Giush on নভেম্ভর ১৫, ২০১২ at ৭:১৮ অপরাহ্ণ

    আপনার সঙ্গে একমত।

  3. mizan on নভেম্ভর ১৫, ২০১২ at ৭:০১ অপরাহ্ণ

    প্রতিবন্ধী কোটার পাশাপাশি সমাজের অনগ্রসর অংশের জন্য কোটা থাকা দরকার। যেমন – হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, চাকমা, মারমা, নারী। রাষ্টের আদর, ভালবাসা আর যত্ন ছাড়া অনগ্রসর অংশের এগিয়ে যাওয়া অনেক দুরূহ ও কষ্টের।

  4. Mushtaque Ahmed on নভেম্ভর ১৫, ২০১২ at ৩:১৬ অপরাহ্ণ

    আপা
    আপনার এই লেখাটি পড়ে অনেক ভালো লেগেছে। আমাদের বেবী আপা বেবী আপাই আছেন। যার লেখায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ইতিহাস ও মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালবাসা থাকে। আপনাকে আমার গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম।

  5. Helal Uddin on নভেম্ভর ১৫, ২০১২ at ৮:৫২ পুর্বাহ্ন

    লেখাটির জন্য অনেক ধন্যবাদ। স্কুলে কোটা থাকলে অবশ্যই সঠিকভাবে মেধা যাচাই করা যাবে না। এতে মেধাবীরা ঝরে পড়বে আর অযোগ্যরা এগিয়ে যাবে। তবে এই অযোগ্যরা কিন্তু দেশকে এগিয়ে নিতে পারবে না। দেশ মেধাবীদের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হবে।

  6. Zakir Hossain on নভেম্ভর ১৫, ২০১২ at ৮:১৮ পুর্বাহ্ন

    বেবী আপা

    আপনার সঙ্গে আমরা একমত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অশেষ সাধুবাদ জানাই এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। খুব ভালো লাগল লেখাটি পড়ে। আপনাকে শুভেচ্ছা আপা।

মন্তব্য করুন

প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes

ফেসবুক লিংক

ট্যাগ

আর্কাইভ