Feature Img

monwarগ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টি কীভাবে আলোচনায় এসেছিল সে স্মৃতি আমাদের কারও মনে ফিকে হয়ে যাওয়ার কথা নয়। ড. ইউনূস নোবেল শান্তি পাওয়ার আরও পরে, প্রায় বছর দুয়েক আগে নরওয়ের একজন সাংবাদিক একটি নরওয়েজিয়ান টিভি চ্যানেলের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। সে প্রতিবেদনটি প্রচারিত হলে তুমুল হৈচৈ শুরু হয়। কারণ প্রতিবেদনটিতে গ্রামীণ ব্যাংকের অন্যান্য অনিয়মের পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ কল্যাণে ফান্ড ট্রান্সফারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। এ নিয়ে নরওয়ের দূতাবাস, এবং পরে নরওয়ের পার্লামেন্ট এবং মন্ত্রিপরিষদে বিষয়টি আলোচিত হতে থাকে। কয়েক দফা চিঠি চালাচালিও হয়। নরওয়ের সরকারের আপত্তির মুখে একসময় গ্রামীণ কল্যাণ থেকে তহবিলটা গ্রামীণ ব্যাংকে ফেরত নেয়া হয়।

এটাই প্রমাণ করে যে এখানে কোনও না কোনও অনিয়ম হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ এখানেই। এরপর মিডিয়াতে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে আরও লেখালেখি হতে থাকে। তাতে একটি বিষয় উঠে আসে- ড. ইউনুসের পৈতৃক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজেস কর্পোরেশনের সঙ্গেও গ্রামীণ ব্যাংকের একটি সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগ উঠে, ড. ইউনূস সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা পারিবরিক স্বার্থে গ্রামীণ ব্যাংককে ব্যবহার করেছেন।

এ ছাড়াও আরও দুটি বড় বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। একটি হল, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ ফান্ড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ দুটো প্রতিষ্ঠান পরে আরও কিছু লাভজনক ও অলাভজনক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গঠন করে যেগুলোর নামের আগে গ্রামীণ শব্দটি রয়েছে। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, এ সব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হচ্ছেন ড. ইউনূস। তাছাড়া ব্যাংকের ক’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও ওই সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে আছেন। সরকার এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সঙ্গত কারণেই জানতে চায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের সম্পর্ক কী। ফান্ড ট্রান্সফারের বিষয়টি কী বা গ্রামীণ ব্যাংকের যে উচ্চ সুদের হার সে ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে কিনা। দ্বিতীয় যে বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে তা হল, গ্রামীণ ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের ওপর তখন পর্যন্ত কোনও রিভিউ হয়নি। তাই এ সম্পর্কে একটি পর্যালোচনা জরুরি হয়ে পড়েছিল।

এ জন্যই অর্থ মন্ত্রণালয় গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর একটি রিভিউ কমিটি গঠন করে। আমরা ২০১১ সালের প্রথমদিকে কাজ শুরু করি। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে আমি ছিলাম প্রধান। গ্রামীণ ব্যাংকের এই বিষয়গুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যত করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনাও চাওয়া হয় কমিটির কাছে। তাছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের নানা অনিয়ম নিয়ে এত দীর্ঘদিনেও কেন কোনও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি সেটিও ছিল একটি প্রশ্ন।

আমরা যখন রিভিউ শুরু করলাম তখন সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ একটি বিষয় আমাদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ল। গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে আমাদের সবার ধারণা হচ্ছে এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। অনেকের ধারণা এটা একটা এনজিও’র মতো। আমরা গ্রামীণ ব্যাংকের সবগুলো মিটিংয়ের কার্যবিবরণী পড়ে দেখেছি। রিভিউ কমিটিকে কাজ করতে গিয়ে এটা করতে হয়েছে। আমরা দেখতে পেলাম, ব্যাংকের ৫২ তম পর্যালোচনা পর্ষদে সরকারের মনোনীত এক ডিরেক্টর বলে বসলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই আমরা যতদিন চাইব ততদিনই ড. ইউনূস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে থাকতে পারবেন।’ ওই পর্ষদে সভাপতিত্ব করেছিলেন ড. রেহমান সোবহান। তিনিও বললেন যে এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

সত্য হল বিপরীতটি। বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিকেল ৫২-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বলতে আমরা বুঝি পার্লামেন্ট, সরকার এবং রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংস্থা (স্ট্যাটুটরি পাবলিক অথরিটি)। যে সব সংস্থা, সংগঠন বা কোম্পানির কার্যাবলি অথবা প্রধান কার্যাবলি রাষ্ট্র কর্তৃক তৈরি বিশেষ কোনও আইন, স্ট্যাটিউট বা অর্ডিন্যান্সের দ্বারা পরিচালিত হবে, সে সব প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংস্থা। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স জারি করেন। বাংলাদেশের সংবিধান মানলে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করলে- এটা সুস্পষ্টভাবে পরিষ্কার যে, সংবিধানের ৫২ ধারা অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংক রাষ্ট্রের একটি অংশ। কারণ এটি একটি রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংস্থা। তার মানে, এটি একটি রাষ্ট্রীয় সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও অবশ্যই নয়।

তার মানে কী দাঁড়াল? বাংলাদেশ ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এটিও একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হচ্ছে ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্স বলে। বাংলাদেশ ব্যাংকও হয়েছে পৃথক অর্ডিন্যান্সের সাহায্যে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও বলে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের সময়কার এক অর্ডিন্যান্সের বলে। এ ধরনের রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংগঠনের এমপ্লয়িরা কিন্তু পাবলিক সার্ভেন্ট। হ্যাঁ, অবশ্যই এরা প্রচুর স্বাধীনতা ভোগ করেন। তবে তাদের এই স্বাধীনতা দিয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র চাইলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা কমাতে বা বাড়াতে পারে। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক যে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এতে কোনও রকম বিতর্ক থাকার কোনও কারণ নেই। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট।

আমরা, রিভিউ কমিটি আরেকটি বিষয় জানতে পেরেছি। তা হল, আজ যে ঘটনাগুলো জনসমক্ষে আসছে, সে সব বিষয় প্রায় এক যুগ আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক তদানীন্তন সরকারের নজরে এনেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ইন্সপেকশন টিম গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যাবলী অডিট করে। এখন যে সব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে তার বেশিরভাগই অডিট রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল। আমরা জানতে পেরেছি যে, অডিট রিপোর্টটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আলোচনা হয়েছিল। সে আলোচনায় অর্থসচিব, ব্যাংকিং ডিভিশনের সচিবসহ দায়িদ্বশীল অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। কী কারণে তখন এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি সেটা একটা প্রশ্ন বটে। এটা খুব দু:খজনক।

১৯৮৩ সালের যে অর্ডিন্যান্সের বলে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে বেশ কয়েক জায়গায় লেখা আছে- সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তারপরও সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে তেমন কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ড. ইউনূসের বয়সসীমা অনেক আগেই পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি এ পদে ছিলেন। তাই আমরা যখন রিভিউ করছিলাম তখন বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে জানিয়ে দেয় যে, ড. ইউনূস আর এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পারিচালক নেই।

ড. ইউনূস এই বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানি হয়েছে। তবে রুল ইস্যু করা হয়নি। এর কারণ ছিল, সরকারের পক্ষ থেকে ড. ইউনূসকে শুধু তাঁর বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল- তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেয়া হয়নি। যেমন, ডিসমিসাল, টার্মিনেশন, ফোর্সড রিটায়ারমেন্ট, ডিমোশন টু আ লোয়ার পোস্ট ইত্যাদির মতো বড় কোনও শাস্তি। এমনকী মাইনর কোনও পদক্ষেপ, যেমন অ্যানুয়েল ইনক্রিমেন্ট বন্ধ বা নিন্দাজ্ঞাপনের মতো পদক্ষেপও নয়। স্বভাবতই রুলটি ডিসমিস হয়ে যায়।

ইউনূস সাহেব এরপর সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেন। তারা আর্জিতে উল্লেখ করলেন যে, ইউনূস সাহেব গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এর ৯৭ ভাগ শেয়ারহোল্ডার দরিদ্র নারী। সুপ্রিম কোর্টের প্রায় ৬-৭ জন বিচারক এ বিষয়ে একক সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, ‘‘ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রি-কারসর ছিলেন মাত্র। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা নন। তাছাড়া তিনি অবশ্যই গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারই গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন। কারণ গ্রামীণ ব্যাংক একটি বিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ব্যাংক নয়। এ প্রতিষ্ঠানের এমডি’র স্ট্যাটাস সোনালী বা জনতা ব্যাংকের এমডি’র সমতুল্য।’’ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হল যে গ্রামীণ ব্যাংক কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়।

আরেকটি তথ্য আমাদের জানা দরকার। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার সময় অর্ডিন্যান্সে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই ব্যাংক গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণসুবিধা প্রদান করবে। ক্ষুদ্রঋণের কথা কিন্তু কোথাও ছিল না। এভাবে লেখা হয়েছিল, ‘টু প্রোভাইড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটিজ অ্যান্ড আদার এনসিলারি সার্ভিসেস টু দ্য ল্যান্ডলেস পিপল ইন দ্য রুরাল এরিয়াস।’ রুরাল এরিয়া কী হবে সেটাও নির্ধারণ করবেন সরকার, এটা অর্ডিন্যান্সে বলা হযেছিল। তবে ক্ষুদ্রঋণের বিষয়টি সোশ্যাল ডিসকোর্সে পরে এসেছে– এটাও দোষের কিছু নয়।

আমি বরং এখানে অন্যান্য দিক থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টিকে দেখব। ১৯৮৩ সালের অর্ডিন্যান্সে গ্রামীণ ব্যাংকের পেইড-আপ ক্যাপিটাল কত আর অথরাইজড ক্যাপিটাল কত তা নির্ধারণ করা ছিল। ১৯৮৬ সালে অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে এর পরিমাণ বাড়ানো হয়। ১৯৯০ সালের জুন মাসে আরেকবার অর্ডিন্যান্স সংশোধন করা হয়, ক্যাপিটালের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যই। এরপর আর ক্যাপিটালের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য অর্ডিন্যান্সে কোনও সংশোধনী আনা হয়নি। ব্যবস্থাপনা পারিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে শুধু আরেকবার সংশোধনী আনা হয়। কিন্তু গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ কার্যদিবসে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্যাপিটালের পরিমাণ বাড়ানো হয় প্রশাসনিক আদেশের ভিত্তিতে। একটি মূলধন ৪০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা, আরেকটি মূলধনের পরিমাণ ৫০ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি হয়ে যায়।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ বাড়াতে পারেন। তবে এ জন্য অর্ডিন্যান্সের ধারা সংশোধন করতে হবে। কোনও প্রকার প্রশাসনিক আদেশে- অর্থমন্ত্রী, এমনকী প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই মূলধনের পরিমাণ বাড়াতে পারবেন না। অবশ্যই এ জন্য পার্লামেন্টের মাধ্যমে অর্ডিন্যান্স সংশোধন করতে হবে। সেটা যে করা হয়নি তা-ও একটি অনিয়ম।

দ্বিতীয়ত, ড. ইউনূসের পক্ষে অনেকেই বলছেন, গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক দরিদ্র নারীরা। তাদের মধ্য থেকে পরিচালক নির্বাচিত হন ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমি একমত- এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্যাপিটাল স্ট্রাকচার যা-ই হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। এমনকী বরোয়ারদের শতভাগ মালিক হলেও। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ অর্থের জোগানদাতা সরকার, বাকি ১০ শতাংশ বিশ্বদ্যিালয় নিজে জোগার করে। উল্টোটা যদি হত, তাহলে? সে ক্ষেত্রেও এটি রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংস্থা থাকবে, এর মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।

কারণ মালিকানা একটি আইনি ধারণা। আমার মৃত্যু হলে আমার সম্পত্তির মালিক হবেন আমার সন্তানরা। গ্রামীণ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারা কি এভাবে মালিকানার দাবি করতে পারবেন? আসলে গ্রামীণ নারীদের জন্য এটা একটা সান্ত্বনা। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের মালিক যেমন আমরা সবাই। গ্রামীণ ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংগঠনের মালিক কিন্তু রাষ্ট্র। সরকার বদলাতে পারে, গণতান্ত্রিক থেকে আধা-সামরিক সরকার বা বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগ এভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে লোক বদলাতে পারে; গ্রামীণ ব্যাংকের অবস্থান বদলাবে না।

তাই যারা আজ বলছেন যে, সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে ধ্বংস করতে চাচ্ছেন- তাদের উদ্দেশে আমি বলব, কোন দুঃখে সরকার এটা করতে যাবেন? প্রতিষ্ঠানটির মালিক তো রাষ্ট্র। তাই সেই অর্থে সরকারেরই প্রতিষ্ঠান এটি। আমি বিশ্বাস করি যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া– কেউ চাইবেন না এই প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হোক। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, ‘যত মত তত পথ।’ ইসলাম ধর্মেও একই ধরনের কথা রয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন সরকারের, বিভিন্ন দলের মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তেমনভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে এ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বা বিএনপি সরকারের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তাই বলে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস করতে চাইবেন না কেউ-ই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংক কেউ ধ্বংস করতে চাইবেন? গ্রামীণ ব্যাংকের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় বোঝার বিষয় হল সেটাই। এটি একটি স্ট্যাটুটরি পাবলিক অথরিটি বা রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংস্থা, ঠিক যেমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ এগুলো। এই কথাটি না মানলে আমাদের রাষ্ট্র ও সংবিধানকে পুনর্ব্যাখ্যা করতে হবে। ১৯৮৩ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে এইচ এম এরশাদ একটি অর্ডিন্যান্সের বলে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। তখনকার অর্থমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত। তিনিই প্রফেসর ইউনূসকে অর্ডিন্যান্স পাশ করাতে সাহায্য করেছেন। কারণ তখন কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।

এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, এতদিন কেন গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে এ সব আইনগত বিষয় নিয়ে কোনও প্রশ্ন আসেনি? কেন প্রফেসর ইউনূসকে নির্বি্ঘ্নে অনিয়মগুলো করে যেতে দেওয়া হয়েছে? রাষ্ট্রীয় সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও এতদিন ধরে এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও’র মতো কাজ করেছে- এটা আমার কাছে একটা বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন। রিভিউ কমিটির রিপোর্টে আমরা এই প্রশ্নটি করেছি। এ নিয়ে পলিটিক্যাল ও সোশ্যাল রিসার্চ হতে পারে।

সমস্যাটা হচ্ছে এখানেই যে, গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকার মনোনীত সদস্যরা পর্যন্ত বলছেন এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তারা বলছেন, পর্ষদই ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেবে। আসল ঘটনা হল, এই পর্ষদ নমিনেশন, সুপারিশ সবই করতে পারত। আগে এই মনোনয়কে অনুমোদন দিত অর্থ মন্ত্রণালয়। এখন এর ধারা বদলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এদের অনুমোদন ছাড়া হবে না। আদালতও কিন্তু তাই বলেছেন, ‘ইট ইজ দ্য গভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ হুইচ ইজ দ্য আলটিমেট রেগুলেটর অব গ্রামীণ ব্যাংক।’ সম্প্রতি সরকার ধারাটা বদলে ফেলেছেন। সরকার চাইলে সুদের হারও কমাতে পারেন। যা-ই করুন না কেন, আমি মনে করি এই মুহুর্তে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ব্যাংককে আরও গতিশীল, কার্যকর ও সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী করা। আর সে জন্য দ্রুত একজন যোগ্য, দেশপ্রেমিক, প্রতিশ্রুতিশীল ও ডায়নামিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে।

বলা হচ্ছে, গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচিত ৮০ লাখ দরিদ্র নারী শেয়ারহোল্ডার তাদের ব্যবস্থাপক নিয়োগ দেবেন। আসলে এরা কি নির্বাচিত? এরা তো তেমন শিক্ষিতও নন যে একটি সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। তাই এখন যেহেতু সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে এর রেগুলেশনের দায়িত্ব দিয়েছেন, এখন তারা যা করবেন সবই গ্রামীণ ব্যাংক সংক্রান্ত ১৯৮৩ সালের অর্ডিন্যান্সের ধারা মেনেই করবেন। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হবেন একজন সরকারি এমপ্লয়ি, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

মজার ব্যাপার হল, বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হল, এর কারণ কী? হিলারি ক্লিনটন এ দেশে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভাটি করেছেন ড. ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে। তার মানে কী? একসময় গ্রামের মহাজনরা যে ব্যবসা করতেন সেটা এখন এরা করছেন। ক্ষুদ্রঋণও একটি ব্যবসা। ওরা ওয়েস্টার্ন ফাইন্যান্স ক্যাপিটালের প্রতিনিধি। আর এটা একটা মার্কেট ইকোনমি। তাহলে এখানে কোনও স্বার্থ কি নেই?

আমরা যে সুপারিশগুলো করেছি তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটির কথা উল্লেখ করছি। আমরা একটি কমিশন বা কমিটি করার কথা বলেছিলাম। কমিশন গঠিত হয়েছে এবং সেটি কাজ করছে। আমাদের সুপারিশ ছিল অবশ্য কোনও স্বাধীন রেগুলেটরের হাতে গ্রামীণ ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংককে মনিটারি পলিসি নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই অন্য কোনও রেগুলেটর এ দায়িত্বটা পালন করলে বেশি ভালো হত।

গ্রামীণ নামের যত প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর সমন্বয়ের জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের আইনি কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। সেটা যত দ্রুত করা যায় তত ভালো। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেষ করে দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কারণ এগুলো তো সমাজের কোনও না কোনও চাহিদা পূরণ করছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্পষ্ট নই যে, এ সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আসলে কীভাবে গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের উপকার করছে। তাছাড়া বলা হয়েছিল, ‘রুরাল এরিয়া’ কী হবে তা নির্ধারণ করবেন সরকার। কিন্তু এ সব প্রতিষ্ঠান রুরাল এরিয়াতে সবসময় কাজ করছে তা বলা যাবে না।

তাছাড়া সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণকে সমন্বয় করে একটি জাতীয় নীতি করতে হবে। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমরা সুপারিশে লিখেছি, পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসাকে সমন্বয় করে বৈধতা দেওয়া দরকার।

সমস্যা হল, গ্রামীণ টেলিকম তো গ্রামীণ ফোনের ৩৫ শতাংশের মালিক। এরা হাজার হাজার কোটি টাকার মুনাফা করছে। এখন কথা হল, দুস্থ মহিলারাই যদি গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক হন, তারা কি এই লাভের টাকার অংশীদার হচ্ছেন? হওয়া সম্ভব নয়, কারণ কোনওটিতে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা কিন্তু নেই।

প্রশ্ন উঠতে পারে, আজ যদি ক্ষুদ্রঋণ না থাকত তাহলে কী হত? গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণের অবদান বেশি, নাকি গার্মেন্টস শিল্প বা অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধির ফলে দারিদ্র্য কিছুটা দূর হয়েছে? যারা ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে বলছেন তারাও স্বীকার করছেন দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য এটা কোনও ‘মহৌষধ’ নয়, এটা একটা সোশ্যাল সেফটি নেট বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা মাত্র। একজন নারী গার্মেন্টসে কাজ করলে সেটা তার জীবনেই মৌলিক পরিবর্তন এনে দেবে। আবার ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে যে নারী কিছু করছেন সেটাও একটা পরিবর্তন আনছে তার জীবনে। আরেকটি বিষয় হল মহাজনরা একসময় অনেক-অনেক বেশি উচ্চহারে সুদ ধার্য করত। সে তুলনায় গ্রামীণ ব্যাংকের ৩০ শতাংশ সুদের হার তেমন বেশি নয় কিন্তু। তাই ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার জন্য এনজিওগুলো এগিয়ে না এলে ওই মহাজনদের দাপটে দরিদ্রদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।

আসলে আমাদের মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্র দুর্বল। সরকারও তাই। এখন সরকারি চ্যানেলে ফান্ড বণ্টন করতে গেলে দুর্নীতির কারণে দরিদ্রদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতে পারে। দুর্বল রাষ্ট্র বা সরকার কাঠামো দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে না বলেই পশ্চিমা দেশগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান বা ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করে এ ধরনের এনজিওগুলোকে একভাবে মূল্যায়ন করে।

তাই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হল, ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনও সুযোগ নেই। কারণ গ্রামীণ ব্যাংক দরিদ্র এলাকাগুলোতে কাজ শুরু করার পর থেকে মহাজনরা বিদায় নিয়েছে। এরা একসময় উচ্চসুদে টাকা ধার দিয়ে বিশাল ব্যবসা করেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ। এটা অর্থনীতির দিক থেকে দেখলে খুব বেশি নয়। অবশ্য সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিক প্রফেসন লামিয়া করিম জানিয়েছেন, নানাভাবে জোর-জবরদস্তি করে, হীন সব উপায় প্রয়োগ করে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণের কিস্তি আদায় করা হচ্ছে। নানা সমালোচনা আছে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

আমার বিবেক তবুও বলছে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যাংকের অবদানের কথা অস্বীকার করা যাবে না। সুস্পষ্টভাবেই আমরা গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে নই। কারণ এটা তো আমাদেরই প্রতিষ্ঠান। এখন কীভাবে এই প্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শৃঙ্খলায় এনে এগুলোকে সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী করা যায় এটাই হল আগামীর চ্যালেঞ্জ।

এ কে মনোওয়ারউদ্দিন আহমদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক (ছুটিতে)। বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান। গ্রামীণ ব্যাংক সংক্রান্ত রিভিউ কমিটির প্রধান।

৫৩ প্রতিক্রিয়া -- “গ্রামীণ ব্যাংক, অনিয়ম ও ড. ইউনূস”

  1. Pak

    সুনাম নষ্ট করা উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য অনিয়মের প্রতিকার। আদম (আ:) অনিয়ম করেছিলেন বলে মহান আল্লাহ তাকে জান্নাত থেকে বের করে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন।

    মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহর শেখানো পদ্ধতিতে তারাও বিচার করে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য।

    জবাব
  2. শাওন

    আমাদের দেশে কেউ ক্ষমতা ছাড়তে চান না। না আমাদের নেতারা, না প্রফেসর ইউনূস। আমাদের এখানে কেউ-ই প্রাতিষ্ঠানিকতায় বিশ্বাসী নন। প্রফেসর ইউনূস কেন স্বেচ্ছায় আরও আগেই তার উত্তরসূরী তৈরি করে দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি??????

    ধরা যাক, সরকার তাকে রেখে দিল। কিন্তু কালই যদি হার্ট-অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়- তাহলে গ্রামীণ ব্যাংকের কী হবে?

    পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে তাকান। ওখানে সবাই নিজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে অবসরে যান। বাংলাদেশে সবাই আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকতে চান। কী হাসিনা-খালেদা, কী প্রফেসর ইউনূস….

    জবাব
  3. সনেট

    ধন্যবাদ স্যার আপনার লেখার জন্য। গ্রামীণ ব্যাংক দরিদ্র নারীর কথা বলে যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুঁজির তাঁবেদারি করছে- এই লেখায় এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাদের নিয়ে মার্কিন প্রভুদের মায়াকান্না দেখলে তাই অবাক হই না। ওরা ওদের পুঁজির প্রয়োজনে ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে গিলে খাচ্ছে।

    আমাদের দেশের একটা প্রতিষ্ঠানের এমডি’র পদ নিয়ে এত নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ কি আশু কোনও বিপদের সংকেত ????????????

    জবাব
  4. Shah alam sikder

    গ্রামীণ ব্যাংককে নিয়ে আমার একটা প্রশ্ন। ২৯ বছরে ৩ কোটি টাকা কীভাবে ২৯ হাজার কোটি টাকা হয়? আমি গ্রামে থাকি। তাই আমি দেখেছি ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ গ্রাহকের ক্ষতি হয়েছে। আমি কোনও ব্যাংকের নাম উল্লেখ করব না। তার মধ্যে কিছু লোক ঘর, কিছু লোক বাড়িসহ আরও কিছু বিক্রি করতে বাধ্য হযেছেন। কেউ কেউ তো গ্রামছাড়া হয়েছেন। এ সব ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখেছি।

    অবাক হবেন, গ্রামে ছোট ছোট সুদের ব্যাবসা এখনও টিকে আছে কিস্তির কারণে। এত বিস্তারিত লিখতে হলে অনেক পৃষ্ঠা লাগবে|আমি কয়েকটা গ্রামের এমন ৩৪০ পরিবারে প্রমাণ দিতে পারব।

    তবে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন বলে ডঃ ইউনূসকে সম্মান করা উচিত|

    জবাব
  5. জাহান

    লেখার শুরু আর শেষ কি একরকম হল? শুরু করলেন সমালোচনা দিয়ে, আর শেষ করলেন বন্দনা করে। ভালো বললেন না গাল দিলেন বুঝতে পারলাম না। রাজাকার বা আমেরিকাকে গাল দিলে বাহবা পাওয়া যায়, তাতে তাদের কী হয়?

    আপনি লিখেছেন “একজন নারী গার্মেন্টসে কাজ করলে সেটা তার জীবনেই মৌলিক পরিবর্তন এনে দেবে। ক্ষুদ্রঋণ নয়।” বাহ, বেশ ভালো লিখেছেন। আমেরিকাকে গাল দিবেন আবার গার্মেন্টস না হলে আপনাদের চলবে না! আমেরিকার কাজ না পেলে তো ভিক্ষ্যা করতাম আমরা। সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদি, ফ্যাসিবাদি বলে রাজনীতিবিদরা মুখে ফেনা তোলেন, গাল দিয়ে তৃপ্ত হন, বাহবা পান, ক্ষমতায় যান- জনগণ পায় ঘোড়ার ডিম।

    আমাদের অমুক অহংকার, তমুক অহংকার বলে ক’জন বিদেশি বাংলাদেশকে চিনেছেন? যতজন বিদেশি চেনেন ডঃ ইউনূসের বাংলাদেশকে? ধিক এই অকৃতজ্ঞ বাঙালি জাতিকে।

    যে দেশে জ্ঞানীর কদর নেই সে দেশে জ্ঞানীদের জন্ম নেয়াই পাপ!!!

    জবাব
  6. dr abm Basher

    ড. ইউনূসকে নিয়ে যতই টানাহেঁচড়া করার চেষ্টা করুন, যুক্তিহীন শত লেখার মাধ্যমে যতই আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন না কেন; সত্যটা আমরা ঠিকই জানি এবং বুঝি। সবকিছুরই একটা সীমা আছে। সীমা লঙ্ঘন করলে পরিণতি কখনও-ই ভালো হয় না। তবে হ্যাঁ, আমাদের দেশের বর্তমান সরকারের আগ্রাসী স্বভাবের কারণে বন্ধুহীন এই সময়ে সরকার আপনার মতো ইউনূস-বিরোধীদের কাছে পেলে অথৈ সাগরে খড়ের একখানা টুকরা পাবে। তখন তারা নতুন উদ্দীপনায় ড.ইউনূসের বিরুদ্ধে নবরূপে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। ধৈর্য ধরুন, সময় আর বেশি হাতে নেই। ড. ইউনূসকে অপমান করার ফল অবশ্যই পাবেন।

    জবাব
    • azad sa

      ‌‌‌‌‌‌‌দয়া করে গ্রামীণ মৎস্য ফাউন্ডশনের নামে গরীব মানুষকে নিয়ে ২৫ বছর কী করেছেন মহামান্য ইউনুস সাহেবের সংস্থাটি- তা যে কেউ রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জে গিয়ে খোঁজ করে দেখতে পারেন। আবেগ দিয়ে দুনিয়ার সবকিছু চলে না ভাই।

      জবাব
    • Tanveer

      যারা ডঃ ইউনুস সাহেব সম্পর্কে এত কিছু জানেন তাদের কাছে প্রশ্ন, দেশের স্বার্থর চেয়ে উনার গ্রামীণ ব্যাংকের এম ডি থাকাটা বেশী জরুরী ছিল ? উনি ওনার সমস্ত শক্তি দিয়ে সারা পৃথিবীকে দেশের বিরুদ্ধে নিয়োগ করলেন। এটা কি কোন দেশপ্রেমিক বা জ্ঞানী লোকের কাজ হতে পারে ? যারা ডঃ ইউনুস সাহেবকে নিয়ে বেশী মাতামাতি করছেন তারা কতটুকু জানেন উনার সম্পর্কে ?? অল্প পানির মাছ কিন্তু বেশীই লম্পজম্প করে। উনি উনার নিজের সম্মান নিজেই নষ্ট করেছেন।

      জবাব
  7. Salma Kabir

    জনাব,
    আপনি গ্রামীণ ব্যাংক এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘আরও জনকল্যাণমূলক’ করতে চাচ্ছেন এবং সরকারও তাই চাচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনাদের সবচেয়ে ভালো পরামর্শ দিতে পারেন জনাব মোদাচ্ছর আলী…..

    জবাব
  8. ahmshabib

    আপনাকে দিয়ে যে সরকার তার উদ্দেশ্যটি হাসিল করে নিচ্ছে তা বোধহয় আপনি বুঝতে পারছেন না। অর্থাৎ, আপনি ব্যবহৃত হচ্ছেন। এক জায়গায় বলেছেন, “তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্পষ্ট নই যে, এ সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আসলে কীভাবে গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের উপকার করছে।”

    আবার আপনিই এটিকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে উপসংহার টানলেন। সত্যিই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড!

    জবাব
  9. Anis Sabeth

    গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়। নিশ্চয়ই আপনি জানেন……

    ড. ইউনূসের সঙ্গে কারও তুলনা চলে না….

    জবাব
    • দর্শক

      যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্রদের মস্তিষ্ককে নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে তোলা হয়। ‘মগজ-ধোলাই’ যাকে বলে, সেটি করা হয়। আমি জানি কারণ, আমি তাদের স্কুলের কারিকুলামগুলো দেখেছি। ডক্টর ইউনূসের সামাজিক-উদ্যোক্তা তত্ত্ব ওরা না পড়ালেই বরং আমি আশ্চর্য হতাম। ইউনূসের মতবাদ তাদের দক্ষিণপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল ও পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যার মধ্যে নিউ-লিবারেল পলিসি অন্যতম। সামাজিক-উদ্যোক্তা তত্ত্ব হচ্ছে পুঁজিবাদের অপেক্ষাকৃত একটা সহনীয় প্যাটার্ন। তবে, অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ তাঁর “সামাজিক-উদ্যোক্তা : ডক্টর ইউনূসের নতুন প্রস্তাব” তাত্ত্বিক-গবেষণামূলক প্রবন্ধে ইউনূসের কাছে এর মালিকানা ও অন্যান্য বিষয়ে যে সব তাত্ত্বিক প্রশ্ন ও সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন, ইউনূস সাহেব সে সবের জবাব দিতে পারেননি । তাছাড়া, এ ধরনের ইউটোপীয় প্রচেষ্টার অতীতে বহুবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, সাইমনরা সেগুলো করেছিলেন, কিন্তু সেগুলোর কোনও-টাই টেকেনি।

      আরেকটি কথা, ইউনূস আপনার কাছে দেবতা হতে পারেন, তাই বলে সবাই তাকে দেবতা বা পীর বলে গ্রহণ করবেন, এটা যেন ভুলেও আশা না করেন। ব্যাক্তিপূজা কখনও-ই কোনও সুফল বা কল্যাণ আনেনি, ইতিহাস তার প্রমাণ। আর, কারা ইউনূসকে পীর বানাতে চাচ্ছেন সেটা দেখতে হবে। যারা প্রতিক্রিয়াশীল, শ্রেণি-শোষণের সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে জড়িত, সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণি, বুর্জোয়াভাবধারাচ্ছন্ন, এবং অবশ্যই দক্ষিণপন্থী- ইউনূস তাদের কাছেই পীর। যারা প্রগতিশীল এবং দেশপ্রেমিক তারা একজন সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টকে, ভন্ডকে পীর বানায় না।

      কথায় বলে, রতনে রতন চেনে, ভন্ড চেনে ভন্ড….

      জবাব
  10. মোতাহার

    শুধু একটা কথাযই বলব। স্রোতের উজানে যে মাছটা চলে, সবার আগে তাকেই নজরে পড়ে। আপনার কি রাজনীতিতে নামার ইচ্ছা আছে যে চোখে পড়তে চাচ্ছেন?

    জবাব
    • দর্শক

      বাংলাদেশের একটা প্রজন্মের মস্তিষ্কের মধ্যে রাজনীতির বাইরে আর কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা চলে গেছে। বড় দুটি বুর্জোয়া দলের এক শ্রেণির সমর্থকের মধ্যে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তা ও যুক্তি দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। রাজনীতি আপনাদের মনে হচ্ছে অবসেস্‌ড করে ফেলেছে। রাজনীতির বাইরেও আদর্শ, মেহনতী ও শোষিত শ্রেণিগুলোর জন্য মমত্ববোধ, দেশপ্রেম, শোষণহীন ও কল্যাণভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন, ন্যায়-অন্যায়বোধ, নৈতিকতা বলে একটি জিনিস আছে- যা আজ অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে। ষাটের দশকে যারা রাজনীতি করেছেন, ছাত্র-আন্দোলন করেছিলেন, তারা শুধু রাজনীতির জন্য রাজনীতি করেননি- তাদের রাজনীতিতে আদর্শ ও ন্যায়বোধের ব্যাপার ছিল।

      ধন্যবাদ।

      জবাব
  11. ম্যানিলা নিশি

    আমি মনে করি এই মুহুর্তে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ব্যাংককে আরও গতিশীল, কার্যকর ও সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী করা। আর সে জন্য দ্রুত একজন যোগ্য, দেশপ্রেমিক, প্রতিশ্রুতিশীল ও ডায়নামিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে।
    ===============================================================
    ভয়টা এখানেই,সরকারের দৃষ্টিতে যোগ্য, দেশপ্রেমিক, প্রতিশ্রুতিশীল ও ডায়নামিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা কত দ্রুত একটি ব্যাংককে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যেতে পারে- সোনালী ব্যাংকের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারিই তারই বড় প্রমাণ।

    জবাব
  12. উটপাখি

    ড. ইউনূসকে নিয়ে যতই টানাহেঁচড়া করার চেষ্টা করুন, যুক্তিহীন শত লেখার মাধ্যমে যতই আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন না কেন; সত্যটা আমরা ঠিকই জানি এবং বুঝি। সব কিছুরই একটা সীমা আছে। সীমা লঙ্ঘন করলে পরিণতি কখনও-ই ভালো হয় না। তবে হ্যাঁ, আমাদের দেশের বর্তমান সরকারের আগ্রাসী স্বভাবের কারণে বন্ধুহীন এই সময়ে সরকার আপনার মতো ইউনূস-বিরোধীদের কাছে পেলে অথৈ সাগরে খড়ের একখানা টুকরা পাবে। তখন তারা নতুন উদ্দীপনায় ড.ইউনূসের বিরুদ্ধে নবরূপে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। ধৈর্য ধরুন, সময় আর বেশি হাতে নেই। ড. ইউনূসকে অপমান করার ফল অবশ্যই পাবেন।

    জবাব
  13. হাবীবুর রহমান

    এ লেখা থেকে অনেক তথ্য জানা গেল। ড. ইউনূসের পৈতৃক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা যদি নগণ্য হয় তবে তা নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো। তবে নিবন্ধকার ক্ষুদ্রঋণকে মহাজনী ঋণের স্থলাভিষিক্ত করার প্রসঙ্গটিকে এত ছোট পরিসরে তুলে ধরতে পারেননি। হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠককে তীর্যকভাবে দেখার প্রয়োজন নেই। শুধু ওই বৈঠক শেষে জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে এমনতরো প্রেসব্রিফিং অনেকের ভালো লাগেনি। গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি সুযোগ্য লোকের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তবে সবগুলো কি এমন তা খতিয়ে দেখতে হবে।

    এখন গ্রামীণ ব্যাংক একটা পর্যায়ে এসেছে। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে খুঁজে পেতে ড, ইউনূস সরকারকে সহায়তা করতে পারেন। ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব না নেয়ায় জাতি যেমন তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে- ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তেমনি স্মরণ করবে বাংলার মানুষ।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সুযোগ্য স্বনামধন্য শিক্ষক ড. ইয়াজ উদ্দিীন আহমদকে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান বানিয়ে যে রকম অপ্রধান অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে ড. ইউনূসের বেলায় আমরা কখনও এমনটি কামনা করি না।

    জবাব
  14. Dorshok

    সাংবিধানিক আইনের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে লেখকের বক্তব্য সঠিক যে গ্রামীণ ব্যাংক একটি রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংস্থা। কিন্তু আমি লেখকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি এই পয়েন্টে যে এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। আবার, এটিকে সরল অর্থে বেসরকারি বা ব্যাক্তিমালিকানাধীন সংস্থাও বলা যাবে না। আসলে, আর্থিক কাঠামো ও শেয়ারহোল্ডিংয়ের দিক থেকে এটিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সামাজিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বলা যেতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রেও কিছু সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। যেহেতু, গরীব শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের নীতির কারণে, ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ, লভ্যাংশ-প্রাপ্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

    দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি লেখক উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন তা হল এর ক্ষতিকারক দিক। তিনি লিখেছেন,”…দুর্বল রাষ্ট্র বা সরকার কাঠামো দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে না বলেই পশ্চিমা দেশগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান বা ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে এ ধরনের এনজিওগুলোকে একভাবে মূল্যায়ন করে ।” তাঁর মতো একজন প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে আমি আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও বিশ্লেষণাত্মক মন্তব্য আশা করেছিলাম। সম্ভবত তিনি গ্রামীণ ব্যাংককে নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত বিভিন্ন বিদেশি অর্থনীতিবিদের সমালোচনা ও গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলো পড়েননি। আসলে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে পশ্চিমের বিশেষ করে মার্কিনীদের এত আগ্রহের পেছনের রহস্য বা কারণের কিছু তাদের অর্থনীতিবিদদের লেখা পড়লেই বোঝা যায়।

    সেটি হচ্ছে, এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নিউ-লিবারেল পলিসি প্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক-রাজনৈতিক বিন্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে চায়। এই নিউ-লিবারেল পলিসির মোদ্দা কথাটা হল,অর্থনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে বা রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা এবং কর্পোরেটদের ভূমিকা ও প্রাধান্য বাড়ানো। এর মধ্যে রয়েছে, কৃষিতে সরকারি ভর্তুকি বন্ধ করা, সমবায় সংগঠনগুলোকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা বন্ধ করা ইত্যাদি।

    লেখক তাঁর লেখায় ব্যাংকের যে ক্ষতিকর দিকটি তুলে ধরেননি তা হচ্ছে, এই ব্যাংক গ্রামীণ নামক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি অংশীদারদের (যেমন গ্রামীণ টেলিকম) মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কোটি কোটি টাকার শ্রম-উদ্বৃত্ত বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে এবং তা হচ্ছে সম্পূর্ণ আইনগতভাবে। এর কারণ, পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে আইন তৈরিই হয় দেশি-বিদেশি কর্পোরেট বা পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষার্থে।

    যাহোক, তিনি এড়িয়ে গেছেন যে,ডক্টর ইউনূস কেন মার্কিনীদের কাছে এত প্রিয় ও গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে তাদের এত আগ্রহ কেন সে বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রের বাঘা বাঘা অর্থনীতির পণ্ডিতদের মাথায় আসেনি যে, গ্রামের প্রান্তিক মানুষদেরও শোষণের মাধ্যমে পর্বতপ্রমাণ মুনাফার আওতায় আনা যায়, তাদের মাইক্রোক্রেডিট বিশ্বায়নের আওতায় আনা যায়। আর এখানেই হচ্ছে নিউ-লিবারেল পলিসির ভূমিকা- প্রান্তিক মানুষরা রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হবে কেন? তাদের জন্য দেওয়া রাষ্ট্রের সেফটি নেট বন্ধ করে দেওয়া হোক, ভর্তুকি বন্ধ করা হোক- এ সবই হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, হিলারি প্রমুখদের দাবি। এ কারণেই, ইউনূস ও গ্রামীণে ব্যাংকের এত কদর!!!

    তাছাড়া এই ব্যাংককে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদের দীর্ঘমেয়াদী নকশা-পরিকল্পনা রয়েছে, যা অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি চিফ অব মিশন জর্জ কেনান কর্তৃক প্রণীত “মার্শাল প্ল্যান”এর সঙ্গে তুলনীয়। ওই প্ল্যান “ইউরোপীয় পুনরুদ্ধার কর্মসূচি” নামে বিখ্যাত ছিল। এটি আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক কর্মসূচি হলেও এর ছিল সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক,সামাজিক-রাজনৈতিক, সামরিক ও সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, অর্থনৈতিক কর্মসূচির অন্তর্গত সাহায্য-মঞ্জুরির নামে নানা শর্ত ব্যবহার করে পশ্চিমি ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন প্রভাবিত করা, বামপন্থীদেরকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা, তাদের অর্থনীতিকে মার্কিন সাহায্যনির্ভর করা এবং প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে জনমত ও চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন আনা ইত্যাদি।

    গ্রামীণ ব্যাংককে নিয়ে একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী নকশা রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ বাংলাদেশের রাজনীতির প্যাটার্ন পরিবর্তন করে পুরোপুরি দক্ষিণপন্থী ধারার দুটি রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটাতে চাচ্ছে। এবং সেখানে, ইউনূসের মতো পশ্চিমের প্রতি বিশ্বস্ত কোনও ব্যাক্তিকে বিখ্যাত হওয়ার ব্যবস্থা করে লাইম লাইটে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হবে যাকে দিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে, চট্টগ্রাম বন্দরকে মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার কাছে ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা, সেন্টমার্টিনে ঘাঁটি ইত্যাদি রয়েছে। তারা ইউনূসকে দিয়ে এগুলো করানোর আশা করেছিল, তবে কিছুটা হতাশ হয়েছে। এখনও আশা ছেড়েছে বলে মনে হয় না।

    জবাব
    • Dr. Abdul Moyeen

      আপনার বিশ্লেষণটি অত্যন্ত উন্নতমানের হয়েছে, বিশেষত মার্কিনিদের সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনা। আমার বুঝতে পারি, বাংলাদেশ, এ দেশের গ্রামের দরিদ্র মহিলা, ও গ্রামীণ ব্যাংক – এগুলোর কোনওটিই মার্কিনিদের জন্য কোনও চিন্তার বিষয় নয়। হবেই বা কেন? অনেকে ভাবেন ওরা আমাদের বন্ধু। আসলে একমাত্র ইসরাইল ছাড়া আমেরিকানদের কোনও স্থায়ী বন্ধু নেই। ওরা সেখানে তৎপর যেখানে ওদের স্বার্থ জড়িত।

      জবাব
  15. Khati Bangali

    ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ যে অবস্থানে রয়েছেন সেখানে থেকে দুর্নীতি, অনিয়ম বা মিথ্যাচার করার কোনও প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর সঙ্গে ঈর্ষাপরায়ণতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা করে কখনও-ই লাভবান হতে পারবেন না। তাঁর মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে গিয়ে শুধু আপনাদের মানসিক দৈন্যতাই প্রকাশ পাচ্ছে।

    জবাব
  16. Dr. Abdul Moyeen

    ডক্টর ইউনুছ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তি। কিন্তু উনার যে বিষয়টি আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়েছে তা হল, কীভাবে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান উনি নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। উনার অবর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে চলবে সে ধরনের কোনও “succession plan” উনি করেননি। উনি এমন কোনও ব্যক্তিকে পরিচালনা পর্ষদে রাখেননি যারা এমনকী গুছিয়ে কথা বলতে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্যের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম।

    পৃথিবীর এমন কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার কোনও অধ্যাপক অথবা নামকরা প্রতিষ্ঠানের কোনও ব্যবস্থাপক এই ধরনের ব্যবস্থাপনাকে স্বাগত জানাবেন না। যে পরিচালকেরা আছেন তারা শুধু রাবার স্টাম্পের মতো সিল মারার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।

    হিলারি ক্লিনটনের নিজের দেশে এ ধরনের প্রাকটিসের জন্য কোম্পানির ব্যবস্থাপকদের জেলে যেতে হয়।

    জবাব
  17. md. manzurul

    এটাই প্রমাণ করে যে এখানে কোনও না কোনও অনিয়ম হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ এখানেই। এরপর মিডিয়াতে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে আরও লেখালেখি হতে থাকে। তাতে একটি বিষয় উঠে আসে- ড. ইউনুসের পৈতৃক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজেস কর্পোরেশনের সঙ্গেও গ্রামীণ ব্যাংকের একটি সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগ উঠে, ড. ইউনূস সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা পারিবরিক স্বার্থে গ্রামীণ ব্যাংককে ব্যবহার করেছেন।

    স্যার, আপনি রিভিউ কমিটির প্রধান। পর্যবেক্ষণ করে আপনি দেখেছেন গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ৩০ থেকে ৩৫ পার্সেন্ট। বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করে বললে ভালো হত না???

    জবাব
  18. taher

    আপনারা আছেন তাই আমরা আছি। আবার আমরা আছি তাই আপনারাও আছেন। বুঝতে কষ্ট হয় কতভাবে টেনেটুনে জোড়া লাগাতে চেয়েছেন…

    জবাব
  19. Asif Sardar

    ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টের জন্য লেখককে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া উচিত।

    জবাব
      • হিডেন

        আমিও একমত। একজন গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন বলে শান্তিতে নোবেল পেয়ে থাকলে, একটি লেখা পড়ে পাঠক অনেক শান্তি পেয়ে থাকলে তার জন্য নোবেল নয় কেন?

      • rakib

        আপনাদের সঙ্গে একমত পোষণ করছি না। লেখকের প্রতি নোবেল কমিটির সুনজর কামনা করছি।

  20. sabbir

    স্যার, আপনাকে প্রশ্ন করছি। আপনি কি মনে করেন ড. ইউনূস দুর্নীতিপরায়ণ লোক? তা-ই যদি হয় তবে এর আগে আপনি আমাদের কথাটা বললেন না কেন? নোবেল কমিটি কি এতই বোকা যে তারা একজন দুর্নীতিপরায়ণ লোককে নোবেল পুরষ্কার দেবে? এ দেশে শিক্ষিত লোকেদের অনেকেই দেশের জন্য কোনও অবদান রাখেন না, ড. ইউনূস রেখেছেন, এটাই কি তাঁকে নিযে আপত্তির কারণ???

    জবাব
    • সত্যসন্ধানী

      আপনি প্রশ্ন করেছেন, “নোবেল কমিটি কি এতই বোকা যে তারা একজন দুর্নীতিপরায়ণ লোককে নোবেল পুরস্কার দেবে?” আপনার প্রশ্নের উত্তর লেখকের হয়ে আমি দিচ্ছি….

      আপনি নোবেল কমিটি সম্পর্কে, তাদের ইতিহাস, গঠন-কাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে কতখানি জানেন? জানলে বুঝতেন যে, তারা নিজেদের কায়েমী স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দ্বারা প্রভাবান্বিত হয় কিনা। তারা তুলনামূলকভাবে একজন বিখ্যাত এবং মোটামুটি কম-বিতর্কিত সুশীল ব্যাক্তিত্বকে বেছে নেয় নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে।

      আমি একটি লেখায় হাত দিয়েছি যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে, নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ব্যাবহার করে এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের নামে দেশে-দেশে সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে রেজিম চেঞ্জের জন্য নোবেল কমিটিকে, শান্তি পুরস্কারকে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে ব্যবহার করে এসেছে; মনস্তাত্ত্বিক ওয়ারফেয়ার চালিয়েছে, পুরস্কারটিকে টুল হিসেবে ব্যবহার করে কত ধরনের নকশা ও এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায় সে সব নিয়ে। কোনও কল্পনা নয়- একেবারে রেফারেন্স ও তথ্যপ্রমাণসহ। লেখাটি শেষ হতে আরও এক মাসের মতো লাগতে পারে। ইচ্ছে আছে, এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করব। এটি একটি একাডেমিক ধরনের (গবেষণা) প্রবন্ধ।

      জবাব
  21. Ram Chandra Das

    ধন্যবাদ লেখককে সময়োপযেগী লেখার জন্য। তবে মালিকানার জায়গাটি আরও পরিস্কার করলে ভালো হত। প্রতি সদস্য ১টি শেয়ার ১০০ টাকা দিয়ে প্রতীকী শেয়ার কিনে প্রতীকী মালিকানার বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। এছাড়া সহযোগী সংগঠেনগুলোর লাভের মালিকানার বিষয়টি আরও বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। মালিক হিসেবে সদস্যরা চলে যাওয়ার সময় কী পরিমাণ লাভ পাওয়া উচিত?

    জবাব
    • Prince

      সরি, প্রফেসর মনোয়ারউদ্দিন। আপনি বলছেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আর গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি সরকারি এমপ্লয়ি। ড. ইউনূস তো নিশ্চয়ই গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরির জন্য দরখাস্ত করেননি। ইন্টারভিই বোর্ডও ফেস করেননি।

      তাই না???

      জবাব
  22. abdur rahman

    বাংলাদেশের সীমানায় সরকারি-বেসরকারি যে কোনও প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে গেলে আইনের অধীনেই করতে হবে। আইনি কাঠামো ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। যাহোক, কোনও ব্যবসায়িক উদ্যোগের মালিকানা এর শেয়ারের কাঠামোর মাধ্যমে ঠিক করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু শেয়ার রয়েছে, যেভাবে আইএফআইসি বা এবি ব্যাংকে রয়েছে। এগলো বেসরকারি বাংক। গ্রামীণ ব্যাংকও তাই। এভাবেই আমরা জানি। বেসরকারি ব্যাংকগুলো গ্রামের অতি-দরিদ্রদের জন্য সামাজিক ইস্যুতে কাজ করছে না, গ্রামীণ ব্যাংক যেটা করছে।

    তাই আসুন, গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা নিয়ে বিতর্কটা তুলে রাখি। এই বাংকটি যেহেতু জাতির সেবা করছে তাই এর দক্ষতা বাড়ানোর জন্যই কাজ শুরু করি।

    সোনালী ব্যাংকের কেলেংকারির পর এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, ড. ইউনূস যেভাবে ব্যাংকিং ব্যবসায় সফলতা দেখিয়েছেন সেখানে সরকার কতটা ব্যর্থ। তাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা এটাই যে সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে নিয়ে ভাববেন না। তার চেয়ে বরং সোনালী ব্যাংকের দিকে মনোযোগ দিন যেখান থেকে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।

    সরকারই একমাত্র অথরিটি যার হাতে রয়েছে ব্যাপক কর্তৃত্ব। তাই শুধু সরকারি কেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠঅনেও সরকার হস্তক্ষেপা করতে পারেন। তবে যত কম করবেন ততই ভালো।

    মহান দার্শনিক ইবনে খলদুন বলেছিলেন, সরকারের উচিত নয় ব্যবসায়ে হস্তক্ষেপ করা। সরকারের দায়িত্ব হল কর সংগ্রহ করে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। আর নাগরিকদের ভালোর জন্য কাজ করা। এ পর্যন্ত সরকারের কাজ সম্পর্কে যত পরামর্শ পাওয়া গেছে তার মধ্যে এটাই সেরা।

    জবাব
    • সত্যসন্ধানী

      ইবনে খালদুন যে সময়ের মানুষ ছিলেন, সে সময় সামাজিক-অর্থনৈতিক বিন্যাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন এমনকী শিল্প-বিপ্লবও হয়নি। পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন ঘটেনি। এ সব অনেক পরে হয়েছে। ব্যবসায়ে সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে কিনা এটা একটা আপেক্ষিক প্রশ্ন যা ঐতিহাসিক পটভূমি, প্রশ্নাধীন দেশের শিল্প-ব্যবসার কীভাবে বিকাশ ঘটেছে, সেগুলো পুঁজির আদি লুন্ঠনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে কিনা এ সব প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। এটা আসলে যার যার অর্থনৈতিক দর্শন, নীতি বা মতবাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর প্রশ্ন।

      আপনি যদি মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণকে সমর্থন করেন তাহলে ব্যাক্তিগত ব্যবসায়ের নামে, মুনাফার নামে, গণতন্ত্রের নামে শ্রেণি-শোষণের অবাধ স্বাধীনতাকেসমর্থন করবেন। তবে, সরকারিকরণ বা রাষ্ট্রীয়-মালিকানা যে সমাধান নয়, এতে আমলাতান্ত্রিকতার কারণে দক্ষভাবে, লাভজনকভাবে ও গতিশীলতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান চালানো যায় না সেটি সব দেশেই মোটামুটি স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি কোনও সমাধান নয়। আবার ব্যাক্তি-মালিকের অধীনে মুনাফার মাধ্যমে ব্যাক্তির যে ভোগের ব্যবস্থা করা হয়, তাতে সমাজের তেমন কোনও উপকার হয় না। তাই আজ নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। ইউরোপীয়, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে। লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের অর্থনীতিবিদ এবং নব্য-মার্ক্সবাদীরা রাষ্ট্রীয় ও ব্যাক্তি-মালিকানার বিকল্প হিসেবে নানা ধরনের সামাজিক-মালিকানার প্রস্তাব করছেন ।

      লক্ষ্যণীয়,রাষ্ট্রীয়-মালিকানা এবং সামাজিক-মালিকানা কিন্তু এক জিনিস নয়। রাষ্ট্রীয়-মালিকানায় আমলাতান্ত্রিকতা একটি বড় বৈশিষ্ট্য। গ্রামীণ ব্যাংক এক ধরনের বিশেষায়িত সামাজিক-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হতে পারত। কিন্তু, প্রকৃত প্রস্তাবে এটি কোনও ক্যাটাগরির মধ্যেই পড়ে না বলে আমি মনে করি। তবে গ্রামে-গঞ্জে যে সব সমবায় বা কো-অপারেটিভ রয়েছে, সেগুলোকে সামাজিক-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বলা যেতে পারে। সেগুলোতে অনেকটা গণতান্ত্রিকভাবেই সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা গৃহীত হয়।

      জবাব
      • সত্যসন্ধানী

        আপনি লিখেছেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেহেতু গ্রামের অতি-দরিদ্রদের নিয়ে সামাজিক ইস্যুতে কাজ করছে না, গ্রামীণ ব্যাংক করছে- তাই আপনার মতে, গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা নিয়ে বিতর্কটা তুলে রাখতে। বরং উল্টো। আপনার দেওয়া যুক্তির কারণেই (অর্থাৎ, যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি গরীব মানুষদের নিয়ে কাজ করছে- তার ফলাফল কতখানি নেতিবাচক ও কতখানি ইতিবাচক বা পজিটিভ তা অবশ্য একাডেমিক বিতর্কসাপেক্ষ) প্রতিষ্ঠনটি নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা, গবেষণা ইত্যাদি হওয়া দরকার এবং তা নির্মোহভাবে, রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতা দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে নয়। যত বেশি বিতর্ক এবং একাডেমিক আলোচনা হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে, ততই প্রতিষ্ঠানটি বিকশিত হবে। প্রতিষ্ঠানটির এবং গরীব মানুষের কল্যাণের জন্যই এ ধরনের বিতর্কের প্রয়োজন রয়েছে। আলোচনা-সমালোচনা না থাকলে বিকাশের, সংশোধনের এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনের রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের সহনশীল হতে শিখতে হবে।

        আসলে আমাদের মধ্যে এ জিনিসটির এখনও অভাব যা পাশ্চাত্যে এবং লাতিন আমেরিকায় রয়েছে। কিন্তু, গ্রামীন ব্যাংকের মালিকানার বিতর্কটা আপনি তুলে রাখতে চান কেন? তাহলে কি বুঝব যে এখানে কায়েমী স্বার্থের ব্যাপার রয়েছে? আমি দুঃখিত যে আপনাদের চিন্তাধারা শ্রেণি-পরিচয়ের উর্ধ্ব উঠতে পারেনি। শ্রেণি-চেতনা, শ্রেণি-মানসিকতা বা বুর্জোয়া-ভাবধারা আপনাদের চিন্তাকে অবচেতনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে এটা আপনার বক্তব্যে স্পষ্ট। গ্রামের প্রান্তিক মানুষ আপনাদের কাছে কোনও করুণা চান না। গ্রামীন ব্যাংকের মালিকানার ইস্যুটি তাদের একটি মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন। উদ্বৃত্ত-মূল্য ও উদ্বৃত্ত-শ্রমের মাধ্যমে, (দিনে প্রায় আঠারো ঘন্টা অমানুষিক পরিশ্রম) তারা এই অধিকারটি অর্জন করছেন। এটি সামাজিক-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ার জন্য ঐতিহাসিক বিচারেই দাবীদার। যদি না হয় তবে বুঝতে হবে এখানে আদিম সঞ্চয়নের মাধ্যমে আদিম লুন্ঠন চলছে।

        আর, সোনালী ব্যাংক সম্পর্কে আপনার বক্তব্য আমি সমর্থন করি। আমাদের মতো দেশগুলোতে যেখানে মুক্তবাজার অর্থনীতি চলছে, আইনের শাসন মজবুত নয়, বুর্জোয়া দলগুলো ক্ষমতায় থাকে এবং ব্যবসায়ীরা পার্লামেন্টে প্রাধান্য বিস্তার করে- সেক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বুর্জোয়া দলের লোকরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে হরিলুট করে- যাকে এম এম আকাশ তাঁর লেখায় ‘আদিম সঞ্চয়ন’ আখ্যা দিয়েছেন।

        পক্ষান্তরে, আমরা যদি নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখি- গ্রামীণ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান গ্রামাঞ্চল থেকে ফি-বছর হাজার কোটি টাকার শ্রম-উদ্বৃত্ত্ব বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে সেটিও দেশের জন্য কম ক্ষতিকর নয় এবং সোনালী ব্যাংকের ঘটনার মতোই ক্ষতিকর। অনেকটা সোনালী ব্যাংকের মতো ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটেছে- অনেক ব্যাংক ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক্রাপ্‌সি করেছে। এটা পুঁজিবাদী ও বাজার-অর্থনীতির সমস্যা।

        যেটা দরকার, তা হচ্ছ সরকারি ব্যাংকগুলোতে অব্যাহত সংস্কার চালানো, মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা, সরকারি ব্যাংকগুলোতে দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগ বন্ধের জন্য আইন সংশোধন এবং সেগুলোকে চুক্তিভিত্তিতে নির্দিষ্ট কালপর্বের জন্য দক্ষ ব্যাক্তি উদ্যোক্তা বা কোনও দক্ষ-অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের কাছে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেওয়া। যেখানে শর্ত থাকবে যে ক্ষুদ্র-শিল্প, কৃষিতে ভর্তুকি প্রভৃতিতে বিনিয়োগে ঋণসাহায্যের সরকারি নীতি থেকে প্রতিষ্ঠান সরে যাবে না- যা সাম্রাজ্যবাদীদের নিউ-লিবারেল পলিসি। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে সাম্রাজ্যবাদীদের অতি-আগ্রহের পেছনের একটা কারণ হচ্ছে এ সব ভর্তুকি ও প্রণোদনা বন্ধ করা, রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকাকে সংকুচিত করা ।

  23. rajib

    অত্যন্ত কৌতূহল-উদ্দীপক লেখা। কয়েকটা খটকা যদি দূর করতেন, উপকৃত হতাম।

    “ড. ইউনুসের পৈতৃক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজেস কর্পোরেশনের সঙ্গেও গ্রামীণ ব্যাংকের একটি সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগ উঠে, ড. ইউনূস সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বা পারিবরিক স্বার্থে গ্রামীণ ব্যাংককে ব্যবহার করেছেন।”
    এই অভিযোগটা প্রথম থেকেই শুনছি। কিন্তু কেউ স্পেসিফিকেলি বলে না, এই অনিয়মের মাধ্যমে ইউনূসের পরিবার কী পরিমাণ লাভবান হয়েছে? ধরেন, অন্য প্রেস ৫ টাকায় ছাপাত, ইউনূস সাহেবের প্রেস ৫০ টাকা নিয়া নিয়েছে- এই ব্যাপারটা কেউ ক্লিয়ার করেন না প্লিজ।

    “এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্যাপিটাল স্ট্রাকচার যা-ই হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। এমনকী বরোয়ারদের শতভাগ মালিক হলেও। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ অর্থের জোগানদাতা সরকার, বাকি ১০ শতাংশ বিশ্বদ্যিালয় নিজে জোগার করে। উল্টোটা যদি হত, তাহলে? সে ক্ষেত্রেও এটি রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সংস্থা থাকবে, এর মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।”- তাই নাকি? এ রকম দুই-একটা প্রতিষ্ঠানের নাম যদি জানাতেন কৃতজ্ঞ থাকতাম।

    “তখন কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল”- এটা আপনি কেমন করে জানলেন? কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের লোকজন আপনাকে বলেছে? না আপনার অনুমান?

    “গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচিত ৮০ লাখ দরিদ্র নারী শেয়ারহোল্ডার তাদের ব্যবস্থাপক নিয়োগ দেবেন। আসলে এরা কি নির্বাচিত? এরা তো তেমন শিক্ষিতও নন যে একটি সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।”- এটা হল লাখ কথার এক কথা। অশিক্ষিত লোকজনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কম। আগামী ইলেকশনে কি শিক্ষাগত যোগ্যতা পরীক্ষা করে ভোট নেয়া উচিত না। কী বলেন স্যার?

    “বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হল, এর কারণ কী? হিলারি ক্লিনটন এ দেশে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভাটি করেছেন ড. ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে। তার মানে কী? একসময় গ্রামের মহাজনরা যে ব্যবসা করতেন সেটা এখন এরা করছেন। ক্ষুদ্রঋণও একটি ব্যবসা।”- আপনেরা ২০১১ সাল থেকে রিভিউ করে এই প্রশ্নের জবাব বের করতে পারলেন না? আমি হতাশ।

    “রিভিউ কমিটি আরেকটি বিষয় জানতে পেরেছে। তা হল, আজ যে ঘটনাগুলো জনসমক্ষে আসছে, সে সব বিষয় প্রায় এক যুগ আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক তদানীন্তন সরকারের নজরে এনেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ইন্সপেকশন টিম গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যাবলী অডিট করে। এখন যে সব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে তার বেশিরভাগই অডিট রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছিল। আমরা জানতে পেরেছি যে, অডিট রিপোর্টটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আলোচনা হয়েছিল। সে আলোচনায় অর্থসচিব, ব্যাংকিং ডিভিশনের সচিবসহ দায়িদ্বশীল অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। কী কারণে তখন এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি সেটা একটা প্রশ্ন বটে। এটা খুব দু:খজনক।” এই দু:খজনক প্রশ্নের জবাবটা আসি দিই। এর আগে তো ইউনূস ভাই রাজণীতিতে নামেননি। সুতরাং প্যাঁচেও পড়েননি।

    জবাব
      • mehedi

        এই হার নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অন্যদের মতো নিরবতা অবলম্বন না করে নিজেরাই প্রকাশ্য বক্তব্য দিয়েছে। কাজেই মন্তব্যকারীর কাছে তা জানতে চাওয়া কি উচিত? আর বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরা তার প্রতিবাদ করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে না। বরং সেই পুরনো গানই শোনানো হচ্ছে।

  24. rasel

    সমালোচনা আপনারা করবেনই। কারও গুণের কদর করতে পারেন না ঠিক আছে, তাঁর সম্মান নিয়ে টানাটানি করবেন না প্লিজ….

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—