বেবী মওদুদ

জাকাত ও ফিতরা দারিদ্র দূরীকরণে ব্যবহার হোক

আগস্ট ১৮, ২০১২

Babymoudud-f1পত্রিকায় খবর হয়ে এসেছে- ‘তিন নারী জাকাতের শাড়ি নিতে এসে পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন।’ বড় মর্মান্তিক খবর। তারা যে দরিদ্র এবং মধ্য বয়সী ছবি দেখে বোঝা যায়। হয়তো বা অসহায় ছিলেন। সারা বছর একজন মানুষ যেমন প্রতিদিন দুই বেলা খেয়ে বেঁচে থাকেন, তেমনি পরনের কাপড় হিসেবে শাড়ি, ব্লাউজ-পেটিকোট লাগে তিন-চার সেট। ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহ করে থাকে যারা তাদের এটা লাগে। অবশ্যই লাগে। কীভাবে পাবে বা কোথায় পাবে এ দুশ্চিন্তা তাদের থাকে। লক্ষ্য থাকে ঈদ উপলক্ষে যাকাতের কাপড় সংগ্রহে। পদপিষ্ট হয়ে মৃত চার নারী হলেন- ১। জরিনা বেগম, ২। সাদিয়া আখতার ময়না, ৩। সাহারা খাতুন এবং ৪। হেলেনা আখতার। অসহায়ত্বের কারণে এই শাড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। এই মৃত্যু মেনে নেয়া বড় বেদনাদায়ক। তাদের সংসারে ঈদের আনন্দ বলে আর কিছু থাকলো না। ঈদে নতুন শাড়ি পরার স্বপ্ন নিয়েই তারা বিদায় নিলেন।

প্রতিবছরই আমরা এমন মৃত্যুর সংবাদ পাঠ করি। যাকাতের শাড়ি বা লুঙ্গি বিতরণকালে এভাবে অনেক মৃত্যুর খবর আমরা পাই। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবার পথে লঞ্চডুবিতে বা বাস দুর্ঘটনার খবরও বড় বড় করে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এমন অকালমৃত্যু কখনো কারো কাম্য হতে পারে না। আমরা মনে করি, এই মৃত্যু বন্ধ করতে হলে মৃত্যুফাঁদ কেন তৈরি হচ্ছে সেটা দেখতে হবে এবং কঠোর আইন তৈরি করতে হবে। যাকাত ও ফেতরা দেবার কথা তো ধর্মেই উল্লেখ করা আছে। সেটা হিসাব করে ব্যবসায়ী, ধনী ও স্বচ্ছল ব্যক্তিরা এসব প্রদান করে থাকেন। কিন্তু সবই হচ্ছে বিচ্ছিন্ন বা ছিটেফোটাভাবে। কোথাও কোনো সমন্বয় নেই। নিজেকে দানশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কেউ কেউ ঢাকঢোল পিটিয়ে যাকাত দান করে থাকেন। আর এই অভাবের দেশে হত দরিদ্র ও নিম্নবিত্তরা গিয়ে ভিড় জমান। ফলে উপস্থিত মানুষের সংখ্যার চাইতে অনেক কম সামগ্রী থাকায় একটা হৈ চৈ হয়ে যায়। ফলে ভিড়ের চাপ ও বিশৃঙ্খলার কারণে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর কারণ ঘটে যায়। যারা দান খয়রাত করে থাকেন, তাদের কাছে এমন মৃত্যু নিয়ে মাথাব্যথা আছে কি? হলে নিশ্চয়ই তারা একটি মৃত্যুও ঘটতে দিতেন না। মাথাব্যথা হয় না বলেই প্রতিবছর তারা এসব ছিটেফোটা দান খয়রাত করে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। আমি মনে করি, এমন মৃত্যুর জন্য এরাই অপরাধী- এদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। ধর্মে তো বলা আছে, এমনভাবে এক হাতে দান করবে যেন তোমার আরেক হাত জানতে না পারে। এছাড়া দান করার সময় প্রথমে আত্মীয়স্বজন, তারপর পাড়া প্রতিবেশী এবং সবশেষে অন্যদের কথা ভাবতে হবে। আমরা এর কোনোটিই গ্রহণ করি না। প্রকাশ্যে লক্ষ জনতার সামনে নিজেকে দানবীর হিসেবে পরিচিত করতে প্রতিযোগিতায় নামি। কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ে এই ধরনের দানবীর হওয়ার মধ্যে কী মাহাত্ম থাকতে পারে আমি বুঝি না। তারা যদি সত্যি গরীবের বন্ধু হতে চান, সমাজের সেবা করতে চান, দেশ ও জাতির উন্নয়নে বিশেষভাবে অবদান রাখতে চান- তাদের প্রতি আমার একটি আবেদন আছে। এভাবে ছিটেফোঁটা দান খয়রাত করে আপনি কোনোভাবেই দানশীল হতে পারবেন না। তারচেয়ে আপনার এলাকার দরিদ্র এবং ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলুন। তাদের ঘর দিন, কাজ দিন, শিক্ষা দিন- এভাবে যদি আপনার এলাকা থেকে দারিদ্র্য নিরক্ষরতা, কূপমণ্ডুকতা, অভাব-অনটন দূর করতে পারেন তাহলে তো আপনি শুধু দানবীর কেন আমার মনে হয় মহামনব হিসেবে পূজনীয় হবেন। আপনার এলাকার স্বচ্ছল ও ধনী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে এ প্রচেষ্টা নিয়ে সবার জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারেন। যাকাত বা ফিতরার টাকা এভাবে ছিটেফোঁটা দান না করে প্রতিবছর একজন বা কয়েকজন দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ নেয়াটা আরো বেশি কৃতিত্বের কাজ। ইহলোক ও পরলোক উভয় লোকেই আপনি আলোকিত হয়ে থাকবেন।

সরকারের কাছে আমরা দাবি করতে পারি, জাতীয়ভাবে যাকাত ফান্ডকে কার্যকর করা হোক। শুধুমাত্র আমলাদের ফাইলবন্দি না রেখে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। সেইসঙ্গে এই ফান্ডে যাকাত ও ফেতরার টাকা বাধ্যতামূলকভাবে প্রদানের জন্য জনগণকে বাধ্য করতে হবে। এই অর্থ দ্বারা দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঘর কাজের ব্যবস্থা করে দিলে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণের একটা প্রচেষ্টা নেয়া যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে এভাবে দারিদ্র্য দূর করার কথা শোনা যায়। তারা পারলে আমরা পারব না কেন? এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে অতীতে এতিমদের ফান্ডের টাকা লুটপাট করা হয়েছে। যাকাত ফান্ডের টাকাও কি হবে? হ্যাঁ, সে সম্ভাবনাও থাকতে পারে, আবার নাও পারে। তবে যারা এই লুটপাট করবে তাদের অপরাধের শাস্তি যদি মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর করা যায়, সেরকম আইন প্রণয়ন করতে হবে। গরীবের টাকা যারা খায়, তারা তো শোষক, গরীবের শত্রু। তাদের ধ্বংস করা কোনো পাপ বলে অন্তত আমি মনে করি না।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে কার্যকর করা হলে দেশ থেকে দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, ভিক্ষাবৃত্তি এবং নির্যাতন অবশ্যই দূর করা যাবে। এভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে দানবীর হবার জন্য যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে যাকাত দিয়ে থাকেন তাদের উৎপাতও বন্ধ হবে। মানুষের জীবন নিয়ে খেলার অধিকার কোনো ধর্মে স্বীকৃত নয়।

১৭/৮/২০০১২
ঢাকা

বেবী মওদুদ: লেখক ও সাংবাদিক।

Tags:

WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
| | More
 -------------------------------------------------------------------------
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর নিজস্ব। bdnews24.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bdnews24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)

-------------------------------------------------------------------------

৫ প্রতিক্রিয়া - “ জাকাত ও ফিতরা দারিদ্র দূরীকরণে ব্যবহার হোক ”

  1. নাজমুল হক on আগস্ট ২০, ২০১২ at ১:২০ পুর্বাহ্ন

    ইসলামে বাড়ি বাড়ি গিয়েই যাকাত প্রদান করতে বলা হয়েছে। যাকাত প্রদান অনুগ্রহ নয়, বরং এটা গরীবের প্রাপ্য হক (অধিকার)।

  2. mehedi on আগস্ট ১৯, ২০১২ at ১০:২১ অপরাহ্ণ

    লেখাটির সঙ্গে মোটামুটি একমত পোষণ করছি। তবে কিছু বিষয় আরও পরিষ্কার করে উল্লেখ করলে ভালো হত। জাকাত ও ফিতরা ইসলামী বিধান। ইসলামী আইন অনুযায়ী জাকাত ও ফিতরা প্রদান করা সামর্থবান প্রতিটি মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক। আমাদের দেশে সাধারনত স্বপ্রণোদিত হয়ে এই বিধান পালন করা হয়। কিন্তু, ইসলামী সমাজব্যবস্থায় এটি আদায় ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের কোনও সামর্থবান নাগরিকই এটি এড়িয়ে যেতে পারবে না এবং সেটি নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। কাজেই আমাদের দেশে এটি কতটুকু কার্যকর হবে তা অবশ্যই ভাবার বিষয়।

    তাছাড়া, যারা যাকাত ও ফিতরা দিয়ে থাকেন (দু’একজন স্বনামধন্য ব্যাক্তি বাদে), তারা অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন যে, তারা যে জাকাত ও ফিতরা দিবেন তা অবশ্যই সঠিক ব্যাক্তির দ্বারা সঠিক ব্যাক্তির হাতে পৌছানো ছাড়া তার এই ধর্মীয় বিধানটি পালন হবে না। যদি এমন করা হয় তা হলে তা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে প্রদান করা হবে না, বরং তা এক ধরনের ট্যাক্স হিসেবে গণ্য হবে। ট্যাক্সের সঙ্গে ফাঁকিবাজির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আগে, অবশ্যই আদায়কারী ও বাস্তবায়নকারী ব্যাক্তিবর্গের সততা, সত্যনিষ্ঠতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু সর্বস্তরে দুর্নীতিগ্রস্ত বর্তমান সরকারের দ্বারা তা কীভাবে সম্ভব সেটাই আগে নির্ধারণ করা দরকার।

  3. Noman on আগস্ট ১৯, ২০১২ at ১০:৩৬ পুর্বাহ্ন

    এখানে যে দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে আমি তাকে সমর্থন করি। জাকাত ইসলামের আরও ক’টি স্তম্ভের মতোই একটি। এটি যেমন ব্যক্তির জন্য বাধ্যতামূলক, তেমন এর একটি সামাজিক দিকও রয়েছে। দারিদ্র দূর করার জন্যই জাকাত চালু করা হয়েছে। তাই সরকারের উচিত জাকাত প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করা।

    পাশাপাশি. ধনীদের জন্য জাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করা উচিত। লেখক এখানে সেটাই বলতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে দারিদ্র দূরীকরণে জাকাত একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

  4. Mohammad Mohiuddin on আগস্ট ১৯, ২০১২ at ৪:০১ পুর্বাহ্ন

    যথার্থ বলেছেন……

  5. মিন্টু on আগস্ট ১৯, ২০১২ at ১:৫৩ পুর্বাহ্ন

    এই দায়িত্ব কার? যারা নাম জাহির করার জন্য দান করে তাদের শাস্তি হওয়া দরকার আগে…..।

মন্তব্য করুন

প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes

ফেসবুক লিংক

ট্যাগ

আর্কাইভ