Feature Img

nurulhuda-f121না, পূর্ণ হলো না এমনকি একটি বছর;
হুমায়ূন, তুমি আবার বেলভ্যূ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা-কেন্দ্রে।
কেন এমন হলো? কেন এমন হবে?
না, আমরা মানি না; আমরা মানতে পারি না
এমন অশুভ সংবাদ।

এইতো সেদিন তুমি ফিরে এসেছিলে জননী ও জন্মভূমির কাছে।
তোমার সাধের নুহাশপল্লীতে। ফিরে যাবার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে পূর্ণ আরোগ্যের। তারপর ফিরে আসার । রক্ষিত হোক সেই প্রতিশ্রুতি।
ফিরে এসো হুমায়ূন,
ফিরে এসো হৃদয়ে সবার।

তোমার ভুবনখ্যাত চিকিৎসকদল, যারা তোমার দেহে পর্যায়ক্রমে বারোটি ক্যামোথেরাপি দিয়েছে, তারপর সফল অপারেশন শেষে তোমার শরীর থেকে নির্বংশ করেছে ক্যান্সার, তারাও বিব্রত, হতচকিত। ডাক্তার জেইন ও সার্জন মিলার, তারাও কি আক্রান্ত এক অনতিক্রম্য বিপন্ন বিস্ময়ে?

শুনেছি, সনাক্ত করা যাচ্ছে না এমন এক ভাইরাস আক্রমণ করেছে তোমাকে। আর তাকে মোকাবেলা করার নিদান নাকি জানা নেই জগতের দক্ষতম চিকিৎসকদলেরও। অজানা অদেখা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা কার পক্ষেই-বা সম্ভব, বলো?
তবে কি পুঁচকে এক পাষ- ভাইরাসই জয়ী হবে? তবে কি পরাজিত হবে একবিংশ শতাব্দীর শাণিত ও প্রাণিত চিকিৎসাবিজ্ঞান? তবে কি ব্যর্থ হবে কোটি কোটি মানবাত্মার অবিচ্ছিন্ন শুভকামনা? তবে কি হার মানবে মানবসভ্যতার তাবৎ আরোগ্যকারীর পুঞ্জীভূত প্রজ্ঞা-সার?

সাধারণ মানুষ আমরা। আমরা অতো সব বুঝি না।
আমরা বুঝি, অন্য কিছু হতে পারে না।

হার মানতে রাজি নয় তোমার চিকিৎসকরা কেউ; হার মানতে রাজি নই আমরা কেউ; আমরা যারা জগৎব্যাপী বাংলাভাষাভাষী; আমরা যারা দেশে-দেশে বিশ্ববাঙালি; আমরা যারা ধর্ম, বর্ণ ভাষা ও ভালোবাসা নির্বিশেষে সৃষ্টিশীলতার অবিনশ্বরতায় বিশ্বাসী।
Humayun-m
হুমায়ুন, তুমি হয়তো আমার মতো কারো-কারো ব্যক্তি-বন্ধু।
হুমায়ূন, তুমি কিন্তু সৃষ্টিসুখী তাবৎ জগজ্জনের সামষ্টিক বন্ধু।
হুমায়ূন, তুমি আসলে সর্বযুগের এক শ্রেষ্ঠ মানবিক কন্ঠস্বর।
হুমায়ূন, তোমার সৃষ্টিশীলতার সাক্ষ্যে তুমি অনশ্বর।

তাহলে কেন এমন হবে?
কেন সনাক্ত করা যাবে না, কেন ঠেকানো যাবে না তোমার গোপন শত্রুকে? তোমার মতো এক নির্বিরোধ সৃষ্টিসত্তা কী দোষ করেছে কার কাছে যে, তোমার বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে নেমে পড়তে হবে সেই অদৃশ্য হন্তারককে?
এ যুদ্ধ অসম যুদ্ধ। এ যুদ্ধ নয় ন্যায় যুদ্ধ।
এ যুদ্ধে পরাজিত হবে অদৃশ্য শত্রু।
এ যুদ্ধে বিজয়ী হবে তোমার সৃষ্টিসত্তা।

মাত্র চৌষট্টিও যার পূর্ণ হলো না, তাকে কেন বিদায় দেবো আমরা?
কেন বিদায় দেবে তার ষোলো কোটি স্বদেশী স্বজন?
দারাপুত্র পরিবার রেখে কোথায় যাবে তুমি, কেন যাবে?

না, যেতে হয় না; যেতে দিতে হয়না।
আমরা দ্বিপ্রহরে প্রস্তুত রাখিনি কোনো গাড়ি। না, আমরা প্রস্তুত রাখবো না।
বড় বেশি অযৌক্তিক, বড় বেশি স্বৈরতান্ত্রিক এরকম যাত্রা, এরকম বিপর্যয়। তোমার সোনার হাতের সোনার কলম কুমারী কাগজকে সৃষ্টিসম্ভবা করবে না, তাও কি কখনো হয়?

এই দেখো, আমরা আমাদের জাগ্রত দেহমন প্রদীপ করে তুলে ধরেছি ঊর্ধলোকে; আমরা আমাদের প্রার্থনা উন্মীলিত করেছি সর্বলোকে : ‘হে সৃষ্টিপিতা, হে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দ্রষ্টা ও স্ররষ্টা, হে তিনভুবনের পালনকর্তা, হে শ্বেতবিবর ও কৃষ্ণবিবরের রক্ষক ও সমন্বয়ক, হে আরোগ্যকারী চিকিৎসকশ্রেষ্ঠ, তুমি তোমার স্বয়ংক্রিয় আলোক-চিকিৎসায় পূর্ণ আরোগ্য দান করো তোমার অনুগ্রহধন্য হুমায়ূনকে, যার সৃষ্টির পূর্ণতায় নন্দিত হবে তোমারই বদান্যতা, তোমারই আদিঅন্তহীন ব্যাপ্তি ও অবিভাজ্যতা। হে স্রষ্টার স্রষ্টা, তুমি সক্রিয় করো তোমার রোগহর নিদান। তোমার বিনাশহীনতারই মানবপ্রতীক হয়ে উঠুক হুমায়ূন, এই ইহলোকের এক চিরঅমৃতপ্রাণ।’

না, তুমি একা নও।
হুমায়ূন, তোমার ভেতর সর্বক্ষণ জাগ্রত তোমার অন্তরাত্মা।
তার সঙ্গে যুক্ত তোমার পরমাত্মা।
তোমার জন্যে জায়নামাজে প্রার্থনারত তোমার মহিয়সী জননী।
তোমার পাশে প্রতীক্ষারত তোমার প্রিয়তমা, তোমার সন্তান-সন্ততি।

তোমার পাশে তোমার ভাই জাফর ইকবাল, তোমার বন্ধু সাংসদ নূর, জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মোমেন, তোমার প্রকাশক ছায়াসঙ্গী মাজহার, তোমার ডাক্তার, নার্স; তোমার পাশে প্রার্থনারত বাংলার তাবৎ নেতা-নেত্রী, শাসক প্রশাসক, তোমার গুণমুগ্ধ পাঠক-পাঠিকা, গণমন; তোমার জন্যে প্রতীক্ষারত বাংলার প্রতি ইঞ্চি আসমান, প্রতি ইঞ্চি জমিন, প্রতি ইঞ্চি নদী ও জলধি। তোমার জন্যে তাদের সকলের মিলিত আরোগ্য-এষণা।
এই ঘন-সংবদ্ধ কামনা-সংহতি পরাজিত করবে তোমার অদৃশ্য শত্রুকে।
সে হার মানবে; তাকে হার মানতেই হবে।

জেনেছি, তোমার মস্তিষ্ক সক্রিয়,
অর্থাৎ সক্রিয় তোমার মন ও মনন।
এইতো তোমার অস্তিত্বের যুগল বৃত্ত : তোমার চন্দ্র ও সূর্য।
তোমার কেন্দ্রে একই আলোর এপিঠ ওপিঠ।
চিরজীবী হোক তোমার এই আলোক সক্রিয়তা ।
আবার সচল হোক সোনার হাতে সোনার কলম।
ফিরে এসো হুমায়ূন,
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার।

আমি একটি রজনীগন্ধা।
তুমি একটি রজনীগন্ধা।
সে একটি রজনীগন্ধা।
আমরা প্রত্যেকে এক একটি রজনীগন্ধা।
আমাদের সকলের রজনীগন্ধা,
হুমায়ূন, আজ তোমার জন্যে।

হে রজনীগন্ধার স্রষ্টা,
আমাদের সকলের সম্মিলিত রজনীগন্ধা
তুমি আরোগ্যপ্রাপ্ত হুমায়ূনের নামে
কবুল করো।
আমিন।

মুহম্মদ নূরুল হুদা: কবি ও লেখক।

প্রতিক্রিয়া -- “হে রজনীগন্ধার স্রষ্টা”

  1. ডা মো জাফরুললা্হ্

    ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে করেছ শুরু, তারপর দু’শতাধিক ফুল হাতে দিয়ে গেছ গুরু… হে হুমাঘূন, আমরা বেদনার আশ্রু দিয়ে সব নেব ধুয়ে… তোমার দেওয়া ফুল কালোত্তীর্ণ হয়ে ফুটতে থাকবে আর কইবে কথা আন্তরের….

    জবাব
  2. prodip chowdhury

    প্রিয় হুমাযুন,

    তারিখটা ঠিক এ মুর্হুতে মনে পড়ছে না। দৈনিক সমকালে সর্বশেষ দেশছাড়ার সময় বিমানবন্দরে মাহবুব মোর্শেদ ভাইয়ের নাতিদীর্ঘ একটি লেখা পড়ে মনটা ভারি হয়ে উঠেছিল। আজ আবার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল এই লেখা পড়ে। জানি না ইশ্বর কী করেন? কিন্তু এই সত্য তো আমাদের মানতেই হবে; একজন হুমায়ুন আহমেদ-ই প্রথম মানুষ, যিনি গত দুই দশকে এই ভূখন্ডে বাঙালির পড়ার অভ্যাস তৈরিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

    জবাব
  3. Nayan Kar

    হুমায়ুন আহমেদ খুব শিগগির সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা তার জন্য প্রার্থনা করছি। তিনি কিন্তু বিশ্বের সেরা চিকিৎসা পাচ্ছেন।

    জবাব
  4. jakir mohammed

    হুমায়ূন
    আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে
    ছনের ছাউনি বেয়ে
    চোখের জল বৃষ্টির জল হয়
    তোমার বেঁচে থাকার আরাধনায়
    আমরা চেয়ে আছি
    স্রষ্টার দিকে
    স্বপ্নের সোনালি স্বাষ্কর হবে তুমি
    আমাদের বেঁচে থাকার জমিনে

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—