এ. এম. হারুন-অর- রশিদ

পাওয়া গেছে ইশ্বর-কণা

জুলাই ৫, ২০১২

Harun-fসংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ জেনেভার সার্ন গবেষণাগার ঘোষণা করেছে, বহু প্রতীক্ষিত হিগ্‌স-কণা এখন বাস্তবিকই ধরা পড়েছে। পাঁচ বছর আগে ২০০৭ সালের ৩ মে এ ধরনের একটি সংবাদ পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তখন তা ধোপে টেকেনি। আজ একই দাবি করা হয়েছে এবং এবারকার দাবির পেছনে প্রমাণ বোধহয় বেশি জোরালো।

ওই সময়ে আমি এই ঈশ্বর-কণার ওপরে একটি প্রবন্ধ বাংলাদেশ ফিজিকাল সোসাইটির বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করেছিলাম, যা আমার একটি গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধে আমি বলেছিলাম, এই সংবাদটি একটি অত্যন্ত সুসংবাদ, বিশেষ করে আমার কাছে, কেননা পিটার হিগস্ আমার ব্যক্তিগত বন্ধু। তিনি একদিন আমাকে তাঁর ফোক্স-ভাগেন গাড়িতে এডিনবরা রেলস্টেশন থেকে নিউব্যাটল অ্যাবি’তে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তখন প্রথম স্কটিশ গ্রীষ্মকালীন স্কুল অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তখন থেকেই আমি হিগস্-কণা সম্বন্ধে দারুণ আগ্রহী হই এবং আমি জানি যে, হিগস্-কণা ধরা পড়লে শুধু যে কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটা ‘জ্বলন্ত’ সমাধান হবে তাই নয়, হিগস্ নিজেও একদিন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হবেন।

কণা পদার্থবিজ্ঞানে বিপুলভাবে সার্থক হলো সালাম-ভাইনবার্গ-গ্লাসাও তত্ত্ব, যার তিনজনই নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। এই তত্ত্বের ভিত্তি হলো কোয়ার্ক-লেপটনের অভ্যন্তরীণ বিস্তার পরিমাপ-অপরিবর্তী বা গেজ-ইনভ্যারিয়ন্স। এ ধরনের তত্ত্বে প্রতিসাম্যের স্বতঃস্ফূর্ত গেজ অপরিবর্তন-ভঙ্গের জন্যে প্রয়োজন হয় একটি নির্দিক ক্ষেত্রের। এই নির্দিক ক্ষেত্রের অনুষঙ্গী কণাই হলো হিগস্-কণা, যা বহু প্রচেষ্টার পরেও আমরা নির্দিষ্টভাবে ধরতে পারিনি। কিন্তু মনে হলো আজ সার্ন গবেষণাগারে এই কণা ধরা পড়েছে, যার পরিসংখ্যানভিত্তিক নিশ্চয়তার সূচক বিশ্বাসযোগ্য।
piter-higgs
পাঁচ বছর আগে নিউ সায়েনটিস্ট ম্যাগাজিনের ৩ মে’র সংখ্যায় লেখা হয়েছিল যখন জন কনওয়ে তাঁর পরীক্ষার ফল দেখছিলেন, তখন একটা শিহরণ তাঁর মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে যাচ্ছিল। বিশ বছর ধরে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সবচেয়ে বেশি পলায়নপর বস্তুটি হিগস্-বোসন কণা বা ঈশ্বর কণা, যা মহাবিশ্বের সব বস্তুর ভরের জন্য দায়ী। এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ কণা-চূর্ণকরণ যন্ত্রের স্পষ্ট ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই রয়ে গেছে। ওই কণার অস্তিত্বের আকর্ষণীয় ইঙ্গিত। আজ পাঁচ বছর পরে এই ইঙ্গিত বা উদ্ভাস আরো দৃঢ় হয়েছে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। হিগস্-বোসন কণা সত্যিই বোধহয় আজ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং কণা পদার্থবিজ্ঞানীদের অধীর আগ্রহের অপেক্ষা করার দিনের অবসান হয়েছে।

এখানে মনে রাখা দরকার, পিটার হিগ্‌সের ৪৫ বছর আগে প্রস্তাবিত এই কণাটির সাথে জড়িত আছে বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম। সত্যেন বোস ১৯২০’এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বসে যে বন্টন-বিধিটি প্রণয়ন করেন সেটা বসু-আইনস্টাইন বন্টন সূত্র নামেই সমধিক পরিচিত। এই সূত্রানুযায়ী মৌলিক কণাদের, যাদের স্পিন বা ঘূর্ণন পূর্ণ-সংখ্যক তাদেরকে কীভাবে বন্টন করা যায় তার ব্যাখ্যা মেলে। দেখা যায়, প্রকৃতিতে দু’রকমের কণা আছে – যাদের স্পিন পূর্ণ সংখ্যক তারা বোসন আর যাদের স্পিন পূর্ণ সংখ্যার নয় তারা ফার্মি-কণা বা ফার্মিয়ন। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রকৃতিতে মৌলিক বলবাহী কণাসমূহ সাধারণত বোসন-জাতীয় হয়ে থাকে। যেমন আলোক কণা ফোটন একটি বসু-কণা। এরকমই একটি কণা পিটার হিগ্‌স সেই ১৯৬৪ সালে প্রস্তাব করেছিলেন যে কণাটি মৌলিক কণার ভার-যুক্ত হবার সাথে জড়িত। সেই স্কেলার কণাটিই এই ‘ঈশ্বর কণা’। ঈশ্বর কণা বা গড পার্টিকল নামটি এসেছে আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যানের বই থেকে। শোনা যায়, তাঁর বইটির নাম তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, ‘দ্য গড-ড্যাম পার্টিকল’, প্রকাশক ‘ড্যাম’ শব্দটি কেটে দেন কাটতির কথা ভেবে। সেই থেকেই এটি ‘ঈশ্বর কণা’ নামে পরিচিত।

গতকাল ৪ঠা জুলাই সার্নের প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে,
“আমাদের ডেটায় ১২৬ গিগা-ইলেকট্রন ভোল্ট পরিমাণ ভরের কাছাকাছি একটি নতুন কণার স্পষ্ট ইংগিত আমরা পাচ্ছি, যার মাত্রা ৫ সিগমা। LHC ও ATLAS কণা নিরূপক যন্ত্রের অভূতপূর্ব সাফল্য এবং আরো বহু মানুষের সম্মিলিত কাজ আমাদেরকে এই চমৎকার মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।”
এই কণার অস্তিত্ব এতোদিন কাগজে-কলমে আর অংকের হিসাবেই ছিল। এর অস্তিত্ব নিয়েও অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু চার দশকেরও বেশী সময় ধরে এবং বহু কোটি টাকা খরচ করে এর শক্ত পর্যবেক্ষণ-সম্মত প্রমাণটি বিজ্ঞানীরা অবশেষে পেলেন।

পদার্থবিজ্ঞানের শেষ হাসিটি, তাই, পিটার হিগ্‌সেরই প্রাপ্য। আর হ্যাঁ, সেইসাথে নোবেল পুরস্কারটিও, অন্তত স্টিফেন হকিং তাই মনে করছেন।

এ. এম. হারুন-অর-রশিদ:পদার্থবিজ্ঞানী পিটার হিগস্-এর ব্যক্তিগত বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানলেখক।

Tags: , ,

WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
| | More
 -------------------------------------------------------------------------
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর নিজস্ব। bdnews24.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bdnews24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)

-------------------------------------------------------------------------

৬ প্রতিক্রিয়া - “ পাওয়া গেছে ইশ্বর-কণা ”

  1. Nazim on জুলাই ৮, ২০১২ at ১:২৯ অপরাহ্ণ

    আমরা কীভাবে উপকার পাব? অথবা বিজ্ঞানের কী উপকার হবে? আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকার পাব? আমাদের এখানে শিক্ষণীয় কী আছে এটা জানার ইচ্ছা ছিল।

  2. Dhreeti Ranjan Basu on জুলাই ৭, ২০১২ at ৩:১২ অপরাহ্ণ

    আলোর গতিতে কোনও বস্তু স্থানান্ত্ররিত করার প্রক্রিয়াটা আরও পাকাপোক্ত হল ।।

  3. Alamgir Hossain on জুলাই ৬, ২০১২ at ৮:৫৫ পুর্বাহ্ন

    বর্তমানে যারা নামকরা বিশ্ববিদ্যালযয়র অধ্যাপক আছেন তারাই তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারছেন। কিন্তু যারা তাদের মতো প্রতিষ্ঠিত নন তাদের মতামত কোথায়্ও প্রকাশিত হয় না।

  4. হাসান on জুলাই ৫, ২০১২ at ১১:০৯ অপরাহ্ণ

    বিজ্ঞানের শেষ বলে কিছু নাই, অনেক নামকরা বিজ্ঞানীর আলোচিত তত্ত্ব অনেক পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তাই এখানে শেষ হাসি বলে কিছু থাকার কথা না !

  5. shakir on জুলাই ৫, ২০১২ at ১১:০১ অপরাহ্ণ

    এই আবিস্কারের গুরুত্ব কী? এর ফলে কোন্ সমাধান পাব আমরা?

  6. Zaman on জুলাই ৫, ২০১২ at ৬:২০ অপরাহ্ণ

    আমরা আপনাকে নিয়ে গর্বিত, স্যার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যেন বসু যেমন ১৯২০ সালের দিকে এই কণা প্রস্তাব করেছিলেন, তেমনি আজ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, বাংলাদেশের বা কোন বাঙালী বিজ্ঞানী পিটার হিগস-এর বর্তমান প্রকল্পের সাথে যুক্ত হয় তাহলে সেটা একটা বিরাট ব্যাপার হবে।

মন্তব্য করুন

প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes

ফেসবুক লিংক

ট্যাগ

আর্কাইভ