Feature Img

razu-fআগামী সাত দিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে মেহিকো(প্রচলিত উচ্চারণ মেক্সিকো)তে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন । আপাতভাবে মনে হতেই পারে এ ব্যাপারে আমাদের কৌতূহলী হয়ে কী লাভ, যেহেতু মেহিকোর সাথে আমাদের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক কোন সম্পর্কই প্রায় নেই বললেই চলে। তাদের কোনো উন্নয়ন বা অবনয়নের অভিঘাত যেহেতু আমাদের উপর পরে না, সেহেতু তাদের বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ সময়ের অপচয় মাত্র। আসলে তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নির্বাচনে পদপ্রার্থীদের মান ও জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অদূরদর্শিতা লক্ষ্য করলে মনে হবে আমরা বহুদূর থেকে যেন পরস্পরের প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছি।

এক সপ্তার মতো বাকি আছে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। কিন্তু ইতিমধ্যেই নির্বাচনী পরিস্থিতি নানা ঘটনায় তাতিয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ-বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির মতোই ওখানেও তিনটি দলই প্রধান।PAN, PRI এবং PRD. ১৯২৮ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত PRI-এর হাতেই ছিলো মেহিকোর নেতৃত্ব। একের পর এক এই দল থেকে নির্বাচিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট। ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আসার কারণে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বেচ্ছাচারের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকেই ছিলো। এইসব অভিযোগের ফলাফল ভোগ করে তারা ২০০০ সালে PAN-এর প্রতিনিধি বিসেন্তে ফক্সের কাছে পরাজয়ের মাধ্যমে। ফক্সের পর PAN-এর হাত ধরে আসেন ফেলিপে কাল্‌দেরন। কাল্‌দেরনের শাসনামল উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে ড্রাগ কার্টেলদের বিরুদ্ধে অভিযানের কারণে। PRI-এর দীর্ঘ শাসনামলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার আর ড্রাগের রমরমা অবস্থা যেভাবে স্থায়ী রূপ নিয়েছিলো তা পুরোপুরি উচ্ছেদ করা এক টার্মের শাসনামলে কতটা সম্ভব তা ভাববার বিষয়। সাধারণ মানুষের জন্য PAN বিষ্ময়কর কোন পরিবর্তন না আনলেও অন্তত দেশকে যে খানিকটা ড্রাগ লর্ডদের আধিপত্য থেকে বের করে আনতে পেরেছে এটা প্রায় সবাই স্বীকার করেন। মেহিকোর সংবিধান অনুযায়ী কোনো প্রেসিডেন্টেরই দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। হলে কাল্‌দেরন হয়তো আবারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পেতেন।

শত্রুর সাথে কোলাকুলি

হোসেফিনা বাসকেস মোতা।
হোসেফিনা বাসকেস মোতা।

PAN-এর পক্ষ থেকে এবারের প্রার্থী হোসেফিনা বাসকেস মোতা। ১৮১০ সালে মেহিকো স্বাধীন হওয়ার পর এইবারই প্রথম কোনো নারী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হলেন। এখনও পর্যন্ত জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে হোসেফিনা বাসকেস মোতা অন্য দুটি দল PRI এবং PRD থেকে সামান্য ব্যবধানে জনপ্রিয়তার তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। কিন্তু জরিপের ফলাফল আর রাজনীতি দুই ভিন্ন জিনিস। রাজনীতির ‍কূট-কৌশল বদলে দিতে পারে সবকিছু। এমনকি জরিপের মধ্যেও আছে দল! দলীয় ও র্নিদলীয় জরিপকারী সংস্থা। সুতরাং সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝে ওঠা মুসকিল কোনটা সত্য আর কোনটা বানোয়াট। তবে এখনও পর্যন্ত নির্দলীয় সংস্থার ফলাফল দেখে মনে হচ্ছে বাসকেস মোতাই এগিয়ে। কিন্তু ভন্ড ও প্রতারক রাজনীতি অবিশ্বাস্য এক কারিগরির মাধ্যমে নিশ্চিত করে তুলতে চাইছে এমন একজনের বিজয় যে কিনা প্রতিদ্বন্ধী দলের প্রার্থী। PAN-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফক্স এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট কাল্‌দেরন PRI-এর এনরিকে পেইনঞা নিয়েতোকে তাদের সহযোগিতা ও সমর্থন দিচ্ছেন–এমন গুঞ্চন এখন সর্বত্র। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও তা প্রচারিত এখন। স্পেন থেকে প্রকাশিত ‘এল পাইস’ পত্রিকায় ২২-০৬-২০১২ তারিখে প্রকাশিত লেখক হুয়ান বিইয়োরোর সাক্ষাৎকারে তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, PAN, ফক্স এবং কাল্‌দেরন সহযোগিতা করছে পেইনঞা নিয়েতোকে। মেহিকোর রাজনীতির ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেছে কিনা জানি না বা ঘটে থাকলেও প্রকাশ্যে তা আসেনি কখনো। কিন্তু নিজের দলের প্রার্থীকে লেঙ মেরে ফেলে দেয়ার জন্য একেবারে বিরোধী দলের প্রার্থীকে জেতানো? PAN-এর ইতিহাসেতো বটেই, মেহিকোর রাজনীতির ইতিহাসেও এটা ঘৃণ্য ও কলংকজনক ঘটনা হয়ে থাকবে। রাজনীতি তাহলে বাস্তবতার চেয়েও আরও বিস্ময়কর কোনো জিনিস। রাজনীতির ভিত্তি অনৈতিক হওয়ার কারণে কে যে কখন শক্রু আর মিত্র হয়ে উঠবে তা বুঝবার উপায় নেই। কিন্তু এ কি কেবল ইর্ষাপ্রসূত ব্যক্তিত্বের সংঘাত? নাকি এর কারণ আরও গভীরে নিহিত রয়েছে? সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে এটা অন্তত বুঝতে পারছি যে না, রাজনীতি এতটা সরল পথে চলে না। আজকের দিনে ধনিক শ্রেণী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আর দেশী বিদেশী কর্পোরেট কোম্পানীগুলোর স্বার্থ রক্ষার সুর যাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে দেখা যাবে তাদেরকেই ক্ষমতায় বসানোর জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়া হবে।

” মেহিকোর প্রেসিডেন্ট হওয়ার কোন অধিকার এই লোকের নেই”

ধারণা করা হচ্ছে এনরিকে পেইনঞা নিয়েতোই জিতবেন এই অসম যুদ্ধে। জেতার কারণ রাজনীতি করার জন্য আর ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে ধরনের দূর্বৃত্তায়ন দরকার তা তিনি ইতিমধ্যে করে ফেলেছেন।

এনরিকে পেইনঞা নিয়েতো।
এনরিকে পেইনঞা নিয়েতো।

মেহিকোর সবচেয়ে বড় দুটা চ্যানেল TV AZTECA এবং TELEVISA তার পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছেন তার পক্ষে প্রচারাভিযানের প্যাকেজ প্রোগ্রাম বিপুল অংকের বিনিময়ে কেনার মাধ্যমে। এ নিয়ে বিতর্কের ঝর বয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ইতিমধ্যেই এ ধরনের চ্যানেলগুলো বর্জনের আহবান জানিয়ে দিয়েছে। মেহিকোর বিত্তবান ছেলেমেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ইবেরোআমেরিকার ছাত্রছাত্রীরা এনরিকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা ও মিছিল অব্যাহত রেখেছেন গত মে মাস থেকে। টুইটার এবং ফেসবুক হয়ে উঠেছে তাদের প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যম। সচেতন ছাত্র সমাজ আর সাধারণ মানুষ এক জোট হয়ে এনরিকেকে কোনঠাসা করার চেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এনরিকে পেইনঞা নিয়েতো তাদের কাছে কেবল দুর্বৃত্ত বা অসৎই নন তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবেও অযোগ্য বলে বিবেচিত। তাকে অযোগ্য হিসেবে বিবেচনার ধারণাটি নিশ্চিত হয়ে ওঠে গুয়াদালাহারায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বইমেলায় সাংবাদিকরা যখন তাকে প্রশ্ন করেছিলো তার পড়া তিনটি বইয়ের কথা উল্লেখ করতে। তিনি তিনটির মধ্যে একটি বইয়ের নাম বলেছিলেন La Silla del Aguilar কিন্তু লেখকের নামটি ভুল করে ফুয়েন্তেসের পরিবর্তে বলেছিলেন এনরিকে ক্রাউসের নাম। পড়াশুনা বা মননশীলতার সাথে তার যে খুব একটা সম্পর্ক নেই তা প্রশ্নের উত্তর থেকেই বেরিয়ে এসেছিলো। কিন্তু একথা তো আর জনসমক্ষে স্বীকার করা যায় না। ফুয়েন্তেস তখনও বেঁচে ছিলেন। পেইনঞা নিয়েতো সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, “আমার বই না পড়ার অধিকার এই ভদ্রলোকের আছে। কিন্তু যেটা ভয়ংকর তা হলো মেহিকোর প্রেসিডেন্ট হওয়ার কোন অধিকার এই লোকের নেই। লোকটি খুবই অশিক্ষিত। সমস্যাগুলো দাবী করে এমন এক লোকের যিনি (বারাক) ওবামা, এ্যাঞ্জেলা মের্কেল বা (নিকোলাস) সারকোজির মতো লোকের সাথে কথা বলতে পারেন। এই লোকের সেই ক্ষমতা নেই।” ফুয়েন্তেসের এই মন্তব্য মেহিকোর গোটা ছাত্র সমাজকে উদ্ভুদ্ধ করেছিলো পেইনঞা নিয়েতোর বিরুদ্ধে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তুলতে। তারা ফুয়েন্তেসের প্রতিকৃতিসহ টিশার্ট পরে SOMOS-132 নামের আন্দোলন গড়ে তোলে মেহিকো জুড়ে।

লুটেরাদের স্বার্থে নির্বোধের উত্থান

কিন্তু এত সব আন্দোলন সত্তেও কি পেইনঞা নিয়েতোকে শেষ পর্যন্ত ঠেকানো যাবে? এই প্রশ্ন এখন সবার কাছে। আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি নির্বাচন অনুষ্ঠানের। কিন্তু দেশে বিদেশে তার পক্ষে অনুকূল প্রচারণাও কম নয়। এ সপ্তাহের টাইম মেগাজিনে মেহিকোর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে কাস্তাইনঞেদার লেখা এবং ইকোনোমিস্ট পত্রিকায় পেইনঞা নিয়েতো সম্পর্কে লেখাগুলো ভালোভাবে পাঠ করলেই দেখা যাবে বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলো চায় এই অশিক্ষিত নির্বোধ লোকটিই মেহিকোর ক্ষমতায় আসুক।

মেহিকোর ধনিক শ্রেণী আর বিদেশী বড় বড় কোম্পানিগুলো যাতে মেহিকোকে লুটেপুটে খেতে পারে তার একটা আভাস পেইনঞা নিয়েতো নির্বাচনী প্রচারনায় দিয়ে রেখেছে। তার বহু প্রস্তাবের একটি হচ্ছে PEMEX বা তেল সম্পদের সরকারী প্রতিষ্ঠানটিকে বেসরকারীকরণের প্রস্তাব। ১৯৩৮ সালের ১৮ মার্চ মেহিকোর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লাসারো কার্দেনাস অসীম সাহসিকতা আর দূরদর্শিতা নিয়ে মেহিকোর বিদেশী মালিকানার তেল কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসেন। তাতে বহির্বিশ্ব তার উপর নাখোশ হয়েছিলো। কিন্তু লাসারো দেশের স্বার্থ রক্ষায় অটল ছিলেন বলে কেউ কিছুই করতে পারেন নি। দেশবাসীকে তিনি এটা বুঝাতে পেরেছিলেন যে এটি মেহিকোর সম্পদ; লুটেরাদের নয়। যে-ঝুঁকি নিয়ে বিদেশী লুটেরাদের হাত থেকে তিনি দেশের তেল সম্পদকে উদ্ধার করেছিলেন আজ প্রায় ৭১ বছর পর পেইনঞা নিয়েতো আবার তা দেশী-বিদেশী লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়ার আয়োজন করছেন। সুতরাং ইকোনোমিস্ট বা টাইম ম্যাগাজিন তাকে সমর্থন করবে না তো কাকে করবে?

দেশের চেয়ে যখন শ্রেণী স্বার্থ বড়

এনরিকে পেইনঞা নিয়েতো শুধু বিদেশী স্বার্থই রক্ষা করবেন না, একই সঙ্গে রক্ষা করবেন দেশের সবচেয়ে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থও যারা মেহিকোর গোটা অর্থনীতির উপর আছর করে আছে PRI-এর দীর্ঘ শাসনামল থেকে। এখনও পর্যন্ত দেশের বত্রিশটি প্রদেশের যে দশটিতে PRI-এর আধিপত্য ক্ষুন্ন হয়নি সেখানে সহিংসতা, অনুন্নয়ন এবং অপরাধ প্রবণতা বিস্তার লাভ করেছে অন্য প্রদেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এই প্রদেশগুলোতে গভর্নররা প্রায় মধ্যযুগীয় সামন্ত কায়দায় শাসন করে আসছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ভেরাক্রুস হচ্ছে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রদেশ যেখানে সাংবাদিক হত্যা সাধারণ প্রবণতায় দাড়িয়েছে। সম্প্রতি এক সপ্তাহেই হত্যা করা হয়েছে চারজন সাংবাদিককে। এ বছরের জানুয়ারিতে গভর্নরের নিকটতম হিসেবে পরিচিত এমন একজনকে বিমানবন্দরে আটক করা হয়েছিলো যার কাছে স্যুটকেসভর্তি ছিলো প্রায় দুই মিলিয়ন নগদ ডলার। ধারণা করা হয় এগুলো নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ব্যয়ের উদ্দেশ্য ব্যবহার করার জন্য আনা হয়েছিলো।

PRI-এর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মেহিকো প্রদেশের সাবেক গভর্নর পেইনঞা নিয়েতোও দুঃশাসন, অপকর্ম ও দুর্নীতিতে পিছিয়ে নেই। তাঁর শাসনামলে হত্যা ও দারিদ্রসূচক অবিশ্বাস্য রকমে উপরে উঠে যায়। নারীরাই ছিলো হত্যার প্রধান শিকার। সম্প্রতি গুয়াদালুপে এর্নান্দেসের এক গবেষণায় দেখা যায় সরকারের ‘সামাজিক ব্যয়ে’র তহবিলের লক্ষ লক্ষ ডলারের কোন হিসেবে নেই। ধারণা করা হচ্ছে এই তাহবিলের সবটাই তিনি ব্যয় করেছেন প্রচারাভিযানে। মেহিকোর সুশীল সমাজ এই প্রদেশটিকে সর্বচ্চো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রদেশের তালিকায় রেখেছে।

অসাম্যের কূটাভাসে মেহিকো

পৃথিবীর ধনী একটি দেশের পাশেই দরিদ্র একটি দেশ মেহিকো। সংস্কৃতি ও খনিজ সম্পদে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ একটি দেশ রাজনৈতিক দারিদ্র ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে দারিদ্রমুক্ত হতে পারছে না। যদিও স্বাধীন সার্বভৌম হিসেবে দেশটির বয়স ২০০ বছরেরও উপরে। অসাম্যের কূটাভাসে মেহিকো এখন পৃথিবীর শীর্ষ স্থানে রয়েছে। কারণ মেহিকো হচ্ছে্ এমন এক দেশ যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী কার্লোস স্লিমের জন্ম, যেখানে এই গোলার্ধের সবচেয়ে নার্কোট্রাফিকার হোয়াকিন গুসমানেরও বসবাস। মেহিকোর দেশীয় পণ্যের শতকরা দশ ভাগই নিয়ন্ত্রন করে মাত্র দশটি পরিবার। আবার বিত্তবানদের এই দেশটিতেই ৫০ মিলিয়নেরও বেশি লোক দারিদ্র সীমায় কোনো মতে টিকে আছে। মেহিকোর দুঃখ হচ্ছে এই যে করুণ এই কূটাভাসকে বিলুপ্ত করার মতো কোন দল বা নেতা এই মুহূর্তে নেই।

অপদার্থরা করবে প্রভুত্ব বিস্তার

অন্য যে দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় প্রথম সারিতে রয়েছে যেমন PAN-এর হোসেফিনা বাসকেস মোতা এবং PRD –এর মানুয়েল লোপেস ওব্রাদোর, এরা পেইনঞা নিয়েতোর মতো দুর্নীতির দায়ে তেমন একটা অভিযুক্ত না হলেও, তাদের মধ্যে এমন কোন যোগ্যতা বা অঙ্গীকার নেই যা দিয়ে দেশকে এই ধরনের অপরাধ ও দারিদ্র থেকে মুক্ত করতে পারেন। আবারও ফুয়েন্তেসের উদ্বৃতি দিয়ে বলা যাক বামপন্থী লোপেস ওব্রাদোর সম্পর্কে যিনি তার ভাষায় ”পুরোনো বামের” প্রতিনিধি মাত্র। সুতরাং ….. ”ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর হাতে কোনো সমাধান নেই। এদের কাছে এমন কোনো প্রস্তাব নেই যা দিয়ে মানুষকে পক্ষে নিয়ে আসতে পারেন। সমস্যাগুলো খুবই বড় ধরনের, বিপরীতে রাজনীতিটা হচ্ছে বামনাকৃতির।

আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেস ওব্রাদোর।
আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেস ওব্রাদোর।

সুতরাং এটা পরিস্কার, দুর্নীতিগ্রস্ত বামন আর নির্বোধদের হাতে মেহিকোর উজ্জ্বল উদ্ধারের চাবিটি নেই। মেহিকোর এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে জার্মান কবি গ্যোটের গ্যোৎস ফন বের্লিখিঙ্গন নাটকের সেই অবিষ্মরনীয় উক্তি: ”প্রতারণার যুগ আসছে।… অপদার্থরা করবে প্রভুত্ব বিস্তার আর কাপুরুষদের হাতে বন্দী হবেন বীরগণ।”

যাদুবাস্তবতা: শিল্প থেকে সমাজে উত্তরণের অপেক্ষা

এখন সাধারণ জনগনই একমাত্র ভরসা যারা অর্থলিপ্সু প্রচার মাধ্যমগুলোর প্রচারণার ভেলকি ভেদ করে নিজেদের জন্য বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারেন তাদের মূল্যবান ভোটদানের মাধ্যমে। যে-লাতিন আমেরিকা এই শতকের মাঝামাঝি সাহিত্যে জন্ম দিয়েছে যাদুবাস্তবতার মতো চমকপ্রদ শিল্পরীতির, এবং যে-শিল্পরীতির উদ্দীপক উৎস হিসেবে সেখানকার সমাজ ও সংস্কৃতিকে কৃতিত্ব দিয়ে এসেছেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, পারবে কি তা আবার শেকড়ে ফিরে গিয়ে একটি বিস্ফোরণ ঘটাতে, অন্তত মেহিকোর জনগণ পারবে কি সামাজিক যাদুবাস্তবতার চমকটি সৃষ্টি করতে? অন্তত মন্দের ভালো হিসেবে হয় লোপেস ওব্রাদোর কিংবা বাসকেস মোতাই হতে পারেন অনাকাঙ্খিত কিন্তু নিরুপায় পছন্দের মানুষটি যার মাধ্যমে কাল্পনিক শিল্প খুঁজে পাবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক শেকড়।

রাজু আলাউদ্দিন: লেখক ও সাংবাদিক।

রাজু আলাউদ্দিনলেখক ও সাংবাদিক

প্রতিক্রিয়া -- “মেহিকোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: তবে কি নির্বোধেরই জয় হবে ?”

  1. Anisuz Zaman

    চমৎকার! মেহিকো থেকে এত দূরে খাকা সত্ত্বেও একেবারে যেনে এই দেশটির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করছে লেখক। লেখাটি স্প্যানীশে অনুবাদ করে স্প্যানীশভাষী কোন পত্রিকায় কি দেয়া সম্ভব? পেইনঞা নিয়েতো থেকে সাবধান। তিনি হয়তো ড্রোন পাঠিয়ে তোমাকে হত্যা করতে পারে।

    জবাব
  2. আমিনুল ইসলাম সুজন

    তথ্য ও ছবিসম্বলিত লেখাটি পড়ে ভাল লাগল। চমৎকার (!) সাজুয্য খুঁজে পেলাম বহু দূরের দেশ মেক্সিকো (মেহিকো) এর সঙ্গে। আপনার লেখার আগে আমি জানতাম-ই না, দেশটির সঠিক উচ্চারণ মেহিকো।

    জবাব
  3. দীপেন ভট্টাচার্য

    আপনি বাংলাদেশে লাতিন আমেরিকার সমাজ, রাজনীতি ও সাহিত্যের দ্বার উন্মুক্ত করছেন। লেখাটি মেক্সিকোর আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে আরও জানতে আমাকে উৎসাহিত করেছে। ধন্যবাদ।

    জবাব
  4. এহসানুল কবির

    এই লেখাটার মারফতে মেহিকোর নির্বাচনীয় উত্তাপ আমারও গায়ে এসে লাগলো। উচ্চকণ্ঠ পক্ষপাত(দোষ!) লেখাটিকে স্বাদু, নির্বাচনসই ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। রাজু ভাইকে অভিনন্দন।

    জবাব
  5. Taposh Gayen

    ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ওবামা ২৬০ মিলিয়ন ডলার এরং রমনি ১২১ মিলিয়নেরও বেশি ডলার সংগ্রহ করেছেন। ২০১২ সাল নির্বাচনের আগে এই অংক দ্বিগুন হয়ে যেতে পারে। মেহিকোতে আপনি ভিন্ন কী আশা করতে পারেন? কেবল উনিশ বিশ ছাড়াতো আর কিছু নয়।

    জবাব
  6. Mohiuddin Kader

    রাজু ভাই, আমার মনে হয় মেহিকো একটা সমস্যায় আক্রান্ত দেশ। বাংলাদেশের সাথে এই দেশটির মিল খুঁজে পাই আমরা। লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—