pexels-photo - 111

১.

এই বছর আমরা গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান এবং ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে সব মিলিয়ে এক ডজন মেডেল পেয়েছি। খবরটি সবাই জানে কিনা আমি নিশ্চিত নই। আমাদের দেশের সংবাদপত্র খুবই বিচিত্র। তাদের কাছে সব খবর সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনো কোনো অলিম্পিয়াডের খবর তারা খুবই গুরুত্ব নিয়ে ছাপাবে। আবার কোনো কোনোটির খবর তারা ছাপাবেই না। কাজেই আমি ভাবলাম আমি নিজেই সবাইকে খবরটি দিই। একটা দেশের জন্যে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে এক ডজন মেডেল সোজা কথা নয়।

আমরা গণিতে চারটি মেডেল পেয়েছি, দুটি সিলভার এবং দুটি ব্রোঞ্জ। এক নম্বরের জন্যে আবার গোল্ড মেডেল হাতছাড়া হয়ে গেল। কিন্তু আমি ঠিক করেছি সেটি নিয়ে আমি মোটেই হা-হুতাশ করব না। দেখতে দেখতে একটা সময় চলে আসবে যখন আমরা গোল্ড মেডেল রাখার জায়গা পাব না! গণিতে গোল্ড মেডেল না পেলেও অন্য একটি ‘মেডেল’ আমরা পেয়েছি– সেটি হচ্ছে এই অঞ্চলের সব দেশকে হারিয়ে দেওয়ার ‘মেডেল’। আমাদের পাশের দেশ ভারতবর্ষ বিশাল একটি দেশ। লেখাপড়া, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে তারা অনেক এগিয়ে আছে। হলিউডের একটা সিনেমা তৈরি করতে যত ডলার খরচ হয় তার থেকে কম খরচে মঙ্গলগ্রহে তারা মহাকাশযান পাঠাতে পারে। কাজেই আমরা যদি গণিত অলিম্পিয়াডে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের হারিয়ে দিতে পারি তাহলে একটু অহংকার তো হতেই পারে।

পদার্থ বিজ্ঞানেও আমরা এবারে চারটি মেডেল পেয়েছি। তার মাঝে একটি সিলভার এবং তিনটি ব্রোঞ্জ। পদার্থ বিজ্ঞানে মেডেল পাওয়া তুলনামূলকভাবে অনেক কঠিন। কারণ সেখানে খাতা-কলমে সমস্যা সমাধানের সাথে সাথে প্র্যাকটিক্যাল করতে হয়। আমাদের দেশের লেখাপড়াটা এতই দায়সারা যে, এই দেশের ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠানিকভাবে ল্যাবরেটরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা একেবারেই পায় না। পদার্থ বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের কমিটি নিজেদের উদ্যোগে ল্যাবরেটরির কাজকর্ম একটুখানি শিখিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে ম্যাজিকের মতো ফল এসেছে। চার চারটি মেডেল!

আমার আনন্দ একটু বেশি। কারণ এই চারজনের ভেতর একজন মেয়ে। আমরা কখনোই মেয়েদের ছেলেদের সমান সুযোগ দিই না। শুধু তাই না, পারিবারিক বা সামাজিকভাবেও তাদের ধরে বেঁধে রাখি। তাই এই প্রতিযোগিতাগুলোতে সমান সমান ছেলে এবং মেয়ে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, একটুখানি পরিকল্পনা করে অগ্রসর হলেই ছেলেদের সাথে সাথে মেয়েদের দলটিকেও পেতে শুরু করব। পদার্থ বিজ্ঞানের মেডেল বিজয়ী এই মেয়েটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার সহকর্মী শিক্ষকের মেয়ে। তাকে আমি ছোট থেকে দেখে আসছি। তাই আমার আনন্দটুকুই অন্য অনেকের থেকে বেশি।

ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে আমরা চারজনকে পাঠিয়েছি, চারজনই মেডেল পেয়েছে। তিনটি ব্রোঞ্জ এবং একটি সিলভার। ইনফরমেটিক্স শব্দটা যাদের কাছে অপরিচিত মনে হচ্ছে তাদেরকে সহজভাবে বলা যায়, এটি হচ্ছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের অলিম্পিয়াড। ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডের কথা বললেই আমাকে একবার প্রফেসর কায়কোবাদের কথা বলতে হবে। এই মানুষটি না থাকলে আমাদের ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডকে কোনোভাবেই এতদূর নিয়ে আসতে পারতাম না। অনেকেই হয়তো জানে না যে, প্রতিযোগীরা যেন নিশ্চিন্তে প্র্যাকটিস করতে পারে সেজন্যে তিনি তাদের নিজের বাসায় দিনের পর দিন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। আমাদের ধারণা, ঢাকা শহরে চিকুনগুনিয়ার আক্রমণ না হলে আমাদের প্রতিযোগীরা ঢাকা শহরে এসে আরও একটু বেশি প্রস্তুতি নিতে পারত।

গণিত অলিম্পিয়াডের মতোই ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডেও আমাদের আরও একটি ‘মেডেল’ আছে, সেটি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতবর্ষকে হারিয়ে দেওয়ার ‘মেডেল’। এত বড় একটি দেশ, তথ্যপ্রযুক্তিতে সারা পৃথিবীতে তাদের হাঁকডাক। কাজেই সেই দেশটিকে যদি আমাদের স্কুল-কলেজের বাচ্চারা হারিয়ে দেয়, একটুখানি আনন্দ তো আমি পেতেই পারি!

আমাদের দেশের এই এক ডজন ছেলেমেয়ে তাদের এক ডজন মেডেল দিয়ে আমাকে যা আনন্দ দিয়েছে সেটি আমি কাউকে বোঝাতে পারব না।

২.

ঠিক এই একই সময়ে আমাদের দেশের প্রায় এক ডজন ছেলেমেয়ে আমার বুকটা ভেঙে দিয়েছে। মোটামুটি এই সময়টাতেই এইচএসসি পরীক্ষার ফল বের হয়েছে। পরীক্ষার ফল মনের মতো হয়নি, তাই সারা দেশে প্রায় ডজন খানেক ছেলেমেয়ে আত্মহত্যা করেছে। শুনেছি, শুধু কুমিল্লা বোর্ডেই নাকি এগার জন ছেলেমেয়ে আত্মহত্যা করেছে।

 

pexels-photo - 222
পরীক্ষার ফল মনের মতো হয়নি, তাই সারা দেশে প্রায় ডজন খানেক ছেলেমেয়ে আত্মহত্যা করেছে

 

খবরটি জানার পর থেকে আমি শান্তি পাচ্ছি না। কোনো কারণ নেই, কিন্তু নিজেকেই দোষী মনে হচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে, “আহা, আমি যদি আশাভঙ্গ এই ছেলেমেয়েগুলোর সাথে একবার কথা বলতে পারতাম– একবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারতাম, জীবনটা অনেক বিশাল, তার তুলনায় একটা এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষা একেবারে গুরুত্বহীন একটা ব্যাপার। যার পরীক্ষা খারাপ হয়েছে তার জীবনের কিছুই আটকে থাকবে না, কোনো না কোনোভাবে সে সামনে এগিয়ে যাবে।”

আমি শিক্ষক মানুষ, আমার সব কাজ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। আমি তাদের অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারতাম, এই একটি পরীক্ষার ফলাফল মনমতো না হলে তাতে জীবনের বিশাল প্রেক্ষাপটে কিছুই উনিশ-বিশ হয় না। আমি তাদের বোঝাতে পারতাম জীবনটা কত মূল্যবান। একটা জীবন দিয়ে পৃথিবীর কত বড় বড় কাজ করা যায়। কিন্তু সেটা করা যায়নি। এই দেশের দশ-বার জন ছেলেমেয়ে (কিংবা কে জানে হয়তো আরও বেশি) বুকভরা হতাশা আর সারা পৃথিবীর প্রতি এক ধরনের অভিমান নিয়ে চলে গেছে। আমি তাদের আপনজনের কথা ভেবে কোনোভাবে নিজেকে সান্তনা দিতে পারি না।

আমি যেটুকু জানি তাতে মনে হয় সারাদেশের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সব অভিভাবকই কেন জানি ভাবতে শুরু করেছেন তাদের ছেলেমেয়েদের জিপিএ ফাইভ কিংবা তার থেকেও বড় কিছু গোল্ডেন ফাইভ পেতেই হবে। তারা বুঝতে চান না সেটা সব সময় সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, তার প্রয়োজনও নেই। মানুষের নানা ধরনের বুদ্ধিমত্তার মাঝে লেখাপড়ার বুদ্ধিমত্তা শুধু একটা বুদ্ধিমত্তা। তাই তারা শুধু লেখাপড়ার বুদ্ধিমত্তাটাকেই গুরত্ব দেবেন, অন্য সব ধরনের বুদ্ধিমত্তাকে অস্বীকার করবেন বা সেটাকে দমিয়ে রাখবেন, সেটা তো হতে পারে না। বাবা-মা যখন তার সন্তানকে পৃথিবীতে এনেছেন তাকে একটা সুন্দর জীবন উপহার দিতে হবে। লেখাপড়ার চাপ দিয়ে জীবনটাকে দুর্বিষহ করে তুললে কোনোভাবেই তাদের ক্ষমা করা যাবে না।

পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে যেখানে লেখাপড়া আছে, কিন্তু পরীক্ষা নেই। সেই দেশের ছেলেমেয়েরা সবচাইতে ভালো লেখাপড়া করে। আমাদের দেশ সেরকম দেশ নয়। এখানে লেখাপড়ার চাইতে বেশি আছে পরীক্ষা। আমরা শিক্ষানীতিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষার কথা বলেছিলাম। সেই শিক্ষানীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চারটি পাবলিক পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। যার অর্থ, আমরা একটি ছেলে কিংবা মেয়েকে তার শৈশব আর কৈশোরে চার চারবার একটা ভয়ংকর অমানুষিক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাঝে ঠেলে দিই।

তা-ও যদি সেই পরীক্ষাগুলো আমরা ঠিকভাবে নিতে পারতাম, একটা কথা ছিল। প্রতিবার পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে স্বীকার করে নেওয়া হলে আবার নূতন করে পরীক্ষা নিতে হবে। তাই সবাই মিলে দেখেও না দেখার ভান করে। এই প্রক্রিয়ায় আমরা অনেক ছাত্রছাত্রী এবং তাদের বাবা মায়েদের অপরাধী হওয়ার ট্রেনিং দিয়ে যাচ্ছি এবং অল্প কিছু সোনার টুকরো সৎ ছেলেমেয়ে, যারা পণ করেছে তারা কখনো ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দেখবে না, মরে গেলেও অন্যায় করবে না তাদের বুকের ভেতর দেশের বিরুদ্ধে এবং চক্ষুলজ্জাহীন কিছু দেশের মানুষের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশার জন্ম দিয়ে পাচ্ছি। যে দেশ তাদের সৎ ছেলেমেয়েদের ভেতরে হতাশার জন্ম দেয় সেই দেশকে নিয়ে স্বপ্ন কেমন করে দেখব ?

অথচ খুব সহজেই প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একবার ঘোষণা দিতে হবে, যা হবার হয়েছে, ভবিষ্যতে আর কখনো প্রশ্ন ফাঁস হবে না। তারপর প্রশ্ন যেন ফাঁস না হয় তার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্যে দেশের অসংখ্য আধুনিক প্রযুক্তিবিদ প্রস্তুত হযে আছে। কেউ তাদের কাছে একবারও পরামর্শ নেওয়ার জন্যে যায়নি!

কাজেই যা হবার তাই হচ্ছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ছেলেমেয়েদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আমার কাছে প্রমাণ আছে যেখানে একটি ছেলে কিংবা মেয়ে চিঠি লিখে বলেছে তার বাবা-মা তাকে বলেছে যে, তাকে জিপিএ ফাইভ পেতেই হবে– যদি না পায় তার সুইসাইড করা ছাড়া আর কোনো উপায নেই।

কী ভয়ংকর একটি কথা! এটি কত জনের কথা?

অসংখ্য ছেলেমেয়ে আছে যাদের পরীক্ষার ফলাফল মনের মতো হয় না। তখন তাদের সান্তনা দেওয়া, সাহস দেওয়া কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানোর দায়িত্বটি পড়ে তার বাবা-মা কিংবা অন্য আপনজনের উপর। কিন্তু তারা অনেক সময়েই সেটি পালন তো করেন না, বরং পুরোপুরি উল্টো কাজটা করেন, তাদেরকে অপমান করেন, তিরস্কার করেন, লাঞ্ছনা করেন। অসহায় ছেলেমেয়েগুলো সান্তনার জন্যে কার কাছে যাবে বুঝতে পারে না। (কান পেতে রই (০১৭৭৯৫৫৪৩৯২) নামে একটা সংগঠন হতাশাগ্রস্ত এবং আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষদের সাহায্য করে। আমি এই সংগঠনের ভলান্টিয়ারদের কাছে শুনেছি প্রত্যেকবার পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর তাদের আলাদাভাবে সতর্ক থাকতে হয়।)

৩.

বছরের এই সময়টা আসলে আমার সবচেয়ে মন খারাপ হওয়ার সময়। কারণ এই সময়ে ছেলেমেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সময়। কারণ এই সময় ছেলেমেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষাগুলো হয়। শুধুমাত্র অল্পকিছু বাড়তি টাকা উপার্জন করার লোভে প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদাভাবে ভর্তিপরীক্ষা নেয়। দেশে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় যে প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদা দিনে পর্যন্ত পরীক্ষা নিতে পারে না। একদিন দেশের এক কোণায় পরীক্ষা, তার পরের দিন দেশের অন্যপ্রান্তে পরীক্ষা। ছেলেমেয়েরা এক জায়গায় পরীক্ষা দিয়ে রাতের বাসে উঠে সারারাত জার্নি করে ভোরবেলা দেশের অন্য প্রান্তে পৌঁছায়। অজানা অচেনা জায়গা, তাদের হাত-মুখ ধুয়ে বাথরুমে যাবার পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেই। সেইভাবে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত-ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লোভের টাকা সংস্থান করার জন্যে ভর্তিপরীক্ষা দেয়।

 

Students - 999
শুধুমাত্র অল্পকিছু বাড়তি টাকা উপার্জন করার লোভে প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদাভাবে ভর্তিপরীক্ষা নেয়

 

সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মান কেউ দেখেছে? হাই কোর্ট থেকে নির্দেশ দেওয়ার কারণে একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্ন আমাকে দেখতে হয়েছিল, যেখানে প্রত্যেকটা প্রশ্ন নেওয়া হয়েছিল কোনো না কোনো গাইড বই থেকে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি এরকম অবস্থা হয় তাহলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী অবস্থা হতে পারে কেউ কি অনুমান করতে পারে? সে জন্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে রমরমা ব্যবসার নাম ইউনিভার্সিটি ভর্তি কোচিং!

আমি জানি আমার এই লেখাটি যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চোখে পড়ে তাহলে তারা আমার উপর খুবই রেগে যাবেন এবং বোঝানোর চেষ্টা করবেন তারা মোটেই বাড়তি টাকার জন্যে ভর্তিপরীক্ষা নিচ্ছেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বজায় রাখার দায়বদ্ধতা থেকে করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটি হতেও পারে, কিন্তু মোটেও সামগ্রিকভাবে সত্যি নয়। ভর্তিপরীক্ষা প্রক্রিয়া থেকে একটি টাকাও না নিয়ে যদি কোনো শিক্ষক আমাকে চ্যালেঞ্জ করেন আমি অবশ্যই আমার বক্তব্যের জন্যে তার কাছে ক্ষমা চাইব! আছেন সেরকম শিক্ষক?

এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চোখে এখনও ভর্তিপরীক্ষা নামে এই ভয়ংকর অমানবিক প্রক্রিয়াটি চোখে পড়েনি। কিন্তু এই দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির চোখে পড়েছে। তিনি কিন্তু দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের একটি সম্মেলনে একটি সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে এই দেশের ছেলেমেয়েদের এই অমানুষিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করার অনুরোধ করেছিলেন। আমি খুব আশা করেছিলাম যে, তাঁর অনুরোধটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রক্ষা করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি সেরকম কোনো লক্ষ্মণ দেখতে পাচ্ছি না! মনে হচ্ছে, এই দেশের ছেলেমেয়েদের উপর নির্যাতনের এই স্টিম রোলার বন্ধ করার কারও আগ্রহ নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয় আগ বাড়িয়ে কখনোই এই উদ্যোগ নেবে না।

আমরা একবার যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। দেশের ‘মেহনতি’ মানুষের রাজনৈতিক সংগঠন বামপন্থী দলগুলো এবং কমিউনিস্ট পার্টি মিলে সেটি বন্ধ করেছিল! (বিশ্বাস হয়?) কাজেই মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধটি রক্ষা করার জন্যে যদি কোনো উদ্যোগ নিতে হয় সেটি নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে। তারা কি সেই উদ্যোগটি নিয়েছে?

এই দেশের ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের পতাকা বুকে ধারণ করে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিভিন্ন অলিম্পিয়াডের মেডেল নিয়ে আসে তখন আনন্দে আমাদের বুক ভরে যায়। তার প্রতিদানে আমরা এই দেশের ছেলেমেয়েদের প্রতি যে অবিচারটুকু করি সেটি চিন্তা করে বুকটি আবার বেদনায় ভরে যায়।

কেন আনন্দের পাশাপাশি বেদনা পেতে হবে? কেন শুধু আনন্দ পেতে পারি না?

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

১৩ Responses -- “আনন্দ এবং বেদনার কাহিনি”

  1. Shaheen Alam

    আমার ছেলে ক্লাস থ্রি তে পরে, আমি সোজা কথায় বুঝিয়ে দিয়েছি যে , পরিক্ষায় রেজাল্ট টা বড় নয়, জরুরি হলো জ্ঞ্যান অর্জন করা।
    আমার কিছু আসে জায় না আমার প্রথম হলো নাকি ৫০তম হলো, যতক্ষন সে শেখার মধ্যে আছে , আমি সন্তুষ্ট

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      আপনি সঠিক কথাটিই বলেছেন। একজন সফল মানুষের জীবনব্যাপী শেখার সিংহভাগই হলো জীবন-দক্ষতা। একাডেমিক শিক্ষা সেখানে একটি সামান্য অংশ মাত্র।

      Reply
  2. DR MUHAMMAD ABDUL GOFFAR KHAN

    I am a professor at RUET. I received 16500.00 Taka last year as remuneration of admission test. My basic salary is 78000.00 taka. I do not consider the amount I received is too big, compared to the work load of admission test. I agree Prof Zafar Iqbal sir regarding countrywide central (one) admission test.

    However I have a different view. Our students and guardians do not get opportunity of travelling and visiting their own country even. During admission test they are compelled to do so thereby come to know closely our country. During our liberation war we were running from one place to another having all types of troubles and uncertainty, even threat of life, this generation is getting some sort of similar experience, during admission test.

    I think such hurdles are required for building up of life.

    Reply
    • Mahbubur Rahman

      DR MUHAMMAD ABDUL GOFFAR KHAN’s comments on running guardians from one end to another end of the country is almost likely of BUS/TEMPOO’s assistant on the road. Is this standard of RUET?

      Reply
    • Lutfur Rahman

      The Professor of RUET has given a very interesting analogy in favour of undertaking individual university admission tests. Students can see the country moving from one place to another for attending the admission tests.
      No body can, I am sure, accept such and idea at a time when the mental notes of both parents and students are only on how to get entry into the University of one or the other types, and not seeing the places of the country
      I and many of my students as well as citizens of the country are waiting to see the results of the Presidents requests to the vice-chancellors for organizing unified admission test of subjects of their interest. Lutfur Rahman, Former Professor, BAU

      Reply
  3. Shahadat Hossain

    আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা ‍আজ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মত করে দাড়িয়েছে। আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত না করে শিক্ষা ব্যবস্থা গলদকরন করা হচ্ছে।

    Reply
  4. Mahbubur Rahman

    Sir, Thanks for bold writing and challenging all Public University teachers on pocketing illegal money from so called admission test.
    Why they will accept Chancellor’s advice? If they accept, they will loss from illegal income.
    Thanks again for your bold and important feature. It does not matter whether Public University teachers will realize or not. They will not. Long ago an organization was formed by teachers at Jahangirnagar University in the title Jahangirnagar University Teacher’s Association (JUTA).

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      Dear Mahbub, as a 7th batch student of JU I thank you for your mention of JUTA. Yes, you are very right. Teachers associations in universities can play a vital role in this regard if they are sincere in their role.

      Reply
  5. সরকার জাবেদ ইকবাল

    স্যার, সমস্যাটির গোড়া আমি অন্য জায়গায় দেখতে পাই। যে কোন চাকুরিতে প্রধান শর্ত হিসেবে শিক্ষাগত যোগ্যতাটিকে প্রাধান্য দেয়া হয়, যেমন: প্রথম বিভাগ থাকতে হবে, জিপিএ-৫ পেয়ে থাকতে হবে, ইত্যাদি। প্রার্থীর কারিগরি দক্ষতা ও অন্যান্য জীবন-দক্ষতাগুলো আছে কিনা তার খোঁজ নেয়া হয় না। এমনকি বিয়ের ক্ষেত্রেও পাত্র বা পাত্রী কি পাশ, কোন বিভাগ পেয়েছিল ইত্যাদি বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়, তার সংসারধর্ম পালনের মানসিকতা ও চর্চা আছে কিনা তা খুব একটা গুরুত্ব পায় না। ফলে, মা-বাবারাও সম্তানদেরকে ঐ শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের জন্য তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। আর তাই অনেক ক্ষেত্রেই ছেলেমেয়েরা পেরে উঠতে না পারার কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচেছ।

    Reply
  6. শিশির ভট্টাচার্য্য

    ২০০০-৩০০০ টাকা প্রতি পরীক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

    Reply
  7. Fazlul Haq

    অর্থের কাছে সব মানবতা, মানবিক গুণাবলি বিকিয়ে গেছে। শিক্ষকরাও বাইরে নেই। আপনার মত দু একজন যে এখন ও আছেন সেটাই ভরসা।

    Reply
  8. Bishwajit Kumar Bhowmik

    স্যার আপনার সুন্দর লেখার জন্য ধন্যবাদ।
    একটি অনুরোধ করছি স্যার একটি পরীক্ষা থেকে একজন শিক্ষক কতটাকা আয় করেন তার একটা পরিসংখ্যান দিয়ে লেখা লিখলে সাধারণ জনগন বুঝতে পারত। সেটা হতে পারে আপনার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—