Obaidul+Quader

কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যধারা এবং পাঠ্যবিষয় সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী না করেই এই শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত, গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের বৈঠকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গনে স্থাপিত বিচারব্যবস্থায় নৈতিক শক্তি বা ন্যায়বিচারের ধারণা প্রতীকীভাবে তুলে ধরা ‘লেডি জাস্টিস’এর ভাস্কর্য অপসারণের জন্য হেফাজতে ইসলামের দাবির পক্ষে পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস প্রদান প্রভৃতি ঘটনার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, ছাত্রসংগঠন, ইসলামি সংগঠন এবং সমাজের বিশিষ্ট নাগরিকরা তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও প্রগতিশীল মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ও ছাত্রসংগঠন সরকারের এমন সিদ্ধান্ত-আশ্বাস পছন্দ করেনি। কট্টর ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলামকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের জন্য হবে আত্মঘাতী– এমন মনোভাব মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিপরীতে হাঁটার মতো এবং হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে নেওয়া হলে দেশে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার আরও ঘনীভূত হবে– এমন নানা বক্তব্য তুলে ধরেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

ধর্মীয় অন্ধত্ব আর অসহিষ্ণুতা আমাদের দেশের টিকে থাকা সমস্যা যা সমাজকে পীড়িত করছে বর্তমান সময়েও। পাকিস্তানি আমলে এই দেশে রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, আজ থেকে ১৬ বছর আগেই পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে হয়েছিল বোমা হামলা। ধর্মান্ধ গোষ্ঠী আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক রূপ কখনও পছন্দ করে না। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। কদিন আগেই বাংলা নতুন বছর বরণ করে নেওয়ার সাংস্কৃতিক আয়োজনের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীদের আঁকা দেয়ালচিত্র রাতের অন্ধকারে পোড়া তেল দিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।

পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বর্ষবরণের উৎসবের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আক্রোশ এখনও কতটা তীব্র তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। দেয়ালচিত্র নষ্ট করার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিস্তু তারা হাল ছেড়ে দেয়নি। আবার নতুন করে তারা এঁকেছে বাংলা নববর্ষের জন্য দেয়ালচিত্র।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষ এক হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধের মাধ্যমে অর্জন করেছিল এই দেশের স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের ও বাঙালি সংস্কৃতির সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা এই দেশের অগণিত মানুষ ধারণ করে গভীরভাবে। ফলে ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক ও অসহিষ্ণু চিন্তা এই দেশে প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

Bengali New Year - 2
মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বর্ষবরণের উৎসবের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আক্রোশ এখনও কতটা তীব্র তা বুঝতে অসুবিধা হয় না

 

যুক্তিবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তচিন্তার মানুষদের সঙ্গে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এই দ্বন্দ্বই প্রগতিশীল আর প্রতিক্রিয়াশীলদের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়। একদা প্রগতিশীল কাউকে কখনও হঠাৎ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে দেখা গিয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাকে কিন্তু আর প্রগতিশীল বলা যায়নি। একইভাবে কোনো কৌশলগত কারণের কথা বলে প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার অনুসারীদের সঙ্গে প্রগতিশীলদের সুসম্পর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিকতা নির্দেশ করবে না; তা নির্দেশ করবে প্রগতিশীলতার মূল আদর্শ আর বোধ থেকে বিচ্যুতি।

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে স্থাপিত ভাস্কর্যটি সরানোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে– এই ব্যাপারে কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রতিনিধিদের আশ্বাস দেওয়ার কয়েকদিন পর এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই ভাস্কর্য সরানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের। এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাসীন দলের প্রচার সম্পাদক বলেছেন:

“সুপ্রিম কোর্ট একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তা সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে এই ভাস্কর্য থাকবে কী থাকবে না, এটা একান্তই সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার।”

হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির একটি ছিল দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন বন্ধ করা। হয়তো ভবিষ্যতে তারা দেশের অন্য বিভিন্ন ভাস্কর্য, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সেসবের অপসারণও দাবি করতে পারে। কিন্তু যুক্তিনির্ভর মানুষ জানেন এসব ভাস্কর্য হল শিল্পকর্ম। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক শৈল্পিক কাজের মাধ্যমে এই ধরনের ভাস্কর্যে তুলে ধরা হয়েছে। মূর্তিপূজা করার জন্য এসব ভাস্কর্য নির্মাণ করে পথে স্থাপন করা হয়নি, সেটা সাধারণ বুদ্ধি দিয়েও বোঝা সম্ভব।

ভাস্কর্য অপসারণের কথা বললে বিরোধিতা করা হয় শিল্পকর্মের। আর শিল্পকর্ম প্রত্যাখ্যান করার অর্থ মানুষের নান্দনিক বোধ, সৃজনশীলতা আর উদ্ভাবনী শক্তি বাতিল করে দেওয়া। সংকীর্ণ, অন্ধচিন্তা মনে লালন করলে কোনো শিল্পকর্মের সৌন্দর্যই বোঝা সম্ভব নয়। আর কোনো শিল্পকর্ম তো ধর্মীয় আচার পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কারণ গভীর ও আন্তরিক বিশ্বাস নিয়ে যে ধর্মীয় আচার পালন করা হয় তা তো ঠুনকো কোনো ব্যাপার নয় যে, শিল্পকর্মের উপস্থিতি থাকলেই সেই আচার পালন বিঘ্নিত হবে।

পাশ্চাত্যের অনেক শহরের পথে নানা ধরনের ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন শিল্পকর্ম দেখা যায়। সেসব শহরেও আছে বিভিন্ন মসজিদ। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা বহুদিন ধরেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন সেসব স্থানে এবং তারা ধর্মানুরাগী। তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন তো বিঘ্নিত হচ্ছে না। যদি হত তাহলে কি তারা যুগের পর যুগ সেসব শহরে বসবাস করতেন?

সৌন্দর্য অনুধাবনের জন্য রুচিশীল মন প্রয়োজন। কার্ল মার্কস বলেছিলেন:

“যে কানে সুরবোধ নেই সেই কানে কি মনোগ্রাহী সঙ্গীতের মাধুর্য পৌঁছুবে কখনও?”

একইভাবে বলা যায় যার সৌন্দর্য বোঝার মন নেই, সেই মানুষ কি আকাশ, নদী, অরণ্য বা পাখির উড়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করতে পারবে? মন অনুভূতিশীল না হলে কি শক্তিশালী কোনো উপন্যাস বা কবিতা কেউ পাঠ করবে বা পড়ার পর তার মন মানবিকতার বোধে আন্দোলিত হবে? এখানেই সৌন্দর্যবোধ আর সংকীর্ণ, উগ্র মানসিকতার পার্থক্য।

সাম্প্রদায়িক চিন্তায় আচ্ছন্ন মানুষ গল্প বা কবিতা বিচার করবে লেখার মান দিয়ে নয় বরং তা মুসলমান লেখক না হিন্দু লেখক লিখেছে সেই অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। মুসলমান পাঠকরা তাই পড়বেন না শেকসপিয়ার আর রবীন্দ্রনাথের লেখা। আর ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন বা আল-ফারাবির দর্শন হিন্দু আর খ্রিস্টান পাঠকরা পাঠ করা থেকে বিরত থাকবেন। সংকীর্ণমনাদের যুক্তিহীন ভাবনার অসারতা বুঝতে তাই সমস্যা হয় না। আর ধর্মান্ধ চিন্তার উত্থান ঘটলে যেহেতু বিপদগ্রস্ত হয় যুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা আর সৌন্দর্যবোধ, তাই প্রগতিশীল মানুষ সবসময় এগিয়ে আসেন অন্ধচিন্তা আর সংকীর্ণতা প্রতিরোধের জন্য।

 

Michelangelo's statue of David - 111
পাশ্চাত্যের অনেক শহরের পথে নানা ধরনের ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন শিল্পকর্ম দেখা যায়, সেসব শহরেও আছে বিভিন্ন মসজিদ

 

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমালোচনা শুরু হওয়ার পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন যে, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কোনো জোট বা আপস হয়নি। ওবায়দুল কাদের সেই সময় বলেছেন আরও একটি কথা:

“বাস্তবতাই হচ্ছে প্রগতিশীলতা। বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে কেউ প্রগতিশীল হতে পারে না।”

বাস্তবতার রূপ তো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং সমাজে বহু আলোকিত মানুষের উপস্থিতি যেমন বাস্তবতা হতে পারে তেমনি কখনও অর্থনৈতিক শোষণ, যুক্তিহীনতার অন্ধকার, গণহত্যা, স্বৈরশাসনের অত্যাচারও তো বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। সমাজের প্রগতি আর গণমানুষের মুক্তির জন্য বিপদ সৃষ্টি করা সেই নেতিবাচক বাস্তবতাও কি তাহলে প্রগতিশীলতা? না, সেই অত্যাচারী আর অন্ধকারাচ্ছন্ন বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্যই প্রগতিশীলতা নয়।

বিদ্যমান বাস্তবতায় যুক্তি-বিবর্জিত অন্ধচিন্তায় আচ্ছন্ন মানুষদের উপস্থিতি দেখলেও রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য তাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা কখনও প্রগতিশীল আচরণ নয়। বরং যদি দেখা যায় সাম্প্রতিক বাস্তবতা প্রগতি, যুক্তিবোধ আর মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, বেড়ে চলেছে নৈতিক আর রাজনৈতিক অধঃপতন, তখন সেই নেতিবাচক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, প্রতিরোধ অব্যাহত রাখাই প্রগতিশীলতা। সাম্প্রদায়িক এবং যুক্তিহীন চিন্তা ধারণ করে যারা প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে থাকে বর্তমান সময়ে তাদের উপস্থিতি দেখলেও তাদের খুশি রাখার চেষ্টা করা প্রকৃত প্রগতিশীলদের কাজ নয়।

পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ করে দেওয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসরদের পরিচালিত নির্মম গণহত্যা, তারপর স্বাধীন দেশে সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন, ক্ষমতায় যুদ্ধাপরাধীদের অবস্থান– সবই তো ছিল বাস্তবতা। এমন বাস্তবতার সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলের কথা বলে যারা তাল মিলিয়ে চলেছে তারা কি প্রগতিশীল? না, তারা প্রগতিশীল নয়। বরং প্রগতিশীল শক্তি এমন বাস্তবতা প্রতিরোধ করেছে সবসময়।

সমাজে যদি ধর্মীয় অন্ধত্ব আর সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিস্তার দেখা যায়, তা প্রতিরোধ না করলে সমাজ তো ঢেকে যাবে যুক্তিহীনতার অন্ধকারে। প্রগতিশীলতা তাই প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপক্ষে থাকে সবসময়। ইংরেজিতে appeasement বলে একটি শব্দ আছে। এর অর্থ হল উগ্রচিন্তা ধারণ করা কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীকে বিভিন্ন ছাড় প্রদান করে তাদের শান্ত রাখার রাজনৈতিক কৌশল। যারা এই কৌশল ব্যবহার করে তাদের appeaser বলা হয়।

প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত স্যার উইনস্টন চার্চিল তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এই appeaser দের। একটি উপমা দিয়ে তিনি বলেছিলেন:

“An appeaser is one who feeds a crocodile hoping it will eat him last.”

অর্থাৎ উগ্রবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে ছাড় দেওয়া কুমিরকে খাওয়ানোর মতো– এমন চিন্তা করে যে খাওয়ানো হলে কুমির সহজে আক্রমণ করবে না।

চার্চিল এমন মন্তব্য করেছিলেন হিটলারের উগ্রনীতির সামনে নতজানু ইউরোপীয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে। সেই নেতারাও তখন হিটলারকে তোয়াজ করছিলেন এই কথা বলে যে, এটাই নাকি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু চার্চিলের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। হিটলারের নাৎসি বাহিনী তাদের উগ্র, বিধ্বংসী নীতি নিয়ে ছাড় দেয়নি তাদের মতের বিপরীতে থাকা কোনো রাষ্ট্রকেই।

চার্চিলের এই কথাটি প্রগতিশীল-প্রতিক্রিয়াশীলদের সম্পর্ক বোঝাতেও ব্যবহার করা যায়। যেহেতু এই দুই গোষ্ঠীর চিন্তাধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন তাই প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিরোধ না করে ছাড় দেওয়া হলে প্রগতিশীলদের অবস্থান শক্তিহীন আর নড়বড়ে হবে। আর ছাড় পেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, উগ্রবাদীরা হয়ে উঠবে ক্ষমতাশালী। যে প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তারা ছাড় দিচ্ছেন চার্চিলের ভাষায়:

“সেই পরিস্থিতি নিরাপদ হয়ে উঠবে না। বরং তা হয়ে উঠবে আরও ভয়াল, বিপদ হবে আরও বিস্তৃত।”

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেছেন:

“কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতির পর হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী এক জনসভায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটা লাভজনক নয় কি?”

এই কথার অর্থ কি এমন হল না যে, হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে নেওয়ার পরই তাদের আমির জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন? তাহলে তো অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, তাদের সন্তুষ্ট করা হলে কেবল তখনই তারা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে, মন থেকে তারা জঙ্গিবাদের মতো অন্ধত্ব ও দানবীয় কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে না। তাই যদি হয় তাহলে শাহ আহমদ শফী আর তার অনুসারীদের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাখার জন্য সামনের দিনগুলিতে তাদের আরও কত দাবি একের পর এক মানতে হবে ক্ষমতাসীন দলকে?

 

Allama Shafi - 111
এই কথার অর্থ কি এমন হল না যে, হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে নেওয়ার পরই তাদের আমির জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন?

 

জঙ্গিবাদের মতো অন্যায় মন থেকে ঘৃণা না করলে কেবল স্বার্থপ্রাপ্তির পর জঙ্গিবাদ-বিরোধিতা কতটা কার্যকর আর আন্তরিক হবে? ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের পর সচেতন নাগরিকদের মনে এই প্রশ্নগুলি তৈরি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।

দেশের সচেতন নাগরিকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী এবং প্রগতিশীলতা কী তা জানেন। আর এই দিকগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সচেতন মানুষদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্মান অক্ষুণ্ন রাখতে চাই তাহলে আমাদের অনুসরণ করতে হবে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের যারা নিজ স্বার্থের জন্য আদর্শবাদিতা বিসর্জন দেননি, সংগ্রাম করেছেন অত্যাচারী ও সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি, তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই দেশে সমুন্নত রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনে ধারণ করে যারা রাজনীতি করছেন সেই রাজনীতিবিদদের তাই খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে, তাদের কথা ও কাজ যেন তরুণ প্রজন্মের মনে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা সম্পর্কে কোনোরকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে।

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন:

“তরুণদের ধোঁকা দেওয়া সহজ, কারণ তরুণরা খুব দ্রুত আশা করে।”

তরুণদের মনে যেন যুক্তিবোধ তৈরি হয়, তারা যেন নিজ সংস্কৃতির স্বতন্ত্রতা আর ইতিহাসের বিভিন্ন দিক গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং অন্ধ আর নীতিহীন লোভী চিন্তা থেকে যেন তারা দূরে থাকে। তাদের মনে সেই আদর্শবাদিতা তৈরি করার দায়িত্ব সফলভাবে পালনের উপরই নির্ভর করছে দেশের মঙ্গলময় ভবিষ্যৎ।

এই দায়িত্ব পালন করতে হবে বয়োজ্যেষ্ঠদের যাদের মধ্যে আছেন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, আইনজীবীসহ আরও বিভিন্ন পেশার মানুষ। বয়োজ্যেষ্ঠরা নতুন সময়ের মানুষদের আলো আর অন্ধকার, যুক্তি আর অন্ধচিন্তার পার্থক্য কতটা কার্যকরভাবে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং এই প্রশ্নটির উত্তর আমাদের সচেতনভাবে সন্ধান ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অ্যারিস্টটলের গুরু বিখ্যাত গ্রিক চিন্তাবিদ প্লেটোর একটি উক্তি দিয়েই লেখা শেষ করি–

“যে শিশু অন্ধকার দেখে ভীত হয়ে ওঠে তাকে আমরা সহজেই ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হল সেটি যখন বয়োজ্যেষ্ঠরা আলোর কাছে যেতে ভয় পায়।”

মনীষী প্লেটোর এই বক্তব্যটি উপলব্ধি করতে পারলেই আমাদের উপকার হবে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

নাদির জুনাইদঅধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

২৪ Responses -- “বাস্তবতা প্রগতিশীলতা নয়, বাস্তবতায় বিদ্যমান অন্ধচিন্তা প্রত্যাখ্যানই প্রগতিশীলতা”

  1. Rasha

    The write-up is so meaningful and eye opening. But Alas! again I am depressed as some people even don’t have EYE! Only dead don’t know and don’t need to ask questions but living human being must need to ask questions and need logic. Blindness covered our society and some people calls it Religion!!! But people need to know religion of Religions,I mean pithy/ nutshell of religions and that is only humanity. Humanization is a process and people hardly have that knowledge to follow that process. No particular religion could show that path,it needs amalgamation of all religion and finally logic,which only could guide us for having peace.

    Reply
  2. জাবেদ

    খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান,শিক্ষা ওচিকিৎসা এই মৌলিক চাহিদা গুলো পূরন হলে আপনি কোন মানুষকে ভালো উপদেশ দিলে সে সহজেই আপনার কথা শুনবে, অন্যথায় আপনার কথা তার বোধগম্য হবে না। আইনস্টাইন,বোর, ডাল্টন,নিউটন উনারা এমন সবকিছু উদ্ভাবন করেছেন যা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অনেকবেশি অবদান রেখেছে।তাই তাদের কাজগুলো আমরা উদ্ভাবনীশক্তি বা শিল্পকর্ম যা ই বলি না কেন সেটাই উপযুক্ত হবে।কিন্তু আমরা যে ভাস্কর্য বানানোকে শিল্পকর্ম বলছি এটা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটা সবাই জানে। ভাস্কর্য যদি ন্যায়ের প্রতীক হয় তাহলে বলতে হবে যে দেশে যত বেশি ভাস্কর্য আছে সে দেশ ততবেশি ন্যায়পরায়নশীল। এবং সে দেশই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী,উন্নত এবং সমৃদ্ধশালী দেশ।কিন্তু না, বাস্তবে তো এমনটা হচ্ছে না।সুতরাং ভাস্কর্য কখনোই ন্যায়ের প্রতীক হতে পারেনা সেটা সাধারন জ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়।

    Reply
    • নাদির জুনাইদ

      ভাস্কর্য ন্যায়ের প্রতীক তা কী কখনো কেউ বলেছে? আপনি ‘সাধারণ জ্ঞান’-এর কথা বললেন তো? সাধারণ জ্ঞান ব্যবহার করলে তো এই সহজ ব্যাপারটি বোঝা সম্ভব যে ন্যায়বিচারের যে ধারণা সেটি প্রতীকীভাবে ভাস্কর্যে তুলে ধরা হয়েছে। ‘লেডি জাস্টিস’-এর যে ভাস্কর্য সেখানে হাতে দাঁড়িপাল্লা আর তরবারি, আর চোখ বাঁধা কী নির্দেশ করে? তার সাথে ন্যায়বিচারের ধারণার কী মিল সেটা চিন্তা করেন। দেশে পায়রার সংখ্যা বেড়ে গেলেই কী শান্তি চলে আসবে? আসবে না তা তো শিশুও বুঝবে। তাহলে পায়রাকে আমরা শান্তির প্রতীক হিসেবে ধরি কেন? কারণ শান্তির ধারণাটি প্রতীকীভাবে পায়রার মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রতীকীভাবে তুলে ধরার ব্যাপারটি শৈল্পিক। আর শৈল্পিক বিষয়টি আসে মানুষের চিন্তা থেকে। মানুষ তো আর মুরগি বা ছাগল নয় যে তার চিন্তা করার দরকার নেই। মানুষ লেখাপড়া করে এজন্যই কারণ সে মুরগি বা ছাগল নয় আর প্রকৃত লেখাপড়া তাকে চিন্তা করতে শেখায়।

      আপনি খাওয়া-পরর কথা বললেন তো? হ্যাঁ খাওয়া-পরার মৌলিক চাহিদা তো অবশ্যই পূরণ করতে হবে। কিন্তু চে গেভারা একবার একটি কথা বলেছিলেন তা হলো যদি দুবেলা মানুষকে দুমুঠো খাওয়ানোই একমাত্র সমস্যা হয় সেক্ষেত্রে একটি শোষণমূলক সমাজব্যবস্থাও সেই সমস্যা দূর করতে পারে। সেখানেও মানুষকে দুবেলা বা চারবেলাই খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। কিন্তু শোষণ, দুর্নীতি, অন্যায় বন্ধ হবে না। কিছু মানুষ অনেক ধনী থাকবে, আর বহু মানুষ থাকবে দরিদ্র। তাই দরকার মানুষ যেন খাওয়া-পরার পাশাপাশি গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায় সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ মানুষ তো ছাগল বা মুরগি না যে সে কেবল খাবে আর ঘুমাবে। তার চিন্তা করাও প্রয়োজন। আর মানুষ চিন্তা করে বলেই সে সৃষ্টি করতে পারে শিল্প। মানুষ পশুপাখির স্তরে নেমে গেলে তো আর সে শিল্প বুঝবে না। বা তৈরিও করবে না। কেবল বিজ্ঞান আর বাণিজ্য দিয়েই তো মানুষের জীবন চলে না। মানুষ তো ভালোবাসে, মানুষ হাসে, কষ্ট পায়, মানবিকতা দিয়ে অসাধারণ কাজ করে, সৎসাহসের মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করে। এই অনুভূতি না থাকলে কেবল বিজ্ঞান আর বাণিজ্য নিয়ে থাকলে মানুষের জীবন তো আর মানবিক থাকবে না, তা হয়ে যাবে যান্ত্রিক। আর এই মানবিক আর শৈল্পিক অনুভূতির জন্যই মানুষ সঙ্গীত শোনে, ছবি দেখে, কবিতা পড়ে। যাদের এই নান্দনিক বোধ নেই তাদের সূক্ষ্ণ চিন্তা করার ক্ষমতাও নেই। তাদের জীবন যন্ত্রের মতো। যেখানে লাভ আর লোভ নিয়ে তাদের ভাবনা আর বসবাস। আর তাদের মন আর যুক্তির আলোয় আলোকিত হয় না কারণ তারা গভীরভাবে চিন্তাই করে না।

      দুঃখজনক এটাই যে যারা যথেষ্ট সুবিধাভোগী, যারা দুই বেলার জায়গায় ছয় বার খেতে পারে, যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও আছে সেই রকম অনেক মানুষও গভীরভাবে চিন্তা করে না। তাদের মনেও যুক্তি নেই, আছে অন্ধচিন্তা। এটাই প্রমাণ করে যে কেবল খাদ্য বস্ত্রের অভাব মিটলেই যে মানুষ ভাল উপদেশ শুনবে তা নয় যাদের অনেক আছে তারাও যদি স্বেচ্ছায় নিজেদের কানে দেয়াল তুলে রাখে, আর মনের জানালা বন্ধ করে রাখে সেক্ষেত্রে তারা যৌক্তিক বক্তব্য শুনবে না। যুক্তি অকাট্য হলেও ইচ্ছা করে সেই যুক্তির বিরোধিতা করবে। সমাজে অন্ধকার তৈরি হয় এমন যুক্তিহীনতার জন্যই।

      Reply
      • সরকার জাবেদ ইকবাল

        চমৎকার জবাব। ‘বোধ’ না থাকলে ‘উপলব্ধি’ হয় না। আর, উপলব্ধি না হলে চিন্তার দ্বার খোলে না। কাজেই, নির্বোধের দরজায় কড়া নেড়ে কোন লাভ নেই। যারা ‘সিলেক্টিভ পারসেপসন’-এ আটকে থাকেন তারা কোনদিনও ঘরে নির্মল হাওয়া ঢুকতে দেবেন না, – এটাই স্বাভাবিক। শিল্প আর নান্দনিকতাবোধতো অনেক দূরের কথা। আপনার পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় রইলাম নাদির সাহেব।

      • নাদির জুনাইদ

        জনাব সরকার জাবেদ ইকবাল,

        আপনার মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।

  3. সুমি

    লেখকের সাথে সহমত পোষণ করছি । নেতৃ স্থানীয় ব্যক্তিরা কঠোর হলে ওনাদের তোষামোদের প্রয়োজন হতো না ।

    Reply
  4. shahriaf

    কয়েকদিন আগে আমার আম্মা বলতেছিলেন ” দেশতো এখন অনেক সভ্য হয়ে গেছে , আরো হয়ে যাবে আস্তে আস্তে । আমরা আগে দেখতাম তোদের মত ছেলেরা একদমই মসজিদে যাইতো না , এখন তো ছেলেরাই বড়দের চেয়ে বেশি মসজিদে যায়। মেয়ে মহিলারা আগে শাড়ী পরে বাইরে যেতো পর্দা একদমই কম ছিলো । এখন তো কলেজের মেয়েরা প্রায় সবাই ই বোরকা পড়ে। আগে তো শুক্রবার ছাড়া মসজিদে মানুষ খুব কম যাইতো। ”
    ইনশাল্লাহ আরো বদলে যাবে । তো মূর্তি বানাবো যদি সৃজনশীলতা আর উদ্ভাবনী শক্তি বাড়াতো তাহলে তো আইনস্টাইন, ডাল্টন, বোর, জবস, জাকারবার্গরা তাদের কর্মে মূর্তি বানানোকেই প্রাধান্য দিতো তাতে তারা আরো বেশি উদ্ভাবনী শক্তি পেতো ।

    Reply
    • নাদির জুনাইদ

      আপনার মন্তব্য পড়েই বুঝতে পারছি কেমন যুক্তি(!) দিয়ে আপনি কথা বলেন!!
      আইনস্টাইন বা জাকারবার্গ বা নিউটন বা স্টেফান হকিং ভাস্কর্য বানাবেন কেন? তারা কী মাইকেলঅ্যাঞ্জেলো, ডনাটেলো, রোদা বা ব্রাঁকুসির মতো শিল্পী? একজন বৈজ্ঞানিকের উদ্ভাবনী শক্তি তো ভাস্কর্য বানাবার জন্য না, বা একজন লেখকও ভাস্কর্য বানান না। কিন্তু তারা ভাস্কর্য বানান না বলে একজন চিত্রশিল্পী বা ভাস্করের কাজ অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল? যদি যুক্তি দিয়ে ভাবতে সক্ষম হতেন তাহলে বুঝতেন বৈজ্ঞানিক, লেখক এবং ভাস্করের উদ্ভাবনী শক্তির রূপ আলাদা। একজন বৈজ্ঞানিক ভাস্কর্য বানাবেন না আর তাই বলেই ভাস্কর্যের মতো শিল্প মূল্যহীন হয়ে যাবে এমন কথা কেবল একজন জ্ঞানহীন মানুষই বলতে পারে। বৈজ্ঞানিক তো চাইলেও ভাস্কর্য তৈরি করতে পারবেন না। কাজেই প্রতিটি কাজের ক্ষেত্র আলাদা। সাধারণ বুদ্ধি দিয়েই তা বোঝা যায়। আর যদি মন বদ্ধ রেখে বুদ্ধি সৃষ্টির সুযোগ কেউ বন্ধ করে সেক্ষেত্রে আর কী বলা যাবে। আর একটি কথা, আইনস্টাইন বা জাকারবার্গ কখনো ভাস্কর্য ধ্বংস করে দেয়া হোক এমন কথা বলেছেন? নাকি তারা বলেছেন তাদের কাজের চেয়ে ভাস্কর এবং চিত্রশিল্পীর কাজ কম উদ্ভাবনী?
      যাদের নাম বলেছেন তারা বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। আর বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ সংকীর্ণ চিন্তার হয় না।

      Reply
    • সৌমিন শাহ্‌রিদ

      আইনস্টাইন, ডাল্টন, বোর, জবস, জাকারবার্গের ছাড়াও আর একজন আছেন যার নাম নেপোলিয়ন, চেনেন??
      তো নেপোলিয়নের একটা উক্তি আছে “তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দিব”। কিছু মনে করেন না।

      আপনি আইনস্টাইনের কথা বললেন না? আপনি কি জানেন আইনস্টাইন খুব ভাল বেহালা বাজাতেন? তাঁর স্ত্রী এলসা একবার বলেছিলেন যে তাঁর বেহালায় মোৎযার্ট শুনেই তিনি তাঁর প্রেমে পড়েন।

      মানুষের ভেতরের যে শৈল্পিক চেতনা রয়েছে তার আশির্বাদেই আজ পৃথিবী এই পর্যায়ে এসেছে আর যদি তা না থাকত তাহলে সভ্যতার অগ্রগতি কখনোই হতো না।

      প্রাণী হিসেবে আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ মূলত শরীরবৃত্তীয় চাহিদা মেটানো অর্থাৎ খাদ্য সংগ্রহ করা, তা খাওয়া এবং বিশ্রাম-নিদ্রার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় খোঁজাই হচ্ছে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য মূল কাজ যা আর দশটা প্রাণী করে কিন্তু আদি মানুষের অবধারণগত বিবর্তনের ফলে আমাদের মধ্যে প্রবণতা দেখা যায় ‘অপ্রয়োজনীয়’ কাজ করা (জৈবিক কাজের বাইরের কাজই এখানে অপ্রয়োজনীয় কাজ বোঝানো হচ্ছে)। আমাদের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যবোধই আমাদের অপ্রয়োজনীয় কাজটি করার তাড়না যোগায়।

      মানুষ বাদেও অন্যান্য কিছু প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির সুন্দর করে নকশা করার প্রবণতা যদিও তা সীমিতভাবে। তবে মানুষের এই দিকটি প্রকট।

      আলতামিরা, লাসকো, আইজিস এর গুহাচিত্রগুলো দেখলে অবাক হতে হয় – বৈরী পরিবেশে অনিশ্চিত জীবনযাপনের মধ্যেও মানুষ কিসের তাড়নায় সেই শিল্পকর্মগুলো করেছিল! মানুষের শিল্পবোধ মানুষকে তাড়িত করে অপ্রয়োজনীয় কাজ করতে, গৎবাঁধা ব্যবস্থার বাইরে যেতে।

      ভেবে দেখুন , নিউটন তাঁর দারিদ্র্যভরা জীবনে অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য চেষ্টা না করে গাছ থেকে আপেল পড়ার সৌন্দর্যকে অবলোকন করে তার প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন দেখেই আমরা “Theory of Gravity” পেয়েছি। আপেল তো নিউটনের গাছের নিচে বসার আগেও পড়েছে , সেটার যে শিল্প রয়েছে সেটা তো অন্য কারো চোখে পড়লো না। পড়লো কার ? একজন বিজ্ঞানীর। তাও কী – গাছ থেকে একটা আপেল পড়া থেকেই চলে আসলো মহাকর্ষীয় তত্ত্ব। এটি শুধুই সম্ভব হয়েছে তাঁর শিল্প চেতনার কারণে।

      নিউটন তাঁর দারিদ্য দূর করার জন্য যদি বিবিএ পড়তো তাহলে কি আর আমরা এটা পেতাম? বলে দেখুন তো আপনাদের শফি হুজুরকে এরকম একটা কিছু করে দেখাতে, পারবে??

      মানুষের শিল্পবোধই মানুষের মধ্যে উদ্ভাবনীশক্তি সঞ্চার করে আর এই শক্তিই পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে এক যুগ থেকে অন্য যুগে। এই শিল্পবোধের নানা আকার থাকে, নানা প্রকৃতি থাকে। কারো শিল্পবোধ সজ্জিত হয় ক্যানভাসের উপর রঙ্গে, কারো পাথরের ভাস্কর্যে, কারোটা যন্ত্রে, কারোটা কোন তত্ত্বে। তবে নিঃসন্দেহে প্রত্যেকটি ফর্মই একেকটি শিল্প।

      আর যদি পৃথিবী থেকে শিল্প হারিয়ে যায় , নিশ্চিত থাকুন পৃথিবীর ধ্বংস হতে খুব সময় লাগবে না। আর এদের বাড়াবাড়ি যেভাবে বাড়ছে তাতে তো মনে হয় ঐ ধ্বংসের ব্রত নিয়েই এরা জন্মেছে।

      Reply
    • সৌমিন শাহ্‌রিদ

      আইনস্টাইন, ডাল্টন, বোর, জবস, জাকারবার্গের ছাড়াও ইতিহাসে আর একজন আছেন যার নাম নেপোলিয়ন, চেনেন??
      তো নেপোলিয়নের একটা উক্তি আছে “তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দিব”। কিছু মনে করেন না।

      আপনি আইনস্টাইনের কথা বললেন না? আপনি কি জানেন আইনস্টাইন খুব ভাল বেহালা বাজাতেন? তাঁর স্ত্রী এলসা একবার বলেছিলেন যে তাঁর বেহালায় মোৎযার্ট শুনেই তিনি তাঁর প্রেমে পড়েন।

      মানুষের ভেতরের যে শৈল্পিক চেতনা রয়েছে তার আশির্বাদেই আজ পৃথিবী এই পর্যায়ে এসেছে আর যদি তা না থাকত তাহলে সভ্যতার অগ্রগতি কখনোই হতো না।

      প্রাণী হিসেবে আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ মূলত শরীরবৃত্তীয় চাহিদা মেটানো অর্থাৎ খাদ্য সংগ্রহ করা, তা খাওয়া এবং বিশ্রাম-নিদ্রার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় খোঁজাই হচ্ছে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য মূল কাজ যা আর দশটা প্রাণী করে কিন্তু আদি মানুষের অবধারণগত বিবর্তনের ফলে আমাদের মধ্যে প্রবণতা দেখা যায় ‘অপ্রয়োজনীয়’ কাজ করা (জৈবিক কাজের বাইরের কাজই এখানে অপ্রয়োজনীয় কাজ বোঝানো হচ্ছে)। আমাদের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যবোধই আমাদের অপ্রয়োজনীয় কাজটি করার তাড়না যোগায়।

      মানুষ বাদেও অন্যান্য কিছু প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির সুন্দর করে নকশা করার প্রবণতা যদিও তা সীমিতভাবে। তবে মানুষের এই দিকটি প্রকট।

      আলতামিরা, লাসকো, আইজিস এর গুহাচিত্রগুলো দেখলে অবাক হতে হয় – বৈরী পরিবেশে অনিশ্চিত জীবনযাপনের মধ্যেও মানুষ কিসের তাড়নায় সেই শিল্পকর্মগুলো করেছিল! মানুষের শিল্পবোধ মানুষকে তাড়িত করে অপ্রয়োজনীয় কাজ করতে, গৎবাঁধা ব্যবস্থার বাইরে যেতে।

      ভেবে দেখুন , নিউটন তাঁর দারিদ্র্যভরা জীবনে অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য চেষ্টা না করে গাছ থেকে আপেল পড়ার সৌন্দর্যকে অবলোকন করে তার প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন দেখেই আমরা “Theory of Gravity” পেয়েছি। আপেল তো নিউটনের গাছের নিচে বসার আগেও পড়েছে , সেটার যে শিল্প রয়েছে সেটা তো অন্য কারো চোখে পড়লো না। পড়লো কার ? একজন বিজ্ঞানীর। তাও কী – গাছ থেকে একটা আপেল পড়া থেকেই চলে আসলো মহাকর্ষীয় তত্ত্ব। এটি শুধুই সম্ভব হয়েছে তাঁর শিল্প চেতনার কারণে।

      নিউটন তাঁর দারিদ্য দূর করার জন্য যদি বিবিএ পড়তো তাহলে কি আর আমরা এটা পেতাম? বলে দেখুন তো আপনাদের শফি হুজুরকে এরকম একটা কিছু করে দেখাতে, পারবে??

      মানুষের শিল্পবোধই মানুষের মধ্যে উদ্ভাবনীশক্তি সঞ্চার করে আর এই শক্তিই পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে এক যুগ থেকে অন্য যুগে। এই শিল্পবোধের নানা আকার থাকে, নানা প্রকৃতি থাকে। কারো শিল্পবোধ সজ্জিত হয় ক্যানভাসের উপর রঙ্গে, কারো পাথরের ভাস্কর্যে, কারোটা যন্ত্রে, কারোটা কোন তত্ত্বে। তবে নিঃসন্দেহে প্রত্যেকটি ফর্মই একেকটি শিল্প।

      আর যদি পৃথিবী থেকে শিল্প হারিয়ে যায় , নিশ্চিত থাকুন পৃথিবীর ধ্বংস হতে খুব সময় লাগবে না। আর এদের বাড়াবাড়ি যেভাবে বাড়ছে তাতে তো মনে হয় ঐ ধ্বংসের ব্রত নিয়েই এরা জন্মেছে।

      Reply
  5. সৈয়দ আলি

    এই নিবন্ধটির যে দুর্বলতাটুকু প্রকট, তা’ হলো হেফাজতকে তোষন করার পেছনে যে একটি রাজনীতি আছে তা উল্লেখ না করা। হেফাজতও আচমকা জনমায়নি, সরকারও তাদের দলে টানার চেষ্টা আজ থেকে করেনি। এমনকি রাষ্ট্রীয় কর্মচারী চট্টগ্রামের ডিআইজিকেও হেফাজতকে পক্ষে আনার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিলো।

    ‘হয়তো ভবিষ্যতে তারা দেশের অন্য বিভিন্ন ভাস্কর্য, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সেসবের অপসারণও দাবি করতে পারে।’- হয়তো নয়, নিশ্চিত থাকুন যে হেফাজতের নামে উগ্র ওয়াহাবীদের সুযোগ দিতে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নও রাখবেনা।

    Reply
    • নাদির জুনাইদ

      আপনার মন্তব্যর জন্য ধন্যবাদ।

      সবার লেখার ধরন এক রকম নয়। কোনো লেখক (কোনো চলচ্চিত্রকারও) সরাসরি তাদের তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করেন। আবার কোনো লেখক বা চলচ্চিত্রকার বা কবি খোলাখুলি সমালোচনা প্রকাশের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক উদাহরণ এবং ব্ক্তব্য তুলে ধরেন। সেখানে থাকে অনেক স্পষ্ট ইঙ্গিত। এর মাধ্যমে পাঠককে চিন্তা করার এবং উপস্থাপিত বক্তব্যের মধ্যে থাকা সমালোচনা অনুধাবন করার সুযোগ দেয়া হয়। লেখক চান পাঠক গভীরভাবে চিন্তা করার মধ্য দিয়ে সেই ইঙ্গিত বুঝবেন। আমি এই দ্বিতীয় ধারাটিই পছন্দ করি।

      আমার লেখায় আমি appeasement প্রসঙ্গটি এনেছি যা একটি ‘রাজনীতি’ ইঙ্গিত করতেই ব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবতাসম্মত বলে কেউ এই কৌশল ব্যবহার করে তাও ইতিহাসের আলোকে বলা হয়েছে। এর সাথে বর্তমানের কী সম্পর্ক তা সচেতন পাঠক বুঝতে পারবেন। পাঠকদের চিন্তা করার সুযোগ দেয়াও জরুরি। লেখক নিজে সব বলে দিলে পাঠকের সক্রিয়ভাবে চিন্তা করার সম্ভাবনা কমে যায় বলেই আমি মনে করি।

      আর আমার লেখায় আমি একটি অ্যাকাডেমিক ধাঁচ রাখাই পছন্দ করি। তাই কখনো ‘হয়তো’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতেই হয়। এই ‘হয়তো’-র অর্থ কী তা পুরো লেখা পাঠ করলে সচেতন পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যেহেতু আমি আমার লেখা কোনো রাজনৈতিক প্যামফ্লেটের মতো করার পরিবর্তে অ্যাকাডেমিক রাখতে চাই তাই কিছু শব্দ (যেমন হয়তো) ব্যবহার করার প্রয়োজন থাকে।

      আপনাকে আবারো ধন্যবাদ।

      Reply
  6. সরকার জাবেদ ইকবাল

    আমাদের প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেন না, তিনি প্রগতিশীল নন, কিংবা প্রগতিশীল হয়েও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সঙ্গে হাত মেলান, – তাঁর মতো একজন বিজ্ঞ রাজনীতিক সম্পর্কে আমরা এ রকম কথা কেমন করে বলতে পারি? তাহলে তিনি এমন কি করেছেন যার জন্য আমরা শতমুখে তাঁর সমালোচনা করছি? এটা কি তাহলে তাঁর সুগভীর কোন রাজনৈতিক কৌশল যার পরিণতিতে রয়েছে অমিত অর্জনের সম্ভাবনা? নাকি, পরিণামে তিনি নিক্ষিপ্ত হবেন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে? আগাম কথা বলে লাভ নেই। সময়ই এসব প্রশ্নের জবাব দেবে।

    Reply
  7. আসিফ চৌধুরি

    দারুণ লিখেছেন, বিশেষত চার্চিলের মন্তব্যটি এক্ষেত্রে আমাদের উপলব্ধি করাটা খুব জরুরী (এবং প্লেটোর উক্তিটিও)।

    Reply
  8. Raton J Murmu

    Congratulations for this beautiful article.I think this one of the most relevant articles which gives us knowledge about what is culture,religion and fundamentalism. Above all we need to change our outlook or mentality. We should study about literature and history in order to know better ourselves. Nothing comes out of nothing. we hope so that there will be a beautiful country where will be no discrimination among people and they will live in peace and harmony by working for the common good for building a better Bangladesh.

    Reply
  9. Abdus Samad Azad

    প্রথম বাক্যটা এত বড় যে, আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। আর পড়তে ইচ্ছে করছে না। স্যরি…….

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—