farhad_ed (1)

গত শতকের তিন দশকের বেশি সময় আমাদের দেশের বাম-প্রগতিশীল রাজনীতির যিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র, তাঁর নাম বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই এখন অজানা। জীবনকালে যিনি হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী তৈরি করেছিলেন ধৈর্য্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে, মৃত্যুর তিন দশক পার না হতেই তাঁর নাম আজ বিস্মৃৃতপ্রায়। একজন সৎ ও আদর্শবাদী রাজনৈতিক নেতা মোহাম্মদ ফরহাদকে ভুলে থাকা আমাদের রাজনীতির দৈন্যদশারই প্রকাশ।

মোহাম্মদ ফরহাদ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি পঞ্চগড়-২ (বোদা-দেবীগঞ্জ) থেকে সংসদসদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসদসদস্য হিসেবে তিনি এক বছরের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ওই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, আকস্মিক মৃত্যু দেশ নিয়ে তাঁর যেসব স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি।

মোহাম্মদ ফরহাদ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৭৩ সালে। আমৃত্যু তিনি ওই পদে থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৩৮ সালের ৫ জুলাই তাঁর জন্ম। সে হিসেবে মাত্র ৪৯ বছরের জীবনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি যে ‘নায়ক’ হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন, এটা তাঁর বহুমাত্রিক উদ্যোগ ও সক্রিয়তার পরিচয় বহন করে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে তিনি সবসময়ই অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন।

পাকিস্তানের প্রায় পুরোটা সময় কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য কাজকর্ম ছিল নিষিদ্ধ। শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন, অত্যাচার-নির্যাতন উপেক্ষা করে হাতে গোনা কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতা পার্টির অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি ছিল তখন একটি ক্ষুদ্র পার্টি। সারা দেশে পার্টির সাংগঠনিক কাঠামোও ছিল না। কোনো কোনো জেলায় বিপ্লবের জন্য আত্মনিবেদিত কয়েকজন নেতা ছিলেন মাত্র। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর এই ক্ষুদ্র পার্টিকে একটি গণভিত্তিসম্পন্ন জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করার কৃতিত্ব মূলত মোহাম্মদ ফরহাদের। সংগঠক হিসেবে তাঁর প্রতিভা ও দক্ষতা ছিল অতুলনীয়।

রাজনীতিতে মোহাম্মদ ফরহাদের পারদর্শিতার বিষয়টি ফুটে ওঠে তাঁর মৃত্যুর পর আয়োজিত শোকসভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্য থেকেও। আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, “ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বিভিন্ন দলমতের লোককে একত্র করে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ব্যাপকভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগঠিত করার ব্যাপারে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না।”

ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন বলেছেন, “মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের মুহূর্তগুলোতে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।”

আওয়ামী লীগ নেতা মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন, “১৯৮৩ সাল থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঐক্য প্রচেষ্টায় তাঁর যে নিরলস উদ্যোগ– এটা মতাদর্শগতভাবে তাঁর বিপরীতে অবস্থানকারী লোকটিও অস্বীকার করতে পারছে না।”

১৯৬২ সালে আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী পর্যায়ে দেশে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক প্রতিটি আন্দোলনে মোহাম্মদ ফরহাদ নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে তিনি পালন করেছেন উদ্যোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। কমিউনিস্ট পার্টিকে বিকশিত করা, পার্টির গণভিত্তি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন গণসংগঠনের শক্তিবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলকে আন্দোলন-সংগ্রামে টেনে আনার জন্য তিনি অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এই ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তিনি ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের জয়লাভ নিশ্চিত করেছিলেন।

কমরেড ফরহাদ বলতেন–

“আমাদের রাজনীতিতে বিভেদের অনেক জায়গা আছে, কিন্তু ন্যূনতম ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না, সেটা বের করাই বড় কথা।”

এই ঐক্যসূত্র বের করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত যোগাযোগ গড়ে তুলতেন, তাদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার জন্য ক্রমাগত আলাপ-আলোচনা চালাতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ধৈর্য ও নিষ্ঠা ছিল প্রবাদতুল্য। তাঁর সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ যাদের হয়েছে তারা সবাই এটা অবশ্যই স্বীকার করবেন যে, কোনো কারণে তাঁর মতের সঙ্গে একমত পোষণ করা সম্ভব না হলেও তাঁর যুক্তির প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া ছিল একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। যারাই রাজনৈতিকভাবে তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তারাই জানেন যে তিনি কতটা রাজনীতি-অন্তপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতি ভিন্ন দলের নেতারাও শ্রদ্ধা জানাতে দ্বিধা করতেন না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসে তা থেকে উত্তরণের জন্য মোহাম্মদ ফরহাদ কুশলী ও দক্ষ ভূমিকা পালন করে সব মহলেই প্রশংসিত হয়েছেন। শুধু কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠন নয়, দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল রাজনীতিকে সংহত করার কাজেও তিনি সর্বাত্মক সহায়তা করেছেন। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতাদেরও তিনি নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন, সক্রিয় করেছেন। সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সময়োপযোগী নির্ভুল ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার কারণে একপর্যায়ে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অভিভাবক হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হয়েও তিনি যে প্রধান ভূমিকায় চলে এসেছিলেন, সেটা তাঁর যোগ্যতার কারণেই। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলায়, ঐক্য রক্ষায়, বিভেদ ও অনৈক্যের জট খুলতে, ১৫ দল ও ৭ দলের আন্দোলনের যুগপৎ ধারা তৈরি ও রক্ষায় তিনি অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়ে সব দলের নেতাকর্মীদের কাছে শ্রদ্ধা ও আস্থা অর্জন করেছিলেন। গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ দেশে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলে নির্বাচনী লড়াইয়ে স্বৈরাচারকে পরাস্ত করার কৌশল হিসেবে দুই নেত্রীর ১৫০:১৫০ আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে তিনি তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তার এই প্রস্তাবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এরশাদ তড়িঘড়ি সংবিধান সংশোধন করে একজন প্রার্থী পাঁচটির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না বলে বিধান প্রবর্তন করেছিলেন।

মৃত্যুর পর কেউ কেউ কমরেড ফরহাদকে আকণ্ঠ বিপ্লবপিয়াসী বলে উল্লেখ করেছিলেন।

সত্যি, তিনি সেই শৈশবে যখন রাজনীতির পাঠগ্রহণ করেছিলেন, তখন থেকে আমৃত্যু বিপ্লবের তথা সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের। রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার না হতে পারলে মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না– এই বিশ্বাস থেকেই তিনি একটি বড় পার্টি গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আশির দশকের মাঝামাঝি এসে তিনি ২০০০ সালের মধ্যে এ দেশে বিপ্লব সংঘটনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। বিপ্লবের লক্ষ্যে তিনি বিশেষ কোনো ছক কেটেছিলেন কি না, সেটা বিস্তারিত জানা না গেলেও বিপ্লবের জন্য সর্বতোভাবে প্রস্তুত হওয়ার লক্ষণ তার প্রতিটি কাজের মধ্যেই পাওয়া গেছে।

মোহাম্মদ ফরহাদ বলতেন, তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে সবসময় সবকিছু পরিকল্পিতভাবে হয় না, অপ্রত্যাশিতভাবেও অনেক কিছু ঘটে যায়। তাছাড়া আমাদের সমাজে অনেক দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল। এসব দ্বন্দ্ব নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগানোর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সে জন্য যেমন আদর্শনিষ্ঠ শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজন, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী-প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সাঁড়াশি আক্রমণ মোকাবেলার জন্য দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক শক্তির জোট গড়ে তোলাও কম দরকারি নয়। এ ধরনের বৃহত্তর জোটকে বিপদের সময় ছাতা হিসেবে ব্যবহার করাকে তিনি উত্তম কৌশল বলেই মনে করতেন। সে জন্য একদিকে তৃণমূল পর্যন্ত পার্টি-সংগঠনকে মজবুত করতে পরিকল্পিতভাবে ক্যাডার বা কর্মী নিয়োগ করেছেন। অন্যদিকে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য উপায় উদ্ভাবন করেছেন।

অকারণে কাউকে বৈরী করা নয়, কেবল চরম শত্রুপক্ষকে বাদ দিয়ে অন্যদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছেন। প্রতিনিয়ত তিনি সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। ‘ঐক্য ও সংগ্রাম’ ছিল তার একটি বড় কৌশল। তিনি এটাও বলতেন যে, সব মানুষকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে, সবার হাতে হাতে কমিউনিস্ট পার্টির লাল ঝাণ্ডা তুলে দিয়ে তারপর কোন দেশে আর বিপ্লব হয়েছে?

তিনি মনে করতেন, বিপ্লবের জন্য আসল প্রয়োজন হল নিখুঁত ও উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং দৃঢ়তার সঙ্গে তা কার্যকর করতে এগিয়ে যাওয়া। এভাবেই তিনি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নিখুঁতভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার জন্য খুঁটিনাটি বিষয়েও তিনি গভীর দৃষ্টি রাখতেন। তিনি যেভাবে সর্বক্ষণ রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, অন্যরাও তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলুক– এটা তিনি চাইতেন। তার মধ্যে একটি তাড়া ছিল, সে জন্য কিছুটা অস্থিরতাও হয়তো ছিল। কিন্তু তা বলে তিনি অদূরদর্শী বা হটকারি কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। তিনি নীতির প্রশ্নে দৃঢ় ছিলেন, কৌশলে ছিলেন নমনীয়।

মোহাম্মদ ফরহাদ একজন সক্রিয় মানুষ ছিলেন বলেই তার কিছু ভুলত্রুটিও অবশ্যই ছিল। কাজ করবেন অথচ ভুল করবেন না, তা কি কোনো মানুষের জীবনে সত্য হয়? কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোহাম্মদ ফরহাদের দুর্বলতা ছিল, ছিল সীমাবদ্ধতাও। সবসময় যোগ্য ও বিচক্ষণ লোকদের তিনি কাছে টেনেছেন, তা-ও হয়তো নয়। ইতিহাসের নায়ক হয়ে ওঠার জন্য দ্রুততার সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে তিনি সবসময় নির্ভুল সিদ্ধান্ত হয়তো নিতে পারেননি।

এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ‘খালকাটা’ কর্মসূচির প্রতি কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনদানের কথা। একজন মানুষের পক্ষে সবকিছু করা সবসময় সম্ভব হয় না। তবে তাঁর অধিকাংশ রাজনৈতিক কৌশল ও সিদ্ধান্ত যে একটি বড় পার্টির গড়ে তোলার জন্য সহায়ক ছিল– সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বল্প পরিসর জীবনে জাতীয় নেতার স্বীকৃতি লাভের গৌরব তিনি অর্জন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ছাড়া রাজনীতির সব মহলেই শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।

মূলধারার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে বাম রাজনীতির ঐক্য ও সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে তিনি দেশের রাজনীতিকে যে গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন সে বিষয়ে ব্যাপক পর্যালোচনা-মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। তাঁর অকাল মৃত্যু শুধু কমিউনিস্ট পার্টির জন্যই ক্ষতির কারণ হয়নি, দেশের রাজনীতিতেই বড় শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল। সে জন্যই তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে যখনই কোনো সংকট দেখা দিয়েছে তখনই অনেককে বলতে শোনা গেছে, “এখন ফরহাদ ভাই থাকলে নিশ্চয়ই একটি পথ বের করতে পারতেন।”

একজন কমিউনিস্ট নেতার প্রতি এই আস্থা ও নির্ভরতা এমনি তৈরি হয়নি, এটাকে খুব ছোট বিষয় বলে মনে করাও ঠিক নয়।

মোহাম্মদ ফরহাদ ছিলেন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী। রাজনীতি ছাড়া তিনি অন্য আর কিছুই করতেন না। রাজনীতি নিয়েই তিনি প্রতিদিনের ব্যস্ত সময় কাটাতেন। তাঁর সংসার ছিল, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা থাকলেও তাদের জন্য দেওয়ার মতো সময় তাঁর খুব একটা ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা তিনি সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়ে কৈশোরেই যে রাজনীতির পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, সে রাজনীতিতে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ তখন ছিল না।

তাই রাজনীতি করে তিনি গাড়িবাড়ির মালিক হননি। জেল-জুলুম-হুলিয়া উপেক্ষা করে মানুষের জন্য মানুষের মধ্যে থেকে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন তিনি। তাঁর জীবনে আড়ম্বর বা বিলাসিতার কোনো স্থান ছিল না। কঠিন-কঠোর তত্ত্বের বর্মে কমিউনিস্ট পার্টিকে আবৃত করতে না পারার সমালোচনা তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কেউ করতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে দেশের মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদানকে কোনোভাবেই ছোট করা যাবে না।

বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির ইতিহাসে মোহাম্মদ ফরহাদের নাম চিরভাস্বর থাকবে। যে কোনো রাজনৈতিক সংকটের সময় তাঁর অভাব গভীরভাবে অনুভূত হবে।

আজ যখন দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, কালোটাকার মালিক, চিহ্নিত ক্রিমিনালদের দেশের রাজনীতির মাঠে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা যায়, তখন মোহাম্মদ ফরহাদের মতো ত্যাগী দেশদরদী নেতার অভাব প্রকটভাবেই অনুভব করেন সবাই। কিন্তু তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও তেমন আলোচনা নেই। তাঁর মৃত্যুদিনটিও জাতীয়ভাবে পালন করা হয় না। রাজনীতির জন্য যিনি জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন, তাঁর নাম রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও উচ্চারিত না হওয়া দুঃখজনক।

দুর্নীতিবাজ, সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিতাড়িত করতে হলে মোহাম্মদ ফরহাদের মতো দৃঢ়চেতা, সৎ ও নির্লোভ চরিত্রের মানুষ তৈরির কোনো বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মের সামনে ত্যাগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ত্যাগী ও আদর্শস্থানীয় রাজনীতিবিদদের জীবনাদর্শের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ-প্রচেষ্টা কি কেউ গ্রহণ করবেন না?

মোহাম্মদ ফরহাদকে আমরা যদি ভুলে যাই তাহলে তাঁর কোনো ক্ষতি নেই, ক্ষতিগ্রস্ত হব আমরা নিজেরাই।

বিভুরঞ্জন সরকারসাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Responses -- “মোহাম্মদ ফরহাদকে ভুলে গেলে ক্ষতি আমাদের”

  1. হাছান

    দূর্বত্তেরা লোভীরা কমরেড ফরহাদকে মনে রেখে লাভ নেই , কমরেড ফরহাদকে মনে রাখে শিবিরের কমরেড ” সাথীরা ” ।

    Reply
  2. Ahad Khan

    এরশাদ বি‌রোধী অা‌ন্দোল‌নে নির্বাচনী প্রস্তাব ছিল ১৮০:১২০। বিএন‌পি চে‌য়ে‌ছিল ১৫০:১৫০ যা ১৫ দল না মানার পর ক্যন্টন‌মেন্ট এ ষড়যন্ত্র ক‌রে খা‌লেদা জিয়া তথাক‌থিত অা‌পোষহীন নেত্রী হ‌য়ে যান এবং ১৯৮৬ এর নির্বাচন থে‌কে স‌ড়ে দা‌ড়ি‌য়ে এরশাদ‌কে ক্ষমতায় থাক‌তে সহ‌যো‌গিতা ক‌রেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—