Chakma people - 23111

২০১৬ সালের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক দিবসের (International Day of the World’s Indigenous Peoples)– যাকে আমরা বাংলায়ন করে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ নামে দিয়েছি– এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার‘ (Indigenous Peoples’ Right to Education)। এ-প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ বিশ্বব্যাপী প্রায় নব্বইটি দেশের সাত হাজার ভিন্ন ভাষাভাষীর পাঁচ হাজার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সাঁইত্রিশ কোটি আদিবাসী মানুষ বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করছে।

১৯৮২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী আগস্ট মাসের ৯ তারিখ ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন করা হয়। প্রতি বছর জাতিসংঘ কর্তৃক একেকটি লক্ষ্য বা এজেন্ডা নির্ধারণ করে তা সামনে রেখে একেকটি প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়। আদিবাসী জনগোষ্ঠী ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালন করার পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ-অনুযোগ, দাবি-দাওয়া ও শোষণ-বঞ্চনার প্রতিবাদ করেন এবং নানান-আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি, নিজেদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রান্তিকায়নের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাই, বিশ্ব আদিবাসী দিবস বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বিশেষ দিন এবং সে কারণেই তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দিবসটি পালন করে থাকেন।

বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বরঞ্চ বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় অধিকতর ন্যায্যতা দাবি করে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশ এখনও এদেশে বসবাসরত প্রায় ষোল লাখ আদিবাসী জনগণকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই, নিজেদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বাংলাদেশে অপরিসীম।

আদিবাসী ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। অনেক সিরিয়াস একাডেমিকস, গবেষক ও আদিবাসীদের প্রতি সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবী এ-বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন; সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করেছেন। কেন বাংলাদেশে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষীর ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তার ষোল লাখ মানুষকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি এবং এটা যে তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার, এ বিষয়ে আমি নিজেও প্রচুর লেখালেখি করেছি।

২০১৫ সালের বিশ্ব আদিবাসী দিবসে বিডিনিউজ টেয়েন্টিফোর ডটকমে ছাপানো লেখায় (রাষ্ট্রের কাঠামোয় অস্তিত্বহীন জীবন) আমি সবিস্তারে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের সংকট ও আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের রাজনীতির ধারাবাহিক ব্যাখ্যা দিয়েছি। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানে সে ইতিহাস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কিছু সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করছি।

আজ থেকে প্রায় চৌত্রিশ বছর আগে ১৯৮২ সালে জাতিসংঘে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করা হয় এবং ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতি বছরের আগস্ট মাসের ৯ তারিখ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৯৫-২০০৪ ‘প্রথম আদিবাসী দশক’ এবং ২০০৫-২০১৪ ‘দ্বিতীয় আদিবাসী দশক’ ঘোষণা করা হয়। পৃথিবীর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণের সূত্র ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী রকম হওয়া উচিত সেসব বিবেচনায় রেখে ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘আদিবাসী অধিকার সনদ’ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়। চারটি দেশ (আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড) আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ক এ-সনদের বিরোধিতা করে এবং ১১টি দেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে। যার মধ্যে বাংলাদেশ একটি যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতেও আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সরকার ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী বিভিন্ন বাণী দিয়ে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনে দেশের আদিবাসী জনগণকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন।

২০১১ সালে এসে হঠাৎ কোনো এক ‘অজানা’ কারণে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। কী কারণে আওয়ামী লীগের সরকার এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও আমরা জানতে পারিনি। আসলে কারা আদিবাসী হওয়ার অধিকার রাখে এবং আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবি করে তা নিয়ে জাতিসংঘ, বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছে যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। এ-বিষয়ে আমি অন্যত্র লিখেছি:

“একটি রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বসবাসকারী একদল জনগোষ্ঠী যারা সাংস্কৃতিকভাবে সংখ্যালঘু, যাদের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি আছে যা জনতাত্ত্বিক সংখ্যাগুরুদের সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র এবং যাদের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার আছে, যাদের নিজস্ব ভাষা আছে এবং যারা রাষ্ট্রের কাঠামোয় সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক তারাই আদিবাসী হিসাবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।“

[রাহমান নাসির উদ্দিন, ‘জ্ঞানকাণ্ডের কাণ্ডজ্ঞান: পার্বত্য চট্টগ্রাম, আদিবাসী ও উপস্থাপনার রাজনীতি, ২০১৫’; পৃষ্ঠা: ১১৫-১১৬]

তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালি ছাড়া পাহাড়ের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খেয়াং, খুমি, ম্রু, লুসাই, পাংখোয়া, চাক কিংবা সমতলের গারো, মণিপুরি, হাজং, শাওঁতাল, ওরাং, পাত্র, জৈন্তা, খাসিয়া প্রভৃতি অবশ্যই জাতিগোষ্ঠী আদিবাসী হওয়ার দাবি রাখে। কেননা, বাঙালিরা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং তারা সাড়ে চার দশক ধরে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এদেশের আধিপত্যশীল শ্রেণি। ফলে–

“তারাই রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত যেখানে সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘু জনগণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে। নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা নিয়ে প্রান্তিক অবস্থানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে যদি বিশ্বব্যাপী আদিবাসী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে বাংলাদেশে তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়? রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আমরা এখনও পর্যন্ত পাইনি।”

[রাহমান নাসির উদ্দিন, “রাষ্ট্রের কাঠামোয় অস্তিত্বহীন জীবন”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম; ৯ আগস্ট, ২০১৫]

২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ‘স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং কল্যাণ-চিন্তা’ যার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আলাদা করে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে তেমন দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অবশ্য যে রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই স্বীকার করে না, সে রাষ্ট্র আদিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি করবে আর আদিবাসীদের জন্য কল্যাণচিন্তা করবে, এটা ভাবা দুরাশা। ফলে, ২০১৬ সালের যে জাতিসংঘের ঘোষণা ‘আদিবাসীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা’, সে ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় উদাসীন্যতা সহজেই অনুমেয় যা একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন জাতিসংঘ এ-বছরে বিশ্ব আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে শিক্ষার অধিকারে গুরুত্ব দিয়েছে।

শিক্ষা সব সময় মানবজাতির এবং মানবসমাজের গুণগত উন্নয়নের একটি প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এ-ঘোষণার সঙ্গে কেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকারে গুরুত্ব দেওয়া উচিত তার একটি চমৎকার ব্যাখ্যা খোদ জাতিসংঘ তার ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে:

“২০৩০ সালের জন্য যে টেকসই উন্নয়নের এজেন্ডা (Sustainable Development Goal 2030) গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০১৫ সালে প্যারিসে জলবায়ু চুক্তি (Paris Climate Agreement 2015) স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেখানে এ পৃথিবীর বসবাসকারী সকলের জন্য একটি সমমর্যাদার সহাবস্থান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ দুটি এজেন্ডায় প্রথমবারের মতো এরকম একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং সকলের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখনও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।”

ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী মূলধারার জনগোষ্ঠীর তুলনায় শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। আর সে কারণেই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেও পেছনে তারা। তাই, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকারের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। তাছাড়া, ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গৃহীত ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ঘোষণাপত্রে’ (UN Declaration on the Rights of Indigenous Peoples) ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

এছাড়া ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত শিক্ষায় বৈষম্য বিরোধী ইউনেস্কোর ঘোষণাপত্রেও (UNESCO Convention against Discrimination in Education) আদিবাসীদের জ্ঞান সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যার জন্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার প্রসার জরুরি বলে মনে করা হয়।

এ রকম একটি ঐতিহাসিক, বাস্তবিক ও প্রায়োগিক উপলব্ধি থেকে আদিবাসীদের শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করতেই ২০১৬ সালের আদিবাসী দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার।

এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে যদি আমরা বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি শিক্ষা-ভূগোল (education-geography) চিত্রায়ন করি, তাহলে অবাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (পার্বত্য চট্টগ্রাম), উত্তরাঞ্চলে (রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নওগাঁ, লালমনিরহাট প্রভৃতি অঞ্চলে), ময়মনসিংহ অঞ্চলে (প্রধানত গারো-অধ্যুষিত এলাকায়) এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার) বসবাসরত বিভিন্ন ভাষাভাষীর প্রায় আটচল্লিশটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার, একটি বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, মূলধারার বাঙালিদের তুলনায় ৭ শতাংশ।

এ রকম একটি অসম শিক্ষা-চিত্র থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য এবারের দিবসটির ঘোষণা কতটা গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষার অগ্রগতি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে উন্নতির পথে ধাবিত করতে পারে। তাই, শিক্ষার অধিকারের বিষয়টি যেমন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উপলব্ধি করতে হবে, তেমনি সরকারকেও তাদের সত্যিকার উন্নয়নের জন্য শিক্ষার প্রসারে কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই, সকলের সমমর্যাদার সত্যিকার সহাবস্থান সম্ভব।

মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি যা নিয়ে আমি অন্যত্র সবিস্তার লিখেছি। বিশ্বায়নের ক্রমধাবমান প্রবণতায় যখন সবকিছুই মুনাফার ফ্রেইমওয়ার্কে বিচার্য হয়ে উঠছে, সেখানে এখনও বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তাই, বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ‘অশিক্ষার’ অন্ধকারে রেখে কেবল বাঙালির শিক্ষার হার প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোনোদিনই দেশ আলোকিত করা যাবে না। ‘জিপিএ-৫’ এবং ‘গোল্ডেন-এ’ বেসুমার প্রবৃদ্ধি এবং তার ঝকঝকে চমৎকারিত্ব সত্যিকার ‘চমৎকার’ আনতে পারবে না, যদি আমরা সকলের জন্য শিক্ষার সুযোগ সুনিশ্চিত করতে না-পারি; বিশেষত আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার শীতল ছায়াতলে সমবেত করতে না-পারি।

তাই, আজকে এ বিশ্ব আদিবাসী দিবসে সকলের সমম্বরে সম্মিলিত উচ্চারণ হোক, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার চাই’।

রাহমান নাসির উদ্দিননৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Responses -- “শিক্ষার অধিকার নিয়ে বিশ্ব আদিবাসী দিবস”

  1. mizan rahman cht

    লেখক আদিবাসী বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ পেতে পারে। কিন্ত একটি বিষয় লেখক আড়াল করলেন কেন? আদিবাসী হতে হলে যে সব গুণ বা নিয়ম আছে, বাংলাদেশের উপজাতী বা সাওতাল জনগোষ্ঠী কি তার আওতায় পরে? লেখক ভুলে গেছেন কি নিয়মগুলো লিখতে?

    Reply
  2. সরকার জাবেদ ইকবাল

    একটি তথ্যসমৃদ্ধ এবং সংবেদনশীল লেখা। ভাল লাগলো। আদিকালে একটি কথা প্রচলিত ছিল ‘জোর যার মুল্লুক তার’। আমরা কি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি? বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হিসেবে আমরা যে দোর্দন্ডপ্রতাপে ধর্মকর্ম করে যাচ্ছি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কি তা পারছে? একইভাবে বাঙালি হিসেবে আমরা যে সুযোগ-সুবিধা (রাষ্টভাষা অধিকারসহ) ভোগ করে যাচ্ছি তা কি অন্যান্য ভাষাভাষীরা পারছে?

    জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ৩০ নং ধারায় উল্লেখ আছে, “In those States in which ethnic, religious or linguistic minorities or persons of indigenous origin exist, a child belonging to such a minority or who is indigenous shall not be denied the right, in community with other members of his or her group, to enjoy his or her own culture, to profess and practise his or her own religion, or to use his or her own language.”

    আমাদের কথায় এবং কাজে মিল নেই; যা বলি তা বিশ্বাস করি না, আর, যা বিশ্বাস করি তা বলি না; সম্ভবত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে দখলিস্বত্ব হারানোর ভয়ে! তাহলে আমরা মানবীয় মূল্যবোধের বড়াই কেমন করে করছি? এই শঠতা আর প্রতারণার অবসান হোক।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—