Print

তনু শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি কবরে। আবারও তার লাশ তোলা হয়েছে কবর থেকে—- ময়না তদন্তের জন্য। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ করেছেন পুনরায় ময়না তদন্তের। তাহলে আগের তদন্তের রিপোর্ট কী হল? ভুল ছিল? চাপের ফলে সত্যরহিত রিপোর্ট ছিল? তদন্তকারী চিকিৎসক কি তাঁর নৈতিকতা হারিয়েছেন? কার চাপে? কিংবা কাকে বাঁচানোর জন্য?

তনুর মৃত্যুতে গল্প গুঞ্জরিত হচ্ছে। কেন? তনু কি বেঁচে আছে? না, বেঁচে নেই। তনু আমাদের মাঝে নেই। চেনা অচেনা কারও মাঝে নেই। তনু ব্যানারে উঠে এসেছে, ফেস্টুনে জায়গা পেয়েছে। পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হচ্ছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তাকে নিয়ে বলাবলি হচ্ছে। তনুর বন্ধুরা, বাংলাদেশের বিচারপ্রার্থী নাগরিকরা তনুর নাম উচ্চারণ করছে ক্রোধে, চিৎকারে, বেদনায়, অশ্রুজলে।

মেয়েটি অত বিখ্যাত হতে চায়নি। বাঁচতে চেয়েছিল। সংগ্রাম করছিল। টিউশনি করে ছাত্র পড়িয়ে উপার্জন করে স্বাবলম্বী ছিল। তনু পড়ছিল ইতিহাস নিয়ে। শিল্প-সাহিত্য করত সে। করত নাটকের দল। পারিবারিক কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে তনু হিজাব পরত। একজন মানুষের সম্পুর্ণতার আর কী বাকি থাকে?

তনু কি জানত তবু কিছু ‘মানুষের’(?) কাছে সে সম্পূর্ণ নয়। মানুষ, না কি ‘পুরুষ’? না কি ‘জন্তু’? চরম অকর্মণ্য, অশিক্ষিত হয়েও যে বিশেষ শারীরিক গঠনের জন্য নিজেকে ক্ষমতার দুর্গ মনে করে? পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর উপর আধিপত্য করার চেষ্টা করে তাদের প্রকৃতিদত্ত বিশেষ গঠন দুর্বল ও ক্ষমতাহীন আখ্যা দিয়ে। এ এক অদ্ভুত অলিখিত সংহিতা পাঠ চলছে হাজার বছর ধরে সারা পৃথিবীতে, যার নাম ‘পুরুষতান্ত্রিকতা’। অশিক্ষিত বর্ণজ্ঞানহীন পুরুষেরাও যেন এই উদ্ভট কালো বইয়ের পণ্ডিত। এই পুরুষতান্ত্রিকতার জোরে শ্রমজীবী বর্ণজ্ঞানহীন রিক্সাচালকও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে মাথায় ঘোমটা দিয়ে রিক্সায় বসার আদেশ জানায়। কী উদ্ভট!

এই আজব সমাজ কিংবা পৃথিবীর পুরুষদের কালো হাত তনুর জীবন ও সম্ভ্রম হরণ করেছে, কেড়ে নিয়েছে তার সংগ্রাম। পুরুষতান্ত্রিকতার সমর্থক প্রত্যেক পুরুষই এ জন্য অপরাধী, শুধু নির্দিষ্ট কিছু হত্যাকারী সম্ভ্রম-লুটেরা নয়। পুরুষতান্ত্রিকতার নিত্য প্রচারকরা নারীকে একটি অপরাধী সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে। নারীর পোশাক পরা হয়নি, নারী রাতের বেলা ঘর থেকে বের হল কেন, নারীর রিক্সার হুড ফেলা কেন; ওড়না গলায় পেঁচানো কেন; টি শার্ট-জিনস পরেছে কেন; সিগারেট খেল কেন; মদ খেল কেন; শাহবাগে কেন! এক দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণের তালিকা নিয়ে বসে আছে শিক্ষিত অধ্যাপক, সচিব, জেলারেল থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী পুরুষ পর্যন্ত।

এদেশের রাষ্ট্র পুরুষ, সচিবালয় পুরুষ, বিশ্ববিদ্যালয় পুরুষ, ক্যান্টনমেন্ট পুরুষ। রাষ্ট্র নিজে এবং তার ছোট সত্তাগুলো পুরুষ। কিছু নারী সেখানে কর্মরত থাকলেও ক্ষমতাকাঠামো তাকে পুরুষতান্ত্রিকতার পুরুষ করে তোলে। সেই নারীরাও পুরুষতান্ত্রিকতার জয়গান গাইতে থাকেন। আক্রান্ত নারীকে দুষতে থাকেন। এ এক গভীর ব্যাধি।

এই গভীর ব্যাধি আরও গভীরতর করে তুলেছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। সন্দেহ নেই যে, এই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য নারীকে দাবিয়ে রাখা। নারীকে নিচে রেখে ‘ব্যক্তি-পুরুষদের’ (male as man) ‘রাষ্ট্র-পুরুষ’( state as man) নির্মাণের রাজনীতি, এই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। প্রত্যেক পুরুষতান্ত্রিক পুরুষই মূলত ওই মৌলবাদী রাজনীতির সমর্থক, তিনি আপাত অন্য রাজনীতির লোক হলেও। এই রাষ্ট্র-পুরুষ নির্মাণের কল্পনাধারীরাই তনুকে হত্যা করেছে।

তনুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ক্যান্টনমেন্টের নিরাপদ বেষ্টনীর মধ্যে। তাই নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থাশীল প্রত্যেক নাগরিকই চমকে উঠেছেন। কীভাবে এটা সম্ভব! ভুলে গেলে চলবে না যে, ক্যান্টনমেন্ট, পুলিশ কিংবা প্রশাসন আমাদের ‘রাষ্ট্র-পুরুষ’এর প্রদর্শনযোগ্য মাংসপেশী, যার মাধ্যমে তার পৌরুষ জারি থাকে। আর ব্যক্তি-পুরুষ কিংবা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো তার সামন্তীয় অহমের জায়গা থেকে নারীর এক ধরনের নিরাপত্তায় বিশ্বাস করে। সেটা নারীকে মানুষ ভেবে কিংবা নাগরিক ভেবে নয়, দুর্বল কিংবা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ভেবে।

ক্যান্টনমেন্টের নিরাপদ বেষ্টনীর মধ্যে তনুর হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক সেই অহমে আঘাত লেগেছে। কারণ হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে আমাদের রাষ্ট্র-পুরুষের সবচেয়ে নিরাপদ বাহুর নিচে। আর তাই রাষ্ট্র তার আহত অহম চাপা দেওয়ার জন্য তনুর মৃত্যু কেন্দ্র করে ‘রশোমন’ কাহিনি ফাঁদার চেষ্টা করছে।

অনেকেই মনে করছেন নিরাপত্তা দিতে না পারায় আহত অহমবশত সামরিক বাহিনী এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছে না। আসলে বিষয়টি তা নয়। অহম আহত হয়েছে রাষ্ট্রের। আর আহত অহম চাপা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নেমেছে গোটা রাষ্ট্র। সেখানে সামরিক বাহিনী আলাদা বিষয় নয়।

পুরুষতান্ত্রিকতা আক্রান্ত এই রাষ্ট্রের পুলিশ, বেসামরিক প্রশাসন, সামরিক বাহিনী যারা রাষ্ট্র-মন্দিরের পূজারী, তারা সবাই মন্দিরের খসে পড়া ইটের দাগ মুছে দেওয়ার চেষ্টারত। এই সমস্ত স্থাপনার শীর্ষ ব্যক্তিরা ঘরে ফিরে নিজের সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হবেন, চেনা মেয়ে তনুর কথা ভেবে বিষণ্ণ হবেন কিংবা অশ্রু বিসর্জন করবেন। কিন্তু মূল ভূমিকার জায়গায় রাষ্ট্রের হয়েই কাজ করবেন।

আকিরা কুরোশাওয়ার ‘রশোমন’ চলচ্চিত্রটি যারা দেখেছেন তারা জানেন একটি হত্যাকাণ্ড কতভাবে বিভিন্ন জন বিভিন্ন বয়ানে হাজির করেন। শেষ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির আত্মাও একটি বয়ান দেয়। কিন্তু কোন বয়ানটি সঠিক সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাষ্ট্রের একটি স্থায়ী বয়ান আছে এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত-কাঁপানো এই তনু হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্র যে একটি স্থির বয়ানে যাবে না বরঞ্চ বহু বয়ানের একটি ‘রশোমন’ কাহিনির অবতারণা করবে এটা আঁচ করেই আজ মানুষ মাঠে নেমেছে বিচারের দাবিতে।

বিচারহীনভাবে বিচারের নাম করে যতবার তনুর লাশ কবর থেকে তোলা হবে ততবার বাংলাদেশেরই পোস্টমর্টেম হবে। আমাদের সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলো শরীরে বহন করেই তনু মারা গেছে।

সব কিছুর পরও সুবিচারের উপর আস্থা রাখতে চাই। তনুর হত্যাকাণ্ডের সুবিচার হোক। তনুর মৃত্যুতে যেন কোনো নারী সাহসহীন না হয়ে পড়েন।

জহিরুল হক মজুমদারঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

১৬ Responses -- “তনুর মৃত্যু ও রাষ্ট্র-পুরুষ নির্মাণের রাজনীতি”

  1. রমিজ

    মেয়ে মানে আমার মা, আমার বোন।আমার মা,বোন রাস্তায় অন্য মানুষের সামনে বুকের কাঁপর গলায় তুলে মানুষ কে দেখাবে,চাপা জিন্স পরে সে যে মেয়ে তা বোঝাবে,এসব হবেনা বাংলাদেশে। আপনার এত শখ আপনার মেয়ে বউকে ওভাবে রাস্তায় বের করেন,ইচ্ছা হলে তসলিমা নাসরিনের কথা মতো ছেলেদের মতো আপনার বউ মেয়েকেও খালি গায়ে বের করেন। তারপর ……..।

    Reply
  2. md. Ferdous Rahman

    যে প্রকৃত অপরাধী এবং অপরাধ কার্যে সহায়তা করেছেন। এক মাত্র তাদের খুজে বেরকরে বিচারের কাটগাড়ায় দাঁড়ানও এবং বিচার বা সাজা হওয়া উচিত। দেশের অন্য কোন সাধারণ মানুষ যেন কোন ভাবে হয়রানির শিকার বা ভোগান্তিতে না পড়ে।

    Reply
  3. শোহেইল মতাহির চৌধুরী

    এম এ মতিনের মন্তব্যের সাথে একমত।
    মশা মারতে কামান দাগিয়েছেন মজুমদার ।

    Reply
  4. এম এ মতিন

    সাহিত্য রচনা করতে পুরুষদের মানুষ থেকে আলাদা করেছেন- যেমন “মানুষ, না কি ‘পুরুষ’?”
    তনুকে নিয়ে গল্প লিখে নিজেও রাষ্ট পুরুষ হবার চেষ্টায় মত্ত ছিলেন। তাই কারণে অকারণে ধর্মকে দোষারোপ করেছেন-যাতে আপনার দিকে সরকারের দৃষ্টি আসে। যেমনঃ “এই গভীর ব্যাধি আরও গভীরতর করে তুলেছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি।”কিন্তু আপনি নিজেও বিশ্বাস করেন সমাজের সকল অন্যায় ধর্মের ছায়াতলেই বিলীন হয়। হোক সে হিন্দু , বদ্ধো, খিস্টান অথবা মুসলিম।ধর্ম মানুষকে নর্ম,ভদ্র হতে শিক্ষা দেয়।তাই কারনে অকারনে ধর্মকে টেনে মুর্খের পরিচয় না দিলেই কি নয়?

    Reply
  5. পলাশ

    আপনি পুরুষদের কেন দোষ দিচ্ছেন বুজলাম না। আপনিই বলুন একজন স্ত্রী যদি তার স্বামীর টাকা পয়সা নিয়ে কোন প্রেমিকের হাত ধরে চলে যায় তাহলে কি ওই স্বামী এদেশের আইনে বিচার পায়? এটা একটা উদাহরন দিলাম মাত্র। এরকম অনেক নির্যাতিত পুরুষ আমি দেখেছি যারা বিচার পাচ্ছে না। কিন্তু একই অপরাধ পুরুষ না করলেও একজন নারীর মিথ্যা অভিযোগের কারনে পুরুষকে একদিনের জন্যও জেল খাটতে হচ্ছে।

    Reply
  6. আহসান সুমন

    তনু হত্যার বিচার চাই।

    প্রিয় জহিরুল হক মজুমদার,
    রাষ্ট্রএর চরিত্র সম্পর্কে একটি ব্যতিক্রমী মুল্যায়ণ পড়ে আলোকিত হলাম। নিচের মন্তব্যগুলিতে আপনার পরবর্তী প্রবন্ধের উপাদান আছে।

    Reply
  7. Akhtar Hossain

    Actually , a lot of তত্ত্ব কথা . Not really addressing the real issues. Sure, all males have strong sexual desires; nothing to blames; nothing to hide. But strong social vales, strong legal systems deter men from assaulting women. This heinous murder was pre- planned; Tanu’s house and the house she went to tutor her students is only 300 yards; she went and about to return. Everything was done within these short span of time; so quick. Who is safe now?

    Reply
  8. R. Masud

    জহিরুল হক মজুমদার সাহেব কি বলতে চাচ্ছেন কিছুই বুঝলামনা।
    আমার বিদ্যা বুদ্ধির আয়তন কম বলেই হয়তোবা–
    তাই কিছু প্রশ্ন-
    এই যে বললেন
    ঃঃঃ===চেনা মেয়ে তনুর কথা ভেবে বিষণ্ণ হবেন কিংবা অশ্রু বিসর্জন করবেন। কিন্তু মূল ভূমিকার জায়গায় রাষ্ট্রের হয়েই কাজ করবেন।-===
    আপনি যদি সরকারি চাকুরি করে এই অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেতেন , আপনি কি তনুর হয়ে কাজ করতেন – বুকে হাত দিয়ে বলুন।
    সমস্যা এখানেই, আমরা বাংলার জনগন সবাই করাপ্টেড , কম করে হলেও ৯৮%।
    সরকার, মিলিটারী, পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক , সরকারী চাকুরিজীবি ইত্যাদি সবাই এই জনগন থেকেই আসে, কেউ আকাশ থেকে পড়েনা —
    আমার কাছে চমক লেগেছে আপনার লিখার নিছের অংশটুকু পড়ে-
    === অনেকেই মনে করছেন নিরাপত্তা দিতে না পারায় আহত অহমবশত সামরিক বাহিনী এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছে না। আসলে বিষয়টি তা নয়। অহম আহত হয়েছে রাষ্ট্রের। আর আহত অহম চাপা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নেমেছে গোটা রাষ্ট্র। সেখানে সামরিক বাহিনী আলাদা বিষয় নয়। ===
    কাগজে কলমে সামরিক বাহিনী সরকারের আন্ডারে হলেও বাস্তবেও কি তাই মনে করেন। যদি তাই মনে করেন – তাহলে বলতে হবে আপনি বোকার স্বর্গে আছেন, বেরিয়ে আসুন।
    তাছাড়া
    —সামরিক বাহিনী এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছে না। আসলে বিষয়টি তা নয়।—
    এই Confirmation আপনি কিভাবে দিচ্ছেন?

    তার সাথে আর একটা কথা, আপনারা যারা বাংলায় লিখাতে পন্ডিত, সাধারনের জন্য যখন লিখেন , তখন কম করে হলেও অস্টম শ্রেণীর বাচ্চারাও পড়েও বুঝতে পারে অমন শব্দ ব্যাবহার করুন । প্রবন্দ রচনা, পেপার লিখার নিয়ম কানুনে এই কথা পরিস্কার করে বলা আছে।
    ১% লোকও বুঝেনা এমন শব্ধ ব্যাবহার না করলেই কি নয় !!- যেমন ~অহমবশত~ শব্দটা ।
    আমি সহ আমার চার পাশের ৭, ৮ জন বাঙ্গালীকে জিজ্ঞাসা করেছে তাদের কেউ বুঝেনাই। এদের সবাই বাংলাদেশের ভাল ভাল ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করা ছাত্র

    Reply
    • শামীম রেজা

      “অহমবশত” শব্দটি “বাংলাদেশের ভাল ভাল ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করা ছাত্র”রা বলতে পারে নি? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি “মালপত্র” বেরোচ্ছে, এটা বোঝানোর জন্য ধন্যবাদ।

      Reply
  9. Bangladeshi

    তনুর হিজাব পরা ছবি দেখেই কি তথাকথিত প্রগতিশীলরা এতদিন চুপ করে ছিল?!

    সেনানিবাসের ভিতরে একজন অনার্স পড়ুয়া ছাত্রীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে। একজন নারীকে ধর্ষনের পর হত্যা- বিষয়টি বড় খবর। সাথে ঘটনাস্থল যেহেতু দেশের সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনিতে আবদ্ধ সেনানিবাসের ভিতরে ঘটেছে তাই খবরটি খুবই গুরুতর ও বিশাল হ্ওয়ার কথা। বলছি সোহাগী জাহান তনুর কথা। তাকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ২০ মার্চ সন্ধ্যার পর কোন এক সময়। সম্ভবতঃ পরের দিন অর্থাৎ ২১ মার্চ কোন একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে ভাবে খবরটি এসেছিল। বিষয়টি নিয়ে লিখার আগে ২১ মার্চ থেকে নিয়ে ২৪ মার্চ তারিখ পর্যন্ত দেশের সবকটি তথাকথিত প্রগতিশীল, নারীবান্ধব, সুশীল, প্রথম সাড়ির পত্রিকা দেখেছি। কোন পত্রিকাতে ২৩ মার্চের আগে কোন নিউজ তেমন আসেনি। ২৪ তারিখও তেমন উল্লেখযোগ্য কোন নিউজ আসেনি। এমনকি তথাকথিত নারী অধিকার সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন, প্রগতিশীল গোষ্টি, ব্যাক্তিত্ব কেউই তেমন কোন প্রতিবাদ, বিবৃতি কিছুই করেনি। বিষয়টি নিয়ে খুবই আশ্চর্য হয়েছি। ঢাকার কাছে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভিতরে একজন ছাত্রীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হলো অথচ তথাকথিত প্রগতিশীল, নারীবান্ধব, সুশীল, মিডিয়া, ব্যাক্তিত্ব, সংগঠন কেউই কোন কথা বলছে না, সংবাদ প্রচার করছে না, প্রতিবাদ-বিবৃতি কিছুই করছে না! অথচ কোন এক অজপাড়া গায়ে মাদ্রাসা বা স্কুলের ছাত্রীকে মাথায় ওড়না পরতে বললে সেটি নারী অধিকার হরণের খবর হয়ে যায়, বিবৃতি, মিছিল, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, হাইকোর্টে কয়েকটি রিট হয়। পত্রিকাগুলো সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় লিখতে লিখতে ভরে ফেলা হয়। অথচ এখানে সবাই সম্পূর্ণ চুপ! এর বিপরীতে সামাজিক মিডিয়াতে যাদেরকে মৌলবাদী বলে অভিহিত করা হয় তারা বরং বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবাদ ও লেখালেখি করে যাচ্ছিল।

    ২০ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত চুপ থেকে ২৪ মার্চ এসে তথাকথিত সুশীলরা কথা বলা শুরু করলো। তনু হত্যার প্রতিবাদে তথাকথিত প্রগতিশীলরা মানববন্ধন করলো, বিবৃতি দিলো এবং তথাকথিত সুশীল মিডিয়াগুলো আজ ২৫ মার্চ সে সব খবর প্রথম পাতা সহ বিভিন্ন পাতায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ ও অনলাইন ভার্সনে কঠিন কঠিন মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা শুরু করলো। কিন্তু ২০ থেকে ২৩ বা ২৪ মার্চ প্রায় ৪/৫দিন ওরা কেউই কোন কথা বলেনি কেন?! দেশের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় নারীত্বের এতবড় অপমান অথচ তথাকথিত সুশীলরা সবাই নিশ্চুপ! ঘটনা কি?! তারা কি নৈতিকভাবে অধঃপতিত সেনাবাহিনীকে ভয় পাচ্ছিল? সেনানিবাসের ভিতর ঘটনা বলে কি ভয়ে চুপ ছিল? না তা নয়। সেটি হলে ৪/৫দিন পরও প্রতিবাদ জানানো বা খবর প্রকাশ করার কথা নয়।

    এসব যখন চিন্তা করছি তখন অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক মিডিয়ায় প্রকাশিত তনুর ছবিগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। সামাজিক মিডিয়ায় তনু হত্যার খবরটি প্রকাশ হয়েছে তার স্কার্ফ বা হিজাব সহ ছবি দিয়ে। প্রথম দিকে স্কার্ফ সহ ছবির সাথে শুধু বলা ছিল তনু কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তার পিতার পরিচয়ও ছিল। সামান্য ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী। ব্যস এতটুকুই। কিন্তু ২২/২৩ তারিখের পর সামাজিক মিডিয়াতে আরো বিস্তারিত পরিচয় আসা শুরু করলো। তনু কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী শুধু নয় সে আসলে তথাকথিত প্রগতিশীলদের সাথে উঠা-বসা করতো এবং তাদের থিয়েটার কর্মী ছিল। অর্থাৎ স্কার্ফ পরলেও সে তথাকথিত প্রগতিশীলদের সংগঠনের সাথেই জড়িত ছিল। এ খবরটি জানার পরপরই তথাকথিত সুশীল ব্যাক্তিত্ব, সংগঠন, মিডিয়াগুলো তনুকে নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে।

    তার মানে এর আগে স্কার্ফ পরা দেখে তথাকথিত প্রগতিশীলরা কি মনে করেছিল আরে ওতো মৌলবাদী টাইপের, স্কার্ফ পরে, হিজাব করে-ওদেরকে ধর্ষন করেছে তো কি হয়েছে?! হত্যা করেছে ঠিকই আছে! সামান্য ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর মেয়ে সেনানিবাসের ভিতর থাকে আবার হিজাবও করে! তাকে হত্যা করা হবে না তো আর কাকে করবে?! এটিই কি ছিল প্রগতিশীলদের মনোভাব?! সে কারণেই কি তারা এতদিন চুপ ছিল?! কিন্তু যখন জানতে পারলো হিজাব করলেও আসলে তনু তাদেরই একজন- এরপরই শুধুমাত্র তারা কথা বলা শুরু করলো?!

    এ সন্দেহ হওয়ার কারণ হলো খোদ ঢাকা শহরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইডেন কলেজ সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হিজাব পরিহিতা ছাত্রীদের প্রশাসন ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন ভাবে হয়রানী করে আসছিল, হিজাব পরিহিতা ছাত্রীদের নিয়মিত হল ও প্রতিষ্ঠান থেকে বহিঃস্কার করছিল এমনকি পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছিল এবং পুলিশ হিজাব পরিহিতা ওসব ছাত্রীদের দিনের পর পর রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করছিল এবং মাসের পর মাস কারাগারে আটক করে রাখছিল। এত কঠিন নির্যাতন যখন হিজাব পরিহিতা ছাত্রীদের উপর চলছিল তখন কোন সুশীল মিডিয়া, ব্যাক্তিত্ব, সংগঠন সামান্য প্রতিবাদ করেনি বরং মিডিয়াগুলো এমনভাবে খবর প্রকাশ করছিল যেন হিজাব পরিহিতা ওই ছাত্রীরা বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসী!

    সে ধারাবাহিকতায় ঘটনার পর সামাজিক মিডিয়ায় প্রকাশিত তনুর স্কার্ফ সহ ছবি দেখেই কি তথাকথিত প্রগতিশীলরা চুপ ছিল? এখন কথা বলছে কারণ তারা সবশেষ জানতে পেরেছে তনু প্রগতিশীলদের কথিত থিয়েটারের একজন কর্মী?! তার মানে ৯০% মুসলমানের এদেশে তথাকথিত প্রগতিশীলদের হিজাব, স্কার্ফ, পর্দা করা নারীদের কোন অধিকার থাকতে নেই?! তাদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিঃস্কার করতে পারবে, পুলিশ-ছাত্রলীগ রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করতে পারবে, কারাগারে নিক্ষেপ করতে পারবে, এমনটি ধর্ষনের পর হত্যাও করা যাবে! কিন্তু প্রগতিশীলরা কোন কথা বলবে না যদি মেয়েটি হিজাব পরিহিতা হয়! শুধুমাত্র তখনই বলবে যখন জানতে পারবে হিজাব পরলেও সে তাদেরই একজন! তার আগে যত নির্যাতনই হিজাব পরিহিতাদের উপর আসুক প্রগতিশীলদের বিবেক কোন কথা বলবে না…

    Reply
  10. সিরাজুল হোসেন

    ধরা যাক তনু নয়, তনুর জমজ ভাইকে একইভাবে মেরে ফেলা হয়েছে, যে গরীব, মুসলিম, নিম্নপদস্থ এক কর্মচারীর সন্তান, তাহলেও কি ভিন্ন কিছু হত? তনুর জন্য যেটুকু আন্দোলন প্রতিবাদ হচ্ছে তার কিয়দংশও হত না।

    কয়েক দিন আগে মগবাজারে উড়াল সড়কে অনিরাপদভাবে কাজ করতে গিয়ে তনুর বয়সী একজন মরে গেছে, মামলাটুকু পর্যন্ত হয়নি যে, এটা কোনো অবহেলা কি না তার বিচারে।

    এত জটিল কিছু তো এখানে নেই, হিসাবটা খুব সহজ। গরীবের সন্তান মরে গেছে তো, সেটা কি আর এমন কী!

    Reply
    • মঞ্জু

      বর্ণজ্ঞান এর সাথে সভ্যতা, ধর্ষণ এর সম্পর্ক কি বুঝলাম না। বর্ণজ্ঞানওয়ালারা অপকর্মে খুব বেশী পিছিয়ে নেই।

      Reply
      • মোঃ ফিরোজ অাহমেদ

        ওতো পান্ডিত্যে কাজ নেই, তনুসহ প্রত্যেকটা হত্যাকান্ডের বিচার চাই।

      • মোজাইয়েন উদ্দিন আহমেদ।

        বর্ণজ্ঞানওয়ালারা যখন ধর্ষণকারী হয় তখন তারা আর সভ্য থাকে না।তাদের সাথে বর্ণজ্ঞানহীন মানুষদের কি কোন তফাৎ আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—