বেবী মওদুদ

আন্তর্জাতিক অটিজম ২০১১: অভিজ্ঞতার প্রথম ধাপ

আগস্ট ২৪, ২০১১

baby-maudud16112111111আন্তর্জাতিক অটিজম সম্মেলন -২০১১ বেশ সফলভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বাংলাদেশে। গত ২৫শে জুলাই সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন ভারতের অটিজম কর্মকাণ্ডের প্রধান পৃষ্টপোষক সোনিয়া গান্ধী, শ্রীলংকার ফার্স্ট লেডি শিরস্থি রাজাপাকাসে, মালদ্বীপের সেকেন্ড লেডি ইহাম হুসেন ছাড়াও এ অঞ্চলের আরও অনেকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, জাতিসঙ্ঘের প্রতিনিধিসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে বক্তারা সকলেই অটিজম সংক্রান্ত জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গূরুত্ব আরোপ করেন। এইসব অসহায় শিশুদের চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠার ওপরও বক্তব্য রাখেন এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। বিশেষ করে সরকারি – বেসরকারি উদ্যোগের কথাও তারা বলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শ্রীলংকার ফার্স্ট লেডি শিরস্থি রাজাপাকসে ‘ঢাকা ঘোষণা’ পাঠ করেন । এ ঘোষণায় অটিজম সম্পর্কে সাত দফা প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবগুলো হচ্ছে: (১) অটিজম ও ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস ব্যক্তিদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য এ অঞ্চল ও বিশ্বব্যাপী জোরদার এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ ঘোষণাকে গ্রহণ করা।

২। ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস শিশুদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে যেসব বিষয় রয়েছে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমর্থন দিতে হবে। (ক) ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস শিশুদের অধিকারের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও এসব শিশুদের জন্য ব্যক্তি সামাজিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি সামনে আনা। (খ) ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস শিশু ও তার পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার মান ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। (গ) ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস শিশুদের সমন্বিত চিকিৎসা সেবার বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত পেশাজীবীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে বিশেষায়িত সেবা পর্যায় অন্তর্ভুক্ত। (ঘ) ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে জনবল ও আর্থিক সম্পদ বৃদ্ধি এবং ধীরে ধীরে অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন। (ঙ) পরিবার, বাড়ি ও স্কুল সান্নিধ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং পারিবারিক জীবন, শিক্ষা, সমাজে স্বাভাবিক অংশগ্রহণ সহায়তা করা। (চ) সেবার মান নিশ্চিত করতে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি। (ছ) সামাজিক অন্তর্ভুক্তির পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক জাতীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন। (জ) ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সেবা ক্ষেত্রে কার্যকর দলীয় কর্মকৌশল তৈরি। (ঝ) তথ্য আদান-প্রদান এবং সঠিক প্রয়োগ উন্নয়নের অগ্রগতি তুলে ধরার জন্য ধারাবাহিক আঞ্চলিক সম্মেলনের আয়োজন করা।

৩। স্থানীয় পরিস্থিতি এবং বিশেষত্ব অনুযায়ী সেবার কর্মপদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশের অগ্রাধিকার ও সহায়তার বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়।
৪। ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস এবং অটিজমের প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে সরকার বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে আহবান করা এবং প্রস্তুত করা।
৫। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিপ্রেক্ষিতে ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার ছাড়াও অটিজম শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সদস্যভুক্ত দেশগুলোর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও কারিগরি সহায়তা দিতে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আহবান জানানো।
৬। আন্তর্জাতিক, দ্বিপাক্ষিক ও এনজিওগুলোকে যারা ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস এবং অটিজমের জন্য কাজ করে আসছে তাদের বিশেষ ক্ষমতা অনুযায়ী এ ঘোষণাকে সমর্থন করার জন্য আহবান জানানো ও
৭। ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস এবং অটিজমে আক্রান্ত লাখো মানুষের অপরিমেয় প্রয়োজন মেটাতে এবং যত্ন ও সেবার মান উন্নয়নে আর্থিক ও কারিগরি কর্মসূচির পরিকল্পনার জন্য দাতা সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে আবেদন করা হয়। ( সৌজন্যে দৈনিক ইত্তেফাক )
এই ঘোষণাটি সামনে রেখে আমাদের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুবিধা হবে। আমরা প্রত্যাশা রাখবো, উদ্যোক্তারা এটা স্মরণ রাখবেন।

বাংলাদেশেই অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বের প্রথম অটিজম সম্মেলন। এটা একটা বিরাট অর্জন যা বিশেষভাবে প্রভাব রাখবে সামনে এগিয়ে যাবার কর্মপন্থা গ্রহণে। উদ্বোধনের পরদিন অটিজম বিষয় নিয়ে দেশী বিদেশী বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন – যা এখানকার সংগঠকদের উপকারে আসবে। এরপর ২৭, ২৮ ও ২৯ জুলাই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে অটিজম আক্রান্ত শিশুর মা, স্কুল শিক্ষক, সংগঠক ও চিকিৎসকরা। এই প্রশিক্ষণে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। অনেকেই আমার কাছে বলেছেন, এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। আমরা অনেক কিছু জানতাম না, এখন অনেকটা জেনেছি। তবে এধরনের প্রশিক্ষণ যত বেশি হবে আমাদের কাজ করতে আরও সুবিধা হবে।

আমরা এবার যেটা শুনেছি, তা হলো অটিজম কোন রোগ নয়। এর কোন চিকিৎসা বা ওষুধ নেই। শুধুমাত্র সেবা, যত্ন, শিক্ষা, আচরণে অভ্যাস গড়ে তোলাটাই প্রধান কথা। অটিজম চিহ্নিত কীভাবে করা যাবে সেটা চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। অটিস্ট শিশুদের ফিজিওথেরাপী, স্পীচ থেরাপি ইত্যাদির মাধ্যমে স্বাভাবিক শিশুদের মত গড়ে তোলা যায়। এদের আচরণগত কিছু সমস্যা থাকে–সেগুলোও স্বাভাবিক করা যায়। কারও মৃগীরোগ থাকে – সেটারও চিকিৎসা ও ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। মায়েদের প্রশিক্ষণটাও খুব জরুরী ছিল। এসব সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তারা। স্বামী-শাশুড়ীর গালমন্দ, সমাজের অবজ্ঞা, রাষ্ট্রের অবহেলা সবকিছু থেকে তাদের মুক্তি দেয়াটা প্রথম কাজ। সন্তান তো মায়ের কাছেই থাকে, সুতরাং তার আচরণগত যত্নটা নেয়ার কাজ মা অনেকখানি গ্রহণ করে থাকে। আর মায়ের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করাটাও জরুরী। এটা তাকে চিকিৎসক দেন না, পরিবার ও সমাজ তো দূরের কথা। মা’কে সাহসী, সংগ্রামী ও ধৈর্যশীল করে তোলা সম্ভব হলে এই সন্তানই অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে জীবন – যাপন মেধা মনন-শ্রমশক্তি নিয়ে। মা-সন্তানের মাঝে এই মমত্ববোধ গড়ে তোলাটাই হবে প্রধান কাজ। ১নং ঘোষণার (ঙ) ধারায় বলা হয়েছে ‘পরিবার বাড়ি ও স্কুল সান্নিধ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং পারিবারিক জীবন, শিক্ষা ও সমাজে স্বাভাবিক অংশগ্রহণে সহায়তা করতে হবে।’ এটা অনেক বেশি জরুরি।

অটিস্ট শিশুকে ঘরের ভেতর লুকিয়ে রেখে, সবকিছু থেকে বঞ্চিত অবহেলিত করে রাখলে, তার মানসিক বিকাশ হবে না এবং শারীরিক দুর্বলতাও দূর হবে না। সে আরও বেশি আতংকিত অথবা উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারে। তাকে সবার মাঝে ছেড়ে দিতে হবে, অংশগ্রহণের সুযোগ কবে দিতে হবে। পরিবারের সবার ভালোবাসা সে নিজেই অর্জন করুক। এভাবে একদিন বাইরের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতাও সে অর্জন করতে সক্ষম হবে। আর সেটাই হবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাফল্য।

আমরা আশা করবো এই সম্মেলনই শেষ নয়, এটা মাত্র শুরু। সম্মেলন আরও হবে, কর্মশালা হবে, সেমিনারও হবে এবং প্রশিক্ষণও চালু রাখতে হবে। প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ দেয়া হোক যাতে তারা অন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে পারে। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যে আস্থা ও বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে, তা ভেঙে যেতে দেয়া যাবে না। আমরা হতাশ, নিরাশ হতে চাই না।

এই মহৎ সম্মেলনে প্রধান উদ্যোক্তা স্কুল সাইকোলজিস্ট সায়মা হোসেন পুতুলকে আমাদের ধন্যবাদ জানাই। দেশী-বিদেশী যেসব বিশেষজ্ঞ, কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থা এ সম্মেলনে কাজ করেছেন তাদের কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ। অনেক অটিস্ট শিশুর মা-বাবা আমাকে টেলিফোন ও ই-মেইল করেছেন একটি আমন্ত্রন পত্রের জন্য। তারা এ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে ও প্রশিক্ষণ নিতে চেয়েছেন। আমি দুঃখিত আমন্ত্রনপত্রের কড়াকড়ি ছিল, কোথায় কীভাবে পাওয়া যাবে কেউ সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে দুঃখ করবেন না। আমিও করিনি, কেননা আমিও কোন আমন্ত্রনপত্র পাইনি। যারা এ সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তারা সচেতন হয়ে উঠুন – এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। এই সম্মেলনের অভিজ্ঞতার প্রথম ধাপ হলো জনসচেতনা বৃদ্ধি এবং আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক। আমাদের সন্ত্রানদের তারা ভালোবাসতে শিখুন।

Tags: , ,

WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
| | More
 -------------------------------------------------------------------------
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর নিজস্ব। bdnews24.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bdnews24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)

-------------------------------------------------------------------------

মন্তব্য করুন

প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes

ফেসবুক লিংক

ট্যাগ

সর্বশেষ মন্তব্য

আর্কাইভ