Enlightenment - 111

৩ নভেম্বরের জেল-হত্যাকাণ্ড নিয়ে যখুনি লিখতে বসেছি তখুনি পেলাম আরও এক মর্মান্তিক খবর। আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক স্যারের একমাত্র পুত্র, জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, শাহবাগে, তারই অফিস-কক্ষের ভেতরে।

খবরটি শুনে সঙ্গে সঙ্গেই ইথিওপিয়া থেকে স্যারকে ফোন করেছিলাম। পুত্রশোকের এই নিদারুণ বেদনার মধ্যেও প্রথমেই আমার কুশল তিনি জিজ্ঞাসা করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত তাজউদ্দীন আহমদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ডের তৃতীয় বর্ষপূর্তির (২৮ অগাস্ট, ২০১৪) স্মারক বক্তব্যের (তাজউদ্দীন আহমদ ও প্রথম বাংলাদেশ সরকার) নির্মোহ উপস্থাপনায় তিনি সত্যান্বেষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন।

ঠিক যেন একই অন্তর্দৃষ্টি থেকেই তাঁর স্বভাবজাত শান্ত অথচ অন্তহীন বেদনামিশ্রিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন উচ্চ আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমনতরো নির্বিচার এবং অমানবিক হত্যাকাণ্ড রোধের কথা। তিনি বললেন ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা এবং আধুনিক যুগের অনাচার দূর’ এবং ‘স্বাধীনতার অন্যতম অঙ্গীকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমাজে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার’ প্রয়োজনীয়তার কথা। তিনি, ‘জ্ঞান ও বিবেকবোধসম্পন্ন আলোকিত মানুষ সৃষ্টির’ কথা উল্লেখ করলেন; যার মাধ্যমে এমনতরো অমানবিক ও পাশবিক হত্যাকাণ্ড প্রতিহত করা যায় এবং পুত্রশোকের আজীবন বেদনার মধ্যেও কিছুটা সান্তনা পাওয়া যেতে পারে।

এ বছরের বই মেলায় প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বিজ্ঞানী ডক্টর অভিজিৎ রায়কে। তাঁরই বই প্রকাশ করার শাস্তি হিসেবে দীপনকে খুন করা হয়েছে বলে মনে করেন আবুল কাশেম স্যার। এই খুনিরা প্রকাশ্যে একের পর এক লেখক-ব্লগার এবং অতিসাম্প্রতিক প্রকাশককে খুন করে পালিয়ে যাচ্ছে এবং হত্যার হুমকি দিয়ে চলেছে, অথচ তাদেরকে ধরা সম্ভব হচ্ছে না, এটি অতি বিস্ময়কর, লজ্জাকর ও হতাশাজনক ব্যাপার।

 

খুনিরা লেখক-ব্লগার এবং অতিসাম্প্রতিক প্রকাশককে খুন করে পালিয়ে যাচ্ছে, তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না, এটি বিস্ময়কর, লজ্জাকর ও হতাশাজনক

 

এই খুনিরা কারা? তারা সেই ধর্মান্ধ এবং অন্ধকারের প্রতিনিধি অপশক্তি যারা অজ্ঞতা, হিংস্রতা ও ঘৃণাকে বানিয়েছে অনন্ত জ্ঞান ও করুণার আধার স্রষ্টার প্রতিনিধিস্বরূপ। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, যে ষড়যন্ত্রকারী এবং হত্যাকারীরা রাতের আঁধারে কারাগার-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে খুন করেছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী এবং কামরুজ্জামানকে এবং ১৫ অগাস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে, তারাও ছিল সম-মানসিকতাসম্পন্ন– অন্ধ অপশক্তি এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অংশ।

উন্নত সমাজের সঙ্গে অনুন্নত সমাজের মূল ফারাক হল জ্ঞান ও অজ্ঞানতার। উন্নত সমাজে কোনো মত প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সাধারণত যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগ করা হয় এবং তার বিপরীত মত প্রতিষ্ঠার জন্যেও একইভাবে যুক্তি-বুদ্ধির প্রাধান্য দেওয়া হয়। বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা তো স্রষ্টার আরাধনাস্বরূপ। মধ্যযুগের অন্ধকারাছন্ন ইউরোপে ইসলাম ধর্ম রেনেসাঁ বা নবজাগরণের পথিকৃৎ হয়ে ছিল জ্ঞানের বাতিঘর হয়ে। বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারী ইসলামি আইনের পণ্ডিত ইবনে রুশদ (আভে রোঁশ) যুক্তিনিষ্ঠ মুক্তচিন্তার মশাল হয়ে ইউরোপের বিদ্বৎ-সমাজে আলোড়ন তুলেছিলেন। আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক-রপে অভিহিত ইবনে খালদুন বিভিন্ন দেশ ঘুরে বৈচিত্র্যময় জাতি ও সংস্কৃতির বিশ্লেষণ করেছিলেন ও রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের কারণ নির্ণয় করেছিলেন। গণিতবিশারদ আল খোয়ারিজমি আল-জাবর ও আল মুকাবিলা পুস্তকে বীজগণিতের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন।

এ ধরনের উন্নত চেতনাসম্পন্ন চিন্তাবিদরা বিরুদ্ধ মতবাদ ভয় করতেন না, বরং তাকে জানতে সচেষ্ট হতেন, বিশ্লেষণ এবং খণ্ডন করতেন বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার সংস্কৃতি লালন করে। ইসলাম ধর্ম বা হযরত মোহাম্মদ (স.)এর বিরুদ্ধে কেউ কটূক্তি করলে তাকে যারা হত্যা করে, তারা বাস্তবিক দুর্বল, অজ্ঞ ও কাপুরুষ। শত কোটি মানুষের বিশ্বাসের ক্ষেত্র ধর্ম তো কোনো ঠুনকো বস্তু নয় যে, কারও কটূক্তিতে তা ধসে পড়বে। ধর্ম হল আগুনের মতো শক্তিস্বরূপ। যার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কিন্তু অজ্ঞ লোকের হাতে তা ধ্বংসই নিয়ে আসে।

কোরআন শরীফে বর্ণিত হয়েছে:

“জ্ঞান ও উৎকৃষ্ট উপদেশ সহকারে তোমার প্রতিপালকের প্রতি আহবান কর এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত আচরনের মাধ্যমে তাদেরকে বোঝাও।”

(১৬-২৫)

অন্যত্র বলা হয়েছে:

“পরম করুণাময়ের সত্যিকারের দাসরা পৃথিবীতে হাঁটে বিনয়-সহকারে। অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের আহ্বান করে, তারা বলে, ‘শান্তি’।”

(২৫-৬৩)

একই সঙ্গে এটাও লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের দেশের মূলধারার অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী ধর্মের বিষয়টি এড়িয়ে চলেন। ধর্মের মানবিক ব্যাখ্যা প্রদান হতে তারা বিরত থাকেন। এর ফলে এই শূন্য স্থানটিতে আসন গেঁড়ে বসে ধর্মের সংকীর্ণ ও অপব্যাখ্যাকারীরা। বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মুক্তচিন্তার সঙ্গে ধর্মের মূল বাণীর যে সংঘাত নেই, এটি মূলধারার আলোচনায় তেমন উঠে আসে না।

অন্যদিকে, পাশ্চাত্যে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সকল ধর্মর নির্যাস আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিষয়টি, যা আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে অতীন্দ্রিয় জগতের সন্ধান দেয় এবং সমাজে ভারসাম্যতা আনে, তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আশির দশকে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাই তখন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বিশেষত মলিকিউলার বায়োলজি এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্সের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আবিস্কার আলোড়ন তুলেছিল। বিজ্ঞানী ডক্টর ব্রুস লিপটন, ডক্টর ফ্রেড অ্যালান উলফ, ডক্টর জোন বরিসেনকো, চিকিৎসাবিদ ডক্টর ল্যারি ডসি প্রমুখের গবেষণালব্ধ ফলাফল সে যুগে জ্ঞানের জগতে নতুন মাত্রা প্রদান করেছিল।

 

মধ্যযুগের অন্ধকারাছন্ন ইউরোপে ইসলাম ধর্ম রেনেসাঁ বা নবজাগরণের পথিকৃৎ হয়ে ছিল জ্ঞানের বাতিঘর হয়ে

 

বিশ শতকের শুরুতে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, নিলস বোহর, মাক্স প্ল্যাঙ্ক, নিকোলা তেসলা প্রমুখ বস্তু, শক্তি, আলো এবং আলোর বিভিন্ন মাত্রার স্পন্দন (ভাইব্রেটিং ফ্রিকোয়েন্সি) নিয়ে যে যুগান্তকারী আবিস্কার এবং নতুন পথ দর্শন করেছেন, তা-ই প্রাযুক্তিক উন্নয়নের ফলে আরও অগ্রসর হয়ে বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতাকে একসূত্রে গেঁথেছে। আত্মিক উন্নয়নের চাবিকাঠি প্রার্থনা, সুচিন্তা, কৃতজ্ঞতাবোধ, দয়া, দান, ক্ষমাশীলতা প্রভৃতির অনুশীলন যে শরীরের প্রতিটি জীবকোষে, বংশধারায় (ডিএনএ) এবং পারিপার্শ্বিকতায় অসামান্য এবং হিতকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম তা উল্লিখিত এবং অনুল্লিখিত বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়।

মানব-ইতিহাসের অতি-প্রাচীন আধ্যাত্মিক জ্ঞান আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে ও ব্যাপ্তি লাভ করে বিজ্ঞানের শাণিত স্পর্শে। নব্বই দশক হতে এই বর্তমান সময় পর্যন্ত মানবদেহের কার্যক্রম, মন, চেতনা সম্পর্কে যে বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলি প্রকাশিত হয়েছে তা হতে একটি সত্যই ক্রমান্বয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে যে, জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতি ও বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের উৎস এক অনন্ত মহাশক্তি হতে। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মূলেও রয়েছে অদৃশ্য শক্তি, যাকে অনেক বিজ্ঞানী অভিহিত করেছেন ‘আলো’ রূপে। সকল বস্তুর উৎপত্তি এই এক অসীম বুদ্ধিসম্পন্ন মহা-আলো হতে যা স্থান ও সময়ের গণ্ডির বাইরে।

বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসে এই মহাশক্তিকে সম্বোধন করা হয় ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান,গড, জেহভা এবং আদি আমেরিকান ইনকা, মায়া, চেরকি,অ্যাজটেক প্রভৃতি গোত্র যাকে সম্বোধন করত ‘দ্য গ্রেট স্পিরিট’ রূপে।

বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সেই অনন্ত আলোরই প্রতিফলন। কোরআন অনুসারে, “আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীর আলো…। আলোর উপর আলো। আল্লাহ যাকে চান তাকে স্বীয় আলোর দিকে পথ প্রদর্শন করেন।”

(আল কোরআন, ২৪- ৩৫)

মুণ্ডক উপনিষদ অনুসারে, “উচ্চতম সোনালী কোষে অধিষ্ঠিত নিখুঁত ব্রহ্ম (অদ্বিতীয় স্রষ্টা), সম্পূর্ণ, পূর্ণ, অতি-উজ্জ্বল, সকল আলোর আলো। যে নিজ সত্তাকে জানে, সে তা জানে।… সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড তারই আলোতে প্রতিফলিত।’’

(মুণ্ডক উপনিষদ, ২-১০)

বাইবেলেও স্রষ্টাকে আলোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে:

“… এবং শহরটির কোনো প্রয়োজন নেই যে, সূর্য অথবা চন্দ্র তার ওপর দীপ্তি ছড়াক; কারণ স্রষ্টার মহিমাই হল তার আলো।”

(রিভিলেশন, ২১-২৩)

ভূগর্ভের অতল অন্ধকারে হীরা যেমন লুকিয়ে থাকে তেমনি সকল মানব-হৃদয়েও লুক্কায়িত থাকে স্রষ্টার আলো। এই আলোকে তিলে তিলে খনন করে বের করতে হয় আত্মোউপলব্ধি ও আত্ম-পরিশুদ্ধির হাতিয়ার দিয়ে। যারা সেই সাধনা অব্যাহত রাখেন তারা হন সমাজের পথপ্রদর্শক। তাঁদের অঙ্কিত পদচিহ্ন অনুসরণ করে নবীনরা খুঁজে পায় আলোকিত পথের সন্ধান।

১ নভেম্বরে স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের সঙ্গে জেলে শেষ সাক্ষাতের সময় তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না। আর ঐ একই সময়ে বন্দি তাজউদ্দীন আহমদ জেল-প্রাঙ্গনে শতাধিক মৌসুমি ফুলের চারাগাছ লাগানোর কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। যাঁরা মৃত্যু আসন্ন জেনেও মাটিতে রোপণ করেন স্বপ্ন ও সৌন্দর্যর বীজ, তাঁরাই মৃত্যুঞ্জয়ী– আলোর পথের যাত্রী।

আদ্দিস আবাবা, ইথিওপিয়া

২ নভেম্বর, ২০১৫

শারমিন আহমদশিক্ষাবিদ ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জ্যেষ্ঠ কন্যা

Responses -- “আলোর পথের যাত্রী”

  1. Amin Ahsan

    সম্পূর্ন লিখাটি পড়লাম । খুব ভালো লেগেছে । বিশেষ করে আপনি যে কুরআন শরীফ, হাদীস, বাইবেল সবকিছু থেকে কোটেশন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন তা অসাধারন । এ থেকেই বুঝা যায় আপনার এক একটি লিখা একটি গবেষনা ।
    আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বুদ্ধি বৃত্তি চর্চার মাধ্যমে সকল বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আমাদের দেশও হয়তো একসময় আধুনিক উন্নত সমাজ এ পরিনত হবে । কিন্তু সেটিকে সত্যিকারের আদর্শ উন্নত সমাজ বলা যাবে না যদি ধর্মীয় নীতি নৈতিকতা সঠিক ভাবে মেনে চলা না হয় । যারা যে ধর্মের সে ধর্মের রীতি অনুসরন এবং পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার মাধ্যমে একটি সুন্দর আদর্শিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমি মনে করি । কিন্তু দু:খের বিষয় এটিই যে পৃথিবীর কোথাও এমন আদর্শ্ সমাজের অস্তিত্ব নেই ।

    Reply
  2. Shafiq Shohag

    সম্পূর্ণ লিখাটিই পড়লাম । বহুমাত্রিক তথ্য নির্ভর হওয়ায় অত্যন্ত চমৎকার লেগেছে । চমৎকার এই লিখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করার পূর্বে অন্যান্য মন্তব্য গুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই আঁতকে উঠি । লেখিকা পশ্চিমাদের উন্নত সমাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন ! এরপর আরেকটু মনোযোগ বৃদ্ধি করে লিখাটি আবার পড়লাম । কিন্তু না; লেখিকা উন্নত সমাজ বলতে পশ্চিমাদের আখ্যায়িত করেছেন এমন কিছুই পেলাম না ।

    লেখিকা উন্নত সমাজ সম্পর্কে বলেছেন, “উন্নত সমাজের সঙ্গে অনুন্নত সমাজের মূল ফারাক হল জ্ঞান ও অজ্ঞানতার। উন্নত সমাজে কোনো মত প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সাধারণত যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগ করা হয় এবং তার বিপরীত মত প্রতিষ্ঠার জন্যেও একইভাবে যুক্তি-বুদ্ধির প্রাধান্য দেওয়া হয়।”

    আমি মনে করি লেখিকা উন্নত সমাজ বলতে সে সমাজকেই বোঝাতে চেয়েছেন, যে সমাজে যুক্তি ও বুদ্ধি ভিত্তিক মুক্ত চিন্তা-মুক্ত ভাবনা এবং মুক্ত বাক স্বাধীনতা বিদ্যমান ।

    তবে আমাদের সমাজে কিছু ব্যক্তি নিজেদের মুক্ত চিন্তক দাবী করে মুক্ত বাক স্বাধীনতার জন্য গলা ফাটায় । কিন্তু দুঃখজনক, এসকল স্ব-স্বীকৃত মুক্ত চিন্তকগণ একবারের জন্যও চিন্তা করেন না; তাদের এই মুক্ত চিন্তা আদৌ কি যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগকৃত কিনা । আবার কিছু ধর্মান্ধ, ধর্মের সংকীর্ণ ও অপব্যাখ্যাকারী ব্যক্তি আছে যারা ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার অভাবে ধর্ম সম্পর্কে যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগহীন ব্যাখ্যা প্রদান করে । এ বিষয়ে লেখিকা মূলধারার অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীদের দায়ী করে বলেছেন, “আমাদের দেশের মূলধারার অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী ধর্মের বিষয়টি এড়িয়ে চলেন। ধর্মের মানবিক ব্যাখ্যা প্রদান হতে তারা বিরত থাকেন। এর ফলে এই শূন্য স্থানটিতে আসন গেঁড়ে বসে ধর্মের সংকীর্ণ ও অপব্যাখ্যাকারীরা।”

    উন্নত সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে যুক্তি-বুদ্ধি তথা জ্ঞানের প্রয়োগ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন এর নির্দেশনাটিও লেখিকা উল্লেখ করেছেন-
    “জ্ঞান ও উৎকৃষ্ট উপদেশ সহকারে তোমার প্রতিপালকের প্রতি আহবান কর এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত আচরনের মাধ্যমে তাদেরকে বোঝাও।”
    (১৬-২৫)

    সুতরাং এটা নিশ্চিত, লিখাটিতে যুক্তি এবং বুদ্ধির প্রাধান্য ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজকেই উন্নত সমাজ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে । এখানে পশ্চিমাদের কথা কেন আসবে তা আমার বোধগম্য নয় ।

    যাই হোক, লেখিকা তাঁর এই লিখাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন যে, প্রত্যেক ধর্মেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাসী । তবে সৃষ্টিকর্তাকে সম্বোধন করা হয় ভিন্ন ভিন্ন নামে । ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান,গড, জেহভা এবং দ্য গ্রেট স্পিরিট নামে সম্বোধন করা হয় । তবে প্রত্যেক ধর্মগ্রন্থেই বলা হয়েছে যে, সকল মানব-হৃদয়ে লুকায়িত থাকে স্রষ্টার আলো যা তিলে তিলে খনন করে বের করতে হয় আত্মোউপলব্ধি ও আত্ম-পরিশুদ্ধির হাতিয়ার দিয়ে। যারা এই সাধনায় সফল হন তাঁরা অন্যের পথপ্রদর্শক, তাঁরা মৃত্যুঞ্জয়ী– আলোর পথের যাত্রী ।

    Reply
  3. মোঃ মিজানুর রহমান চৌধুরী

    উন্নত সমাজ বলতে উন্নত সমাজ ব্যবস্থা চিন্তা করলে দ্বিধা দূর হতে পারে। পশ্চিমা দেশ বলে এখানে কোন শব্দ উচ্চারিত হয়নি,আর হলেই বা কি, এই দেশগুলোর স্বদেশীয় ভাবনা আর আন্তর্জাতিক ভাবনা বা পলিসি একরূপ নয়। আমার মনে হয় শারমীন আহমদ যা লিখেছেন তার মর্মার্থ বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়, শুধু এদেশীয় বুদ্ধিজীবীদের যা একটু সমস্যা হতে পারে। উনি যেদিকের ইঙ্গিত দিয়ে তাদের ভাবনা চিন্তা ও প্রতিক্রিয়ার কথা বলেছেন, তা ওনাদের কাছে করলার রসের মতই তিতা মনে হতে পারে। ধর্মের মর্ম বুঝতে গেলে দেশীয় কি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বুদ্ধিজীবীরা নিজদেরাই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারেন, এই যুগে এত বড় রিস্ক নেয়া সম্ভব নয়, তার উপর যে যোগাযোগ ব্যবস্থার গতিশীলতা, ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, কেউই নজরদারির বাইরে নন। ৭১ এ এদেশ একবার বুদ্ধিজীবীদের লাশ বহন করেছিল, এখন আমরা প্রতিনিয়ত এই মৃত বুদ্ধিজীবীদের দায় বহন করে চলছি, এদেশে এখন আর কেউ বুদ্ধিজীবী নেই, তারা বুদ্ধি করে নিজের গা বাঁচিয়ে হাওয়ার তালে কথা বলেন, কিন্তু নিজস্বার্থ আর পিতৃপ্রদত্ত প্রাণের হেফাজত ছাড়া কোন সুশীলতার কথা এনাদের মুখ দিয়ে বের হয়না। আমি বিষোদ্‌গার ছাড়া একজন বুদ্ধিজীবীও দেখিনি এদেশে, একজন বুদ্ধিজীবীও পাইনি যাদের চোখের সমস্যা নেই, একজন বুদ্ধিজীবীও পাইনি যিনি সর্বজনীন স্বার্থের কথা, মুক্তির কথা উচ্চারণ করেন। এদেশসহ মুসলিম দেশ এই পৃথিবীতে কম নেই, কিন্তু আমরা মুসলিম এই ভাবনাটা খুব বেশী নেই আমাদের মাঝে। (সরি, কথাগুলো বলতে গিয়ে নিজেই বিষোদ্‌গার করে ফেলছি !) দুশ্চিন্তায় কারো হাতে কলম উঠে আসুক এটাও কাম্য হতে পারে না, এরপরেও আপনার পরিশীলিত ও যথার্থ ভাবনা শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

    Reply
  4. মোঃ মোস্তফা জামাল জাহেদী

    আপনার লেখাটি মনযোগ দিয়ে পড়লাম, বেশ ভালো লাগলো । তবে আপনি উন্নত সমাজ বলতে যদি পশ্চিমা পরাশক্তি সমাজকে বুঝিয়ে থাকেন তবে অনুরোধ করবো ঐসকল উন্নত সমাজ কিভাবে অনুন্নত সমাজের আলোর প্রক্ষেপণকে নিভিয়ে দিচ্ছে দেশে দেশে কালে কালে তারও একটি বিশ্লেষনধর্মী লেখা উপহার দিন।

    Reply
  5. লতিফুল কবির

    বিডিনিউজ২৪-এ আপনার লিখা ছাপা হওয়া আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। আপনি প্রথম-আলোতেও লিখেন, যা আমার ভালো লাগেনা।

    আপনার পুরো লিখাটাই মনযোগ দিয়ে পড়ার মত। তবে, এক যায়গায় আটকে গেলাম, যেখানে বলছেন, “উন্নত সমাজের সঙ্গে অনুন্নত সমাজের মূল ফারাক হল জ্ঞান ও অজ্ঞানতার। উন্নত সমাজে কোনো মত প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সাধারণত যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগ করা হয় এবং তার বিপরীত মত প্রতিষ্ঠার জন্যেও একইভাবে যুক্তি-বুদ্ধির প্রাধান্য দেওয়া হয়।” প্রকৃতপক্ষে আপনি উন্নত সমাজ বলতে এক আদর্শ সমাজের কথা বলছেন, যেটা বিশ্বের কোথাও নাই। পাঠক পশ্চিমাদের উন্নত সমাজ ভেবে বিভ্রান্ত হতে পারে।

    পশ্চিমারা উন্নত সমাজের নামে যে কতটা বর্বর সমাজ তৈরী করেছে, তা আপনার চোখে ধরা না পড়াটা আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। যে পশ্চিমা সমাজ ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানের হাজার বছরের সভ্যতা ধ্বংস করেছে, যে পশ্চিমা সমাজ আদিবাসীদের হত্যা করে আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার গোড়াপত্তন করেছে, তাকে উন্নত সমাজ বলার কোন সুযোগ নাই।

    পর্দার আড়ালে বঙ্গবন্ধু ও তাজুদ্দিনের খুনীরা যে পশ্চিমের উন্নত সমাজের বাসিন্দা তা উঠে না আসাটা দুঃখজনক, এবং একধরনের আলোহীনতা; যদিও আপনার নিবন্ধ শুরু হয়েছে আলোর পথের যাত্রীদের উদ্দেশ্যে।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      যে সমাজে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় তাকেই উন্নত সমাজ বলা যেতে পারে। সেটি প্রাচ্যেই হোক বা পাশ্চাত্যে। নিখুত বা আদর্শ সমাজ বিশ্বে নেই। তা সত্ত্বেও যে সমাজ আত্ম বিশ্লেষণ, আত্ত সমালোচনা এবং বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা আব্যহত রাখে সেই সমাজই সত্যিকারের উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। যেমন কোস্টারিকা একটি ক্ষুদ্র ও মধ্যম অর্থনীতির রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বহু ধনশালী ও প্রাযুক্তিক ক্ষেত্রে উন্নত রাষ্ট্রের চাইতেও অনেক অগ্রসর এবং লাতিন আমেরিকার অন্যতম স্থিতি শীল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত। এই রাষ্ট্রটি সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে সামরিক বাহিনী বিলুপ্ত করে এবং সামরিক খাতের সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করে সর্ব সাধারণের জন্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। এই রাষ্ট্রের গুরুত্ব পূর্ণ নীতি নিরধারনে পেশী ও অস্ত্র নয় বরং শান্তি পূর্ণ নীতিরই প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। তিন দশক আগেও বিশ্বের দরিদ্রতম রাষ্ট্রের অন্যতম দক্ষিন কোরিয়ার শিক্ষা ব্যাবস্থা আজ বিশ্বের সরবচ্চ শিখরে এবং বুদ্ধিবৃত্তির শান্তি পূর্ণ প্রয়োগে এবং সবল অর্থ নীতিতে সমৃদ্ধ।
      অস্ত্র রফতানী কারী পশ্চিমা রাষ্ট্র গুলির যুদ্ধবাদী বৈদেশিক নীতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুক্ত রাষ্ট্র সরকারের আগ্রাসী ভুমিকার উপর আমি আগেও অনেক লিখেছি। এই বিডি নিউজেই সে সম্পরকে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে (সত্যর সংগ্রাম সহ বিভিন্ন প্রবন্ধে, যা আর্কাইভে সংরক্ষিত)। পাকিস্তানকে অনৈতিক সমর্থন, বাংলাদেশের গন হত্যায় অস্ত্র সরবরাহ এবং বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদ সহ চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রর ভূমিকা সম্পর্কে আমি বিভিন্ন প্রবন্ধে লিখেছি। ” তাজউদ্দীন আহমদ নেতা পিতা গ্রন্থেও তথ্য সহকারে লিখেছি (পৃষ্ঠা ১০১-১০৫,২২৩-২২৪) নিজ সরকারের যুদ্ধবাদী নীতির কঠোর সমালোচনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক সিনেটর কেনেডির ওয়াশিংটনের জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রদত্ত ( ২৬ অগাস্ট, ১৯৭১) সুদীর্ঘ ভাষণ হতে নিজে অনুবাদ করে একই গ্রন্থে উল্লেখ করেছি।
      “আলোর পথের যাত্রী” তারাই যারা যে সমাজেরই হননা কেন আত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আত্ত শুদ্ধির প্রয়াস অব্যহত রাখেন।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—