Feature Img
বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থাপত্যকর্ম বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন
বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থাপত্যকর্ম বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থাপত্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। ১৯৬২ সালে মার্কিন স্থপতি লুই ইসাডোর কানকে যখন সংসদ ভবন ও শেরে বাংলা নগরের নকশার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বৃহৎ ও সেরা কর্মটি এই দেশেই করে যেতে চেয়েছিলেন। লুই কানের এই নকশার মূল অনুপ্রেরণা ছিল এদেশের মানুষ, যাদের প্রাণস্পন্দন তিনি স্থাপত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

এস্তোনীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন স্থপতি লুই ইসাডোর কান
এস্তোনীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন স্থপতি লুই ইসাডোর কান

লুই কানের ভাষায়–

I was given an extensive program of buildings: the Assembly, the Supreme Court, hostels, schools, a stadium, the diplomatic enclave, the living sector, market: all to be placed on a thousand acres of flat land subject to flood…I kept thinking of how these buildings may be grouped and what would cause them to take their places on the land. On the night of the third day, I fell out of bed with a thought which is still the prevailing idea of the plan. I made my first sketch on the paper, of the Assembly, with the mosque and the lake. I added the hostels framing this lake. This came simply from the realization that “assembly” is of a transcendent nature. Men come to assembly to touch the spirit of community, and I felt that this must be expressible.

[লুই আই কান, লাইট এন্ড স্পেস, উরস বাটিকার, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ১৬১]

সম্প্রতি আমরা পত্রিকায় দেখেছি নিরাপত্তার খাতিরে নাকি জাতীয় সংসদ ভবনকে আট ফুট উঁচু লোহার প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলার একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে লোহার প্রাচীর দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত যে এই ভবন ঘিরে লুই কানের চিন্তাভাবনা ও জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে গণমানুষের প্রাণস্পন্দন তুলে ধরার জন্য এই অ্যাসেম্বলি ভবনের সৃষ্টি হয়েছে, সেই মানুষদেরই এখন দেয়াল তুলে সরিয়ে দেওয়া হবে!

প্রসঙ্গতভাবে উল্লেখ্য, সংসদ ভবনের নকশার কারণেই এটি যথেষ্ট সুরক্ষিত; ভবনের চারপাশে কৃত্রিম লেক তৈরি করে প্রাকৃতিকভাবেই নিরাপত্তা বেষ্টনির সৃষ্টি করা হয়েছে– ব্রিজ বা র‌্যাম্প ছাড়া আর কোনোভাবে ভবনে প্রবেশের সুযোগ নেই। একে লোহার বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলার কী প্রয়োজন এবং এই বেড়াই-বা কতটুকু নিরাপত্তা দেবে তা ঠিক আমাদের বোধগম্য নয়। আরও নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলে এর নকশার ক্ষতিসাধন না করেই আধুনিক নানা প্রযুক্তিগত উপায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা যায়।

গুগল আর্থ থেকে পাওয়া জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার ছবি
গুগল আর্থ থেকে পাওয়া জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার ছবি

জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশায় আঘাতের প্রচেষ্টা এবারই প্রথম নয়। কিছুদিন আগেও পত্রিকায় এসেছে জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর ফটকটি বন্ধ করে সেখানে একটি টেলিভিশন কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে যা লুই কানের মূল নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া নকশা রদবদল করে কাঁচ ও কাঠের বিভাজন দিয়ে সংসদ ভবনে বেশ কিছু বাড়তি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে এবং জানালা বন্ধ করা হয়েছে, যার ফলে একদা প্রাকৃতিকভাবে আলোকিত এই জায়গাটি এখন দিনের বেলা প্রায়শই অন্ধকার থাকে।

অথচ এমনটি হবার কোনো কথা ছিল না। জাতীয় সংসদ ভবন যে পৃথিবীর অন্যতম একটি সেরা স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃত তার অন্যতম কারণ হল এটি আলো-ছায়ার কারুকাজের একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। প্রাকৃতিক আলোর প্রক্ষেপণের মাধ্যমে লুই কান সংসদ ভবনকে একটি ‘পোয়েটিক এনটিটি’ করে তুলতে চেয়েছিলেন।

আবারও লুই কানের ভাষায়–

In the Assembly I have introduced a light-giving element to the interior of the plan. If you see a series of columns, you can say that the choice of column is a choice in light…I am working to develop the element to such an extent that it becomes a poetic entity which has its own beauty outside of its place in the composition.

[লুই আই কান, লাইট এন্ড স্পেস, উরস বাটিকার, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ১৭১]

সংসদ ভবনের নকশার কাজ লুই কান কতটা যত্ন দিয়ে করেছিলেন তার একটা উদাহরণ হল অ্যাসেম্বলি হলের মাঝখানে ছাতাসদৃশ যে অষ্টভুজাকৃতি ছাদ রয়েছে, শুধু এই ছাদের নকশার জন্যই সুদীর্ঘ দশ বছর সময় ব্যয় করেন তিনি। এর প্রধান কারণ ছিল প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এখানে কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সেটা নিয়ে নানারকম গবেষণার পর শেষ পর্যন্ত এই ডিজাইনটিই তাঁর মনঃপুত হয়েছিল।

ছবিসূত্র: Louis I. Kahn: Light and Space (Buttiker, 1994)
ছবিসূত্র: Louis I. Kahn: Light and Space (Buttiker, 1994)

শুধু ছাদ বা জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো আসার ব্যবস্থা করে লুই কান ক্ষান্ত থাকেননি– সংসদ ভবনের দেয়াল, মেঝে এবং সিঁড়িগুলো থেকেও তিনি আলোর বিচ্ছুরণ ঘটানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। লুই কানের স্থাপত্যে লাইট ও স্পেসের ভূমিকা নিয়ে ১৯৯৪ সালে লেখা গবেষণামূলক গ্রন্থে উরস বাটিকার জানাচ্ছেন–

‘‘সংসদ ভবনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে সূর্যের আলো এমনভাবে পৌঁছাত যেন মনে হত এর দেয়ালগুলো এবং অভ্যন্তরে সূর্যরশ্মি নদীর মতো বয়ে চলেছে। দিনের বেলায় সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী এর ভেতরের পরিবেশও পরিবর্তিত হওয়ার জন্য ব্যবস্থা নকশায় রাখা হয়েছিল।’’

উরস বাটিকার এখন গেলে হয়তো দেখতে পেতেন লুই কানের নকশায় হস্তক্ষেপ করে বাড়তি নানা কক্ষ বানিয়ে, জানালা বন্ধ করে আমরা সংসদ ভবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছি।

জাতীয় সংসদ ভবন আমাদের গর্ব এবং গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অংশ। বহির্বিশ্বে যে এর এত পরিচিতি তা শুধু এর অতুলনীয় নকশা আর স্থাপত্যের কারণেই। আমরা জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশাটি সবরকম বিকৃতি ও পরিবর্তনের হাত থেকে রক্ষা করে লুই কানের এই অনন্য স্থাপত্যকর্ম যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার দাবি জানাই।

ড. তানভীর ইসলাম: নগর পরিকল্পনাবিদ ও সহকারী অধ্যাপক, জ্যাকসনভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

এম এম আর জালাল: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সংগ্রাহক।

১২ প্রতিক্রিয়া -- “জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশার বিকৃতি কেন”

  1. হাফিজুর রহমান

    লুই আই কান এর মূল নকশার পরিবর্তন করে নিরাপত্তার নামে যারা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা করতেছে তারা সংসদ ভবনের গূরত্ব বুঝতে পারেনি।তারা ভুলে গেছে যে সংসদ ভবন বিশ্বের সর্বকালের১০০ ভবনের একটি।

    জবাব
  2. Mamlukar Rahman

    রাজনীতিবিদ ও আমলাদের শিল্পকলা, স্থাপত্য, নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানের পরিমাণ শূন্য। তাই তারা সংরক্ষিত স্থাপত্য মোগল আমলের লাল মসজিদে সাদা চুনকাম করে, সেখানে ওরশ হয়। লুই কানের কীর্তি বোঝার মতো ঘিলু তাদের নেই!

    সংসদ ভবনের স্যাটেলাইট ভিউ দেখে তাজ্জ্বব হয়ে গেছিলাম। যখন বানানো হয় তখন তো স্যাটেলাইট ম্যাপ ছিল না।

    জবাব
  3. কাজী আহমদ পারভেজ

    ওয়াটার অবস্ট্রাকল বা জলজ বাধার সাহায্যে নিরাপত্তা বিধান এবং ফেন্সিং বা বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা প্রদান, এই দুটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হুমকি (থ্রেট) মোকাবিলা করার জন্য গৃহীত ব্যবস্থা।

    আট ফুট উঁচু লোহার প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলার সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া হয়ে থাকে, তা কোন থ্রেট অ্যাসেসমেন্টের পরিপ্রেক্ষিতে করা হল, সেটা জানা জরুরি। সেটা না জেনে, বেড়ার বিকল্প হিসেবে পানিকে দাঁড় করানো কোনো কাজের কথা নয়।

    তাছাড়া লেকটিকে যতটা নিরাপত্তার অনুষঙ্গ মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হয় সৌন্দর্য্যের অনুষঙ্গ।

    আর একটা কথা, লেক কারও কারও কাছে কিন্তু বাধা নয়, বরং আনডিটেক্টেড চলাচলের নিরাপদ পথ। যেমন প্রশিক্ষিত ডুবুরির।

    লোহার প্রাচীরের বিপক্ষে যাবার আগে আমি থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট জানাটা জরুরি মনে করি।

    জবাব
  4. হুমায়রা

    জিয়াউর রহমান সংসদ ভবনের বড় বড় গাছগুলো কেটে ফেলেছিলেন। নিয়তির পরিহাস হচ্ছে এখন আর সেই কথাগুলো কেউ বলে না!!!

    আর এই প্রবন্ধের মূল যে বক্তব্য তা হল সংসদ ভবনের চারপাশে যেহেতু লেক তৈরি করা আছে, ফলে সেটা নিয়ে নিরাপত্তার আর কোনো চিন্তা নেই। লেক তৈরি করা হলেই কি নিরাপত্তার সব দিক বিবেচনা করা হয়ে যায়? সাঁতার কেটে ওই লেক যে পাড়ি দেওয়া যাবে না, এমন কি কোথাও বলা আছে?

    মূল স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপত্তা বেষ্টনি তৈরি করা হলে অসুবিধাটা কোথায়? নিরাপত্তা বেষ্টনি নানানভাবে দৃষ্টিনন্দন করে ফেলা যেতে পারে। সেখানে সংসদের নানান কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্র ঝোলানো যেতে পারে। উদ্যোগ নিলে সেটাও হতে পারে দর্শনীয় এলাকা।

    কেন নিরাপত্তার দিকটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না বা আমরা দেখতে চাচ্ছি না, ব্যাপারটা বোধগম্য নয়।

    জবাব
  5. Shahed Khan

    কিছু মানুষের নির্বুদ্ধিতার কারণে আমাদের এই দৃষ্টিনন্দন অমূল্য সম্পদ কোনোভাবেই বিকৃত হতে দেওয়া ঠিক হবে না।
    প্রজন্ম একাত্তরের সৈনিকেরা, গণজাগরণ মঞ্চের তরুণেরা এবং মুক্তিয়োদ্ধার সন্তানেরা কোথায় তোমরা? কোথায়??????

    জাগো, বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তোল। আমাদের ঐতিহ্যের নিরাপত্তা বিধান কর।

    জবাব
  6. রাহমান জুবায়ের

    হ্যাঁ, এরপর আমরা দেখব দেয়াল ঘেঁষে থাকবে হাজার হাজার বৈধ অথবা অবৈধ স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা, ঝুপড়ি নির্মাণ করে চলবে ব্যবসা-বাণিজ্য–

    রাজধানীকে কু-দৃশ্য এবং বসবাসের অনুপযোগী করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর কতকাল দেখতে হবে– সচেতন মহল এগিয়ে আসবেন আশা করি।

    জবাব
  7. Kibria Zahid Mamun

    তার মানে পাকিস্তানকে নিয়ে যা বলা হয়, তারা আমাদের বঞ্চিত করছিল সবকিছুতে, একাত্তরের আগে– তা অনেকাংশে সত্য নয়।

    জবাব
    • সৈয়দ আলী

      ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত তথাকথিত পাকিস্তানের বিদেশি মুদ্রা আয়ের প্রধান সূত্র বাংলাদেশে তথাকথিত পাকিস্তানের ব্যয় ছিল মোট আয়ের ২½%, জাতীয় সংসদের মূল ভবন বাংলাদেশে তৈরি করার অনুমতিতেই তা শোধ হয়ে গেল?

      বাহ্‌!!!

      জবাব
      • রাহমান জুবায়ের

        আমি বলব আমাদের ব্যর্থতা হল নিজেদের কৃতিত্ব তুলে ধরতে না পারা। এই সংসদ ভবন নির্মাণের ৯০ শতাংশ কাজ বাংলাদেশ আমলে হয়েছে।

  8. iqbal hasnu

    এ কেমন অবিমৃশ্যকারিতা!

    প্রজন্ম একাত্তর, গণজাগরণ মঞ্চের তরুণরা যদি এ রুচিহীনতা না ঠেকাও তো সর্বনাশ হবে!!!

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—