মুহম্মদ নূরুল হুদা
মন্ত্রী-সচিব, কোচিং ও ছাত্রছাত্রীদের নসিব
সম্প্রতি শিক্ষার নামে বেপরোয়া বিদ্যা-ব্যবসা বন্ধ করার জন্যে মহামান্য আদালত রায় দিয়েছেন। আর সেই রায়ের আলোকে সারা দেশে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অসাধু কোচিংবাণিজ্য বন্ধ করার জন্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জারি করেছে “কোচিং নীতিমালা ২০১২” । এর আগে গত ১৪ জুন শিক্ষক, শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী সভা করে নীতিমালা চূড়ান্ত করেন। তার মাত্র ৬ দিনের মাথায় ২০ জুন এই নীতিমালা জারি হয়েছে। এমন দ্রুততার সাথে ঘটনা আগে তেমন ঘটেনি। আমরা এজন্যে মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই।
তবে নীতিমালাটি জারি হওয়ার পরপরই মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দ। অভিভাবকরা প্রায় সকলেই এতে যারপরনাই খুশি, কিন্তু বিদ্যাব্যবসায়ী প্রায় সকল শিক্ষক এতে অখুশি বলে মনে হচ্ছে। অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না, বিন্তু তারাও মনে মনে অখুশি। ব্যতিক্রম যারা আছেন তাদের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। এদের মধ্যে নিঃসন্দেহে কেউ কেউ আদর্শবাদী শিক্ষক, আর অন্যরা ক্যাডেট কলেজ বা অনুরূপ কঠোর রুটিন-বন্দী শিক্ষাক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
সে যা-ই হোক, ব্যবসায়ী শিক্ষকরা বলছেন তারা এখনো নীতিমালা হাতে পাননি। তাই নীতিমালা পাওয়ার পর তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন, তার আগে নয়। অর্থাৎ তারা এখনো এই ব্যবসা বন্ধ করতে চান না। নীতিমালাটি পাওয়া না পাওয়ার উপর এটি বাস্তবায়ন করা নির্ভর করে কিনা, এ নিয়ে নানা আইনি তর্ক থাকতে পারে। এমনকি অসাধু বিদ্যাব্যবসায়ীরা এই নীতিমালা কার্যকর না করার জন্যে আইনের আশ্রয় নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কেননা অতীতে শিক্ষাসহ প্রায় সকল অঙ্গনে সরকারি আদেশ, পরিপত্র ইত্যাদি আইনি প্যাঁচে দীর্ঘদিন অকার্যকর রাখার ভুরি ভুরি নজির আছে। তবে বর্তমান ক্ষেত্রে শিক্ষাসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর পত্রিকান্তরে প্রকাশিত মন্তব্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “নীতিমালাটি জারির দিন থেকেই কার্যকর হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটা পাঠানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।” সচিব মহোদয়ের এই উক্তি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক– এটিই আমরা জেনে এসেছি এতোকাল। কিন্তু সচিব মহোদয় এই গড্ডল রীতির বাইরে এসে যে যুক্তি দিয়েছেন, তা যতোটা বিধিসম্মত, তার চেয়েও অনেক বেশি সুবিবেচনাজাত। নীতিমালাটি প্রণয়ন, জারি ও বাস্তবায়নের এই তড়িৎ-গতি থেকে মনে হয়, এ-নিয়ে পুরো মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ সদিচ্ছাপ্রবণ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো সরকারের একটি বিশাল প্রশাসনিক ইউনিট সকল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে ন্যূনতম সময়ের মধ্যেই এটি জারি করেছে। সচিব মহোদয়ের যৌক্তিক উক্তি সত্বেও এখন এটা দেখবার বিষয়, কতো দ্রুত এটি শহরে-বন্দরে গ্রামে-গঞ্জে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস্তবায়িত হচ্ছে। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ব্যবসা বন্ধ করা যায়, তাহলে সকলেরই মঙ্গল। কিন্তু আমরা কিছুটা সংশয়বাদীদের দলে। কেননা এ ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়নে অতীতে এই মন্ত্রণালয়ও তেমন পারদর্শিতার প্রমাণ রাখতে পারেনি। জনপ্রিয় এক দৈনিকের ২৪ জুন তারিখের প্রথম পৃষ্ঠার একটি বড় খবর, “শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাগুজে নির্দেশ কেউ মানছে না, উদ্যোগও নেই”। রাজধানীর অভিজাত বিদ্যালয়গুলো ইতিপূর্বে ভর্তি বাবদ যে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেছিলো, গত পাঁচ মাসেও তা কোন বিদ্যালয় ফেরত দেয়নি। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এইসব বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদে থাকার কারণে তারা সরকারি সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখাবার সাহস পাচ্ছে। বলা বাহুল্য, এই সব বিদ্যালয়ে পরিচালনা পরিষদে গতানুগতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ছাড়াও মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরাও রয়েছেন। তাহলে কেন এমন হচ্ছে? অভিভাবকরা বলছেন, কেবল প্রশংসা কুড়ানোর জন্যে এই সিদ্ধান্ত। আমাদের মতে, যেহেতু সিদ্ধান্তটি প্রতিটি বিদ্যালয়ে পৌঁছেছে, সেহেতু এটি অবিলম্বে কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। যারা মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে হাটে মাঠে গতানুগতিক মন্ত্রী-সচিবদের অধিকাংশ বাগাড়ম্বরের মতো এটিও একটি কথার কথা হয়ে থাকবে।
শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষাসচিবের আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই। তাঁদের কিছু কিছু সামষ্টিক অর্জনও সর্বস্তরে স্বীকৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নূরুল ইসলাম নাহিদ সম্প্রতি একজন আদর্শ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমান শিক্ষাসচিব বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন সম্মানিত কবি। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, প্রকাশ ও বিতরণেও তাদের কৃতিত্ব অপরিসীম। তাদের যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটুক, এটিই আমাদের কাম্য।
তবে সর্ষের ভিতর ভূত নেই, এমন দাবি এখনো করা যাবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তদন্তর্গত মহাদপ্তর, পরিদপ্তর, উপদপ্তর বা শাখা-দপ্তরে প্রতিনিয়ত যে টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি-বাণিজ্য ইত্যাদি চলে, তা-তো ভুক্তভোগীদের কারো অজানা নয়। এসব বাণিজ্য নিয়ে পৃথক পৃথক সিন্ডিকেটের কথা বহুশ্রুত, যার মধ্যে নিম্নতম থেকে উচ্চতম পর্যায়ের অনেকেরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংযুক্তি আছে বলে গুজব শোনা যায়। আমরা গুজবে কান না দিলেও ভুক্তভোগীরা এ ব্যাপারে আসল সত্য জানেন। তবে প্রায় ভুক্তভোগী এটিকেই মান্য-রীতি বলে গ্রহণ করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিরাপদ থাকতে চান। আমাদের আদর্শবাদী ও সুনীতিবান মন্ত্রী-সচিবগণ কি এই অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করবেন এবং বিনা ওজরে তা বাস্তবায়নের আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন? যদি পারেন, তাহলে জাতি তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।
ফিরে আসা যাক কোচিং নীতিমালায়। সচিবের ব্যাখ্যা সত্বেও কোচিং নীতিমালাটি কার্যকর করার পদক্ষেপ এখনো গৃহীত হয়নি। আমরা মনে করি, এটি বাস্তবায়নের জন্যে একটি বিশেষ সময়সীমা বেধে দেয়া জরুরী। সেটি অনধিক চার সপ্তাহ হতে পারে।
আর এই নীতিমালা বাস্তবায়নে অভিভাবকদেরও ভূমিকা অপরিসীম। প্রথম কথা হচ্ছে, এই নীতিমালা প্রকাশের পর আর কোনো অভিভাবক যেন তার কোনো ছেলে মেয়েকে কোনো ব্যবসায়িক কোচিং সেন্টারে না পাঠান। এই নীতিমালায় কোচিংকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা হয়নি, বরং ক্লাশরুমনির্ভর পাঠদান ও তদতিরিক্ত সময়ে স্কুলকেন্দ্রিক কোচিংকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি পরিমিতির মধ্যে আনা হয়েছে। একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পড়ালেখার কাজটি স্কুলের চৌহদ্দিতেই শেষ করবেন, এটিই প্রত্যাশিত। স্কুল থেকে বেরিয়ে তাদের দুজনের আরো কিছু কাজ আছে, যা তারা করবেন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে প্রকৃতি, পৃথিবী, সমাজ ইত্যাকার যে সব বিষয় অমুদ্রিত বই আকারে বিরাজমান, সেগুলোর আনন্দপাঠেরও সুযোগ দিতে হবে তাদের। দিনরাতের জেগে-থাকা অংশের প্রায় পুরোটা ছাত্রছাত্রীকে কোচিং-সর্বস্ব মুখস্থবিদ্যার দ্বারস্থ রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আমরা যদি আমাদের উত্তরপ্রজন্মকে বিদ্যায়তনিক ও সিলেবাস-নির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি তাদেরকে গ্রহণ ও বিশ্লেষণী ক্ষমতায় সৃষ্টিশীল করতে চাই, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এই নীতিমালার আনুপূর্বিক বাস্তবায়ন জরুরী। অসাধু বিদ্যাব্যবসায়ীদের ঠেকাতে না পারলে বরাবরের মতো কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের নসিবও কেবল মন্ত্রী-সচিবের বাক্যবাণ দিয়ে ঠেকানো যাবে না। মন্ত্রণালয় কোচিং বন্ধের আদেশ দিয়েছে, নীতিমালা জারি করেছে; এখন তা বাস্তবায়নের প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে ছেলেমেয়েদের কোচিং সেন্টারে না পাঠানোর দায়িত্ব অবশ্যই সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের।
আসুন, আমরা অন্যকে দোষারোপ করার অপসংস্কৃতি ত্যাগ করে আপন আপন দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করার সুসংস্কৃতির চর্চা করি। আসুন, আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষার পাঠ দেই।
মুহম্মদ নূরুল হুদা : কবি ও লেখক।

শিক্ষা-সচিব কবি,লেখকও কবি। একজন শিক্ষা শাসন করছেন, একজন শিক্ষা নিয়ে কিছু ভাবনাউদ্রেকী বক্তব্য রেখেছেন। কবির কথা কবি শুনবেন বলে ভরসা করি। ধন্যবাদ হুদাভাই, ধন্যবাদ কামালভাই।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা করতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বেকায়দায় পড়েছিলেন। কারণ সেখানে বিনিয়োগকারীরা ‘রাঘব বোয়াল’। তাই শেষ পর্যন্ত অনেকটা মালিকদের সুবিধামত নীতিমালা হয়েছে। এটাও অভিভাবকদের বড় দাবি ছিল। এখন শিক্ষকদের কোচিং বন্ধের জন্য যে নীতিমালা(পত্রিকায় যা যা পড়েছি) করা হয়েছে তাতেও রাঘব বোয়ালদের রক্ষা করা হয়েছে। সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতা না দিয়ে তাদের নিতান্তই দায়ে ঠেকে কোচিং করানোর পথ বন্ধ করায় কার লাভ হবে? একটি শ্রেণী কক্ষে কতজন শিক্ষার্থী থাকবে, কতজন শিক্ষার্থীর জন্য কতজন শিক্ষক থাকা বাধ্যতামূলক,স্কুল-ক্যাম্পাস কেমন হওয়া জরুরী, বেসরকারী-সরকারী-ক্যাডেট-মাদ্রাসা-ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মধ্যে বৈষম্য চিরস্থায়ীকরণ বন্ধ কার ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের কিছু উদ্যোগ আছে! মাননীয় মন্ত্রী কি বলতে পারবেন সেনাবাহিনীর হাতে কেন শিক্ষা থাকা জরুরী? বাজেটের বরাদ্দে বৈষম্য কার স্বার্থে?
নীতিমালা করে এসব বন্ধ হবেনা । তৈরি করতে হবে শিক্ষার বিকল্প মাধ্যম যার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা গুণগত শিক্ষা পাবে, তাও আবার ফ্রী । এটা হতে পারে internet এর মাধ্যমে । একটা ওয়েব সাইট এই নিয়ে কাজ করছে , তারা যদি সফল ভাবে এগিয়ে যেতে পারে তা হলে , ছাত্রছাত্রীরা ঘরে বসে ভালো শিক্ষা পেতে পারে ।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা বোর্ডয়ের দুর্নীতি বন্ধে অভিযোগ বক্সের তালা নিয়ে যেভাবে বিপাকে পড়েছিলেন এই নীতি বাস্তবায়নে না জানি সেভাবে কত কী শুরু হয়ে যায়। বেতন কাঠামোর সাথে কোচিং ব্যবসা অনেকাংশেই জড়িত। বেতন কাঠামো ঠিক করলে পুলিশও দুর্নীতি কমিয়ে আনত। বেসরকারি শিক্ষালয়ে চাকরীর জন্য কি পরিমাণ ঘুষ দেওয়া লাগে তা সবার জানা আছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোচিংয়ের সাথে জড়িত থাকেন না। কেন? কারণ তার বেতন কাঠামোর বাহিরেও তার আয়ের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা, অন্যবিভাগ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ক্লাস না নেওয়ার অভিযোগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। সারাদিন ক্লাস নিয়ে তারা আবার কোচিংয়ে যায় ক্লাস নিতে । যত ছোট শ্রেণীর ক্লাস তার কষ্টও তত। কোচিংয়ে যায় তার সংসারের জন্য বাড়তি আয়ের আশায়। সরকারের অন্যসব বিভাগ বসে বসে ঘুষ খেলে তা বৈধ হয়। আর শিক্ষকদের বেতন কাঠামো উন্নয়ন বাদ দিয়ে তাদের শিক্ষা বিতরণের মাধ্যমে উপরি আয় কে অবৈধ করাটা কতখানি যৌক্তিক? প্রতিবছর যে দরিদ্র ছাত্র ছাত্রীরা ভাল রেজাল্ট করছে খোঁজ নিয়ে দেখুন যাদের ব্যবসায়ী বলে গালি দেওয়া হচ্ছে তারাই তাদেরকে ফ্রী পড়িয়েছে। আমি নিজে দেখেছি আমার শিক্ষক প্রতি মাসে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ফ্রী পড়াতেন। কেউ যদি জোর করে তাকে কিছু খাওয়াতে চাইতেন তিনি হাসিমুখে পান খেতে চাইতেন। অসংখ্য নজির আছে শিক্ষকরা বুঝিয়ে শুনিয়ে অভিভাবকদেরকে ছেলে মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত করছেন। ঢালাও ভাবে গলা না কেটে চিন্তা ভাবনা করে করা উচিৎ। টিউশনি বাদ দিলে হয়ত অনেক শিক্ষককে তার সন্তানকে স্কুলে পাঠান বন্ধ করে কাজে পাঠাতে হবে। যার টাকা আছে সে যেভাবেই হোক শিক্ষাকে ক্রয় করবে। শুধুমাত্র শিক্ষকদের আয়ের বিকল্প না দেখিয়ে টিউশনি করা বন্ধ করে দিলে শিক্ষার মান বাড়বেনা। বরং শিক্ষকদের অন্যকোন বিকল্প উপায় খুঁজতে যেয়ে দুর্নীতি করতে বাধ্য করা হবে।
আমি নিজেও কোচিংকে সমর্থন করি না। তবে শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষকদের মান উন্নয়নের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে এই পদক্ষেপে লাভের চেয়ে ক্ষতি হবার সম্ভাবনাই বেশী। শিক্ষকতা পেশায় কোচিং/প্রাইভেট ছাড়া আয় এতো কম যে, অনেক ভালো ছাত্র-ছাত্রীরাই এই পেশায় আসতে চায় না। তাহলে জাতির ভবিষ্যত গড়বে কারা!
আমার মনে হয়, শুধু কোচিং বন্ধ করলেই হবে না, একটি সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। আর শুধু সরকারের দিকে চেয়ে না থেকে আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু প্রচেষ্টা নেয়া দরকার।
সবই ভাল।তবে বাস্তবে আইনকে প্রয়োগ করতে হলে ক্লাশ রুম ৫০ জনের করতে হবে। তা না হলে কোচিং বানিজ্য বন্ধ করা কথার কথাই হবে বাস্তবে ন্য়।
ডাক্টার যদি পারে তবে শিক্ষক পারবে না কেন ?
নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট পড়ানো যাবে না, এতে এক প্রকার বাইরের কোচিং-ব্যাবসায়ীদের জন্য পোয়াবারো। শিক্ষার্থীরা এখন কোচিংমুখী হবে।
যারা আইন প্রণয়ন করেন তাদের বাড়ি-গাড়ি কতগুলো, তার হিসেব কে নিবে ..
.
আজ প্রর্যন্ত কোনও সরকারি শিক্ষকের কতটা বাড়ি, প্রাইভেটের টাকায় বা যে কোনওভাবে হোক করেছেন কেউ কি দেখাতে পারবেন? বিদেশ থেকে ঘুরে এসে, বিদেশি নিয়ম চালু করার আগে, বিদেশি শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষকদের অবস্থাও চিন্তা করা উচিত। আমাদের অনেক শিক্ষক আছেন যারা ঠিকমতো বেতন-ভাতা পান না, চাকরি স্থায়ীকরণ হয়নি, কয়েক মাস পর যদিও বেতন পান, তারপরও ট্রেজারিতে ঘুষ দিয়ে চেক নিতে হয়, কারণ চাকরি রাজস্বখাতে যায়নি। এই শিক্ষকরা তাদের পরিবার নিয়ে কীভাবে জীবনযাপন করে সেটা কি আপনারা ভাবেন?
আমরা সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাইি, তবে এই সমস্যার সমাধানও চাই। শিক্ষক-স্বল্পতার কারণে অতিরিক্ত অনেক ক্লাস নেওয়ার পর, বাসায় আবার প্রাইভেট পড়ানো কারও জন্য সুখকর হতে পারে না। আশা করি সরকার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবেন।
সবাই শুধু শিক্ষকদের বাড়তি আয়োর পথ বন্ধ করার কথা বলেন। একবারও কেউ বলেন না শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর কথা। শিক্ষকতার পেশা ছাড়া সব পেশাতেই বাড়তি আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে। অন্য সব চাকরিজীবীরা বেতন পান মাসের ৫ তারিখের মধ্যে। সেবরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা পান পরের মাসের ১৫ তারিখের পর। তাহলে বাড়িওয়ালাকে ৫ তারিখের মধ্যে ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, সংসারের ষরচ দেবেন কোথা থেকে? নতুন আইনে আছে শিক্ষকরা তার নিজের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। অন্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। তাহলে কি দাঁড়ালো? এটা কি কোনও শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের জন্য সুখকর? যেমস ধরুন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের একজন ভালো শিক্ষকের কাছে তার কলেজের এবং অন্য কলেজের শিক্ষার্থী প্রাইভেট পড়তে চায়। এখন অন্য কলেজের শিক্ষার্থী পড়তে পারবে কিন্তু নিজের কলেজের শিক্ষার্থী পড়তে পারবে না। তাহলে কি একজন ভালো শিক্ষার্থী ভালো শিক্ষকের সহযোগিতা পাবে না? তাহলে তাকে ওই শিক্ষককের সাহচর্য পেতে হলে ভালো কলেজে ভর্তি না হয়ে মন্দ কলেজে ভর্তি হতে হবে।
নতুন আইনে আছে কোচিং-ব্যবসা থাকবে। যে কেউ পানের দোকানের মতো কোচিংয়র দোকান খুলতে পারবেন। শিক্ষকরা সেখানে ক্লাস নিতে পারবেন। কিন্তু নিজে কোচিং সেন্টার খুলতে পারবেন না। তাহলে কি শিক্ষকরা শুধু মজুর হিসেবে চাকরি কিংবা কাজ করবেন? নিজে কিছু করতে পারবেন না।
আমি কখনও প্রাইভেট পড়ার পক্ষপাতি নই। কিন্তু এর আগে শিক্ষকদের জীবনমানের কথা চিন্তা করা উচিত। তাদের বেতন বাড়ানো উচিত। সরকার তিন বছর ধরে বলছেন, শিক্ষকদের জন্য বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন, এই কমিশনের লোকজন সাড়ে ৩ বছরেও কি একটি বেতন কাঠামো দাঁড় করাতে পারলেন না? তাহলে বড় বড় বেতন দিয়ে এসব কর্মকর্তাদের পুষছেন কেন সরকার?
বিভিন্ন ব্লগের মন্তব্যে অনেকে শিষক্ষকদের এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মন্তব্য করেন, আমার খুব কষ্ট লাগে। আমারা তো শিক্ষকদের কাছেই পড়াশুনা করেছি। শিক্ষক সমাজকে সম্মান জানালে কি আমরা ছোট হয়ে যাব?
সরকারের কাছে শিক্ষকদের কোনও সম্মান-কদর নেই। সরকারের যে কোনও বাড়তি কাজ হলেই শিক্ষকদের কাজে লাগানো হয়। নির্বাচন ডিউটি করেন শিক্ষকরা। কত টাকা পান ডিউটি করে? জীবনের ঝুঁকি থাকে কতটুকু, সে খবর রাখেন? আদমশুমারি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করণ, ঘরশুমারি- যত কাজ আছে ডাক পড়ে শিক্ষকদের। কিন্তু সম্মান কিংবা সম্মানী কোনওটিই সম্মানজনক নয়। ৭ বছর বন্ধ ছিল বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের পদোন্নতি। ওরা একেকজন সরকারি কলেজের শিক্ষকদের চেয়েও অনেক বেশি শ্রম দিয়ে শুধু ক্যাডার না হওয়ায় সহকারি অধ্যাপকের বেশি হতে পারেন না। আর প্রাইমারি শিক্ষকদের কষ্টের কথা শুনুন কোনও শিক্ষককের মুখ থেকে।
বিষয়টা হলো আমরা যারা ব্লগে মন্তব্য করি তারা কেউই শিক্ষক নই। মনে হয় আমাদের কেউ শিক্ষকতার চাকরি করেন না। তাই আমরা বুঝি না শিক্ষকদের কষ্ট।
আগে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা দিন। পরে তাদের সব ব্যবসা বন্ধ করুন। কিন্তু মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যাবে না।
আপনার লেখাটি পড়ে বুঝলাম, আপনি অবশ্যই একজন শিক্ষক এবং প্রাইভেট পড়ানো কিংবা কোচিং ব্যবসার সাথে জড়িত । কোচিং সেন্টার করে কিংবা প্রাইভেট পড়িয়ে ঢাকার বুকে শুধু ফ্লাটই নয় বরং আস্ত ৫/৬ তলা বাড়ি এবং গাড়ীর মালিক হয়েছেন মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে, এমন বহু শিক্ষক খোদ ঢাকাতেই রয়েছেন কয়েক হাজার । আপনারা শিক্ষাকে পণ্য বানিয়েছেন। স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়ে কিংবা বিভিন্ন কৌশলে তাদেরকে শিক্ষকদের বাসায় কিংবা কোচিং সেন্টারে পড়তে বাধ্য করেছেন। তখন কে গরীব আর কে বড়লোক তা একবারেরজন্যও ভেবে দেখেননি। আপনারা শিক্ষক নামের কলঙ্ক।
শুধুমাত্র আইন করে কোচিং/প্রাইভেট বন্ধ করা যাবে না। উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কোচিং-বাণিজ্যের চেয়েও ভয়াবহ কোচিং-বাণিজ্য চলছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং-এর নামে। সেটাও খতিয়ে দেখা খুবই জরুরি। এ খাতে অভিভাবকরা প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা খরচ করছেন। আর সে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণীর বিদ্যা-ব্যবসায়ীরা।
শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মানের দিকটাও দেখা খুবই জরুরি। মাত্র ১০০ টাকা বাড়িভাড়া আর ১৫০ টাকা মেডিকেল ভাতা দিয়ে চলতে হয় দেশের ৭ লাখেরও বেশি সম্মানিত শিক্ষকদের। সত্যিই সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ!
আপনার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি- আপনার বক্তব্য একচোখা। প্রাইভেট-কোচিং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র সমস্যা নয়। পর্যাপ্ত শিক্ষা-সুযোগ দান, প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ, নোটবই নিষিদ্ধকরণ, পরীক্ষা-কেন্দ্রিক পড়াশোনার মানসিকতা বদলানো, ট্র্যাডিশনাল প্রশ্নভিত্তিক উত্তরদানের পদ্ধতি পরিবর্তন- সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। সরকারের দায়িত্ব নিয়েও এখানে কিছু বলা হয়নি। বিষয়টা খুবই রহস্যজনক।
বেশ ভাল লেগেছে।
ধন্যবাদ। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকার, অভিভাবক, শিক্ষার্থীসহ সকল মহলকে উদ্যোগী হতে হবে।
কেবল মাত্র কোচিং সেন্টার বন্ধ করলেই কি হবে? একি সাথে শ্রেণী কক্ষে মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সব দিক দিয়ে আটঘাট বেঁধে না নামলে কোনো নীতিমালারই দৌড় বেশি দিন টিকবে না। শিক্ষকদের বাড়তি আয়ের রাস্তা বন্ধ করবার আগে তাদের মাসিক বেতন স্কেল বাড়াতে হবে।
কোচিং সেন্টার বন্ধ করাটা এই মুহূর্তের অগ্রাধিকার। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার মান বাড়ানোর কাজটি সবসময়ের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেটিত হওয়া দরকার। এ জন্যে সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে হবে। বোর্ড, মন্ত্রণালয ইত্যাকার প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে যথার্থ দেখভাল করা। নিয়মিত দেখাশোনা আর সদিচ্ছা ছাড়া কোনও নীতিমালাই পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হতে পারে না। বর্তমান নীতিমালায় শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই সুবাদে তারা কিছু বাড়তি আয় করতে পারবেন। তবে যখন-তখন কোচিং থেকে মাত্রাতিরিক্ত আয় করতে পারবেন না। আর মাসিক বেতন বাড়ানোর দাবিটি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দাবি। জীবনযাত্রার মান ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সকল স্তরের শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো খুবই জরুরি। এই দাবির সঙ্গে সকল স্তরের মানুষের সহমর্মিতা থাকা বাঞ্ছনীয়। আমরা মনে করি, যোগ্য শিক্ষককে তার প্রাপ্য বেতন ও অন্যান্য সুবিধা দিতে হবে। সব সুনীতিপ্রবণ সমাজে শিক্ষকের আদর্শ, মর্যাদা ও বেতন-সুবিধা সবার ওপরে। অন্যদিকে মর্যাদাবান শিক্ষক কখনও বিদ্যা-ব্যবসায়ী হতে পারেন না।
সরকার শিক্ষকদের কোচিং বন্ধ করেছে ঠিক আছে,কিন্তু কোচিং সেন্টার গুলো বন্ধ করছে না যেখানে পড়ালেখার কোন মান নাই।
যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্মরত সে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরকে ক্লাশের পর পড়ানোর সুযোগ দিয়েছে সকরকার। প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য নির্দিষ্ট সম্মানীও ঠিক করেছে। আর মানহীন কোচিং সেন্টার বন্ধ করার জন্যেও সরকারকে চাপ দিতে হবে। এ নিয়ে জনমত গঠন করা জরুরী। মনির
ঠিক বলেছেন।
ধন্যবাদ। এ সম্পর্কে আরও আলোচনা ও সচেতনতা দরকার।
সবাই বলে কোচিং বন্ধ করার কথা,কেউ ভাবে না শিকক্ষরা কিভাবে জীবন যাপন অতিবাহিত করে, আমি একজন শিক্ষকের সন্তান হয়ে বুঝি বাস্তবতা কত করুন। সুতরাং শিকক্ষদের অতিরিক্ত আয়ের একটি উৎস তথা কোচিং সেন্টার বন্ধ করার পূর্বে তাদের বেতন বৃদ্ধির সক্রিয় চিন্তা ভাবনা করা উচিত।
ঠিকই বলেছেন। মানহীন কোচিং সেন্টারগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। অনুমোদন ও নিয়মিত পরিদর্শন ছাড়া কোনও কোচিংকে ব্যবসা করতে দেওয়া সঙ্গত নয়।