আফসান চৌধুরী
ভাষা নিয়ে বাড়াবাড়ি কি শেষ পর্যন্ত “ভাষা-পুলিশ” এর জন্ম দেবে
আমাদের ভাষার মাসে মানুষের ভাষাপ্রীতি ভীষণ বেড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। মানুষ একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে কীভাবে ভাষার প্রতি আনুগত্য দেখানো যায়, ভাষাদ্রোহীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যখন কোন নেতৃস্থানীয় মানুষ বলে যে কেবল একই উচ্চারণে, একই প্রমিত বাংলায় সবাইকে কথা বলতে হবে তখন কেউ চায় আর না চায় “মৌলবাদী” ভাবনার ছায়া তাতে পড়ে। এই বাড়াবাড়ি এক দিন ভাষা ফ্যাসিবাদে পরিণত হয় কিনা সেটা নিয়ে এখন চিন্তা হয়। যে কোন উগ্র জাতীয়তাবাদ, সেটা, ভাষা, ধর্ম, জাতি–এধরণে যে-কোন ভিত্তির উপর যখন দাড়ায় , তখন তা চরম পর্যায়ে ফ্যাসিবাদে পরিণত হয়।
এই দুশ্চিন্তা আরো সবল হয়েছে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের খুবই সফল একটি সম্পাদকীয় দেখে যেখানে ভাষা ‘দূষণ’কে নদী ‘দূষণের’ মতই বিধ্বংসী বলা হয়েছে। আদালত এই লেখাটি গোচরে আনেন এবং সরকারের ওপর কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন কেন যেসব প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে এই ধরণের “কলুষিত” ভাষা ব্যবহার করা হয় সে সবকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে না। যারা এটা করছে তাদের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না সেটিরও কারণ দেখাতে বলা হয়েছে। আদালত আরও বলেছেন যে এই “দূষণ” ঠেকাতে এবং “প্রমিত বাংলা ভাষা” নির্ধারণ করতে একটি বিশেষ কমিটি নিয়োগ করা হোক। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতি, সমাজ ও বিদ্যার জগৎ থেকে বিষয়টি আদালত, আইন এবং গুরুদের হাত অর্পনের ব্যবস্থা করা হলো।
ভাষার মত কোন সামাজিক সম্পত্তি হাত ছাড়া করার প্রক্রিয়া অন্য কোনভাবে শুরু করা যায় বলে জানা নেই।
মনজুর ভাই তার লেখায় তিনটি উদাহরণ দিয়েছেন যেগুলোকে তার কাছে দূষণ বলে মনে হয়েছে ।
এক ব্যক্তি গণমাধ্যমে তার বক্তব্য জানাবার জন্য ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলেন। একজন ছাত্রী সেই একই কাজ করেন, তার জ্ঞানও ভাষার ক্ষেত্রে ছিল ‘দূষিত’। শেষটি হচ্ছে এফএম রেডিওর ভাষা নিয়ে। ক্ষমা চেয়ে নিয়ে লেখছি যে তিনটি উদাহরণের মধ্যে কোনটিকেও আমার ‘দূষণ’ বলে মনে হয়নি। পছন্দ না হতে পারে ভাষা কিন্তু এটাকে দূষণের মত দন্ডযোগ্য অপরাধ বলে মনে হয়নি। মানুষ তার বক্তব্য বোঝাবার জন্য যে কোন ভাষা বা একাধিক ভাষা প্রযোগের অধিকার রাখে। এটা কানে শুনতে কারও কারও খারাপ লাগলেও এটা বেআইনী হতে পারে না। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে এটা এখন প্রচলিত পন্থা, কিছু মনে করবেন না, এটা তার অধিকারও বটে।
মেয়েটি যে শুদ্ধ ও সঠিকভাবে কথা বলতে পারেনি সেটা তার সংস্কৃতি ও শিক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে। এটাকে ভাষার ‘দূষণ’ বলাটাও কীভাবে যুক্তিযুক্ত হয় আমি বুঝি নি। শেষমেষ, এফএম রেডিও’র উদাহরণ বা বক্তব্যটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় কারণ এই দোআঁশলা ভাষায় পৃথিবীর সকল এফএম রেডিও একইভাবে কথা বলে। এটা তাদের ”মাতৃভাষা”।
পৃথিবী ‘দূষণ’, ‘দূষণ’ বলে আহাজারি করে না এটা নিয়ে। অনেকের অস্বস্তি বা বিরক্তি থাকতে পারে কিন্তু তাকে ‘দূষণ’ বলাটা অন্যদের অধিকার খর্ব করার সমান হয়ে যায়। পছন্দের ভাষা ও তরিকায় কথা বলাটা প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার এবং বিশ্বের সকল দেশে তা স্বীকৃত। যারা আমাদের থেকে আলাদাভাবে জীবন যাপন করে, অন্য ভাষায় কথা বলে, ভিন্ন ধরণের পোষাক পরে তাদেরকে ‘দূষণকারী’ বলা মানে নিজেদেরকে ছাড়া অন্যকে সম্মান না করার মানসিকতা। এই অবস্থান মানবাধিকারবিরোধী।
‘দূষণ’ শব্দটি ধর্মীয় ভাবনায় ভরা। বস্তুত পক্ষে এই শব্দটি প্রায় সকল সময় মৌলবাদকে উচু করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। এই দূষণ ও পবিত্র বিষয়টি যে কোন কৃষিভিত্তিক নারীকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে প্রবল হয়ে থাকে। মনে হয় আমাদের ভাবনাতে এই প্রাচীন ঐতিহ্য এখনও যথেষ্ট বিদ্যমান।
একটি নদী প্রকৃতির সৃষ্টি আর ভাষা সামাজ ও মানুষের সৃষ্টি। দুটোকে একই সমান্তরালে রাখা সমস্যা উদ্রেককারী। এবং রূপকটিও তাই ভ্রান্ত। এর ফলে ভাষা ‘ধর্মীয়’ বস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং সেটা রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে আদালত ও তাদের নির্দেশিত পন্ডিতগণ। এই পদ্ধতিটিও গণতন্ত্রবিরোধী।
ভাষা ‘দূষণ’ বিষয়টির মধ্যে ‘বর্ণবাদ’ বা ‘ভাষাবাদ’ জড়িত। ইংরেজ আমলে ইংরেজী ভাষা জানাই ছিল ওপরে ওঠার সিঁড়ি। যে যত শুদ্ধ ‘ইংরেজী’ জানতো সে ততটা ইংরেজ-ঘনিষ্ট হতে পারতো। নিম্নস্তরের দেশীয়রা যারা ‘অশুদ্ধ’ ভাষা ব্যবহার করতো তারাই ব্রাত্যজনের পরিচয় ধারণ করতো।
গত বছরে লন্ডনের লুট-দাঙ্গার সাথে বেশীর ভাগ বিত্তহীন, কম শিক্ষিত কালো মানুষজন জড়িত ছিলো। এদের অনেকেই আবার ক্যারিবিয়ান এলাকার যারা কিনা দাসদের বংশধর। এদের গালি দিতে গিয়ে অনেকেই বলেন যে এই সব বর্বর মানুষেরা যারা অশুদ্ধ জামাইকান-ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলেন… এরা একটা নতুন ভাষায় কথা বলে যার বড় সূত্র র্যাপ সঙ্গীত, সেটা এফএম রেডিও’র মাধ্যমে প্রচারিত হয়, এটা ইংরেজি নয়।
দোষাভী প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে আমরা শিখতাম এই ভাষা ব্যবহারের বিভিন্নতা। নিচু, মধ্য এবং উচু স্তর সব ভাষাতেই থাকে এবং তার প্রয়োগের বিভিন্নতাও আছে। ভাষা জানার বিষয়টি কেবলমাত্র বোঝা ও বোঝানোর বিষয়। সেখানে আইনের কোন ভূমিকা নেই, গুরুজনদের পান্ডিত্য নেই, কেবল মানুষের যোগাযোগ পদ্ধতি ও ব্যবহার রয়েছে। বিবিধ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটাই আর্ন্তজাতিক বিবেচনা।
এই ভাষার মাসে গণমাধ্যমে যে বিষয়টি মনিষীদের বক্তব্যে উঠে আসে সেটা হচ্ছে ভাষা একটি একক স্থির বিষয়। ভাষাভিত্তিক শুদ্ধতার প্রতি আনুগত্য দেখানোর আগ্রহ এই ভাষা সমাজে পূর্বে দেখা যায়নি। সবাই বলছেন যে সর্বস্তরে বাংলা চালু করতে হবে কিন্তু সেটা কী? কেউ কি বাধা দিচ্ছে তাতে? তার মানে কি এই যে কেবল একইভাবে এক উচ্চারণে, কথা বলা হলে এই শুদ্ধতার বাস্তবায়ন হবে? একটি সমাজে যখন কেবল একটি মাত্র শুদ্ধ অস্তিত্ব আছে বলে মনে করা হয়, তখন তাকে একচ্ছত্রবাদী সমাজ বলা হয়।
প্রাক্তন সমাজতান্ত্রিক সমাজে ছিল ও বর্তমান ইসলামী আরবী কিছু দেশে এই ধরনের ব্যবস্থা এখনও চালু আছে।
এই ‘একমাত্র’ পদ্ধতি, এই একক পন্থার প্রতি আমাদের আগ্রহ আছে বলে মনে হয়। বহুবিধ ব্যবস্থা বা মত বা ভাষা প্রযোগ আমাদের অস্বস্তির কারণ হয়। আমরা একদলীয় ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারি কিন্তু বহুবিধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। কেন পারি না তার কারণ বোধ হয় আমরা এক পরিমন্ডলে কেবল একটি বাস্তবতাই সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চাই। আমাদের জন্য বহুবিধতা যে সংকট সৃষ্টি করে তার সমাধন আমাদের ভাবনায় নেই। তাই আমরা চাই সবাই একইভাবে বলবে, একইভাবে ‘শুদ্ধ’ থাকবে যাতে করে দূষণ ও পবিত্রতার মাধ্যমে যে আচরণবিধি-ব্যবস্থা সৃষ্টি হয় সেটা টিকে যাবে, যাতে ভাষা ‘ধর্মীয়’ গন্ডির মধ্যে থাকে যেখানে বিতর্ক ও বিবিধতার ব্যবস্থা নেই।
বিষয়টা জটিল হয়েছে আদালতের জড়িয়ে পড়ার কারণে। এখন যে গন্ডিতে এটা চলে গেছে সেটা কোন ভাষার বিষয় আর নেই। এখন যারা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবে তারা সেই আদালত দ্বারা নির্দেশিত পন্ডিতবর্গ, আইন প্রযোগকারী সংস্থা এবং শেষমেষ যারা তদারকী করবেন তারা সেই আমলাকুল। সমাজের পরিসর থেকে এটা চলে গেছে সরকারী অফিসের পরিসরে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এই প্রক্রিয়ার কি কোন শেষ গন্তব্য আছে? স্বাভাবিক কারণেই আঞ্চলিকতা প্রভাবিত বাংলা সেই যুক্তিতে ‘দূষিত’ বাংলা এবং একই নিরিখে বর্জনের দাবি রাখে। এফএম রেডিওর ভাষা , বাংলা-ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলা বা সেই ভাষা পত্রিকায় ছাপা বন্ধ করা যাবে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আড়িপাতা যাবে ‘ভ্রান্ত ও দূষিত’ ভাষা প্রয়োগের অপরাধ সনাক্ত করার জন্য।
জর্জ ওরওয়েল তার ১৯৮৪ উপন্যাসে ‘চিন্তার পুলিশের’ কথা বলেছিলেন যাদের কাজ ছিল অগ্রহণযোগ্য চিন্তার অপরাধের জন্য মানুষকে গ্রেপ্তার করা। আমরা শেষমেষ “ভাষা পুলিশ” প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করলাম কিনা দেখা যাক।
আফসান চৌধুরী: নির্বাহী সম্পাদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

আফসান চৌধুরী, সাহসী লেখাটির জন্য ধন্যবাদ তোমাকে। ভাষা একটি বহতা স্রোতের মতো, একে বাধা দিয়ে আটকে রাখা যায় না।
দুঃখিত, ‘চাবিকাঠি’ নয়, ‘মাপকাঠি’
ভাই, বাংলাদেশের মুষ্টিমেয় শহুরে কিছু মানুষ এক রকম ভাবে কথা বলছে, সেটা আইন করে, কমিটি করে বন্ধ করতে হবে? ভাষা জিনিসটা এতই ঠুনকো বলে আপনার মনে হয়?
যা শিখলাম – আমার যা খুশী তাই করব – এরই নাম স্বাধীনতা । কর্তৃপক্ষ ভাবেন রাজার ইচ্ছাই প্রজার ইচ্ছা ।
মনে পড়ছে একদল মূর্খের কাছে দুজন অর্ধশিক্ষিতের – যাদের একজন ধূর্ত অপরজন বোকা – নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের প্রতিযোগিতার গল্পটি ।
মন্তব্য – ঘোড়া আর গাধার সংকরে খচ্চর হয় যার পরবর্তী প্রজন্ম তৈরীর ক্ষমতা নেই ।
বলতে চাই অন্যকে শিখুন, জানুন, ভালোবাসুন তারপর নিজের করে নিন । তাই বলে নিজেকে ভুলে অন্যের দাসত্ব কেন?
বাংলাভাষার উপর ফারাক্কাবাঁধ নির্মানের দরকার নাই। ভাষাস্রোত রুদ্ধ করা যাবে না। গতিশীল রাখাটাই বড় কথা। তা করবেন ভাষা বিজ্ঞানীরা। তাদের কাজ তারা করবেন। সরকারের কাজ সরকার করেছে। ভালো কাজ করছে।
আমরা যদি শুদ্ধ বলে কোন মাপকাঠিই না রাখি তাহলে-তো শিক্ষারও কোন প্রয়োজন নেই। আঞ্চলিক বা কথিত ভাষার ব্যবহার অবশ্যই থাকবে কিন্তু তাই বলে সবখানেই সেটা চাপিয়ে দেয়া হলে কি দাঁড়াবে। আর কোন আঞ্চলিক ভাষাটিকে ব্যবহার করবেন? নানা ধরণেরই দূষণ হচ্ছে। বাংলাদেশে বড় হয়েছে এমন বাঙালি ছেলেমেয়েকেও দেখেছি যাহার কথার ৫০ ভাগ ইংরেজি, ৩০ ভাগ বাংলা ও ২০ ভাগ হিন্দি। কাজেই এর ভেতরে রাজনীতি না এনে ভবিষ্যতে বাংলাকে কি ভাবে দেখতে চান সেটাই ভাবুন।
আফচার চৌধুরী সাহেব আপনাকে অসংখ্য ধণ্যবাদ এমন একটি সাহসী লিখা আমাদেরকে উপহার দেয়ার জন্য।
মানুষ, মনের ভাব প্রকাশ করতে মুখের মাধ্যমে যে শব্দ ব্যবহার করে থাকে, তাকে যদি ভাষা বলা হয়ে থাকে এবং মায়ের ভাষাকে মাতৃভাষা বলা হয়ে থাকে, তাহলে ভাষা দূষণ এর মত বাক্য ব্যবহার করে বিতর্ক শৃষ্টি করে লাভবান হওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছেনা।
দয়া করে ‘সাধু সাবধান’ বচনটি মনে রাখলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
আফসান ভাই,
আপনার সমালোচনামূলক নিবন্ধটি ভালো লেগেছে। আমার বিশ্বাস, এতে এই ভাষা সমৃদ্ধ হবে। তবে নিবন্ধের “স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এই প্রক্রিয়ার কি কোন শেষ গন্তব্য আছে?” এই বাক্যটি নিয়ে আমার মিশ্র অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথার বলতে চাই। যদি আমার কাছে গন্তব্যের শেষ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, উত্তরে বলবো হয়তো না। তবে প্রক্রিয়ার মধ্যে সমাধানের প্রচেষ্টা রয়েছে, এটাই আমাদের বাঙালি জাতির জন্য সুখকর।
২০০২ সালে জাহাঙ্গীরনরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলতে হবে তা বিভাগের শিক্ষকরা প্রায়ই বলতেন, মাঝে মাঝে ধমকও দিতেন। শুদ্ধ বাংলা শেখানোর জন্য একাধিক কোর্সও ছিলো। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের আগে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে হবে এমন কথা জোর দিয়ে কেনো নরমসুরেও কেউ কখনো বলেন নি। আমি লক্ষ্য করতাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগের অধিকাংশ সহপাঠীরা নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতো। ‘শুদ্ধ বাংলায়’ কথা বলার জন্য আমাদের বিভাগের শিক্ষকদের তাগিদ রয়েছে এই ব্যাপারটি অন্যরা শুনলে কৌতুক বোধ করতো। দুঃখর বিষয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষাজ্ঞানের উন্নতি ঘটলেও অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছে তা অধরাই থেকে যায়। এতে কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা থেমে আছে? তা তো নয়। তবে প্রশ্নটা অন্যখানে, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ অথবা অন্য বিভাগের শুদ্ধ বাংলা বলে এমন শিক্ষার্থীরা, যখন শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে না এমন সহপাঠীদের নিয়ে রসালো ভঙ্গিতে নানা কথা বলতো, তখন কৌতুক ও রসলো উক্তির শিকার উভয়জনেরই মানসিক যন্ত্রণা বুঝতে আমার কষ্ট হতো না। এই কষ্ট অনুধাবন করতে আদালতের মতোই নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ আমাকে শিখিয়েছে।
এবার একটা মজার বিষয় বলি, ২০০৬ সালে আমাদের বিভাগের প্রথম পুনর্মিলনীর স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানে এক বড় ভাই (যার বাড়ী কুষ্টিয়া জেলায়) বলেন, ”সারাজীবন কথা বলে আসলাম, আর নাট্যতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হয়ে শুনতে হলো আমার নাকি কথাই হয় না।” তখন অনুষ্ঠানস্থলের প্রায় সবাই হেসে উঠে। পরে তিনি বলেন, “এই বিভাগে ভর্তি হয়ে অন্তত শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার অভ্যাসটা গড়ে উঠছে।”
তাই ভাষার ’দূষণ’ রোধে বিষয়টি আদালতে জড়িয়ে মন্দের ভালো হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
এফএম রেডিও প্রসঙ্গে বলতে চাই, পৃথিবীর সব দেশে চলে বলে আমরাও কি তাতে গা ভাসিয়ে দেবো? এফএম রেডিও’র মতো টকশো’র আলোচকদের ব্যাপারে একই কথা বলা যেতে পারে।
গণমাধ্যমের ব্যাপারে বলতে গেলে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশে শুদ্ধ বাংলা বানানরীতি প্রয়োগে আর কোন সংবাদমাধ্যম এতটা মেনে চলে না। এতে করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়েছে। আর তা সম্ভব হয়েছে বিডিনিউজের সম্পাদকীয় নীতির কারণে, যা বিডিনিউজের সংবাদকর্মীরা আদালতের নির্দেশনার মতো মেনে চলে।
আদালতের রায় সম্পর্কে আপনি বলেছেন, “এখন যারা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবে তারা সেই আদালত দ্বারা নির্দেশিত পন্ডিতবর্গ, আইন প্রযোগকারী সংস্থা এবং শেষমেষ যারা তদারকী করবেন তারা সেই আমলাকুল। সমাজের পরিসর থেকে এটা চলে গেছে সরকারী অফিসের পরিসরে।” এ বিষয়টি আমার কাছে একেবারেই অন্যরকম মনে হয়েছে।
বাংলা একাডেমীর ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ কিংবা সম্প্রতি দুই খন্ডে প্রকাশিত ‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ সম্পাদনার সঙ্গে কোনো আমলা জড়িত ছিলো না। এই কাজটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিজ্ঞজনেরাই করেছেন। আদালত তাদের দিয়েই কাজটি করতে বলেছেন। এভাবে ভিন্ন চোখে দেখলে আদালতের অনেক রায় নিয়েই আলোচনা-সমালোচনা সম্ভব।
আপনার নিবন্ধের আরেকটি বাক্য “একটি নদী প্রকৃতির সৃষ্টি আর ভাষা সমাজ ও মানুষের সৃষ্টি। দুটোকে একই সমান্তরালে রাখা সমস্যা উদ্রেককারী। এবং রূপকটিও তাই ভ্রান্ত।” যুক্তির বিচার আপনার বক্তব্য অতুলনীয় ও গ্রহণযোগ্য।
কিন্তু আমি যদি বলি, প্রকৃতি থেকেই আমরা সৃষ্টি, কী উত্তর দেবেন? আদালত তো আমাদেরই সৃষ্টি। আর তা আমাদের প্রয়োজনে। যা আমরাই সৃষ্টি করেছি, সেখান থেকে যা ফলাফল আসবে তার দায়ভার আমাদেরই মেনে নিতে হবে, নতুবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি পাওয়ার পরও আমরা মাতৃভাষায় শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারবো না এই আত্মগ্লানি আর কতদিন ভোগ করতে হবে?
অবান্তর, অপ্রাকৃতিক ও স্থূল ভাবাবেগে চরম আক্রান্ত আজকের বাংলাদেশ। সর্বক্ষেত্রেই ডান্ডা-বেড়ী নীতিকেই সার্বজনিন সাব্যস্ত করা হচ্ছে সস্তা হুজুগকে পুঁজি করে। লেখক যথার্থই ভাষাপুলিশের সন্দেহ পোষন করছেন। নদী দূষণের হুজুগ তুলে চিরবহমান জীবন নদী বাংলা ভাষাকে শুকিয়ে পরিত্যাক্ত চৌবাচ্চায় পরিণত করা ছাড়া এই আদালত ও তাদের নির্দেশিত পন্ডিতগণ আর কিছুই পাবে না।
” বাংলাভাষা কেবলই কোনো একদলীয় “গণ”তন্ত্রে বিশ্বাসী, দেশপ্রেমের চিরস্থায়ী মৌরুসি-পাট্টা নেওয়া কোনো রাজনৈতিক দলের, এই বোধ বাঙালি মাত্রের মনে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা আমাদের করতেই হবে; সে হবে আমাদের দ্বিতীয়, এবং বৃহত্তর, ভাষা আন্দোলন। আমরা বড় বেশিকালযাবৎ এক কৃত্রিম বাংলার দাসত্ব স্বীকার ক’রে আসছি, আর নয়।”–সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ
সহমত সুব্রত, আর নয়।
শাসকগ্রষ্ঠি যদি এইরকম চিন্তা করে থাকেন, তাদের প্রীতি উপহারমূলক এই ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ শেষ কথা, তাইলে উনারা খুবই ভুল করবেন। জনগণের ছাপ্প নেয়া নৈর্বাচিনক হঠকারিতা তো এক্ষণে স্পষ্ট হইয়া উঠছে দুনিয়াব্যাপী।
জনাব আফসান চৌধুরী
এই লেখার সাথে সম্পূর্ণ সহমত জানাচ্ছি। মৌলবাদ সবখানে। উনারা যা করবেন সব ঠিক। বাকিরা সবাই ভুল।
সব মন্ত্রিরা “সঠিক” ভাষায় কথা বলেন নাকি? আঞ্চলিক ভাষাগুলো কি বিকৃত?
সাধু থেকে চলিত ভাষার জনপ্রিয়তা বেড়ে যাবার সময়ও ‘সাধু-ভাষাপ্রেমিক’দের পক্ষ থেকে এমন অনেক প্রতিবাদ উঠেছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই সময়ের জন্য সবচাইতে উপযোগী ভাষাটাই টিকে গেছে। এখন যে ভাষারূপটাকে বিকৃত মনে হচ্ছে একসময় সেটাই হয়ত হয়ে উঠবে সর্বজনস্বীকৃত আর প্রচলিত ভাষারূপ। এখানে আইন-আদালতের দ্বারস্থ হওয়া মানে অবশ্যম্ভাবীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করা। যা শুধু সময় আর উদ্যোগের অপচয় মাত্র।
অনেক সুন্দর লেখা মি. চৌধুরী। ধন্যবাদ।
বাংলা ভাষার জন্য আমরা ৫২’র ভাষা আন্দোলনে রক্ত দিয়েছি । আসুন সবাই বাংলা ভাষাকে রক্ষা এবং শ্রদ্ধা করি । কিন্তু অন্যসব আদিবাসীরাও নিজের ভাষা রক্ষা করবে আদালত আদিবাসীদের সাহায্য করছেন কি?
লেখাটা ভাল হয়েছে – তবে ওই ফ্যাসিস্টদের উপর আক্রমণটা তীব্র হওয়া দরকার ছিল, ওরাই যে সমাজের দূষণ – ওদের সংশোধন করতে হবে। আর ওইসবজনদের credentials দেখতে চাই।
কোর্টের দেয়া ইংরাজি রায়রে স্বাগত জানাই। কারণ এইটার মাধ্যমে তারা স্বীকার কইরা নিছে যে সো কল্ড প্রমিত ভাষা ক্লিনিকালি ডেড। সেক্যুলারের তো আর ধর্ম নাই। ভাষারে অযুরত রাখনের নির্দেশ দেয়া ছাড়া আর কী উপায় থাকে!
ভাষা ব্যবহারে যুগধর্ম
by Mahmud Hasan on Thursday, February 23, 2012 at 2:38am ·
কোন ভাষার নিজস্ব ‘ধরণে’(pattern) এর অন্তর্লীন দর্শন ও ভাব সম্পদ মিশে থাকে।ভাষার মধ্যস্থতায় বস্তুরাজি ও তার সাথে সম্পর্কাদি অনুভব করায় এবং এই অপরের কাছে নিজেকে প্রকাশ করায় যে নিজস্বতা থাকে কোন বৈকরণিক কিংবা মান ভাষায় তা ধরতে গেলে এর অনেকটাই হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।অধিকন্তু এতে ভাষার সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত রূপটি হারিয়ে বক্তব্যের অকপট প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়। ভাষার বাগবিধিতে অঞ্চলভেদে ক্রিয়া পদ ও সর্বনামের ব্যবহারে যে পার্থক্য বা নিজস্বতা আছে ( ভাষার মৌখিক ব্যবহারে অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাস, জিহবা ,তালু, নাসিক্য ও দন্তের ব্যবহার দ্বারা যা নির্ধারিত হয়) তা বজায় রেখে লিখিত ভাষার চর্চা আজকালকার হাল ফ্যাশন। এছাড়া ভাষার ব্যবহারে শব্দ তরঙ্গীয় অভিঘাত (sonorous effect) বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই অনেক লেখককে আজকাল উচ্চারণ অনুসরণ করে বানান করতে দেখা যায়। এসব ব্যাপারে রক্ষণশীলদের অবস্থান যুগবিরোধী । সমস্যা হল, ভাষা ব্যবহারে যন্ত্রের মধ্যস্থতা এসে যাওয়ায় কম্পিউটারের কিবোর্ড/ম্যানুয়ালে খাপ খাওয়াতে গিয়ে ভাষার একটা গড়পড়তা ব্যবহারকে (common use) বেছে নিতে হচ্ছে। এমনকি কম্পিউটার প্রযুক্তির যুগে ভাষার নৈব্যর্ত্তিক ব্যবহার নিয়েও ভাষাতাত্ত্বিকরা বিস্তর কথা বলেছে । প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ও বানান বিধিও তদ্রুপ বিষয় । এগুলোর কোনটাই ভাষা দূষণের পর্যায়ে পড়ে না। তবে মান/প্রমিত ভাষা নির্ধারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ব্যবহারের ‘ধরণ’টাকে উপেক্ষা করা ভাষাবিরোধি কাজ। নিজের শরীরের মত ভাষাকেও অনুভব করতে হয়। তবে দুয়ের মাঝে ফারাক হল ভাষা শরীরের মত পচনশীল নয় । তবে ভাষার বিকৃতি রোধ ও বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য রাষ্ট্র ,বিদ্যায়তন ও প্রযুক্তির যে ফ্যাসিবাদী সংশ্লেষণ আমাদের চোখের সামনে ঘটছে তা সঠিকভাবে চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করাটাই এখনকার জরুরি কাজ । আর কৃষিভিত্তিক নারীকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে ‘দূষণ’জনিত ভীতির বালাই নেই। বরং এই সংস্কুতির প্রবল সংবেদনশীলতায় শস্য ক্ষেত্রের ‘আগাছা’ও মৃত্তিকা দেবীর প্রাণস্পন্দন হিসেবে চিহ্নিত ও লালিত হয়েছে।
স্বাধীনতার ৪০ বছর বা ভাষা আন্দলোনের ৬০বছর পরও আমরা বাংলাকে সম্পূর্নভাবে সর্বজনীন করতে পারি নি। চীন জাপান কোরিয়া ফ্রান্স ইত্যাদি ভাষা এখন কম্পিউটার ভাষা হিসাবে ব্যবহার হয়। এটা হচ্ছে আমার দুখের কথা আর আসল কথা হচ্ছে ” ভাষা হচ্ছে চলমান ” যেমন ধরুন মোবাইল,কম্পিউটার,চেয়ার ইত্যাদি বাংলা ভাষার সাথে মিশে গেছে। এখন যদি চেয়ারকে কেদারা বলেন অনেকে হয়তবা বুঝবে না। প্রতিনিয়ত ভাষায় নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে । যেমন ইংরেজী অভিধান অক্সফর্ড প্রতি বছর নতুন শব্দ সংযোজিত হয়ে নতুন সংস্করন বের হয়। আর বাংলা একাডেমি বাংলা অভিধান এর কয়টা সংস্করণ বের হয়েছে? ইউনিকোডে বাংলা টাইপ করলে বুঝা যায় বাংলা ভাষার কত সীমাবদ্ধতা। আর ভাষা পুলিশ দ্বারা বাংলা ভাষার কী করতে চান হাইকোর্ট?
খাসা কথা।
আপনার লেখাটা পড়ে আমি হতাশ এবং বিরক্ত । কেউ বাংলার সাথে ইংলিশ মিশালে ভাষা দূষণ হবে না কেন ? মনের ভাব প্রকাশের জন্য সবাই ভাষা মিশ্রণ করতে পারে , তাই বলে কি নিজের আভিজাত্য প্রকাশের জন্য ভাষা দূষণ করবে। দোআঁশলা ভাষায় পৃথিবীর সকল এফএম রেডিও একইভাবে কথা বলে–তথ্য হিসেবে এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
আপনি ভাষা পুলিশের কথা ভাবছেন । আর আমি ভাবিতেছি চোরের মনে পুলিশ পুলিশ কিনা !!
“পুলিশ” শব্দটি কোন ভাষা থেকে ধার করা?
শুধু ইংরেজি ক্যান, বাংলা তো (আর সব ভাষার মতই) অন্য অনেক ভাষা থেকে ধার করেছে…উনার এই মন্তব্যের বেশিরভাগ শব্দের etymology ঘাটলে না মজা দেখা যাবে| রেডিও, দো-আশলা, ইত্যাদি, ইত্যাদি…
একটা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার হওয়ার পর এইটা এখন আমাদের শব্দ । তাই বলে যে যার মত করে যখন তখন বিদেশী শব্দ আমাদের ভাষায় ডুকিয়ে দিবে , বিকৃত উচ্চারণ করবে ? তাহলে তো বাংলা ব্যাকরণের আর শিখতে হবে না ।
“বিকৃত উচ্চারণ” কোনটা? ঢাকাইয়া? নাকি সিলেটি? “পুলিশ” শব্দটি যেই ভাষাবিদ চুরি করলেন, চুরিটাও তো ঠিক মতো করতে পারেননি। সবচেয়ে কম ভুল উচ্চারণটি হবে “পোলিস”। (In fact, the current pronunciation for “P” does not exist in Bangla.)
“ডুকিয়ে” মানে কি, স্যার?
“দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার” কিভাবে হবে যদি ব্যবহারের উপর ভাষা-মৌলবাদীরা হামলা-মামলা চালায়?
“current” এর বদলে পড়ুন “correct”। দুঃখিত।
“একটা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার হওয়ার পর এইটা এখন আমাদের শব্দ ।”
কত মানুষ কত দিন ধরে ব্যবহার করলে কোন শব্দ ‘আমাদের’ হয়ে যায়? এই বিষয় নির্ধারণ করতেও একখান কমিটি গঠন করা কর্তব্য, কি বলেন?
যারা বাংলার বদলে উর্দুকে আমাদের ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তারা ভাষাকে অত্যন্ত সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিল। তাদের কাছে এটি একটি মহৎ কাজ বলেই মনে হয়েছিল! এখন যারা কথিত প্রমিত বাংলার নিশান-বরদার তাদের সাথে কার্যত উর্দুঅলাদের যে তেমন একটা পার্থক্য নেই, সেটি বোঝার মতো
জ্ঞান-বুদ্ধি এঁদের আছে বলে বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ আছে কি?
সেদিন আদালত বলেন, বাংলা ভাষা এতটাই সমৃদ্ধ যে, গীতঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে। এটা বাংলা গীতাঞ্জলির ধারে-কাছেও যেতে পারেনি।(কালের কণ্ঠ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২)
এনারা জানেন না যে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি গীতাঞ্জলির জন্যেই নোবেল পান।
ভাষা নিয়ে আলোচনাগুলো সত্যি ভাল, বাংলার মতো গতিশীল একটা ভাষার জন্য এমন আলোচনা আরও অধিক ফলদায়ক। যতক্ষন পর্যন্ত মুক্ত অবারিত ভাবে আলোচনা গুলো চলবে ততক্ষণ ভাষা নিজে তার চেহারাটা দেখে নেবে এই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী এবং ভাষ্যকারদের দেখানো আয়নায়।
যারা ভাষা নিয়ে কথা বলছেন তাদের মধ্যে ভাষাতাত্ত্বিক (লিংগুইষ্ঠিক্স) পণ্ডিত আরও বেশী পরিমানে থাকলে ভাল হতো। যেখানে সমাজতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক এবং জাতিতাত্ত্বিক (সোশিওলজিষ্ঠ, এনত্রপোলোজিষ্ঠ এবং এতনোলোজিষ্ঠ) দৃষ্টিভঙ্গীতে মানুষের মুখের ভাষা, আনুষ্ঠানিক / দাপ্তরিক ভাষা এবং সাহিত্যের ভাষার মধ্যে ফারাকটা আমারা বুঝে নিতে পারতাম। আসলে অনেক ভাষ্যকার/ আলোচক ভাষার ব্যাবহারিক আর আনুষ্ঠানিক বিষয়টি আমাদের ধরিয়ে দিতে পারেন না।
বরং এক বিশুদ্ধবাদী ধারণাপ্রসুত মনভঙ্গিতে ভাষার “দূষণ” এর বিষয়টি উপস্থাপন করেন। যেখানে আমরা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যাই। কখনো আতংকিত হই; “হাঁয় আমি (চট্টগ্রাম/ সিলেট/ নোয়াখালী/ বরিশাল এলাকার মানুষদের বেশিরভাগ) তো এভাবে বিশুদ্ধ ভাবে বলতে পারিনা, কখন আবার আদালত পুলিশ নিয়ে কোন বিপদে পড়ে যাই”।
অনেক সুন্দর লেখা মি. চৌধুরী। ধন্যবাদ। ভাষার রুপ নির্ণয়ে অধিকারের প্রশ্নটি জড়িত। আপনি যথার্থভাবে তা বিশ্লেষণ করেছেন। অনেক ধন্যবাদ। ইংরেজি শেখাটাও এখন জরুরী, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। শহুরে এলিটদেরকে পরাস্ত করার জন্য। এখানেও অধিকারের বিষয়টি জড়িত। ভালো থাকুন।
ভাষা বিকৃতি ঠেকাইতে হাইকোর্ট ভাষা মোড়ল নিযুক্ত করতে চায়। ড. আনিসুজ্জামান এই মোড়লী গ্রহণে আপত্তি জানাইছেন এমন জানা যায় নাই।
আমি মনে করি প্রমিত একটা বিকৃত ভাষাভঙ্গি। সংকোচনমূলক বিকৃতির মাধ্যমে এই জিনিস তৈরি হয়। কিন্তু আমি নিজে ভাষাবিকৃতির যেহেতু বিরুদ্ধে না, তো এই ভাষার বিরুদ্ধে আমার কোনো অবস্থান নাই। খালি ড. আনিসুজ্জামানকে বলব–ভাষাহুজুর, প্রমিত বাদে আর সবই প্রাকৃত, প্রমিতই যথার্থ বিকৃত ভাষা। তবে কলকাতা থিকা যারা এই দেশে আইছেন তাদের জন্য তা প্রমিত নয়, প্রাকৃতই বটে। কিন্তু সেইটা এই দেশের প্রশাসনে আইন আদালতে গিলাইতে চাওয়াটা মোহাজেরদের টিকা থাকার রাজনীতির অংশ। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, যাঁর বাংলার টানে সিলেটি বাতাস বয় তিনি কেন শুদ্ধতা নিয়া পড়লেন!
খাসা কথা বলেছেন। ধন্যবাদ ব্রাত্য রাইসু।
এদেরকে ভাষা মৌলবাদী বলা যায়। linguistic terrorist.
যেখানে ভাবের আদান প্রদানটাই মুখ্য সেখানে ভাষা কোন মুখ্য বিষয় নয়। এমনকি আমরা অঙ্গভঙ্গী, ছবি অথবা শব্দের মাধ্যমেও তা প্রকাশ করতে পারি। অন্যদিকে অনেকক্ষেত্রে যেমন আইন ও আদালত, যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে কোনকিছু বলতে হয় অথবা সর্ব সাধারনের উদ্দেশ্যে বলা বা লেখার সময় প্রমিত বাংলারও প্রয়োজন আছে।
আফসান চৌধুরী সাহেবকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এই চমৎকার লেখাটির জন্যে। আমাদের আদালতের যে অভাবিতপূর্ব নজির এই খাপছাড়া রুলিং, যেখানে আগে আইন ক’রে পরে অপরাধের প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য কমিটি গঠিত হয়; যেখানে আদালত বাঙালির প্রথম এবং প্রধান মৌলিক অধিকারে নাজায়েজ হস্তক্ষেপ করে, যেখানে দেশের মাতব্বর দৈনিকে ছাপানো কোনো ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপকের লেখা একটা আবেগদুষ্ট প্রবন্ধ জাতির ভাষা-ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে, সেখানে এইরকম যুক্তিনিষ্ঠ প্রতিবাদ যে হচ্ছে, কবিকল্পনা (ভাষাদূষণ=নদীদূষণ)-র বিপরীতে ভাষাতাত্ত্বিক-সমাজতাত্ত্বিক কৈফিয়ত তলব করা হচ্ছে, এ বড়ই আশার বাণী। বাংলা ভাষা যে কেবলই “বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র” কি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের, বাংলা অ্যাকাডেমি বা এমনকি আদালতেরও পৈতৃক সম্পত্তি নয়, নয় তা কেবলই কোনো একদলীয় “গণ”তন্ত্রে বিশ্বাসী, দেশপ্রেমের চিরস্থায়ী মৌরুসি-পাট্টা নেওয়া কোনো রাজনৈতিক দলের, এই বোধ বাঙালি মাত্রের মনে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা আমাদের করতেই হবে; সে হবে আমাদের দ্বিতীয়, এবং বৃহত্তর, ভাষা আন্দোলন। আমরা বড় বেশিকালযাবৎ এক কৃত্রিম বাংলার দাসত্ব স্বীকার ক’রে আসছি, আর নয়।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায় … … এখানে কি ভাষা দূষণ আছে?
coffee house এর সেই আড্ডাটা আজ আর নেই … … এখানে?
কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই … … … এখানে?
বাংলাভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে বেশি বেশি বিদেশী শব্দ আত্মস্থ করার মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়া হঠাৎ একদিনে শুরু ও শেষ হয়ে যায় নি। আবার কোন একটি বিশেষ পন্ডিতমহলের মাধ্যমেও এ কার্যটি সমাধা হয় নি। দীর্ঘকাল ধরে সাধারন মানুষ একটি দুটি করে বিদেশী শব্দ ব্যবহার করতে করতে বর্তমানের ভাষায় তার প্রচলন ঘটিয়েছে । এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া যা ২০১১ সালে সমাপ্ত হয়ে যায় নি বলে মনে করি।
ভাষা পুলিশ চাই না। পুলিশের বাংলা প্রতিশব্দও চাই না। যেটি চাই তা হলো বাংলা ভিজ্যুয়াল বেসিক কম্পাইলার- যা বাংলা অনুরূপ প্রোগ্রামিং স্ক্রিপ্টকে মেশিন ভাষায় রূপান্তর করতে পারবে।
একমত।।।।।।।।।।।।।।।
চমত্কার লিখেছেন। আপনাকে অভিনন্দন।
ভাষা নিয়ে লেখা বড়াবড়ই বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়ি। এবং আপনারটা্ও পড়লাম।
কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে কি, আমার কাছে আদালতের ব্যাপারটি বাড়াবাড়ি মনে হলেও প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। কারন যে হারে ভাষার বিকৃত অবস্থায় গণমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে তাতে করে বাংলা ভাষা নষ্ট হয়ে যেতে খুব বেশিদিন লাগবে বলে মনে হয় না।
এখন আপনি বলছেন, যে সব জায়গার এফ এম রেডিওতেই এমনভাবে বলা হয়ে থাকে। আপনার অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে আসলে কতদূর তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোন্ও ধারনা নেই। কিন্তু বেশিরভাগ যে সমস্ত রেডিওতে এসব অদ্ভুত উচ্চারনে কথা বলা হয় সেগুলি কালোদের সৃষ্টি, অথবা কালো অধ্যূষিত অঞ্চলে চলে। এবং তাদের এইসব হাস্যকর উচ্চারনে ভাষা বিকৃতিকে কোনও দিকেই ভাল হিসেবে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ না। কালোদের কাজ অনুসরন করে আমার ভাষাকে বিকৃত করা হচেছ সেটা্ও আমার খুব পছন্দের না। তাই আদালতের আদেশকে এক্ষেত্রে আমি সমর্খন দিচ্ছি। ভাষাকে আরও সুন্দর করে তোলার ক্ষেত্রে যাদের ভূমিকা থাকা উচিত সবচেয়ে বেশি, তারাই যদি একে ক্রমশ বিকৃত করে তুলে থাকে, তাহলে তাদের জন্যে আইন কিছুটা থাকা উচিত বলেই আমার মনে হয়। আর ভাষার বিকৃতটাকে দূষন বললে সমস্যা কোখায়?
“কিন্তু বেশিরভাগ যে সমস্ত রেডিওতে এসব অদ্ভুত উচ্চারনে কথা বলা হয় সেগুলি কালোদের সৃষ্টি, অথবা কালো অধ্যূষিত অঞ্চলে চলে। এবং তাদের এইসব হাস্যকর উচ্চারনে ভাষা বিকৃতিকে কোনও দিকেই ভাল হিসেবে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ না।”
আপনার কথাগুলো বর্ণবৈষম্যমূলক। বাংলাদেশের মানুষ কি অনেক “সাদা”? নাকি যথেষ্ট “সাদা”? “কালোদের সৃষ্টি” আপনার ভাল না লাগলে অন্য কারো সৃষ্টি উপভোগ করেন গিয়ে। কোনটা “বুদ্ধিমানের কাজ” সেই সবক না দিলেও চলবে। কালো সংস্কৃতিকে ঢালাওভাবে অপমান করার জন্য আপনার লেখাকে ধিক্কার জানাচ্ছি।
বিকৃত কোনটা আর সঠিক কোনটা, সেই বিচার কার? বাংলা নিজেই তো সংস্কৃত ভাষার বিকৃত রূপ। ইংরেজি ল্যাটিনের বিকৃত রূপ। তাহলে সবাই এখন থেকে সংস্কৃত আর ল্যাটিন বলি।
মার্কিন মুলুকে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠির যে ভাষা, যাকে Ebonics বলা হয়, তা নিতান্তই ভাষা বিকৃতি এবং কালোদের অশিক্ষা এবং অজ্ঞানতা উদ্ভূত, এই ধারনাটিই আসলে অশিক্ষা এবং অজ্ঞানতা উদ্ভূত | Ebonics বাক-রীতির নিজস্ব কিছু ধরণ আছে, এটির বিবর্তন এবং ব্যবহারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় তার শেকড় বর্ণবৈষম্যের এবং ক্ষমতার দ্বন্দের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত | অনেক শিক্ষিত কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিও Ebonics ব্যবহার করে কারণ এটি ব্যবহারের মাধ্যমে cultural reclamation-এর কাজটি সে করতে পারে | Ebonics-কে Standard English-এর চাইতে নিচু করে দেখার বিষয়টি কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠিকে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠির চাইতে নিচু বলে দাবি করার বিষয়টি থেকে আলাদা করে দেখবার কিছু নেই |
যে সমস্যাটি নিয়ে লেখাটির শুরু তা কিন্তু আমরা এখানে ভুলে যাচ্ছি। এফএম রেডিওর যে ভাষাটি আর.জে রা তৈরী করছে তা আদতে কারো ভাষা কিনা তা কি আমরা অনুধাবন করতে পারি না? বাংলাদেশের কয়জন লোক এই তথাকথিত ভাষায় কথা বলে? এই ইংরেজ ভাবীয় বাংলা সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে নাকি সমাজের উচ্চশ্রেণীর সন্তানেরা তৈরী করছে? স্বীকার করছি যে এখানে আদালত তার লম্বা হাত বিস্তৃত করেছে কিন্তু এই কৃত্রিম বিকৃতকরণ কি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন না! যা ঘটছে তা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন না।
“এই ইংরেজ ভাবীয় বাংলা সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে নাকি সমাজের উচ্চশ্রেণীর সন্তানেরা তৈরি করছে? ”
ভাই, প্রমিত বাংলা কাদের ভাষা? বাংলাদেশের কতজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে প্রমিত বা ‘শুদ্ধ’ বাংলা ব্যবহার হয়? যদি সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের ব্যবহার ভাষার যথাযথতা প্রমানের একটি চাবিকাঠি হয়, তাহলে প্রমিত বাংলা কি কোন ভাবেই সেখানে জায়গা পায়? পায় না| প্রমিত বাংলা পুরোপুরিই সমাজের উচ্চশ্রেণীর সন্তানদের একটি construct, আপামর জনগোষ্ঠির সাথে এর সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে | শ্রেনীর প্রশ্ন যদি তুলতেই হয়, তাহলে middle class কে প্রধান মনে করার কোন বিশেষ কারন আছে কি?