ফখরুজ্জামান চৌধুরী

ওকলাহোমার অলীক পূর্ণিমা

জানুয়ারী ৩১, ২০১২

jaman-f11নিয়ন আর মার্কারির আলোয় ঢাকার আকাশে পুর্ণিমার চাঁদকে কেমন ম্লান মনে হতো। অথচ ঢাকার চেয়ে অনেক বেশী আলোয় আলোকউদ্ভাসিত রাতে পূর্ণিমার আলোয় ওকলাহোমাকে মনে হচ্ছিলো যেন স্বপ্নপুরী। জনবিরল বিশাল এই নগরীর মানুষগুলি উইক ডেতে সন্ধ্যা নামার আগে ভাগেই ঘরমুখী হন।

আটটায় তো রীতিমতো নিশুঁতি রাতের নীরবতার ঘেরাটোপে ঘুমিয়ে পড়ে ওকলাহোমা। জ্যোৎস্নার আলোয় মাঝে মাঝে নৈশবিহার করতে দেখি হরিণ, কিম্বা কাঠবেড়াল আর টার্কির ছোটো খাটো একটা ট্রুপকে। নির্ভয়ে প্রধান সড়ক ধরে হেটে যায়।

ওকলাহোমার এই প্রশান্তি এখন নাগরিকদের মনে আনন্দের প্রলেপ বোলাতে পারে না। চারদিকে কেমন যেন একধরণের অস্থিরতা। অর্থনৈতিক মন্দার কবলে যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বময় এক নম্বর জানা। যুক্তরাষ্ট্রের মন্দার রেশ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে।

মার্কিনীরা অর্থনৈতিক মন্দার কবলে একবার পড়েছিলেন সেই কবে-গত শতকের তিরিশের দশকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে। শেয়ার বাজারে ধ্বস নামতে শুরু করে ১৯২৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। শেয়ার বাজার ধ্বসের চূড়ান্ত রূপ মার্কিনীরা প্রত্যক্ষ করলেন এক মাস পরেই ২৯ অক্টোবর। অর্থনীতিবিদরা দিনটির নামকরণ করেন ‘কৃষ্ণ মঙ্গলবার।’

ব্যবসা বাণিজ্যের মন্দার সঙ্গে দেখা দিলো ফসল হানি। কৃষিজমিতে ফসলের পরিবর্তে ধুলার আস্তরণ। আর বৈরি প্রকৃতির তাণ্ডব দেখা দিলো ধুলো ঝড়ের আকারে। ধুলো ধুসরিত গোটা দেশের মধ্যে ওকলাহোমার নাম হলো ‘ডাস্টবৌল’ (ধুলির গামলা)। ওকলাহোমা ছেড়ে আসা কৃষিজীবী জোড্স্ পরিবারের সংগ্রামী জীবনের কাহিনী নিয়ে মার্কিন ঔপন্যাসিক জন স্টেইনবেক লিখলেন কালজয়ী উপন্যাস ‘দি প্রেপ্স অব দা রেথ’। ভাগ্যের সদ্ধানে জোডস আরো ‘ওকিস’ (ওকলাহোমাবাসীকে সংক্ষেপে বলে) পাড়ি জমালেন কালিফোর্নিয়ায়। কালজয়ী এই উপন্যাসের জন্য স্টেইনবেক পুলিৎজার পেলেন ১৯৪০-এ এবং নোবেল পুরস্কার ১৯৬২ সালে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠলো যুক্তরাষ্ট্র তার বত্রিশতম প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্টের (১৯৩৩-১৯৪৫) নেতৃত্বে। জাতিকে তিনি বিশ্বাস করতে বললেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত সেই গান ‘হ্যাপি ডেইজ আর হেয়ার এগেইন’- এর কথা ও ধ্বনিতে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় অস্থির মানুষকে তিনি বললেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করার সময় তিনি যে উক্তি করেছিলেন, তার প্রতি আস্থা রাখতে। আমাদের একমাত্র ভয়ের বস্তই হলো ভয়।

তিরিশের মন্দা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক মহাশক্তি। আবার মন্দাক্রান্ত দেশের অর্থনীতি। ‘ওয়াল স্ট্রিট অকুপাই’ করার মতো নীরব গনজাগরণ বিশ্বাবাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছে। বলা হলো শতকরা এক ভাগ লোকের বিরুদ্ধে নিরানব্বই ভাগ লোকের ছিলো এই স্বস্তঃস্ফূর্ত সমাবেশ। যেসব মার্কিনী মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরব বসন্ত’ নামক গণবিপ্লব দেখে দেয়ালে পরিবর্তনের ভাষা পড়েছিলেন, ওয়াল স্ট্রিষ্টের সমাবেশে তারাই শংকাবোধ করেন।

শেক্সপিয়র বলেছিলেন, মুকুটধারী রাজমস্তক, অস্বস্তিতে থাকে। তারই অনুকরণে বলি, কর্পোরেট হাউসের মুকুটধারীদের এখন অস্বস্তি আর অশান্তির দীর্ঘ রজনী।

ইতিমধ্যে অনেক মাথা কাটা পড়েছে। আরো পড়ার ভাব।

বড় বড় কর্পোরেট হাউসের মাথা কাটা পড়ছে হরদম। একদম বাদ না পড়লে পদাবনতি হচ্ছে।

ব্ল্যাকবেরির দুই মহারথী একসঙ্গে কাটা পড়লেন। এই আর্থিক দৈন্যদশার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে। নভেম্বরের ৬, মঙ্গলবার। সাল ২০১২।

জাতির উদ্দেশ্যে তৃতীয় স্টেট অফদি ইউনিয়ন ভাষণে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অনেক আশার কথা শোনালেন। যারা অনেক বিত্ত বৈভবের মালিক তাদেরকে আরো বেশি কর দিতে হবে।

ওকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের মূল দাবী ছিলো, শতকরা নিরানব্বই ভাগ মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে একভাগ মানুষ। এখন বৈষম্য আর অবিচারের অবসান ঘটতে হবে।

ধনতান্ত্রিক বিশ্বের মানুষ এমন স্বপ্ন দেখতে পারেন। কিন্তু অলীকই থেকে যাবে সেই স্বপ্ন। এখন স্বপ্নকে সফল হতে হলে যে পরিবর্তন জরুরি, তার জন্য প্রস্তুতি এখন যোজন যোজন দূর।

এডমন্ড, ওকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র।

ফখরুজ্জামান চৌধুরী
: প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক।

Tags: ,

WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
| | More
 -------------------------------------------------------------------------
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর নিজস্ব। bdnews24.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bdnews24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)

-------------------------------------------------------------------------

৪ প্রতিক্রিয়া - “ ওকলাহোমার অলীক পূর্ণিমা ”

  1. Mahfuzur Rahman on ফেব্রুয়ারী ১০, ২০১২ at ৪:২৪ অপরাহ্ণ

    তাই আমাদের সামনে একটিই স্বপ্ন হল নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ভাল লাগল ।

  2. সুদীপ্ত শরিফ on ফেব্রুয়ারী ৩, ২০১২ at ৮:৪৯ অপরাহ্ণ

    ভাল লাগল। ধন্যবাদ

  3. শোহেইল মতাহির চৌধুরী on ফেব্রুয়ারী ১, ২০১২ at ৪:৫৬ অপরাহ্ণ

    জামান ভাই, অনেক অনেক দিন পর আপনার লেখা পড়লাম। লেখা নিয়ে কিছু বলার ধৃষ্টতা নাই। ভালো থাকবেন।

  4. Md. Gias Uddin on ফেব্রুয়ারী ১, ২০১২ at ১:০৫ অপরাহ্ণ

    ওকলাহোমার অলীক পূর্ণিমা : লেখাটি যথেষ্ঠ যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তব। তবে লিখলে কি হবে জাতি যে-স্বপ্ন দেখে পরে সরকার এসে তা ভন্ডুল করে দেয়, ধু্লিস্যাত করে দেয় সব স্বপ্ন। তাই জাতি এখন আর স্বপ্ন দেখে না কোন সরকারকে নিয়েই। কারণ ক্ষমতায় এসে সবাই বেইমানী করে থাকে। তর্কমান সরকারকে নিয়ে জনগণ বেশি স্বপ্ন দেখেছিল কিন্তু তারাই বেশি স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তাই আমাদের সামনে একটিই স্বপ্ন হল নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ধন্যবাদ!

মন্তব্য করুন

প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes

ফেসবুক লিংক

ট্যাগ

আর্কাইভ